বিজ্ঞন সম্পর্কে শেষ কথাঃ বিজ্ঞান সম্পর্কে আরো কিছু কথা না বললেই নয়। পরবর্তি আলোচনায় যাওয়ার আগে বিজ্ঞানের “ক্ষমতা” সম্পর্কে সামান্য আলোচনা করে নেয়া দরকার। বিজ্ঞানের দৌঁড় কতদুর? বিজ্ঞানের ক্ষমতা কতটুকু? এই ধরণের প্রশ্নের সম্মুখিন আমরা কম হইনা। অনেক ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানের ক্ষমতার সাথে স্রষ্টার ক্ষমতার তুলনামূলক বিচার করা শুরু হয়ে যায়, অনেকে এমন প্রশ্নও করে, “বিজ্ঞান কি পারবে মৃত মানুষ কে জীবন দিতে ”? “বিজ্ঞান কি পারবে মানুষকে অমর করতে”? বিজ্ঞান যেনো শুধু ধর্ম না, স্রষ্টারও প্রতিদ্বন্দী। এখন, বিজ্ঞান যদি হঠাৎ মৃত কে জীবিত করে ফেলতে পারে তাহলে কি ইশ্বরের অস্তিত্ব মিথ্যা হয়ে যাবে? মনে হয় না।
আগের পর্বে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি যে বিজ্ঞান কোন ধর্ম বা তত্ত্ব নয়, বিজ্ঞান পদ্ধতি বা চর্চা। সেই হিসাবে বিজ্ঞানের ক্ষমতার প্রশ্ন কি অবান্তর? মোটেই না। প্রশ্নটা সরল এবং অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চবুদ্ধি প্রসুত না হতে পারে তবে প্রশ্নটা অবান্তর না। আগেই বলেছি “ধর্ম” বিষয়টা মানুষের জীবন আর সমাজের নৈতিকতা, আইন আর আচারের একটা সমষ্টি হওয়া সত্ত্বেও “ধর্ম” শব্দটা হেজিমোনিক মর্যাদার কারনেই মানুষ এবং মানবিতার চেয়ে উচ্চ এবং আলাদা অতিপ্রাকৃত “অস্তিত্ব”এর ব্যাঞ্জনা লাভ করে। “বিজ্ঞান” নামক শব্দের ক্ষেত্রেও ঘটে একই ঘটনা। পদার্থ বিদ্যা (পদার্থ বিজ্ঞান), রসায়ন শাস্ত্র (রসায়ন বিজ্ঞান), জীব বিদ্যা (জীব বিজ্ঞান) এইরকম বিভিন্ন জ্ঞান শাস্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু মাত্র “বিজ্ঞান” শব্দটা নিজেই মানুষ এবং মানুষের চেয়ে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন একটা অস্তিত্বে পরিণত হয়। অথচ বাস্তবে আমি যখন কোন রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ক্ষমতা বা সামর্থ সন্ধান করি, তখন মোটেই “বিজ্ঞান” নামক কোন “অস্তিত্ব”এর ক্ষমতা বা সামর্থ অনুসন্ধান করিনা, আমরা অনুসন্ধান করি রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে মানুষের ক্ষমতা বা সামর্থ। বিজ্ঞানের কোন ক্ষমতা নাই, সামর্থ নাই, যোগ্যতা নাই। যত ক্ষমতা, যত যোগ্যতা-সামর্থ সব মানুষের। মানুষ রকেট বানিয়েছে, মানুষ চাঁদে গেছে, মানুষ আবিষ্কার করেছে পদার্থ আর শক্তির মধ্যকার সম্পর্ক, মানুষ আবিষ্কার করেছে মহাকর্ষ, বিজ্ঞন করে নাই। পরমানুর ভিতরের জগৎ আর সৌরজগতের বাইরের জগৎ এইসবের মডেল তৈরি করেছে মানুষ, বিজ্ঞান করে নাই। বিজ্ঞান নামক পদ্ধতি বা চর্চা শুধু মানুষের হাতিয়ার মাত্র। বিজ্ঞানের সাফল্য মানুষের সাফল্য, বিজ্ঞানের ব্যার্থতা মানুষেরই ব্যার্থতা। বেশ কিছু জ্ঞান শাস্ত্রে বিজ্ঞান নামক চর্চা বা পদ্ধতি ব্যাপক সাফল্য প্রদর্শন করলেও সকল জ্ঞান শাস্ত্রেই এই পদ্ধতির প্রয়োগ সঠিক/উচিত/প্রয়োজনিয় কিনা তা ভিন্ন বিতর্কের বিষয়, এই ব্যাপারে এখানে আলোচনা অবান্তর মনে করছি। তবে ধর্মশাস্ত্র বা ধর্মতত্ত্বে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগ সম্ভব কি না বা সম্ভব হলে কিভাবে সম্ভব তা নিয়ে সামান্য আলোচনা করার প্রয়োজন বোধ করছি। এখন পর্যন্ত ধর্মশাস্ত্রে বিজ্ঞান সন্ধানীদের