somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার গায়ে কাপড় নেই, তারপরেও আমি লজ্জিত নই

০৩ রা জুন, ২০১১ দুপুর ১২:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১ ফেব্রুয়ারি, ২০১০। সোমবার। সকাল এগারোটা বেজে ত্রিশ মিনিট।

নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুর-বিরিশিরি হয়ে কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছালাম অফিসের কাজে। বিরিশিরি থেকে প্রায় দেড় ঘন্টা মোটরসাইকেল জার্নি শেষে পৌঁছানোর পর শুনলাম ’উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা’ ছুটিতে আছেন। অফিসে পেলাম পরিসংখ্যানবিদ মাসুদ সাহেবকে। কাজের ব্যাপারে তিনিই সার্বিক সহযোগিতা করলেন আমাকে।

কাজের প্রয়োজনেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখার সময় হঠাৎ দেখা হয়ে গেল আমার কলেজ জীবনের বন্ধু ডা: নাফিসের সাথে। সে এখন এখানকার মেডিকেল অফিসার। আমাকে দেখেই হাসিমুখে তার রুমের ভেতর আসতে বললো নাফিস। তারপর কুশলাদি বিনিময়ের পর জিজ্ঞেস করলো, “কি খাবি? চা-সিগারেট চলবেতো?” আমি কিছু বলার আগেই সে তার পিয়নকে দু’জনের জন্যে বেনসন আর চা আনতে বলে দিল।

“তারপর বল্ দোস্ত্, আছিস কেমন? কতদিন পর তোর সাথে দেখা! বিয়ে-শাদী করেছিসতো? নাফিসের প্রশ্নের উত্তরে হেসে বললাম, “এইতো দোস্ত, একাই চলে যাচ্ছে কোন রকম। তোর খবর বল।”

“হেহ:! আমাদের আর খবর? এই গাঁও-গেরামে পড়ে আছি বছরের পর বছর। ট্রেনিং পোস্ট-এর জন্য ট্রাই করতেছি। কিন্তু বুঝসইতো। সরকার সমর্থিত চিকিৎসক পরিষদে নাম লেখালেও ভালো করেই জানি, টাকা ছাড়া ট্রেনিং পোস্ট পাবোনা। তবে তোদের কথা আলাদা। তোরাতো ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে কাজ করিস। মেলা টাকা তোদের, হিংসা হয় আমার মাঝে মাঝে, বুঝলি?।” কথার মাঝখানে পিয়ন এসে বেনসন আর চা দিয়ে গেল। নাফিসের দিকে সিগারেট ধরানোর ব্যাপারে জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে তাকালাম। সে বললো, “আরে, বাইরে কি যাবি?! রুমেই ধরা। ব্যাপার না।"

চা পর্ব শেষ হতে না হতেই দেখি একের পর এক তিন-চারজন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ এসে বেশ খানিকক্ষণ নাফিসের সামনে বিনীতভাবে তাদের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীর কিছু ওষুধের গুণগাণ করলো। নাফিস কোনটাই মন দিয়ে শুনলো কিনা বুঝলামনা। যাবার আগে প্রত্যেকেই বেশ কিছু প্যাড, কলম আর ’গিফট আইটেম’ দিয়ে গেলো। একজনকে দেখলাম একটু আড়াল করে নাফিসের হাতে একটা খাম গুঁজে দিল। আড়চোখে তাকিয়ে বুঝলাম, সাদা খামের ভেতরে পাঁচশো টাকার নোট আছে কয়েকটা।

“এই ওষুধ বিক্রেতা মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের নিয়ে বিপদে আছি বন্ধু।” নাফিস বলে চললো, “এক ব্র্যাণ্ডর ওষুধ একটা রোগীকে দিলে পরের রোগীকে আরেক ব্র্যাণ্ড দিতে হয়। বুঝসইতো, সবাইরে খুশী রাখতে হয়। তবে একটা কথা ক্লিয়ার। যারা বেশি গিফট দিবে, তাদেরটাই আমি লিখবো। আর যারা মাসিক চুক্তিতে খাম দেয়, তাদেরটা লেখাতো মাস্ট। এই যে এখন যেমন দিয়ে গেল আর কি ... হে: হে: হে: ...।”

