সামুতে এসেছি বেশি দিন হয় নাই। লিখেছিও খুব বেশি না। বাসা এবং অফিস মিলিয়ে দিনের একটা বড় সময় কম্পিউটারের সামনে কাটাই বলে প্রতিদিনই কিছু না কিছু মন্তব্য করছি। আজকাল লেখালেখির জন্য ভাষা, সংস্কৃতি, হেজিমনি, ক্ষমতা এইসব আমার পছন্দের জিনিস। পারতপক্ষে ধর্ম নিয়া, আস্তিকতা নাস্তিকতা নিয়া একেবারে বাধ্য না হলে তর্কে জড়াই না এখন। একসময় ভালোই জড়াতাম। তারপরও বাধ্য হচ্ছি। গত কয়েকদিনের আস্তিক/নাস্তিক দন্দ্বগুলো পড়েই বাধ্য হলাম। কয়েকটা বিষয় বেশ চোখে লাগলো। পয়েন্ট আকাড়ে উল্লেখ করছি।
১। ধর্ম আর বিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণাঃ
ধর্ম শব্দের অর্থ কি? আমরা কি সবসময় “ধর্ম” শব্দটা দিয়ে বিশেষ একটা অর্থই বোঝাই? মনে হয় না। বাংলাদেশে মুসলমান বেশি। ধর্ম বলতে বেশিরভাগ মানুষ যা বোঝে তা হচ্ছে “ইসলাম ধর্ম”। সামহোয়ারইনব্লগের আস্তিকরাও যখন ধর্ম শব্দটা উচ্চারন করেন তখন আসলে ইসলাম ধর্মের কথাই বলেন। আবার তাদের এ ইসলাম ধর্মকে তাদের পূর্ব পুরুষের ইসলাম ধর্মের সাথে মেলানো যাবে না। জাকির নায়েক’কে কোট করে এখানে যারা ইসলামের পতাকা ওড়াতে চান “ইমাম আল আশারি” অথবা “হাম্বলি”র সামনে পড়লে তাদের কারো মাথার চুল আস্ত থাকতো না। ব্রিটিশ আমলে যে ওহাবি/হাম্বলি/ফরায়েজি ধারার আগমনে বংলাদেশে মৌল সুন্নি ধারার বিকাশ, সেই মৌল সুন্নি ধারার সমর্থন করে যারা লড়াইয়ে নামেন তারা যখন জাকির নায়েকের মুরিদ হয়ে আধুনিক বিজ্ঞানে খোঁজেন কোরআন আর ইসলামের মৌলিকতা, তখন যে কত স্ববিরোধী একটা হাস্যকর অবস্থানে তারা দাঁড়িয়ে থাকেন সেটা বুঝলে হয়তো দাঁড়াতেন না। ইমাম আশারি খলিফার দরবারে দাঁড়িয়ে টুকরা টুকরা করে ছিড়ে ফেলেছিলেন গায়ের জামা, বলেছিলেন, যুক্তিবাদিতাকে আমি এইভাবে টুকরা টুকরা করে ছিড়ে ফেললাম। ইসলামে যুক্তিতর্কের কোন স্থান নাই, ইমান মানে নিঃসর্তে আত্মসমর্পণ। ইসলামের জ্ঞান বিজ্ঞান দর্শনের প্রগতিশীল ধারা হিসেবে পরিচিত খলিফা মামুনের দরবার কাঁপানো “মুতাজিলা”দের পরাজিত করে ইসলামি জ্ঞান জগতে প্রগতিশিলতার দেহে মরনঘাতি আঘাতটা আশারিই প্রথম হেনেছিলেন। আইন কানুন বিচার ব্যবস্থায় শুধুমাত্র হাদিস গ্রন্থগুলোই মেনে নিতে হবে, কঠোর ভাবে অনুসরণ করতে হবে, কোন যুক্তিতর্ক, গণতন্ত্র, ইজমা কিয়াস মানা চলবেনা, এ ইমাম হাম্বলির শিক্ষা। হাম্বলি চার সুন্নি মাজহাবের সর্বশেষ এবং সবচেয়ে কট্রোর মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা হাম্বলি। আশারি আর হাম্বলির ধারাতেই ওহাবি ধারার আগমন। যদিও একাডেমিকভাবে