ধর্মগ্রন্থ ঘেটে আধুনিক জ্ঞান চিন্তার সমকক্ষ বক্তব্য খুজে বের করার পদ্ধতিকে মোটেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বলা যায় না। ধর্ম শাস্ত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহারের উদাহরণও একে বলা যায় না। কোন বিষয়ে কিছুই না জেনে তথ্য উপাত্ত্ব বিশ্লেষনের মাধ্যমে নতুন কোন তথ্য/বক্তব্য বা স্বিদ্ধান্ত পাওয়ার পদ্ধতি যেমন বিজ্ঞান, তেমনি আগে থেকে ধারণাকৃত একাধিক স্বিদ্ধান্তের মধ্যে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে শুধুমাত্র সঠিক স্বিদ্ধান্তটি রেখে বাকি গুলো বাতিল করে দেয়াও বিজ্ঞান। সেই ক্ষেত্রে কোন বিশেষ ধর্মের ধর্মানুরাগি তার নিজের ধর্মের অস্তিত্ব,নৈতিকতা,আইন,আচার সংক্রান্ত স্বিদ্ধান্ত ও ধারণা গুলোকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে গ্রহণ অথবা বর্জন করতে পারেন, এই প্রক্রিয়ায় ধর্ম শাস্ত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগ সম্ভব। কোন ধর্মের অস্তিত্ব (ব্যাক্তি ও বিশ্ব) সম্পর্কে ধারণা কেউ পদার্থ বিদ্যার তথ্য ও সূত্র প্রয়োগের মাধ্যমে প্রমানিত ও অপ্রমানিত করতে গেলে কোন আপত্তি দেখি না, তবে সেই ধর্মের নৈতিক ধারণা কোন একক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করা যাবে কি না সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছি। তবে এই কাজ করা কতোটা সমিচিন বা ফলদায়ক হবে জানি না। কারন, কেউ যদি ধর্ম কে শুধুমাত্র বিশ্বাসের সাথেই সম্পর্কিত রাখে তাহলে তো এই সব কিছুই অর্থহীন।
‘আস্তিকতা’ ও ‘নাস্তিকতা প্রসঙ্গেঃ
আস্তিকতা আর নাস্তিকতা, এই দুইটা শব্দই বাংলা ভাষায় এসেছে সংস্কৃত থেকে। শব্দ দুইটার অর্থ বেশ মজার। বুৎপত্তিগতভাবে শব্দ দুইটার সাথে ইশ্বরের কোন সম্পর্ক নাই। দুইটা শব্দেরই মূলে আছে ‘অস্’ ধাতু, যার অর্থ ‘থাকা’। ‘অস্’ ধাতু থেকেই হয়েছে ‘অস্তি’―অর্থাৎ ‘আছে’। আস্তিক শব্দের প্রকৃত অর্থ “যা আছে তাতে যে বিশ্বাস স্থাপন করে” আর নাস্তিক শব্দের প্রকৃত অর্থ “যা আছে তাতে যে বিশ্বাস স্থাপন করেনা”। মানে, অস্তিত্ব প্রমানিত হয়ে গেছে অথচ এমন কোন কিছুর অস্তিত্ব অস্বিকার করাই নাস্তিকতা, যা ডাহা মিথ্যার সামিল। ব্রাহ্মণরা একসময় এই শব্দ দুইটা ব্যবহার করা শুরু করলো “বেদ” মানা আর না মানার ভিত্তীতে। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাচীন কালে যেই সব ব্যক্তি বা জ্ঞানতাত্মিক গোষ্ঠি “বেদ” মানতো (তারা আল্লাহর অস্তিত্ব মানুক বা না মানুক) তাদের ব্রাহ্মণরা অভিহীত করতো আস্তিক বলে আর যারা বেদ মানতোনা তাদেরই অভিহীত করতো নাস্তিক বলে, এমনকি ইশ্বরের অস্তিত্বে তাদের বিশ্বাস থাকলেও। এই প্রক্রিয়াকে যদি আপনি সঠিক মনে করেন, তাহলে আমার কিছু বলার নাই, কিন্তু এই প্রক্রিয়াকে যদি আপনি সঠিক বলে মনে না করেন, তাহলে আমার অনেক কিছুই বলার আছে।
প্রথম যে কথাটা বলার আছে, তা শুরু করি কিছু প্রশ্ন দিয়ে। (প্রশ্নগুলো যারা নিজেদের আস্তিক মুসলমান বলে দাবী করেন তাদের উদ্দেশ্যে।
প্রশ্ন-১। ধরেন, একজন ব্যক্তি ইসলাম ধর্মে যেমন আল্লাহর কথা বলা আছে, সেই রকম কোন আল্লাহর অস্তিত্ব মানে না, সে কোরআন শরিফও মানে না, আপনার রাসুলকেও মানে না। সে হিন্দু ধর্ম মেনে চলে। এই ব্যাক্তি কি নাস্তিক?