“তবে সত্যি কথা কি জানিস দোস্ত, কেউ-ই এই গ্রামে পড়ে থাকতে চায়না।” আয়েশ করে চেয়ারে পায়ের ওপরে পা তুলে নাফিস বলতে লাগলো, “চাকরির শুরুতে আমিও ব্যাপক টাকা ঢালছিলাম ঢাকার আশেপাশে বদলি নেওয়ার জন্য। কিন্তু কপালটা খারাপ। মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় তখনকার ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি করছিলাম বলে এই সরকার আসার পরপরেই আমাকে মানিকগঞ্জ থেকে এখন এই রিমোট অঞ্চলে পোস্টিং দিছে। তবে অসুবিধা নাই। সময়মতো দল বদল করে ফেলছি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আরও ’ইনভেস্ট’ করতেছি। আল্লাহ ভরসা। এইখানে পড়ে থাকলে লাইফ পুরাই শেষ। এই আজাব থেকে তাড়াতাড়ি মুক্তি পেতেই হবে।”

“তার মানেতো তোকে এখন নিয়মিতই এখানে থাকতে হচ্ছে?” জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে তাকালাম নাফিসের দিকে।”

“কি আর বলবো বল্, ভাগ্যটাই খারাপ।” নাফিসের কণ্ঠে বিষন্নতা। “এইখানে জয়েন করার পর আমার বস্ ’উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার’কে নিয়মিত টাকা দিয়ে ’সিস্টেমে’ ঢাকাতেই থাকতাম। আল্লাহর রহমতে ভালোই প্র্যাকটিস জমাইছিলাম। বড়স্যার মানুষ ভালো। টাকা পেলেই খুশী। কোন ঝামেলা করেননা। কাগজে কলমে আমি এখানে, আসলেতো আমি ঢাকায় নিজের ধান্দায় আছি। কিন্তু কিছুদিন আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা এখানে ভিজিট করে আমাকে স্টেশনে পায় নাই বলে সাময়িক ’সাসপেণ্ডের মতো’ একটা ব্যাপার করছিল। ওইটা আবার পরে টাকা দিয়ে সিস্টেম করে ঠিক করে ফেলছি।”

“কি সাংঘাতিক ব্যাপার?! তোর উপর দিয়েতো অনেক বিপদ গিয়েছে তাহলে?” আমি নাফিসের কথা শুনে রীতিমতো উদ্বিগ্ন।

“আরে ব্যাটা, বিপট-টিপদ কিছুনা। এইটা বাংলাদেশ। সব সম্ভব এইখানে। ভুইলা যাস কেন? টাকা থাকলে এইসব ’সিস্টেম’ কোন ঘটনা না। শুধু চ্যানেলটা খুঁজে বের করে জায়গা মতো টাকা ইনভেস্ট করো। খেলা ফাইনাল।” নাফিস একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে লাগলো, “শোনো বন্ধু, আমাদের বাংলাদেশী ডাক্তারদের জীবনটা অনেক সংগ্রামের। বহু টাকা খরচ করে বাংলাদেশের নামকরা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করলাম। তারপর ’সোনার হরিণ’ বিসিএস পরীক্ষায় কত কষ্ট স্বীকার করে স্বাস্থ্য ক্যাডারে হাজার হাজার পরীক্ষার্থীর মাঝে নিজের জায়গা করে নিছি। এরপর এই চাকরীতে এসে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আর সিভিল সার্জনের দপ্তরে বখরা দেওয়া ছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিয়মিত লবিং করে, নিজের কষ্টার্জিত হালাল টাকা ঘুষ দিয়ে একটা সুবিধাজনক পোস্টিং বা ট্রেনিং পোস্টের জন্য দিনরাত ঘুরতেছি।”

