somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাথরকুঁচি জীবনের দিন ও রাত্রীগুলো

১১ ই অক্টোবর, ২০১৫ বিকাল ৪:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


দ্বিতীয় জীবন
পাথরকুঁচির জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের আগের অংশটুকু

আজকাল আমার একা থাকতেই ভালো লাগে। কারো সামনে যেতে ইচ্ছে করেনা। মাঝে মাঝে মনে হয় এর চাইতে মৃত্যুই ভালো ছিলো। এই বিভৎস্য জীবন আমি চাইনা। মরে যেতে ইচ্ছে করে আমার। কয়েকবার আত্মহত্যার প্ল্যানও করেছিলাম। প্রতিবারই বিফল হয়েছি। আসলে প্রথমবার ফ্যানের সাথে ওড়না ঝুলিয়ে মৃত্যুচেষ্টাটা বোকার মত হয়ে গেলো। কাউন্সেলরের নির্দেশে ম্যাডাম প্যাট্রেসিয়া আমার হাতের নাগালের সব দড়ি রজ্জু গায়েব করে দিয়েছেন। আমি বসে বসে নীলনক্সা কষি। আমার মৃত্যুর নীলনক্সা। আসলে মৃত্যু বলছি কেনো? সেই আমার মুক্তি। এ দুঃসহ দূর্বিসহ জীবন থেকে সেই কি মুক্তি নয়?

আমি মুক্তি চাই। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে আমি এ জীবন চাইনা। কি দোষ করেছিলাম আমি যে আমাকে এমন দূর্বিসহ জীবন পোহাতে হবে? খুব ইচ্ছে হয় বিধাতাকে ডেকে জিগাসা করি আমার ভাগ্যে এমন কেনো লেখা হলো? কিন্তু কোথায় বিধাতা? কেমন করে ডাকলে শুনবেন তিনি?

এ হাসপাতালে রুকমনির মা বলে একজন পৌঢ়া মহিলা আসে। ঘর দুয়ার ঝাড়া মোছার জন্য। সে আমাকে দুঃখ পেতে নিষেধ করে। সে বলে এ জীবনে যার যত বেশি দুঃখ পরজীবনে নাকি তার তত বেশি সুখ হয়। এই কথা শুনে আমার খুব হাসি পায়। আমি জিগাসা করেছিলাম, পরকালে আমার ঠিক কেমন সুখ হবে বলে মনে হচ্ছে তার। সে বলে সগ্গে আঙ্গুর বেদানা ফলফলুরি যখন যা চাইবেন তাই খাইতে পাইবেন আপামনি। আপনার চেহারা হবে মা দুগ্গার মত। আপনার আশে পাশে থাকবে শতেক দাসীবাঁদী, আপনার পরনে থাকবে রাণীর লাহান ডেরেশ। কপালে তারা জ্বলজ্বল করবে। আমি আমার অনেক দুঃখের মাঝেও হেসে ফেলি। ওর বর্ণনার জ্বলজ্বলে তারার কথা শুনে আমার তারা হতে ইচ্ছে করে।

স্বর্গ নরক, বেহেস্ত দোযখ আমি বুঝিনা ।শুনেছি মানুষ মৃত্যুর পরে তারা হয়ে যায়। ঐ দূর গগণ থেকে তাকিয়ে দেখে তার ফেলে আসা মাটির ধরণীকে। আমিও তারা হতে চাই। দূর থেকে দেখবো আমার মা, বাবা, বোন, বোনের ছোট্ট মেয়েটিকে। যার জন্য প্রায়ই আমার বুকের ভেতরে এক দলা কষ্ট উথলে ওঠে। আমি গিলে ফেলি। কাউকে কখনও বলিনা। ম্যাডাম প্যাট্রেসিয়া ও আমার কাউন্সেলর প্রায়ই আমাকে জিগাসা করেন আমি কাউকে দেখতে চাই কিনা। আমি দৃঢ়ভাবে বলি, না আমি কারু সঙ্গে দেখা করতে চাইনা। আমার খুব আমার বোনের পিচ্চি মেয়েটাকে দেখতে ইচ্ছে করে তবুও আমি চাইনা । আমার যে সুন্দর মুখের স্মৃতি ওর মনে আঁকা আছে, সেটা আমি নষ্ট করতে চাইনা। আমি জানি আমার এই বিভৎস্য কলঙ্কিত মুখ দেখলে ভীষন ভয় পেয়ে যাবে সে। সারাজীবন একটা বাজে স্মৃতি নিয়ে কাটাবে। আমি চাইনা আমার জীবনের সবচাইতে প্রিয় ছোট্ট ঐ মানুষটা আমার জন্য একটা বিচ্ছিরি স্মৃতি নিয়ে জীবন পার করুক।

কেনো বেঁচে আছি? কেনো আমাকে বাঁচিয়ে রাখা হলো এসব শত শত ভাবনা আছন্ন করে আমাকে। রুকমনির মায়ের কথাই কি ঠিক তাহলে? এইভাবে কি বিধাতা পরীক্ষা করছেন আমাকে? কিন্তু কিসের পরীক্ষা? কি সে পরীক্ষার নাম? মাঝে মাঝে যখন আমার কিশোরীবেলার কথা ভাবি, দু বেনী দুলিয়ে স্কুলবেলা, এক্কা দোক্কা আর চি বুড়ি খেলার দিনগুলো, প্রতিবছর বার্ষিক পরীক্ষার পর মামাবাড়ি বেড়াতে যাবার দিনগুলি। অদ্ভুত ভালো লাগা আর কষ্ট ঘিরে থাকে আমাকে। মন্দ মধুর স্মৃতির দোলাচলে দুলতে থাকি আমি।