প্রশ্ন-২। ধরেন, একজন ব্যক্তি ইসলাম ধর্মে যেমন আল্লাহর কথা বলা আছে, সেই রকম কোন আল্লাহর অস্তিত্ব মানে না, সে কোরআন শরিফও মানে না, আপনার রাসুলকেও মানে না। সে খৃষ্টান ধর্ম মেনে চলে। এই ব্যাক্তি কি নাস্তিক?
প্রশ্ন-৩। ধরেন, একজন ব্যক্তি ইসলাম ধর্মে যেমন আল্লাহর কথা বলা আছে, সেই রকম কোন আল্লাহর অস্তিত্ব মানে না, সে কোরআন শরিফও মানে না, আপনার রাসুলকেও মানে না। সে বৌদ্ধ ধর্ম মেনে চলে। এই ব্যাক্তি কি নাস্তিক?
প্রশ্ন-৪। ধরেন, একজন ব্যক্তি ইসলাম ধর্মে যেমন আল্লাহর কথা বলা আছে, সেই রকম কোন আল্লাহর অস্তিত্ব মানে না, সে কোরআন শরিফও মানে না, আপনার রাসুলকেও মানে না। সে উপরক্ত কোন ধর্মই মেনে চলে না। অনন্ত শক্তির লীলা খেলা গোটা জড় মহাবিশ্বটাকেই সে ইশ্বর মর্যাদা দেয়, কোন একজন দার্শনিক/মনিষী কে সে নবীর মর্যাদা দেয়। অথবা এই জড় মহাবিশ্বে যে প্রানের বিকাশ হয়েছে সেই প্রানকেই সে ইশ্বরের মর্যাদা দেয়, অথবা নিজেকেই সে ইশ্বরের মর্যাদা দেয়, প্রাণের সেবা করার মধ্যেই সে নিজের জীবনের সার্থকতা খুজে পায়। তার প্রিয় দার্শনিক/মনিষীর নির্দেশিত নৈতিক নিয়ম/আচার/আইন অথবা প্রাকৃতিক শক্তির রহস্য খুঁজে, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে প্রকৃতির আইন নামক কোন আইন খুজে পেয়ে সেই আইন অনুযায়ী সে জীবন যাপন করে। এই ব্যাক্তি কি নাস্তিক?
ধারণা করি বেশিরভাগ আস্তিক মুসলমানই প্রথম তিন ব্যাক্তিকে নাস্তিক বলবেন না, যদি না কেউ যদি ইসলাম ছাড়া অন্য সব ধর্মকেই নাস্তিক্য বলে ধরে নেয় । কিন্তু চতুর্থ ব্যক্তিকে অধিকাংশই নাস্তিক আখ্যা দেবেন। যদি তাই দিয়ে থাকেন তাহলে এই ধর্মগুলোর ইশ্বর বিশ্বাসের তুলনামূলক এবং প্রথম তিন ব্যক্তির সাথে চতুর্থ ব্যক্তির তুলনা মূলক আলোচনা করা যাক। হিন্দু ধর্মে একজন ভগবানের কথা থাকলেও সেই ভগবান ছাড়াও নানান দেব দেবীর (যারা হয় কোন প্রাকৃতিক শক্তির প্রতিনিধি অথবা কোন আদী মনিষী) পুজা অর্চনা তারা করে। এই বহুত্ববাদ আর একত্ববাদের মধ্যে “তাওহিদ” নামক বিশাল বড় একটা ফাক আছে। মুসলমানের ইশ্বর যেখানে “এক”এই শেষ, হিন্দুর ইশ্বর সেখানে “বহু”তে পরিব্যাপ্ত। খৃষ্টানের ইশ্বর “এক”এ নয়, “তিন” এ পরিব্যাপ্ত, আল্লাহ-যিশু-পবিত্র আত্মা, এই তিনে মিলে ইশ্বর। মূল বৌদ্ধ ধর্মে ইশ্বর নিয়ে কোন কথাই নাই, গৌতম কে জানা এবং মানাই বৌদ্ধ ধর্ম। গৌতম লাভ করেছেন বোধি, হয়েছেন বুদ্ধ, আর বুদ্ধই ইশ্বর। ইসলাম, ইহুদি, খৃষ্টান,বৌদ্ধ এই চারটা ধর্মে ইশ্বর সম্পূর্ন চারটা ভিন্ন অস্তিত্ব, ভিন্ন বস্তু। ইশ্বর সম্বন্ধে এতো ভিন্ন ধারণা থাকা সত্ত্বেও এই চারটা ধর্মেরই নীতি শাস্ত্র আছে, পাপ-পূন্যের ধারণা আছে। এই যদি হয় ঘটনা তাহলে প্রচলিত এই চারটি ধর্মের সাথে অমিল থাকার কারণে চতুর্থ ব্যাক্তিকে “নাস্তিক” অভিহিত করা হবে কোন যুক্তিতে? এর পরও যদি ঐ ব্যাক্তিকে কেউ “নাস্তিক” বলে অথবা নীতিহীন বলে তাহলে বেদ অমান্যকারীদের নাস্তিক বলে অভিহীত করা ব্রাহ্মণদের সাথে তার কোনই পার্থক্য থাকে না।
“নাস্তিক” কেনো নাস্তিক হইতে চায়?
