somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্মৃতির আকাশের রংধনু...

২২ শে অক্টোবর, ২০০৯ রাত ৩:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


"আঁধার আমি ভালবাসি। আঁধারে নিজের সাথে বোঝাপড়াটা সব সময়ই মিতালিতে গিয়ে মেশে, রহস্যের আবরণে জড়ালেও নিজের অস্তিস্ত্বকে বিদীর্ন করার উপায় থাকে না। আমি আঁধার ভালবাসি।" - কথা গুলো একরাশ নিরবতার অবকাশে বেজে যাচ্ছে মনের ভিতর। এড়াতে চাচ্ছিনা বলেই পারছি না।

বসে আছি একটি রেললাইনের উপর রাতের নিস্তব্ধতা অনুভবের জন্য নয়, নিজের খেয়ালীপনাকে প্রশ্রয় দেবার জন্য। খেয়ালী মনের সাথে নিরন্তর বসবাস করতে করতে খেয়ালীপনাতে সিদ্ধহস্ত আমি, সময় কেবল নিজের জন্যই গচ্ছিত রাখি হয়ত তাই। রেললাইন ধরে হাঁটছি, কিছুদূর একটা স্টেশন আছে ওখানে যাত্রীর কোলাহলকে নিজের মাঝে অনুরণিত করব, - ইচ্ছার স্বাধীনতা।

জীবনের উপভোগ্যতাকে বিলাসীতা পর্যায়ে নিয়ে যেতেই আমার এই নিশীথ ভ্রমন।

হাটছি এক ধাপ কে আরেক ধাপের সাথে সীমারেখা টেনেই। দূরের স্টেশনের নিয়ণ কয়েকটা আলো আমার লক্ষ্য নির্ধারন করে ফেলেছে, লক্ষ্যটা ঐ জামশেদপুর স্টেশন। হাটছি, রেললাইনের পাথর পায়ের সাথে লেগে এদিক ওদিক ছুটে গিয়ে প্রতিবাদী খেলা জমিয়েছে, ভালই লাগে এমন প্রতিবাদ। যেয়ে বসলাম ল্যাম্পপোষ্টের পাশের বেঞ্চিটাতে, বসার পর এক জন সহচর পেয়ে গেলাম, লোকটি অন্ধ সেটা তার লাঠিটাই বলে দিচ্ছে। চেহারার মধ্যে সুবোধের চিহ্ন স্পষ্ট, যেন তার অন্ধকার জগতের অজানা কথা গুলি তার পুরো চেহারা জুড়ে ছড়িয়ে আছে, তাকে পর্যবেক্ষনে দ্বিধার কোন কারন নেই, কারন আমার কৌতুহলী পর্যবেক্ষনে, তার অস্বস্ত্বির কোন সম্ভাবনা নেই। জিজ্ঞেস করলাম "ভাই কেমন আছেন?" হঠাৎ এমন প্রশ্নে তার নিজস্ব জগতে ছেদ পড়ল, নড়েচড়ে উঠে বলে উঠল "কে?" আমি যেন এমন একটি প্রশ্নের অপেক্ষায় ছিলাম, সাথে সাথে সহাস্য উত্তর দিলাম "আমি সীমান্ত, আমাকে চিনবেন না,আমিও আপনাকে চিনি না যদিও আমরা পথিক, পথের পথিক।" তার মুখে একটা অস্বস্তির ছায়া এবার দেখতে পেলাম, না জানার অস্বস্তি, অজানা রহস্যের অস্বস্তি। তাকে আস্বস্ত করার জন্য বললাম "আসলে আমার তেমন কোন কাজ নেই আপাতত, আপনি বসে আছেন তাই ভাবলাম একটু গল্প করি সময় অতিক্রম কেবল, এছাড়া কিছু নয়" সাথে সাথে এও বললাম "কোথায় যাবেন?" লোকটি বললো "পরের স্টেশনেই নামবো, ট্রেন মনে হয় লেট করে ফেলছে" আমি কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বললাম "আপনার নাম কি?" সে স্মিত হাসি টেনে বললো "রাশেদ" বললাম "রাশেদ ভাই, রাতের আবহাওয়াটা অদ্ভুত কি বলেন?" "কেমন করে বলি ভাই, রাত তো আর দেখতে পাইনা, স্মৃতিতে অনেক রাত আছে খুঁজে দেখি কি বলেন?" সাথে সেই স্মিত হাসি। আসলে ক্ষনিকের জন্য ভুলে গিয়েছিলাম যে রাতের আর দিনের অনন্যতা তার কাছে অনুভবের পার্থক্যে বন্দী। হয়ত কোন এক দুর্ঘটনা তাকে অন্ধকারের অস্ত্বিত্বে তলিয়ে দিয়েছে। অবাক চাহনীতে বললাম "স্মৃতির রাত?" সে তখন এক নিঃশ্বাসে বলতে লাগল তার কথা গুলো, শুনতে লাগলাম মুগ্ধতা নিয়ে।

