সকাল বেলা ব্লগে ঢুকেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিছু একটা চক্রান্ত চলছে আগেই আন্দাজ করেছিলাম। কিন্তু তা যে এমন আকার ধারণ করবে এবং ব্লগের অনেক চেনা ব্লগারও যে এমন বোকামি শুরু করবেন এবং এমন আগ্রাসী ভুমিকায় অবতির্ণ হবেন কল্পনাও করি নাই।
ব্লগে যারা যারা আমাকে চেনেন, তারা জানেন, ইশ্বর বিশ্বাসের দিক থেকে আমি একজন অজ্ঞেয়বাদী। ধর্মীয় বিশ্বাস যাই হোক, আমি একজন বাঙালি, আপনাদের ভাই। আমি ধর্মীয় আলোচনায় যুক্তিপূর্ণ আলোচনা করি। রাজাকারদের পোস্টে আস্তিক, নাস্তিক, আওয়ামীলীগ, বিএনপি সবার সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে প্রতিবাদ করি। একজন জাতীয়তাবাদী হিসাবে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ এবং সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধতা এই দুইয়ের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান। এই লড়াইয়ে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষ সকল বাংলাদেশী আমার ভাই।
বাংলাদেশ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, নাস্তিক এহেন বহু ধাচের মানুষের সম্পৃতির দেশ। এই সম্পৃতিতে তারাই ফাটল ধরাতে চেয়েছে, যারা বিভক্ত বাঙালিদের ঘাড়ে কাঠাল ভেঙে খেতে চায়। ব্রিটিশ আমলে, পাকিস্তান আমলে এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করেছে কিছু গোষ্টি। একাত্তরে আমরা ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছি, একসাথে প্রাণ দিয়েছি।
আজকে এই ব্লগে নতুন করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। হিন্দু, বৌদ্ধের প্রাবল্য নাই, তাই এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা হচ্ছে আস্তিক-নাস্তিক মেরুকরণের মাধ্যমে। এবং ব্লগ জুড়ে “নাস্তিক খেদাও” আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। অনেকেই এমন সব মন্তব্য করছেন যা দেখে মনে হবে, নাস্তিকরা বুঝি মানুষ না, বরং জঘন্য পশু। আমি নিচে সাম্প্রতিক অবস্থার কিছু বিশ্লেষন তুলে দিলাম। দয়া করে সবাই ঠান্ডা মাথায় পড়ে বিবেচনা করবেন।
যেভাবে শুরুঃ
যেভাবে এই দাঙ্গার শুরু তা খুবি সন্দেহজনক। হোরাস ভাইয়ের বিবর্তন বিষয়ক এক পোস্টে সার্জন নামক একজন ব্লগার খুচিয়ে খুচিয়ে ঝগড়া বাধালেন। তিনি যে ইচ্ছে করে খুচিয়ে খুচিয়ে ঝগড়া লাগিয়েছেন এটা তিনি নিজমুখে স্বিকার করেছেন, এবং এই বিষয়ে আমি এই পোস্টটাও দিয়েছিলাম তার উদ্দেশ্য কি তা জানার জন্য। তিনি আমাকে কোন সদুত্তরতো দিতে পারেনই নাই, উলটো ঐখানেও ঝগড়া বেধে গেলো। হঠাৎ করেই এমন কিছু নিক সেখানে চলে এলো যাদের আমি আগে কখনো আমার ব্লগে দেখি নাই, এরা খুব পরিচিত মুখও না, বোঝাই যায় মাল্টি নিক। এই নিকগুলো থেকে সার্জনকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা শুরু হলো। তিনি আবার এগুলো প্রমান হিসেবেও রাখছিলেন। উনি এমনিতেই কালকে থেকে যেই পরিমান ছলচাতুরি করেছেন, তাতে এসব তার নিক হলেও অবাক হবো না। তিনি মাল্টিনিক এবং গালিগালাজের বিপক্ষে কথা বলছিলেন, অথচ তিনি নিজেই গালিবাজ, সুশিল হওয়ার অভিনয় করলেও ধরা খেয়ে গেছেন, আর তার নিজের নিকটাও পুরোন কারো মাল্টিনিক। এরপরই ইব্রাহিম আজহারি নামে একজন পোস্ট দেন, সেখানেও একেবারেই কম পরিচিত কিছু নিক (ব্লগে নাস্তিক বলে পরিচিত না) এসে উলটাপালটা গালিগালাজ শুরু করে। এই বিষয়ে দেখুন এই পোস্টটা । তার পরপরই শুরু হয়ে গেল নাস্তিক খেদাও আন্দোলন। শুরুটা যেই নিকগুলো দিয়ে হয়েছিল, সেই নিকগুলোও সন্দেহজনক। এই ব্লগে হাতে গোনা ২/১ জন প্রতিষ্ঠিত গালিবাজ নাস্তিক আছে, তেমন কিন্তু কিছু আস্তিকও আছে। এরা আস্তিক এবং নাস্তিক নির্বিশেষে ভুল পথে আছেন, এক্ষেত্রে শুধু নাস্তিকদের দোষারোপ করা ভুল হবে। আজকের নাস্তিক বিরোধী পোস্ট গুলোতেই ছুটেছে গালির নহর।
যে কারণে এই দাঙ্গা লাগানো হতে পারেঃ