আমার ওপরের যুক্তিগুলো মেনে নিলেও কিছু আপত্তি থেকে যেতে পারে। একজন আস্তিক প্রশ্ন করতে পারেন, নাস্তিক উপাধি তো আমরা সবাইকে জোর করে দেইনা। এই উপাধিতো অনেকেই গর্ব ভরে মাথা পেতে নেয়, চিৎকার করে নিজের নাস্তিক্য দাবী করে। আপত্তি থাকতে পারে একজন নাস্তিকেরও। নাস্তিকেরও ধর্ম আছে, আমার এই কথাটায়ও আপত্তি তুলতে পারেন স্বয়ং একজন নাস্তিক। তা তিনি তুলতেই পারেন। একজন মানবতাবাদী, বস্তুবাদী ব্যক্তি (তিনি আরো অনেক ‘বাদি’ হতে পারেন) যিনি কিনা মানুষকে ভালোবেসে, মানুষের কল্যান সাধনের লক্ষ্যে যুক্তিকে নৈতিকতা মাপার নিক্তি হিসাবে ব্যবহার করে ভালো-মন্দ/উচিত-অনুচিত বিচার করে জীবন যাপন করেন তিনি যদি “নাস্তিক” শব্দের মাঝে নিজের পরিচয় খুজে নিয়ে সাচ্ছন্দ বোধ করেন তাহলে আসলে আপত্তি করার মতো তেমন কিছুই নাই। এখানে তার দোষও কিছু নাই। ভাষার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে আমাদের সমাজ সভ্যতা। একটা শব্দ “নাম”এর মাঝেই খুজে পাই আমরা আমাদের প্রথম স্বিকৃতি, তার পর চাই আরো অনেক শাব্দিক স্বিকৃতি, পরিচিতি। কেনো? তা এইখানে আলোচনার বিষয়বস্তু না। তবে “নাম” এর পরে আরেকটা শব্দ আমাদের আরেকবার সংজ্ঞায়িত করে, আর সেই শব্দটা হলো “ধর্ম”, কোন একটা ধর্ম। আর আজ যখন একটা শিশু বড় হতে হতে প্রশ্ন করা শেখে, জিজ্ঞাসু হয়ে ওঠে, আর যখন প্রশ্নের উত্তরে শোনে এমন প্রশ্ন বা এমন কথা বলতে নাই, এইসব নাস্তিক্য, এইসব প্রশ্ন করলে নাস্তিক হয়ে যাবা, তখন ঐ শিশু হয় প্রশ্ন করা বন্ধ করে, আর যদি তা না করে তখন ঐ নাস্তিক শব্দই হয়ে যায় তার আশ্রয়, পরিচয়। তার সমাজ আর পরিবারের ধর্ম যখন তাকে আশ্রয় দিলো না, আশ্রয় দিলো ঐ শব্দ “নাস্তিক”, তখন ঐ শব্দের জন্য ভালোবাসা আর গর্ব তার থাকতেই পারে? ধর্ম তার সাথে বিমাতাসূলভ আচরণ করেছে বলেই ধর্মের প্রতি অনেক ক্ষেত্রেই সে হয় নির্দয়, তার পূর্ব পুরুষের ধর্মের ভেতরকার ত্রু টি খুঁজে বের করাই হয়ে যায় তার কাছে প্রধান কাজ। অনেক ক্ষেত্রেই সমাজের বিশ্বাসী মানুষের সাথে যে ভাষাগত দুরত্ব তার তৈরি হয় তাতে সে ব্যর্থ হয় তাদের কাছে নিজের বক্তব্য পৌছে দিতে।
কেনো আমি আস্তিক নই? কেনো আমি নাস্তিক নই?