রাশেদ মগ্নতা নিয়ে বলে গেলেন,
"আমি তখন ছোট, অনেক ছোট। ছোটবেলা থেকে বেড়ে ওঠা গ্রামে, মেঠো পথ গুলো দিয়ে খালি পায়ে দৌড়াতাম,চারপাশে ক্ষেত ছাড়িয়ে উড়তাম যেন, আচ্ছা আপনি ধানের উপর বুলিয়ে যাওয়া সকালের রোদ খেয়াল করে দেখেছেন কখনো? [কিছুক্ষন নিরব থেকে] জানেন আমিও না কখনো সেভাবে খেয়াল করে দেখিনি তবুও এখনও সেই রোদের খেলা দুচোখে ভেসে ওঠে, ধানের ফাঁকে ফাঁকে ধান-শালিকের লুকোচুরি খেলা, আমার বাড়ীর সামনে খোলা মাঠের সামনে একটু জল-দীঘির পাড়ের বকগুলো ঘাসের পাশে এক পায়ে দাড়িয়ে থাকত, দুপুরে নাটাই হাতে ঘুড়ি উড়াতে লেগে যেতাম, ঘুড়ি বানাতাম ফাইনাল পরীক্ষার পর আগের ক্লাসের বইয়ের পাতা গুলো ছিড়ে, অন্যরকম লাগতো জানেন, মনে হতো মুক্ত হচ্ছি পড়াশোনা থেকে, বড় হচ্ছি, এই বই তো আমার মুখস্ত এই ধরনের অনুভুতি নিয়ে ঘুড়ি বানাতাম। [স্মিত হাসিটা বিস্তৃত হলো] নাটাইয়ের সুতো ঘুড়ির সাথে বেঁধে দিয়ে উড়িয়ে দিতাম, আর মাঠে মাঠে দৌড়াতাম, নীল আকাশ, তপ্ত সূর্য, আর আমার ঘুড়িটা অনেক উপরে, অনেক অনেক উপরে চোখ মেলে দেখা যায় না, তখন ঘুড়ির কাছে চিঠি পাঠাতাম, কেমন করে জানেন? একটি কাগজ বর্গাকারে কেটে মাঝে গোল করে কেটে ঘুড়ির সুতার সাথে লাগিয়ে দিলেই ওটা আস্তে আস্তে উপরে চলে যেত সুতা বেয়ে ঠিক ঘুড়ির কাছে, এভাবে কত মনের কথা সাজিয়ে ঘুড়িকে চিঠি দিতাম, সন্ধ্যার পরে নামিয়ে আনলে চিঠিগুলো ঠিক ঠিক ঘুড়ির সাথে পেতাম, তখন অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করত। আচ্ছা আম অথবা কাঁঠাল বাগানের মাঝে রোদের আলো-ছায়া খেলা দেখেছেন কখনো? আমিও না দেখিনি তখন খেয়াল করে, এখন চোখের সামনে দেখি অদ্ভুত সুন্দর।পুকুরের পানিতে সাতার কাঁটতে নামার সময় পানির উপরে আর নিচে দু ধরনের আলো স্বচ্ছ আলো, অস্বচ্ছ আলো। দুপুরের সোনালী আলোর সাথে সূর্যের লালচে মিশে বিকেলে হয়ে যায় স্নিগ্ধ আলো, এক ঝাঁক পাখি, বাঁশপাতার একে অপরের সাথে ঘর্ষন শব্দ এখনো আমার কানে বাজে, চোখে হাসে।

