মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে তার ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনটি ছেড়ে দেবার আহ্বান জানিয়েছেন। এর পেছনে তিনি তার একটি মহান ইচ্ছের কথাও অবহিত করছেন সংসদকে। জানিয়েছেন, বাড়িটি ছেড়ে দিলে সেখানে পিলখানা ট্র্যাজেডিতে শহীদ সেনাপরিবারগুলোর পুনর্বাসন করা হবে। প্রক্রিয়াটা হবে এই যে, পরিবারপ্রতি দু’টি করে ফ্ল্যাট প্রদান করা হবে। একটি ওই পরিবারটির আবাসনের জন্যে আর অপরটি ভাড়া দিয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্যে। নিঃসন্দেহে এটি একটি মহতী উদ্যোগ। তবে সমস্যা হলো, এ প্রশংসিত উদ্যোগটি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী যে জায়গাটি নির্বাচন করেছেন সেখানে ইতোমধ্যেই একজন নিহত রাষ্ট্রপতি ও সাবেক সেনাপ্রধানের বিধবা স্ত্রী পুনর্বাসিত রয়েছেন। পুনর্বাসিত একটি পরিবারকে সরিয়ে সেই স্থানটিতে অন্য কাউকে পুনর্বাসন করবার চিন্তা বোধ হয় ভালো কিছুর আড়ালে মন্দ কিছুর ইঙ্গিতই বহন করে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, সেই বাড়িটি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে আরেক সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান কর্তৃক আদিষ্ট হয়েই। সুতরাং, এমন একটি বাড়িতে পিলখানায় নিহত সেনাকর্মকর্তাদের পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করতে চাইলে তা স্বয়ং ঐ পরিবারগুলোই কতটা সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করবে তা একটি বড় প্রশ্ন।
এদিকে এরশাদ কর্তৃক খালেদা জিয়াকে সেই বাড়িটি বরাদ্দ দেয়ার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে এরশাদকে ব্যঙ্গ করে বলেছেন, ভাবী সাহেবাকে (বেগম খালেদা জিয়া) খুশি করার জন্যেই তিনি নাকি সেই বাড়িটি তাকে বরাদ্দ দিয়েছিলেন! তবে এতে করে এরশাদ সাহেবের তেমন একটা খারাপ লেগেছে বলে মনে হয় না। কারণ এরই মধ্যে রাজনৈতিক আনুগত্য দেখাতে গিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সুর মিলিয়ে কথা বলেছেন। মিডিয়াকে তিনি জানিয়েছেন, সহানুভূতির দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি তখন বেগম জিয়াকে দু’টি বাড়ি প্রদান করেছিলেন। একটি তার থাকবার জন্য আর অপরটি ভাড়া দিয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য। এখন যেহেতু বেগম খালেদা জিয়ার অনেক অর্থ, সুতরাং বাড়িটি তার ছেড়ে দেয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। সাথে সাথে তিনি এটিও জানিয়েছেন যে, বেগম জিয়া রাজনীতি করবেন জানলে তিনি সেই বাড়িটি তাকে দিতেন না।
এরশাদ সাহেবের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বিডিআর বিদ্রোহে নিহত সেনাকর্মকর্তাদের পরিবারগুলোকে যে উদ্দেশ্যে দু’টি করে বাড়ি বরাদ্দ দেবার চিন্তা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সেই একই রকম উদ্দেশ্য ও চিন্তা থেকেই এরশাদ সাহেবও সেসময় দু’টি বাড়ি বরাদ্দ দিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়াকে। শহীদ জিয়া সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাবাহিনী প্রধান ছিলেন বলে তার বিধবা স্ত্রীকে মর্যাদার দৃষ্টিকোণ থেকে দু’টি বাড়ি প্রদান করা হয়েছিল, যা শেখ হাসিনার বর্তমান পুনর্বাসননীতির সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
“বেগম জিয়া রাজনীতি করবেন জানলে বাড়িটি তাকে বরাদ্দ দেয়া হত না” মর্মে যে বক্তব্য দিয়েছেন এরশাদ সাহেব, সেটি তার সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশমাত্র। রাজনীতি করা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। কেউ সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করলে তার থেকে সহানুভূতি উঠিয়ে নিতে হবে এই তত্ত্ব তিনি কোথায় পেলেন? অন্তত দিন বদলের সনদধারীদের সাথে থাকাকালীন তার মুখে এমন কথা মোটেই মানায় না!
আরেকটি ব্যাপার, প্রধানমন্ত্রী তার ছোট বোন শেখ রেহানার জন্যে বরাদ্দকৃত জমি সেনাপরিবারগুলোকে পুনর্বাসনকার্যে প্রদান করার ঘোষণা দিয়েছেন। এটি নিঃসন্দেহে শেখ হাসিনার বড় মানসিকতার পরিচায়ক। তবে শেখ রেহানার জমির সাথে বেগম জিয়ার জমিটির তুলনা করা ঠিক হবে না। কারণ, শেখ রেহানার ওই জমিটি তাকে দেয়া হয়েছে গত আ’লীগ আমলে। সেসময় বঙ্গবন্ধু-পরিবারের সম্মান ও মর্যাদা ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। ফলে এটি অন্তত স্পষ্ট যে, কোনো বিশেষ সহানুভূতি থেকে তাকে সেসময় ওই জমিটি প্রদান করা হয় নি। অপরদিকে বেগম জিয়ার বাড়িটি তাকে দেয়া হয়েছিল তার জীবনের কঠিনতম মুহূর্তে। শহীদ জিয়া কিংবা বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালে সেটি অধিগ্রহণ করা হয় নি, যেমনটি করা হয়েছে শেখ রেহানার জমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে।
সুতরাং, শেখ রেহানার জমি ছেড়ে দেবার ঘোষণার মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়াকে তার বাড়িটি ছেড়ে দেবার ব্যাপারে কোনোপ্রকার মানসিক চাপ আরোপ করার চেষ্টা করাটা নিতান্তই অযৌক্তিক ও হাস্যকর।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



