“আল্লাহ মইরা গেছে! আল্লাহ মৃত! আমরা তারে মাইরা ফালাইছি” - ফ্রেডরিক নিৎসে, দ্যা গে সাইন্স।
“আল্লাহ মইরা গেছে”, উনবিংশ শতকের জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিক নিৎসে’র সবচেয়ে বিখ্যাত এবং কূখ্যাত উক্তি। এই উক্তি তিনি প্রথম ব্যাবহার করেন তার সবচেয়ে ব্যক্তিগত আবেগ অনুভুতির কাজ বলে স্বস্বীকৃত পুস্তক “দ্যা গে সাইন্স”এ। তবে এই উক্তি বিখ্যাত হয়ে আছে তার সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুস্তক “দাস স্পোক জরাথুস্থ্রা” বাঙলায় “জরথুস্থ্র কহেন” এর মাধ্যমে।
“আল্লাহ মইরা গেছে”, এইটা কেমন কথা? নিৎসে জার্মান ছিলেন। জার্মান ভাষায় তিনি লিখছিলেন "Gott ist tot", ইংরেজি ভাষায় যার অনুবাদ “God is dead”। নিৎসে অবশ্য কোন প্রবন্ধ রচনায় এই ঘোষনা করেন নাই। তার তৈরি চরীত্র ‘পাগল’ এর মুখ দিয়াই এই বক্তব্য তিনি দেয়াইছেন, এই পাগলরে আমরা পরে দেখি প্রাচীন যুগের ফারসি নবীর নাম আর আদলে তৈরি নিৎসের নবী জরথুস্ত্র রূপে। এই পাগল আর এই জরথুস্থ্র অবশ্য নিৎসে নিজেই।
এক ধর্মনিষ্ঠ ক্যাথলিক পরিবারে নিৎসের জন্ম। তার এই আল্লাহ তাই আপাত দৃষ্টিতে ইব্রাহিমী ধর্মের খ্রীষ্টান আল্লাহ বইলাই গণ্য হয়। কিন্তু ইব্রাহিমী আল্লাহ তো এক অমর অজর সার্বভৌম সত্ত্বা, এই সত্ত্বার তো মৃত্যু নাই। তাইলে কি নিৎসে এমন কোন মরণশীল আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন যেই আল্লাহ হঠাৎ কইরা উনবিংশ শতকে মারা গেছেন? সেইটা সম্ভব না, কারণ নিৎসে নাস্তিক ছিলেন, অন্তত তার নিজের জবানিতে তাই মনে হয়। নিৎসে নিজেরে অভিহিত করেছেন একজন প্রবৃত্তিগতভাবে বা স্বভাবজাত নাস্তিক হিসাবে। নিৎসের জবানিতে -
“নাস্তিকতা আমার একেবারেই স্বভাবজাত। আমি বড়ই কৌতুহলী, বড়ই জিজ্ঞাসু। যেনোতেনো কোন উত্তরে আমার পোশায় না। ‘আল্লাহ’ একটা যেনোতেনো উত্তর, আমাদের চিন্তাবীদদের জন্য একধরণের অভদ্রতা, এবং দিন শেষে আবার আমাদের জন্য এক ধরণের যেনোতেনো ‘নিষেধাজ্ঞা’ও বটে, যে ‘তুমি এই বিষয়ে কোন চিন্তা করতে পারবানা’।”