মনে করি এসব স্মৃতি নিয়েই কাটিয়ে দেওয়া যাবে বাকীটা জীবন। মাঝে মাঝে অসহ্য লাগে। আরও কতটা কাল বাঁচতে হবে আমাকে? কি নিয়ে বাঁচবো আমি? মানুষের জীবন কাল পরিক্রমায় গড়ায়। ছেলেবেলা, কিশোরবেলা, যৌবন, তারুন্য, বার্ধক্য বা পৌঢ়ত্ব। এসব প্রতিটি বেলায় সে আস্বাদন করে জীবনের নানা মধুর আস্বাদ। রোজ ঠিক বেলা দশটায় এ হাসপাতাল গলিটার পথ ধরে একটি মা দুটি ছোট ছোট শিশুকে নিয়ে যায় স্কুলে।

এ পথটি এমনিতে নির্জন । কখনও কদাচিৎ ফেরিওয়ালা বা আইস্ক্রিমওয়ালা ভুল করে ঢুকে পড়ে এ নির্জন গলিতে। কখনও তারা আর ফিরেও আসেনা। শুধু এই দুটি বাচ্চাকে নিয়েই এই মা রোজ চলে যায় এ পথ ধরে। আমি চুপি চুপি পর্দার আড়াল থেকে ওদেরকে দেখি। বাচ্চা দুটি কি যে মিষ্টি। একটা ছেলে একটা মেয়ে। মাঝে মাঝে ওদের হাতে ধরা থাকে রঙ্গীন হাওয়াই মিঠাই, কখনও বা বেলুন। আমার কি যে ভালো লাগে ওদেরকে দেখতে। আমি রোজ বেলা দশটা বাজার আগ দিয়েই দৌড়ে আসি জানালায়। চুপি চুপি দাঁড়িয়ে থাকি পর্দার আড়ালে। ওরা কখনও আমাকে দেখতে পায় না। বড়জোর ২০ সেকেন্ড। এর মাঝেই পার হয়ে যায় ওরা এ পথ টুকু।

এরপর আমি ওদেরকে নিয়ে ভাবতে বসি। মাটা স্কুল গেটে দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি বাড়ি ফিরে রান্না বসাবে ওদের জন্য? বাচ্চারা নিশ্চয় ঝাল খেতে পারেনা। মা ওদের জন্য রান্না করবে মুরগীর কোর্মা বা মিষ্টি পায়েস। আমার বোনের মেয়েটার কথা মনে পড়ে। আচ্ছা আমি এখানে চলে আসার পরে ও কি আমাকে খোঁজে? ওতো খুব ছোট ছিলো। ওর কি মনে আছে আমার কথা?

ভেতরে ভেতরে আমি মাতৃত্ব অনুভব করি। কিন্তু এসব কথা কাউকে বলিনা আমি .....
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০১৫ বিকাল ৪:৫৬
৩০টি মন্তব্য ৩০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শুভ জন্মদিন প্রিয় ত্রিরত্ন।

লিখেছেন এস.কে.ফয়সাল আলম, ১৭ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ৮:৩৫



আজ যখন ঢাকাগামী ট্রেনের সিটে বসে মোবাইল থেকে এই পোষ্ট লিখছি, তখনও প্রিয় সামু ব্লগ দেশের বেশিরভাগ ISP তে ব্লক! ব্লগের সেই চিরচেনা দিনগুলি আস্তে আস্তে যেন স্মৃতিগত হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুই পাগলের ঝগড়া

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ৮:৫৫


শহীদ্লু ইসলাম প্রামানিক

দুই পাগলে গাছের নিচে
করছে বাড়াবাড়ি
হায়! হায়! হায়! করছে একজন
আরেকজন আহাজারী।

এমন সময় এক পাগলে
দিল গালে চড়
শব্দ হওয়ায় আরেক পাগল
পেল ভীষণ ডর।

ডরের চোটে বলছে পাগল,
এমন করলি কেন
এটম বোমের মতই... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে কূটনামীগুলো করলে আপনি ক্ষমতা লাভ করবেন ! :P

লিখেছেন রাকু হাসান, ১৭ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ১০:৪১




সব কিছুই একটা নিয়মের মধ্য থেকেই করতে হয় । কূটনামী কিংবা ক্ষমতাবান হওয়ারও কিছু নিয়ম আছে ।
সেগুলো নিয়েই আজকের পোস্টে গোপন সূত্র শেয়ার করবো ;) । যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কুটুম

লিখেছেন হাসান মাহবুব, ১৭ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ১১:২৬



শেষরাতে ঘুম ভেঙে গেলে আমার বেহালার সুর শুনতে ইচ্ছে করে। বেহালা যে আমি খুব ভালোবাসি তা নয়। তবে শেষ রাত সময়টা রহস্যময়। এ সময় মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, পছন্দ-অপছন্দের ভার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেলফোর রোড টু কাশ্মীর ! : সভ্যতার ব্লাকহোলে সত্য, বিবেক, মানবতা!

লিখেছেন বিদ্রোহী ভৃগু, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ১:৪০

ফিলিস্তিন আর কাশ্মীর! যেন আয়নার একই পিঠ!
একটার ভাগ্য নিধ্যারিত হয়েছিল একশ বছর আগে ১৯১৭ সালে; আর অন্যটি অতি সম্প্রতি ২০১৯ এ!
বর্তমানকে বুঝতেই তাই অতীতের সিড়িঘরে উঁকি দেয়া। পুরানো পত্রিকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×