বাংলাদেশে হানাফি ধারার মুসলমানের সংখ্যা বেশি, সেই সংখ্যা কিভাবে নির্ণিত হলো খুজে পাইনি। হানাফি সবচেয়ে পুরোনো সুন্নি মাজহাব। এই মাজহাবের যখন জন্ম তখনো হাদিস গ্রন্থগুলো লেখা হয়নি। ইজমা কিয়াসের উপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে এই মাজহাব। বাস্তবে আজকাল এই মাজহাব খুজে পাওয়াই দুষ্কর। বইয়ের পাতায় যাই থাকুক, এই দেশের গ্রাম বাংলার অধিকাংশ মানুষই সুফিবাদী/আধ্যাত্মবাদী ধারার মুসলমান। শিক্ষিত আর সম্ভ্রান্তরা মূলত মৌল হাম্বলি সুন্নি ধারার, ঐভাবে জীবনযাপন করুক বা না করুক, তর্ক ঐভাবেই করে। এখন এই মৌল সুন্নি ধারার লোকেরা যখন বিজ্ঞানে তাদের বিশ্বাসের বিচার খোজে তখন তৈরি হয় একটা হাস্যকর আবহের। সামুতে এদের মধ্যে কয়েকজনকে আবার দেখেছি, যুক্তি তর্কের ধার ধারেন না, গদাম লাথি দিয়ে কারো পাছা বা কারো বিচি থেতলে দিতেই এদের ব্যাপক আগ্রহ। নাস্তিক অথবা আধ্যাত্মবাদী মুসলমান, সবার ক্ষেত্রেই এদের একই আচরণ।
ইসলাম নিয়ে এতো কথা বলার কারণ একটাই। আপনি যদি আস্তিক হন ধর্ম শব্দটা উচ্চারণ করে আপনি কি বলতে চাচ্ছেন, সেটা আগে পরিষ্কার হওয়া দরকার। এবার আমার নিজের কথায় আসি। প্রায়ই দুই ধরণের প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়। একটা প্রশ্ন হচ্ছে, “ভাই আপনি কি ধর্ম মানেন/ ধর্মে বিশ্বাস করেন”। এই প্রশ্নটা বেশি করে আস্তিকরা। শুরুতেই তারা আমার অবস্থান যানতে চান। আমার অবস্থান অনুযায়ী তারা আমার কথার ওজন নির্ধারণ করতে চান। আমি যদি নাস্তিক হই, তাহলে আমার যুক্তি তর্ক তার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আরেকটা প্রশ্ন করে নবিন নাস্তিকরা, “আমার মনে হয় ধর্ম বলতে আসলে কিছু নাই, আপনি কি বলেন”। দুইটা প্রশ্নই আমার জন্য খুব সমস্যা দায়ক। আমি এইভাবে চিন্তা করতে অভ্যস্ত না। ধর্ম হচ্ছে তাই যা আমাদের ধারণ করে, নৈতিকতা, সামাজিকতা, আইন, আইন প্রয়োগকারি সংস্থা, গুরু, ওস্তাদ, গ্রন্থ এইসব মিলিয়ে এমন একটা হেজিমনি যা আমাদের ব্যক্তিগত ‘ইগো’কে কোন একটা ‘আইডিয়াল’ দ্বারা অর্থময় করে, পরিচালিত করে। ধর্মের তাই মৃত্যু নাই, বিভিন্ন নামের ধর্মের মৃত্যু আছে, কিন্তু ধর্মের মৃত্যু নাই, মানুষ নামক ভাষাওয়ালা প্রানীর জীবনে ধর্ম তাই চরম এবং পরম সত্য। নাস্তিকেরও তাই ধর্ম আছে, যেই ধর্ম মেনে সে জীবন যাপন করে। গৌতম বুদ্ধও নাস্তিক ছিলেন। অথচ তিনি বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। ফ্রেডেরিক নিৎসে যখন বলেছিলেন, “আল্লাহ নাই, আল্লাহ মইরা গেছে, আমরা তারে