”মজার ব্যাপার কি জানিস?” কৌতুকের ভঙ্গিতে নাফিস চোখ নাচালো। ”মহাখালীর ওই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এলাকাটা এমনই এক বিচিত্র জায়গা, যেখানে ডাক্তারের চেয়ে পিয়নের দাপট বেশি; যেখানে কোন ডাক্তার ’স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ’ করুক আর ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ করুক, ঘুষের টাকা তাকে জায়গা মতো দিতে হবেই।

“কিন্তু নাফিস, বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা পদ্ধতি পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক ভালো বলেই তো জানতাম।” নাফিসের কথার মাঝখানে একটু বাধা দিয়েই বললাম কথাটা।

“ওগুলো কাগজ-কলমে বন্ধু। বাস্তবতা অনেক ভিন্ন।” নাফিসের কণ্ঠে স্পষ্ট ক্ষোভের বহি:প্রকাশ লক্ষ্য করলাম। এই যে এত কষ্ট করে এত টাকা খরচ করে ডাক্তার হলাম, গ্রামে পড়ে থেকে রোগীদের সেবা করছি - এসব কথা কি কেউ মনে রাখে? আর বিএনপি বলিস, আর আওয়ামীলীগ, কোনো সরকারই কি আমাদের কথা খেয়াল রাখে নাকি?”

“ডাক্তারদেরকে গ্রামে থেকে রোগীদের সেবা দিতে হবে - এসব বুকিশ কথাবার্তা বলে মন্ত্রীসাহেব মুখে ফেনা তুলছেন। অথচ এইসব রিমোট অঞ্চলে একজন ডাক্তার থাকতে পারবে কিনা, লোকবল, যোগাযোগ ব্যবস্থা ঠিক মতো আছে কিনা, চিকিৎসার সরঞ্জামাদি, ওষুধপত্রের সরবরাহ পর্যাপ্ত কিনা -এইগুলার নাই কোন খবর। আর জোর করে ডাক্তারদেরকে গ্রামে পাঠালেই হলো? যত্তোসব বাকওয়াজ। আর তার উপরে উপজেলা লেভেলে রোগীর চিকিৎসাও করো আবার লোকাল পলিটিক্সও সামলাও। এইসব ঝামেলা আর কতদিন পোহাতে হবে আল্লাহই জানে।” রুমালটা বের করে নাফিস মুখটা মুছলো।

কথা প্রসঙ্গে নাফিসকে নিজের আর একটি কৌতুহল জানালাম, “একটা কথা আমি শুনেছি দোস্ত, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বাংলাদেশে ডাক্তারী পাশ করে ছেলেমেয়েরা। কিন্তু তারপরেও বিদেশের অনেক দেশ যেমন ইংল্যাণ্ড, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা-কানাডায় বাংলাদেশী ডাক্তারদের আবার ওইসব দেশের নিজস্ব সিস্টেমে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করতে হয়। তারপর সেখানে প্র্যাকটিসের অনুমতি মেলে। বাংলাদেশ সরকার কি পারেনা ওইসব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে মিল রেখে নতুন যুগোপযোগী ডাক্তারী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে? যেন বিদেশে বাংলাদেশী ছেলেমেয়েরা পাশ করার পর বাংলাদেশী সার্টিফিকেট দিয়েই সরাসরি প্র্যাকটিস করতে পারে? আর বাংলাদেশেতো এখন মাশাল্লাহ সরকারী বেসরকারী অনেকগুলো মেডিকেল কলেজ এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট রয়েছে যেখান থেকে সরকার চাইলেই দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও ডাক্তার-নার্স সরবরাহ করে ব্যাপক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে।”