প্রখ্যাত নিৎসে গবেষক ওয়াল্টার কফম্যান অবশ্য মনে করেন যে নিৎসে নাস্তিক ছিলেন না, বরং অজ্ঞেয়বাদ ছিল নিৎসের দার্শনিক অবস্থান, তবে এই খেয়ালী দার্শনিক আরো বহু শব্দের ব্যাবহারের এলাকা নিয়া যেমন উদাসিন ছিলেন, তেমনি উদাসিন ছিলেন নাস্তিকতা শব্দের এলাকা নিয়া, আর এই কারণে নিজেরে তিনি নাস্তিকই দাবি করেছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, “পরম সত্ত্বা” জাতীয় দার্শনিক “আল্লাহ” অথবা জগতের স্রষ্ঠা জাতীয় কোন সত্ত্বা বিষয়ে তার দার্শনিক অনুসন্ধানের শুরুর এলাকাটা “অজ্ঞেয়বাদী” হলেও ইব্রাহিমী আল্লাহর অনস্তিত্ত্ব বিষয়ে তিনি ছিলেন নিশ্চিত এবং সেইক্ষেত্রে একজন নাস্তিক। তো এই অজড় অমর ইব্রাহিমী আল্লাহর মৃত্যু বিষয়ে নিৎসের এই ঘোষনার অর্থ কি? যার অস্তিত্বে তিনি বিশ্বাসই করেন না, তিনি আবার তার পূর্ব অস্তিত্ব এবং বর্তমান মৃত্যুর ঘোষনাই বা কেমন করেন। তারচেয়েও আরো বড় সমস্যা আছে। নিৎসের পরিচয় আছে দার্শনিক হিসাবে, পরিচয় আছে মনবিজ্ঞানী হিসাবে, জনমনে এইসব তার ইতিবাচক পরিচয়। এর বাইরে নিৎসের এক নেতীবাচক পরিচয় আছে, সেই পরিচয় এন্টিক্রাইস্ট বা ঈসাদ্রোহী হিসাবে। খ্রীষ্টান ধর্ম এবং এই ধর্মের নীতি নৈতিকতার বিরুদ্ধে তার ঘৃণা এবং সমালোচনা তিনি তুলে ধরেছেন তার পুস্তক “দ্যা এন্টিক্রাইস্ট”এ। ইব্রাহিমী আল্লাহর মৃত্যুতে নিৎসের তাই খুশি হওয়ার কথা, অত্যন্ত আনন্দ আর উৎসবের মধ্য দিয়া “আল্লাহ মইরা গেছে” বইলা তার উল্লাস করার কথা। কিন্তু নিৎসে তা করেন নাই। আল্লাহর মৃত্যু ঘোষনা করেছেন তিনি বিমর্ষ মুখে, বেদনার সাথে। তার ঘোষনায় আনন্দ নাই, উৎকন্ঠা আছে।
নিৎসের পাগলা আল্লাহর মৃত্যুতে উল্লাস করে না, পাগল হইয়া সকালের আলোতেও লন্ঠন জালাইয়া বাজারে বাজারে ঘোরে আর চিল্লায়, “আমি আল্লাহরে খুঁজি, আমি আল্লাহরে খুঁজি”। লোকে তা দেইখা হাসাহাসি করে, জিজ্ঞাসা করে – আল্লারে খোঁজো কেন? সে কি হারায়া গেছে? সে কি বাচ্চা পোলাপানের লাহান রাস্তা হারাইছে? না কি সে আমগো ডরে লুকাইয়া আছে? না কি কোনখানে হাওয়া খাইতে গেছে? পাগলা তখন সবার মাঝখানে ঝাপায়া পরে, আর চিল্লায়, “আল্লা কই? আমি তোমগোরে কমু। আমরা তারে খুন করছি, তুমি এবং আমি, আমরা সবাই খুনি”। পাগলা বলে, “আল্লাহ মইরা গেছে, আল্লাহ মৃত, আমরা তারে মাইরা ফালাইছি”। পাগলা সুধায়, “যে ছিল এই দুনিয়ার সবচেয়ে পবিত্র, সবচেয়ে শক্তিশালী, আমাগো ছুরির ডগায় তার হইছে তার রক্তাক্ত মরণ, এই রক্ত আমাগো হাত থেইকা কে ধুইবে?”
