কথাগুলো বলেছিল মিয়ানমারের মেয়ে থুম চু।
সাংবাদিক বলে নানা সময়ে বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়। সেবারও যেতে হলো বান্দরবানের নাইখ্যাংছড়িতে। এখানকার পাহাড় অসম্ভব সুন্দর। পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক স্থানেই এমন ঘন বন নেই। পাহাড়ী বন, পাহাড়ী গন্ধ শুকতে শুকতে আমি একরাতে পৌছে গেলাম মিয়ানমার লাগোয়া আমাদের ঐ জেলাটিতে। রাতে কোথায় থাকবো তার কোন ঠিক ছিল না। সাংবাদিকদের নানা ধরনের সোর্স থাকে, আমারও আছে। এমনই একটি সোর্স একদিন ফোন করে বললো, সে আমার জন্য মিয়ানমারের সামরিক জান্তাদের বিরদ্ধে যুদ্ধ করছে, এবং তাদের নানান নির্যাতনের শিকার হয়ে বাঙলাদেশের বিভিন্ন সস্থানে আশ্রয় নিয়ে আছে, তাদের আস্তানায় নিয়ে যাবে। কিন্তু শর্ত আছে....
: কী শর্ত?
: আপনি কোন ক্যামেরা আনবে না। কোন রেকর্ডারও নয়। ওরা আপনার সঙ্গে কথা বলবে। দ্যাটস অল।
খানিক চিন্তা করলাম। অফিস অনুমতি দেবে না, প্রকাশ করা যাবে না, এমন কাজের জন্য মানে অ্যাসাইনমেন্টের জন্য টাকা দেবে না। কিন্তু এমন সুযোগ হয়তো আসবে না। তাই বললাম আমি আসছি। সে সব বলে দিল। কবে কোথায় আসতে হবে সব। সেই আমাকে নিয়ে যাবে। লোকটি আমাকে বিশ্বাস করে। আমিও তাকে। সোর্সের উপর বিশ্বাস রাখতে হয়। আমিও রাখলাম।
......
রাতে বাস থেকে নেমেই দেখি বৃষ্টি হওয়াতে রাস্তা কাদা হয়ে আছে। এমনটাই তো হবে। বৃষ্টির দিনে তো আর সব শুকনো রুটির মত থাকবে না। থাকার একটা জায়গা ঠিক করলাম।
পরদিন দপুর বেলা আমার সোর্স এলো। কোন কথা না বাড়িয়ে চলতে শুরু করলাম। একটা রিকশা করে বেশ খানিকটা পথ গিয়ে রিকশা ছেড়ে দেয়া হলো। আমি একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে যাচ্ছি। একটা উত্তেজানা কাজ করছে।
লেমুছড়ি নামের একটা এলাকাকে সামনে ফেলে হাটতে থাকলাম। একটা নদী পেরুতে হল, না নৌকা করে নয়, অনেকটা গলা পানিতে হেটে। এখানে পানি এমনই থাকে। শীতে কমে যায়। ছোট্ট হলেও বেশ স্রোত। যাক বেশী বিবরণ দিয়ে যাচ্ছি।
আসল কথা বলি।
.... অনেক পথ পেরিয়ে পৌছে গেলাম ঘন পাহাড়ী বনের মধ্যে একটা বাড়িতে।
এখানে অনেকের সঙ্গে কথা হলো। অনেক কিছু জানলাম।
রাতে খাবো তাদের সাথেই। থাকবোও এখানে। এতক্ষনে তারা বুঝে গিয়েছিল, আমার দ্বারা কোন ক্ষতি তাদের হবার নয়।
খাবার সময় আমাদেরকে ভাত বেড়ে দিচ্ছিলো একটি মেয়ে। হ্যারিকেন জ্বলছে। তার পরনে মিয়ানমারের মেয়েদের পোশাক। ফর্সা গোলগাল চেহারার মেয়েটিকে আমি সেই ফুরিয়ে যাওয়া আলোয় দেখলাম। এমন মায়াবী চোখ আমি আগে কখনো দেখিনি।
খাবার শেষ করে গল্প করছি। আকাশে এক ফোটা মেঘ নেই। পাহাড়ের বাতাসের সঙ্গে যোগ হয়েছে বঙ্গোপসাগরের বাতাস। যেখানটায় দাড়িয়ে আছি, সেখান থেকে ছোট্ট একটা আলো দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রে কোন জাহাজ ভিড়ে আছে হয়তো!
