গোপালগঞ্জ শহরে শেষবার গিয়েছিলাম ২০১০ সালের শুরুর দিকে। সেবার যেমনটা দেখেছিলাম, এবারেও তার ব্যতিক্রম কিছু চোখে পড়লোনা। বৃষ্টিস্নাত গোপালগঞ্জ শহরের বাড়ি-ঘর মানুষ-জন সব আগের মতোই আছে, জীবন-যাত্রায় তাদের কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করলামনা।
কাজের প্রয়োজনেই এবার ঘুরতে হয়েছে গোপালগঞ্জ শহর ছাড়াও কাশিয়ানী, মুকসুদপুর এবং টুঙ্গিপাড়া উপজেলার আনাচে কানাচে।
হয়তো পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, বাংলাদেশের এ্যাত স্থান থাকতে এই গোপালগঞ্জ নিয়েই কেন আমি কথা বলছি? উত্তরে বলবো, 'বঙ্গবন্ধু' খ্যাত শেখ মুজিবর রহমানের জন্মভূমি এই গোপালগঞ্জ নিয়ে এখন শুধু আমি-ই নই, বরং খোদ গোপালগঞ্জবাসী কথা বলছে।
কি বলছে তারা?
১. বেশি ভি.আই.পি এলাকা হওয়াতে এখানে সবাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপা'র পাওয়ারে চলে, এখানে সবাই প্রধানমন্ত্রী। অথচ এখানেই আওয়ামীলীগ এবং তার অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের ভেতরে দ্বন্দ্ব সবচাইতে বেশি, এখানেই উন্নয়নের জন্যে বরাদ্দকৃত টাকার জন্যে বড় এবং পাতি নেতাদের মাঝে 'রাস্তার নেড়ি কুকুরের মতো' কামড়াকামড়ি সবচাইতে বেশি। অতএব, ফলাফল, বঙ্গবন্ধুর গোপালগঞ্জে এখনও আশানুরূপ উন্নতির ছোঁয়া লাগেনি।
২. মুকসুদপুর এবং কাশিয়ানী উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে যে আসন, সেই সিংহাসনেই আরোহন করে আছেন খোদ গোপালগঞ্জবাসীর প্রাক্তন চোখের মণি এবং বর্তমানে চক্ষুশূল আমাদের যোগ্যতাহীন (এবং মুখে লাগামহীন) বাণিজ্যমন্ত্রী ফাখা (ফারুখ খান)। ওই এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, খোদ আওয়ামীলীগ থেকেই যোগ্য কোন লোককে ফাখা গং উঠতে দেবেনা কোনদিন। উঠতে গেলেই মাথা নামাবার তড়িকা তাদের জানা আছে। আর আমাদের আপা (হাসিনা আপার কথা বলছি), তিনিও হয়তো কোননা কোনভাবে ফাখা -এর কাছে বাঁধা পড়ে আছেন। তাই তাকে সরানোর কোন উপায় আপাতত নেই। আর হিন্দুদের বিশাল ভোট ব্যাংক থেকে নিশ্চিত ভোটতো আসবেই। কাজেই, নো চিন্তা, ডু ফুর্তি। ঠিক একই অবস্থা বিরাজমান সদরের সেলিম সাহেবের আসনেও। ওহ্! আরও একজন সুযোগ্য (?) নেতার নাম না বললেই নয়, তিনি হচ্ছেন ডা: শারফুদ্দিন সাহেব। তার কথা এবং কীর্তিকলাপের কাহিনী নাহয় আরেকদিন বলা যাবে।
এবার গোপালগঞ্জ গিয়ে বেশ কিছু অবজারভেশন ছিল আমার। তার মধ্যে একটা হলো:
ক. ১১০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে মধুমতি নদীর খনন এবং এর সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের জন্যে। স্থানীয় জনগণের বক্তব্য হলো, "ভাই ১১০ কোটি লাগবোনা, শুধু ১০ কোটি টাকাও যদি ঠিক মতোন খরচ হয়, তাইলেও চলে।" অর্থাৎ, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী গোপালগঞ্জবাসীরাও জানেন যে, ১১০ কোটি টাকার ১০০ কোটি টাকা লোপাট হওয়াটা খুব সাধারণ একটা ঘটনা মাত্র।
খ. ঠিক একই ভাবে ৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে স্টেডিয়ামের এবং ক্রীড়া উন্নয়নের জন্যে। একটি নতুন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রস্তাবিত রয়েছে। লুটপাটের সরকারের আমলে আদৌ কি হবে এগুলো কাজ?
গ. এবার ক্ষমতায় আসার পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন পর্যন্ত গোপালগঞ্জে আসেন নাই। (টুঙ্গিপাড়াতে গিয়েছেন)
ঘ. সবশেষে যে বিষয়টি নতুন বোতলে পুরনো মদের মতোই লাগলো, সেটি হলো, স্থানীয় এক ব্যক্তি জানালেন, এই অঞ্চলে কোনদিন শিল্পকারখানা বা ব্যবসা বাণিজ্যে অগ্রগতি হবেনা। কারণ জিজ্ঞেস করাতে তিনি বললেন, "ভাই, কি আর বলবো, এই অঞ্চলে হিন্দুদের সংখ্যা বেশি এবং তাদের হাতে ব্যাপক টাকা। কিন্তু দু:খের বিষয় এই সব টাকা তারা ভারতে ইনভেস্ট করে। অর্থাৎ, গোপালগঞ্জে তারা টিনের ছাপড়া ঘরে থাকলেও ভারতে ঠিকই তাদের বাংলাদেশের টাকায় কেনা বাড়ি, গাড়ি - সবই রয়েছে।"
তাই গোপালগঞ্জবাসী রিক্সাওয়ালা শামছু মিঞাকে যখন প্রশ্ন করলাম, "কি ভাই, আপনাদের শেখ হাছিনাতো এখন ক্ষমতায়, কেমন আছেন আপনারা?" উত্তরে শরীরের ঘাম মুছতে মুছতে শামছু মিঞা শুধু মলিন মুখে বিষন্ন এক হাসি দিলেন, যে হাসির অর্থ শুধু আমি নই, বরং পুরো দেশবাসীই এখন জানেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