আমার প্রশ্ন শুনে নাফিস এমন জোরে হা হা করে হেসে উঠলো যে আমি একটু বিব্রত বোধ করলাম। খুব বোকার মতো কি প্রশ্নটা করেছি আমি? উত্তরটা নাফিস-ই দিয়ে দিল। “তুইতো দেখি চরম দেশ প্রেমিক হয়ে গেলি রে! আমাদের মন্ত্রী মিনিস্টারদের এইসব ভাবার টাইম আছে নাকি? অন টপ অব দ্যাট, আমরা বাংলাদেশীরা আর একজন বাংলাদেশীর ভালো কখনো সহ্য করতে পারি নাকি? আমাদের মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী আর আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার শিক্ষকগণ চিন্তা করেন, তারা অনেক কষ্ট করে এত দূর এসেছেন, আর কেউ উপরে উঠুক এটা তারা আদৌ কি মন দিয়ে চান? তারা কি আসলেই এতটা বড় মনের অধিকারী? বিদেশী মানসম্মত আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা কারিকুলাম তৈরি করলে ভবিষ্যতে ডাক্তাররা বিদেশে পাচার হয়ে যাবেন - হয়তোবা এই ধোঁয়া তুলেই তারা ক্ষ্যান্ত। আরে ভাই, আপনাদের কলুষিত রাজনীতির গন্ধ পরিবেশ থেকে বাঁচার জন্যে শুধু ডাক্তার না, কোটি কোটি বাংলাদেশী এখন গোপনে বা প্রকাশ্যে ব্যস্ত কিভাবে বিদেশে পাড়ি দিয়ে ওই ’ডাস্টবিন’ থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়। আর 'বিদেশে মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে যারা মুখে ফেনা তুলছে, তারা দ্যাখ গিয়ে নিজেরাই এই দেশের টাকায় বিদেশে নিজেদের ছেলে-মেয়েদেরকে পড়াচ্ছে। এখন অন্যান্য সেক্টরের মতো আমাদের হেল্থ সেক্টরটাও দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। ভেবেছিলাম, আমাদের জেনারেশনটা অন্তত: ভালো কিছু করে দেখাবে। কিন্তু কিসের কি, আমরাও পুরাই সিস্টেমে আছি। হে: হে:...।"

“ভালো কথা, এখানে তুই প্র্যাকটিস করিস কোথায়?” আমার প্রশ্নের উত্তরে নাফিস গ্লাসে রাখা পানিটুকু এক ঢোক খাবার পর জানালো, কাছেই বাজারে একটা ওষুধের দোকানে সন্ধ্যার পর সে বসে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভিতরে তার বাসা থেকে মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের মোটরসাইকেলেই চেম্বার করতে যায়। “কষ্টে থাকলেও তোদের দোয়ায় ভালোই চলতেছে। মাসে সব মিলায় দেড় লাখের উপরেই আসে।” কথাগুলো গর্বের ভঙ্গিমায় বলতে পেরে একটা আত্মতৃপ্তির ছোঁয়া দেখলাম নাফিসের চোখেমুখে।

“স্যার, একটু ভিতরে আসি?” হঠাৎ একটা নারীকণ্ঠের আওয়াজে আমরা দু’জনেই দরজার দিকে তাকালাম। দেখি, মলিন ছেঁড়া শাড়ি পরিহিতা এক মা’ তার বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে। মহিলা ভেতরে আসার পর ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, নিষ্ঠুর দারিদ্রতার সাথে যুঝতে থাকা এই শীর্ণদেহী নারীর শাড়ীর আঁচলের ভেতর দিয়ে তার ততোধিক শীর্ণ, পুষ্টিহীনতায় ভুগতে থাকা শিশুটি মাতৃদুগ্ধ লাভের আশায় চিৎকার করে কাঁদছে। মায়ের মুখটা শুকনো, চোখদু’টো কোটরের ভেতরে ঢুকে গিয়েছে।

“আসেন, আসেন।” নাফিস তাকে ডেকে নিয়ে নিজের বাম পাশের টুলটাতে বসালো। তারপর বাচ্চাটার সমস্যার কথা শুনে টেবিলের উপরে রাখা নিজস্ব প্রেসক্রিপশনে ’রেনাটা ফার্মাসিউটিক্যালসে’র গিফট দেওয়া কলম দিয়ে খসখস করে একটা ওষুধ লিখে দিল।