ব্লগে একসময় লীগপন্থী ব্লগারদের রাজত্ব চলতো। সেইদিন এখন আর নেই। এদের বেশিরভাগই ব্লগে নিন্দিত, তাদের কিছু ভালো কাজ সত্ত্বেও। আবার ব্লগের রাজাকারপন্থী ছাগুদের বিরুদ্ধেও আছে শক্তিশালী জনমত, এরাও ব্লগের মুলধারা না। গত বেশ কয়েকমাস যাবৎ ব্লগের আস্তিক নাস্তিক নির্বিশেষে একটা পজিটিভ ঐক্য গড়ে উঠছিল ব্লগারদের মাঝে। আমার নিজের সাথেই একেবারে ভিন্ন মতের বেশকিছু ব্লগারের সাথেই যৌক্তিক আলোচনার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল সূসম্পর্ক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি এবং সাম্প্রতিক আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ব্লগে একটা শক্তিশালী ঐক্য এবং জনমত গড়ে উঠছিল। আমার বিশ্বাস এই ব্লগিয় সম্পৃতি এবং ঐক্য বিনষ্ট করতেই এই গভীর ষড়যন্ত্র, পরিকল্পিত দাঙ্গা।
কারা এই দাঙ্গা লাগাতে পারেঃ
আমি খোলাখুলি ভাবেই বলবো। ব্লগের এই সম্পৃতি নষ্ট হলে লাভ দুইটা গোষ্টির। এই দুইটা গোষ্টির গোড়া আবার একটাই, আর তা হলো বিদেশী শক্তির দালালী।
প্রথমতঃ স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে এই দাঙ্গা লাগাতে পারে। বাংলাদেশে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিরা আগেও বহুবার জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করতে ভিন্ন ধর্মের মানুষদের বিরুদ্ধে জেহাদের ডাক দিয়েছে। এই চক্রান্ত তারই ব্লগিয় সংস্করণ হতে পারে।
দ্বিতীয়তঃ এটা আওয়ামীপন্থী ব্লগারদের পছন্দ না হতে পারে। তাও সরাসরি বলি। এই ব্লগে একসময় আওয়ামীপন্থী ব্লগারদের রাজত্ব চলতো। সেই রাজত্ব আর নাই। ব্লগের নতুন জেনারেশন আস্তিক নাস্তিক নির্বিশেষে আওয়ামীলীগের সমালোচনা করে। ব্লগের বর্তমান নাস্তিকদের বড় অংশই আওয়ামীপন্থী না, এমনকি তাদের কয়েকজন একসময় সরাসরি বিএনপির রাজনীতির রাথে জড়িত ছিলেন। এই ব্লগের নিন্দিত, ব্যানড, এবং ব্লগত্যাগী বেশ কয়েকজন বিখ্যাত/কুখ্যাত লীগ পন্থীর এটা ভাল লাগার কথা না। মাল্টি নিকের খেলা এবং চালবাজীতেও এরা বিখ্যাত ছিলেন। ব্লগে একসময় রাজাকার বিরোধীতা করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামীলীগ পন্থী ইতিহাস চর্চা হয়েছে। সম্প্রতি আমি ব্লগের বর্তমান সময়ের বেশ কয়েকজন আস্তিক এবং নাস্তিকদের সাথে বাংলাদেশের নির্দলীয় ইতিহাস নিয়ে ব্লগে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা করছিলাম। এই খবর তাদের কানে পৌছানো বিচিত্র না, এই কাজে ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য নাস্তিক/গালিবাজ ট্যাগিং করে ব্লগের বেশ কয়েকজন পজিটিভ ব্লগারকে নিন্দিত করতেও এই সাজানো দাঙ্গা লাগানো হতে পারে।
আস্তিকদের প্রতি আহবানঃ
প্রিয় আস্তিক ভাইয়েরা, আপনারা অনেকেই আমার বন্ধু মানুষ। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করেন। বহু অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই নাস্তিক ভাইয়েরাই কিন্তু আপনাদের কাধে কাধ মিলিয়ে লড়াই করেন। আপনারা ভুলে যাবেন না, বেশিরভাগ নাস্তিকই কিন্তু রাজকার বিরোধী কর্মঠ এবং তুখোড় ফাইটার। এদের বিরোধীটা করে আপনারা নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারছেন।
নাস্তিকদের প্রতি আহবানঃ
প্রিয় নাস্তিক ভাইয়েরা। আপনারা মাথা ঠান্ডা রাখুন। মনে কষ্ট নেবেন না, রাগ করবেন না। করলে আস্তিক নাস্তিক নির্বিশেষে ব্লগের পুরো কমিউনিটিরই ক্ষতি হবে। অনেকেই আজকে জঘন্য ভাষায় গালিগালাজ করছে। উলটো গালিগালাজ করা থেকে বিরত হোন, সন্দেহজনক নিক ব্লগ করুন। আমিও করেছি।
এর বেশি আর কিছু বলার নাই। অনেক পরিচিত ব্লগারই আজকে যেই আচরণ করছেন, তা অব্যাহত থাকলে হয়তো আর এই ব্লগে ব্লগিংই করা হবে না। আপনারা যদি ব্লগে শুধুমাত্র আস্তিকদেরই চান এবং আমাদের ঘৃণা করেন, তাহলে তো এইখানে ব্লগিং করে লাভ নাই। আর বিশেষ কয়েকজন নাস্তিককে বলবো, আপনারা গালিগালাজ করে নিজেদের ক্ষতিই করছেন। এর জন্য আপনাদের পস্তাতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুলাই, ২০১০ দুপুর ২:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