আল্লাহর মৃত্যুতে নিৎসে খুশি না, বরং ব্যাথিত এবং হতাশ। নিৎসের এই হতাশার কারণ আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, প্রেম বা সহানুভুতি না, বরং নৈতিকতা বিষয়ে তার উদ্বেগ। পাগলা এমনি এমনি আল্লাহর সন্ধানে দিনের আলোয় লন্ঠন নিয়া বাজারে বাজারে ঘোরে না। যেই আল্লাহর মৃত্যুর কথা নিৎসে ঘোষনা করেছেন সেই আল্লাহ কোন বাস্তব অস্তিত্বশীল সত্ত্বা না, বরং সামাজিক সত্ত্বা। বিষয়টা আমি যেইভাবে বুঝি তা একটু ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। আদতে আল্লাহরে কেউ কোনদিন দেখে নাই, আল্লাহ মানুষের সাথে কথা বলে না, সামনে আইসা আদেশ দেয় না, মুখ ভার কইরা রাগও করে না। তারপরেও আল্লাহর একটা হেজেমনিগত অবস্থান জনমানুষের জীবনে প্রবল। মানুষ আল্লাহরে ডরায়, তার আদেশ অমান্য করারে পাপ মনে করে, অমান্য করলে তা নিয়া অপরাধবোধে ভোগে, অনবরত আল্লাহর অস্তিত্ব নিজেরে জীবনে অনুভব করে। এই অনুভুতি অদেখা আল্লাহর সাথে কোন বস্তুগত সম্পর্কের কারনে তৈরি হয় না, হয় কিছু বাস্তব সত্ত্বার সাথে সম্পর্কের কারণে। মসজিদ, মোল্লা, কোরআন, হাদিস ইত্যাদি ধর্মপুস্তক অদেখা বা অজ্ঞেয় বস্তু না, বরং বাস্তব সত্ত্বা। আর এইসব বাস্তব সত্ত্বার সাথে মানুষের সম্পর্ক যতক্ষন থাকে ততক্ষন পর্যন্ত তার জীবনে আল্লাহর অস্তিত্ব আছে, ততক্ষন পর্যন্ত আল্লাহ জীবন্ত সত্ত্বা। এইসব বাস্তব সত্ত্বার সাথে সম্পর্ক না থাকলে আল্লাহর আদেশ থাকে না, নিষেধ থাকে না, আল্লাহ থাকে না। মসজিদ যদি শিক্ষা এবং সামাজিক আচার বিচারএর কেন্দ্রে না থাকে, তাইলে আল্লাহ থাকে না। কোরআন, হাদিস যদি মূলধারার শিক্ষালয়ে পাঠ্য না হয়, তাইলে আল্লাহ থাকে না। শরিয়ত যদি বিচার ব্যাবস্থার আইন না হয়, তাইলে আল্লাহ থাকে না। নিৎসের সময় জ্যোতির্ময়কাল অর্থাৎ ইউরোপিয় এনলাইটেনমেন্টের পরের সময়। চার্চ বহু আগেই ক্ষমতা হারাইছে। উনবিংশ শতকের বেশিরভাগ বড় দার্শনিক, বিজ্ঞানী বুদ্ধিজীবী খ্রীষ্টান্ ধর্ম, খ্রীষ্টান আইন এবং খ্রীষ্টান আল্লাহর প্রয়োজন এবং যৌক্তিকতা অস্বীকার করেছেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা থেকে আল্লাহর আইন পুরাপুরি দূর করা হয়েছে। যেই সামাজিক বাস্তব সত্ত্বা এবং প্রতিষ্ঠানগুলা সমাজে আল্লাহর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতো সেইগুলা তাদের ক্ষমতা হারাইছে। মানুষের ওপরে তাদের কোন নিয়ন্ত্রন নাই, মানুষের কাছ থেকে আগের সম্মান এবং