কারন দুই ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর খোজার ক্ষেত্রে আমি একজন অজ্ঞিয়বাদী। অজ্ঞিয়বাদই যুক্তিবাদের মূল খুটি। আস্তিকতা-নাস্তিকতা যদি একত্ববাদী ধর্মের ইশ্বরে বিশ্বাস নিয়ে হয় তবে আমি অজ্ঞিয়বাদকেই শ্রেয় মনে করি। একত্ববাদী ধর্মের ইশ্বর বা আল্লাহর ধারণা এমন একটা ধারণা যার অস্তিত্বের কোন প্রমান নাই আবারা অনস্তিত্বেরও কোন প্রমান নাই। জগত এবং অস্তিত্বের অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ ধারণা সৃষ্টিকর্তার ধারণা। সৃষ্টিকর্তাকে কে সৃষ্টি করেছে এই প্রশ্ন অবান্তর। সৃষ্টিকর্তা নিজেই সবকিছু সৃষ্টি করেছে এবং তাকে কেউ সৃষ্টি করে নাই, এটা তার সংজ্ঞা। প্রকৃতিতে “মহাকর্ষ” শক্তির আবির্ভাব ব্যাখ্যা করতে যেমন হিগস বোসনের অস্তিত্ব একটা গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, প্রকৃতির সৃষ্টির পেছনেও ইশ্বরের অস্তিত্ব তেমন একটা পুরাতন ও প্রচলিত ধারণা। একটা ধারণার পিছে আছে আধুনিক চিন্তাশীল মানুষ আর আরেকটা ধারণার পেছনে আছে প্রাচীন কালের চিন্তাশীল মানুষ। হিগস বোসনের অস্তিত্ব আছে কি নাই তার প্রমান পাওয়া যেতে পারে লার্জ হাড্রন কল্লাইডরের মাধ্যমে। ইশ্বরের অস্তিত্ব প্রমান বা অপ্রমান করার জন্য এমন কোন যন্ত্র এখনো হয় নাই। সেই ক্ষেত্রে অজ্ঞিয়বাদী অবস্থান গ্রহণ করাই শ্রেয় মনে করি। অনেক দার্শনিক (মুসলমান দার্শনিকরাও) যে গুনহীন, বিকারহীন সর্বব্যাপী ইশ্বরের কথা বলে গেছেন, সেই রকম ইশ্বর থাকা অসম্ভব এইরকম কোন প্রমান কখনো পাই নাই।
দ্বিতীয়ত, আমি “আস্তিক” বা “নাস্তিক” নই এই শব্দ দুইটার অর্থগত দুর্বলতার বা প্রচলিত অর্থের সিমাবদ্ধতার কারণে। এ বিষয়ে আমি বারবারা আলোচনা করেছি এ লেখায়। ইশ্বর আর জগৎ সম্বন্ধে একজন মুসলমানের বিশ্বাসের সাথে আমার ধারণার মিল অমিলের সাথে তুলনা করেতো আমি “নাস্তিক” বা “আস্তিক” হয়ে যাবো না। তাছাড়া এই শব্দ দুইটার আশ্রয় না নিয়েও আমি পরিচিত হতে পারি। প্রথম পর্বেই আমি “ইশ্বর”, “ধর্ম” এই শব্দগুলোর প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি। আমি তাই ধর্মহীনও না, নীতিহীনও না, আমি কে এবং আমি কেমন তা বিচার করবে সমাজের মানুষ। মুসলমানের “আল্লাহ” বা হিন্দুর “ভগবান” সম্পর্কে আমার ধারণা কি তা বিবেচনা না করেও বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটা দেশের গণমানুষের মুক্তির লড়াইয়ে, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যুদ্ধে, জাতীয়তাবাদী ধ্যান ধারণায়, পরিবেশবাদী চেতনায়, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে একই অবস্থান আর একই স্বার্থের যায়গা থেকে ভালো/মন্দ, ন্যায়/অন্যায় আর পাপ/পূন্যের সময়োপযোগি ম্যানিকিয় ধারণায় আমার সাথে একতাবদ্ধ হতে পারে কোন বাঙালী মুসলমান অথবা বাঙালী হিন্দু। একই কাজ আমিও করতে পারি।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