দেখুনতো রাতের কথা শুনতে চাইলেন আর আমি দিনের ফিরিস্তি নিয়ে বসেছি। সন্ধ্যার ঠিক পর পরই অনেক সময় বেরিয়ে পড়তাম 'জোনাকি বনে' আমার বন্ধুটিকে নিয়ে, ঐ নামটা আমরাই দিয়েছিলাম, ওখানে আসলে ছিল একটি মেহগনি বাগান, আমরা যেতাম ঐ বাগান হয়ে সামনের দীঘিতে মাছ ধরতে, জোনাকির মেলা বসতো সেখানে, অনেক অনেক জোনাকি জ্বলতো নিভতো, এক ঝাঁক জলছে আরেক ঝাঁক নিভছে অদ্ভুত খেলা অনেক দিন জোনাকি ধরে বুক পকেটে নিয়ে যেতাম, হেসে কুটিকুটি হতাম বুক পকেটে নীল আলো রাতে জ্বলা নিভা দেখে, ভালো লাগা কেবল ঐ নীল আলোতে তখন জুড়ে থাকতো - জোনাকের নীল স্নিগ্ধ আলো। রাতে নৌকায় চড়ে চিত হয়ে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, তারার আলো, চাঁদের আলো, চাঁদ-তারার আলো, মেঘের উপর চাঁদ, চাঁদের আলোয় মেঘ সব দেখতাম এখনো দেখি, কেবল স্মৃতিতে।" তিনি একটু থামলেন যেন এক মুহুর্তের জন্য কোন একটা মুহুর্ত থেকে উঠে এলেন,আমি তার মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা এটা তখনই আবিস্কার করলাম। "আচ্ছা আপনি বৃষ্টির আগের রংধনু দেখেছেন?" তার উচ্ছলতা ফুটে উঠলো....আরো অনেক কিছু বলতে গেলেন ট্রেনটি হুইছেল বাজিয়ে হাজিরা দিলো।

লাঠিটি হাতে নিয়ে বললেন, "সীমান্ত ধন্যবাদ আপনাকে" আর কিছু না বলে দক্ষতার সাথে হেটে গেলেন ট্রেনের পানে...আমি যেন তার রেখে যাওয়া স্মৃতির রং গুলো জাবর কেটে দেখছিলাম।স্তম্ভিত আমি।

রং অদ্ভুত, অদ্ভুত তার ভাষা....

=============
* অনেকদিন ধরে একটা গল্প লিখতে ছটফট করছিলাম তাই আজ বসে গেলাম, জানি না গল্প লিখতে পেরেছি কিনা।তবু গল্প লেখার সান্ত্বনাকে প্রশ্রয় দিতে পেরেছি, ভাল লাগা সেখানেই। এই লেখাটা লেখার পিছনে যে ভাবনাটা কাজ করেছে তা শেয়ার করছি, সেদিন ক্যাম্পাসের বাসে যাচ্ছিলাম, পুরো আধাঘন্টা বসে যেতে হয় তাই বাইরে তাকিয়ে ছিলাম, কারো আত্মহত্যার ঘটনা আমাকে খুব ভাবাচ্ছিল হয়তো, হঠাৎ মনে হলো একজন মানুষ যে জীবনের মায়া ছেড়ে দিয়ে আত্নহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে তাকে এমন কি স্বপ্ন দিলে সে আবার জীবনকে ফিরে পেতে চাইবে, এ সময় বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম চারপাশের রঙের খেলা হঠাৎ চোখে খুব করে দোলা দিচ্ছিল, প্রকৃতির অপূর্ব এক রুপ আবিস্কার করলাম হঠাৎ - ই, তখন ভাবতে লাগলাম কোন অন্ধের স্মৃতির রং গুলো,চিরতরে হারিয়ে ফেলা দৃশ্যগুলোকে যদি জীবনের প্রতি মায়া কাটানো কাউকে দেখানো যায় সেকি নতুন করে জীবনকে ভাববে না? - এগুলো কেবল কিছু ভাবনা ছিলো।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা এপ্রিল, ২০১০ রাত ১০:৫৫
২৫টি মন্তব্য ২৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×