আকাশের দিকে তাকিয়ে সিগারেটে টান দিচ্ছি। হঠাত আমার পাশে বুনো ফুলের গন্ধ । তাকিয়ে দেখি ফুরিয়ে যাওয়া আলোয় দেখা মেয়েটি আমার পাশে দাড়িয়ে আছে। একটু হাসি দিলাম। সেও।
পরিস্কার বাংলায় বললো
; আমাদের দেখতে এসছেন?
: হ্যা
: কি দেখলেন, মানে কি বুঝলেন? আপনাদের দেশে থাকি। অবৈধভাবে। করুণা হচ্ছে, তাই না!
আমি এর কী উত্তর দেবো। আমার খারাপ লাগছে। ৭১ এ আমরাও আশ্রয় নিয়েছিলাম ভারতে। আমরাও আমাদের স্বাধীনতার জন্য তাদের ভুমিতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। আর তারাও। এ নিয়ে আমার কোন করুণা নেই। সহমর্মিতা আছে।
আমি বললাম
: আপনি ঠিক বলছেন না। কত দিন এখানে আছেন?
: সাক্ষাতকার নিচ্ছেন?
: জানতে চাইছি।
: সাড়ে চার বছর।
: দেশে যান না?
: যাই, অপারেশনে।
: গুলি চালাতে কষ্ট হয় না?
: ভাত খেতে কষ্ট হয়না?
কোন উত্তর দিলাম না। মেয়েটির নাম জানলাম। মনে রাখার চেষ্টা করছি সব কিছু। জানলাম থুম চুরও একটি জীবন ছিল। বাড়ির পাশের নিজেদের কলা বাগান থেকে কলা বিক্রি করতো। বাবা ছিল, ভাই ছিল। ছিল মা। আর একজনও ছিল। ভালোবাসার মানুষ। একটি স্কুলে পড়াতো ছেলেটি।
এক সকালে কলা নিয়ে বাজারে গেছে সে। যখন ফিরলো তখন অনেক কিছুই অতীত হয়ে গেছে। অতীত হয়ে গেছে, বাবা মা ভাই।
আর স্কুলে যাবার পথে হারিয়ে গেছে সে....আর কোন দিন ফিরবে না। নাসাকা বাহিনীর পুড়িয়ে দিয়েছে তাদের সব। ধ্বংস করে দিয়েছে জীবন। চার মাইল দূরের বাজারে সে শব্দ শুনেছে। কিন্তু বোঝেনি তার যে সব হারিয়ে যাচ্ছে।
: বলুন এবার আমার কী করার ছিল। হাতের তালু আমার শক্ত হয়ে গেছে। চাইলে ধরে দেখতে পারেন। হাতিয়ারের বাট ধরতে ধরতে এই অবস্থা। আমি কেন কষ্ট পাবো। গুলি আমি চালাবোই।
বাতাসে সুঘ্রাণ বাড়ছে। কোথাও ডেকে উঠছে পাখি, পাহাড়ের পাখি। অনেক গল্প হলো। শেষে থুম চু বললো, হয়তো আপনার সাথে আর কোন দিন দেখা হবে না। শুধু জেনে রাখুন, বলেই থামলো মেয়েটি। ভোর হচ্ছে। আরও অনেক কথা হলো। সঙগ্রামের কথা হলো। তার লক্ষ্য নিয়ে কথা হলো। যুদ্ধ শেষ হলে কি করবে তাও বললো। শেষে শুধু বললো
:তাহলে তার কাছেই ফিরবো আমি। দেখবেন। আমি তার কাছেই ফিরবো।
আমি জানি থুম চুর যুদ্ধ শেষ হবার নয়........
বন, জার্মানি
২৪ জুলাই, ২০০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