মাইরা ফালাইছি, তুমি, আমি আমরা সকলে মিলা তারে মাইরা ফালাইছি”, তখন তার কথাটা অনেকেই বোঝে নাই। ফ্রেডেরিক নিৎসে আল্লাহ বলতে এই আইডিয়ালের কথাই বলেছেন। উনবিংশ শতকেই আমাদের ব্যাক্তিক আর সামাজিক জীবনে আইডিয়ালের বাধন ছেড়া ইগোর ইতরামি যেভাবে বাড়তে শুরু করে তিনি সেটা মানতে পারেন নাই। নিৎসে অবশ্য জানতেন, এক আল্লাহ মরলে আরেক আল্লাহ দাঁড়ায়, এক ধর্ম মারা গেলে আরেক ধর্ম আসে, তবে বিংশ শতকের ধর্ম আর আল্লাহ কি হবে এইটা নিয়া মাথা ঘামাইত ঘামাইতে তিনি পাগল হয়েছেন। বিংশ শতাব্দি পার হয়ে একবিংশ শতকের ধর্ম এখন পর্যন্ত “পুজি”, অথবা ব্যাক্তিক “ইগো”। প্রশ্ন উঠতে পারে, কিভাবে। আমাদের এলাকার প্রাক্তন এমপি “দৌড় সালাউদ্দিন” এবং বর্তমান এমপি “জোকার হাবিবুর রহমান মোল্লাহ” দুই জনেই আলহাজ্জ, দুইজনেরই দাড়ি আছে, দুইজনেই সময় আসলে প্রয়োজন মতো নামাজ পড়ে, এলাকার সবগুলা ওয়াজ মাহফিলের দাওয়াত কবুল করে, আবার একজনে ডাইল খায় দিনে দুই বা ততোধিক তো আরেকজনে একদা আরেক ব্যাটার বঊ ভাগাইছে, চাঁদাবাজি করে দুইজনেই, সন্ত্রাসী পোষেও দুইজনেই। ওনাদের আল্লাহ কে? ওনাদের ধর্ম কি? আমাদের এলাকার মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা, এলাকার সনামধন্য সম্ভ্রান্ত হাজি সাহেবের ধর্ম কি, যিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, আবার মসজিদের ইমাম নিজের খেয়াল খুসি মতো পরিবর্তন করেন, জনপ্রিয় ইমাম হইলে নারি বিষয়ক কুৎসা রটিয়ে কলংকিত করেন, আবার নিজের ৩৫ বছরের বিয়া করা বউ শান্তিতে মরারও সময় পায় না, মরতে মরতে কাজের বেটিরে বিয়া করার অনুমতি দিতে হয়, সেই বিয়া হয় এক সপ্তাহের মাথায়। ওনার ধর্ম কি? ওনার আল্লাহ কে? এদের সবার আল্লাহ ক্ষমতা, এদের ধর্ম “পুজি”, ব্যাক্তিক “ইগো”। ক্ষমতা যা ডিমান্ড করে তা করাই এদের নৈতিকতা। এইবার যারা নিজেদের আস্তিক ভাবেন, তারা একটু ভালো মতো চিন্তা করেন, আপনি যখন নিজেকে আস্তিক বা মুসলমান বলেন তখন আপনি আসলে কি বলেন। এই ব্লগে নাস্তিকদের মুন্ডুপাত করা বেশিরভাগ ব্লগারই ব্যাক্তি জীবনে উপরে উল্লেখিত মৌল সুন্নি, হানাফি সুন্নি, আধ্যাত্মবাদি মুসলমান এসবের কোনটাই নন, এই আদর্শবাদে আপনি জীবন চালান না। আপনি যখন নিজেকে মুসলমান দাবী করেন তখন বিশেষ কিছু সুবিধা নেয়ার জন্য দাবীটা করেন। অনেকেই এখানে যেভাবে কোরআন হাদিসের অন্ধ ভক্ত হিসেবে নিজেকে দাবী করেন, তারা কয়জন এই দেশের সংবিধান অস্বিকার করে তালেবানদের মতো লড়াইয়ের ময়দানে নামতে পারবেন। প্রকৃত মুসলমান হতে গিয়ে কয়জন পারবেন