“এই যে ওষুধ দিলাম, এইটা খাওয়ান। আর সন্ধ্যার পর চেম্বারে আসেন।” অসুস্থ শিশুর মা’কে নাফিস কথাটা বুঝিয়ে বললো। মহিলা নিজের বাম হাতের মধ্যে গুঁজে রাখা একটা পুরনো পঞ্চাশ টাকার নোট টেবিলের উপরে রেখে আমতা আমতা করে বললো, “স্যার, অনেক দূর থেইকা আইছি। সন্ধ্যারসুমতো আর আইতে পারুমনা।”

সাথে সাথে নাফিস তার হাত থেকে খানিক আগেই দেওয়া প্রেসক্রিপশনটা নিয়ে কলম দিয়ে আরও দুইটা ওষুধ লিখে দিল। তারপর মহিলার দেওয়া পঞ্চাশ টাকার নোটটার দিকে তাকিয়ে একটু গম্ভীর স্বরে বললো, “এইটা কি দিছেন?” মহিলা অপরাধীর ভঙ্গিতে নিজের বক্ষদেশের ভেতর থেকে এবার একটা একশো’ টাকার নোট বের করে নাফিসকে দিল। আগের পঞ্চাশ টাকা আর এই একশো টাকা -এই দুইটা নোট সযত্নে ভাঁজ করে নাফিস নিজের পকেটে রেখে সাত দিন পর মহিলাকে আসতে বলে বিদায় করে দিল।

পুরো ব্যাপারটা আমি দেখলাম। এরপর একটু বিব্রত ভঙ্গিতে বললাম, “এই যে হাসপাতালেই ডিউটির সময় তুই রোগীর থেকে টাকা নিস, আমি থাকলেতো নিতে পারতামনা, লজ্জাতে মারাই যেতাম।”

এই কথা শুনেতো নাফিস হাসতে হাসতে শেষ। টেবিলে রাখা প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে বেশ কায়দা করে ধরিয়ে ধোঁয়াটা মুখ দিয়ে ছাড়তে ছাড়তে বললো, “কি যে বলিস তুই দোস্ত। সিচুয়েশন বুঝতে হবে তোকে। এই যে দেখছিস রোগীগুলোকে। এরা অনেক দূর থেকে আসে। দিনের বেলাতেই শুধু চিকিৎসা নিতে আসে, সন্ধ্যার পর আসার সুযোগ নাই তাদের। দূরের রোগীগুলো যদি সন্ধ্যার পর না-ই আসে, তাহলে সন্ধ্যার পর চেম্বার জমবে কিভাবে? তুই-ই বল? যেহেতু সন্ধ্যার পর দূরের এইসব রোগীদের থেকে প্র্যাকটিসের টাকাটা নিতে পারিনা, তাই এই যে, এখন এরা আমাকে টাকা দিচ্ছে। আরে ভাই, এইটাতো আমার অধিকার। এইখানে লজ্জা পাবার কি আছেরে? হে: হে: হে:...।”

নীরবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। মনে মনে বললাম, “হ্যাঁ দোস্ত ঠিকই বলেছিস তুই, ল্যাংটার আবার লজ্জা কিসের?”

শেষকথা: ’ডা: নাফিস’ নামটি কাল্পনিক। যার ব্যপারে গল্পটি লিখলাম, তার সম্মানের কথা বিবেচনাপূর্বক আসল নামটি গোপন করলাম। তবে একটা কথাই বলতে চাই। এই ডা: নাফিসের নিজের গায়ে কাপড় না থাকতে পারে। কিন্তু একজন বাংলাদেশী হিসেবে আমার বড় কষ্ট হয়, যখন দেখি শত চেষ্টা করেও আমার এই ডাক্তার বন্ধুর মতো আরও অনেক ডা: নাফিসদের গায়ে এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার শরীরে চাইলেও আমরা কাপড় পড়াতে পারছিনা।

গল্পটি কানাডার টরন্টো থেকে প্রকাশিত 'সাপ্তাহিক আজকাল' পত্রিকার ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ সংখ্যায় প্রকাশিত।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জানুয়ারি, ২০১৭ রাত ৩:৪৬
৪২টি মন্তব্য ৪২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×