আধুনিক পুজিবাদী বিলাস বেসনের সুবিধাটুকু ছাড়তে। আপনারা বেশিরভাগই সুবিধা নিতে কখন মুসলমান, আবার কখন একজন অত্যাধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা মানুষ। আপনার ধর্ম ইসলাম নয়, আপনার ধর্ম পুজি/ইগো। এই ব্লগের আস্তিকদের একটা বড় অংশই কখন প্রয়োজন মাফিক যুক্তির আবার কখন বিশ্বাসের আবার কখন সমর্থন আর গালাগালির আশ্রয় নেন, এটা ধর্মহীনতার প্রমান। নাস্তিকদের অবশ্য দেখা যায়, তারা প্রায় সবসময় একটা অবস্থানে থেকেই লড়াইটা চালান। সে হিসাবে এ ব্লগের আস্তিকরা অপেক্ষাকৃত বেশি নাস্তিক আর নাস্তিকরা অপেক্ষাকৃত বেশি আস্তিক। ব্যাতিক্রম অবশ্যই আছে। তারা এ হিসাবের বাইরে। নাস্তিক ব্লগারদেরও দেখেছি অনেক ক্ষেত্রে গায়ের জোরে বা জ্ঞান গোরিমায় অন্ধ হতে, আস্তিকদের হাস্যস্পদ করতে।
এবার আসি বিজ্ঞানের কথায়। “ বিশ্বাসই যেখানে ইসলাম/ খৃষ্টান/ ইহুদি এ জাতীয় ধর্মগুলোর মূল খুটি, সেখানে গত প্রায় এক শতক ধরে এই ধর্মগুলোকে বিজ্ঞানময় বলে যাহির করতে যুদ্ধে নামার কারণ কি? কারণ আর কিছু না, ধর্ম একটা নানান রুপের নানান ধারার ক্রম পরিবর্তনশীল বিষয় হওয়া সত্ত্বেও আধুনিক যুগে এসে আমরা “ধর্ম” শব্দটাকে যেমন একটা বিশেষ বিমূর্ত ব্যাঞ্জনা দিয়েছি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও সেই একই ঘটনা ঘটেছে। ইউরোপিয়রা এই শব্দটাকে একটা আগ্রাসি হেজিমোনিক রুপ দিয়েছে। শিল্প বিপ্লবের পর একটা শ্রেনী এই “বিজ্ঞান” নামক জিনিসটাকে নিজেদের সম্পত্তি বলে দাবি করে এর সিড়ি বেয়ে ক্ষমতার উচ্চ শিখরে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে “বিজ্ঞান” নামক কোন একটা কিছুর কাছে নিজেদের অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যাওয়ার পর শুরুতে “একটা শ্রেনী” চেষ্টা করেছে এই “বিজ্ঞান” নামক অচেনা অজানা বস্তুটার বিরোধীতা করতে, তা সম্ভব হইনি, ক্ষমতা হাড়ানোও তাদের বন্ধ হয়নি, এখন তারা শুরু করেছেন এই বস্তুটাকে নিজেদের সম্পত্তি বলে দাবি করা। কিভাবে তা দাবি করা যায়, একমাত্র উপায় নিজেদের ধর্ম গ্রন্থে এই বিশেষ বস্তুটাকে খুজে বের করা। কাজটা প্রথমে করেছে ইহুদিরা, তারপর খৃষ্টানরা, তারপর মুসলমানরা, এখন হিন্দুরাও শুরু করেছে। কিন্তু এই বিজ্ঞান জিনিসটা কি? এটাতো বোঝা গেলো না। এটা কি কোন আদর্শ, কোন ধর্ম না কি কোন পদ্ধতি? এটা না জেনে যখন আমরা তর্কে নামি বিজ্ঞান বড় না কি ধর্ম তখন তা আসলে একটা অর্থহীন বিতর্ক ছাড়া আর কিছুই হয় না। (চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