আনুগত্বও তারা পায় না। জ্ঞান আর আইনের উৎস এবং যাবতিয় ক্ষমতার উৎস হিসাবে ইউরোপীয় ভুখন্ডে ইব্রাহিমী আল্লাহ তখন মৃত। এই আল্লাহর মৃত্যুতে নিৎসে ব্যথিত না, উদ্বিগ্ন না। তার উদ্বেগ এই আল্লাহ যেই খ্রীষ্টান নৈতিকতা এবং আদর্শের ধারক ছিলেন সেই নৈতিকতা বা নৈতিকতার সিস্টেমের মৃত্যুতে। কিন্তু একজন ঈসাদ্রোহী নিৎসে ঈসার নৈতিকতা তথা ইব্রাহিমী ধর্মের নৈতিকতার মৃত্যুতে উদ্বিগ্ন কেন হবেন? ভুলে গেলে চলবেনা যে নিৎসের চিন্তার পুরাভাগে মূলত ইউরোপ, ইউরোপের দর্শন এবং সমাজ। ইউরোপিয় এই সমাজ প্রায় দুই হাজার বছর ইব্রাহিমী ধর্ম শাষিত, জনমানুষের যাবতিয় নৈতিকতার উৎসই ছিল ইব্রাহিমী আল্লাহ। এই ইব্রাহিমী আল্লাহ যখন সকল জ্ঞান এবং আইনের উৎস হিসাবে আর থাকেন না, তখন জনমানুষের কাছে নৈতিকতার উৎস বইলাও আর কিছু থাকে না। আইন আর ট্যাবুর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। আইন থাকলেও সেই আইনের হেজিমনিগত অবস্থান না থাকতে পারে, সেই আইনের প্রতি মানুষের ভয় বা শ্রদ্ধাও না থাকতে পারে, থাকলেও কম থাকতে পারে, কিন্তু ট্যাবু মানুষের জ্ঞানে এমন প্রভাব বিস্তার করে যেই প্রভাবের বাইরে গিয়া সেই ট্যাবু অতিক্রম করা মানুষের পক্ষে সহজে সম্ভব হয় না। প্রায় দুই হাজার বছরের পথ পার হয়ে ইব্রাহিমী আইন মানুষের কাছে পায় ট্যাবুর মর্যাদা, আর সেই আইন যখন থাকে না, সমাজ তখন আক্রান্ত হতে পারে আদর্শহীনতা আর অনৈতিকতার পাগলামীতে। নিৎসের নায়ক তাই পাগল, আল্লাহর মৃত্যুতে সে পাগল হইছে, আল্লাহর খোঁজে অথবা নৈতিকতার উৎসের খোঁজে সে পাগল।
নিৎসে কি তাইলে আল্লাহর পূনর্জীবন চান, তিনি কি ইব্রাহিমী ধর্মের পূনঃপ্রতিষ্ঠা চান? তা না, তিনি অবশ্যই তা চান না। নিৎসের চাওয়া বুঝতে গেলে নিৎসে দর্শনের একেবারে মৌলিক কিছু বিষয় বুঝতে হবে। নিৎসের দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বস্তু হইল decadence বা “অবক্ষয়” বিষয়ক ধারণা। এই ডিকেডেন্স বা অবক্ষয় বলতে নিৎসে বুঝাইছেন “নৈতিক এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক আদর্শের অনুপস্থিতি”। অবক্ষয় আক্রান্ত মানুষ ধোঁকাবাজ, অন্তর্মূখী এবং দায়িত্ব জ্ঞানহীন। অবক্ষয় আক্রান্ত সমাজে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য চুরান্ত আকার ধারণ করে। নিৎসে খ্রীষ্টান তথা ইব্রাহিমী ধর্মকে অবক্ষয়ের ধর্ম, ইব্রাহিমী আল্লাহকে অবক্ষয়ের আল্লাহ এবং এর নৈতিকতাকে অবক্ষয়ের নৈতিকতা বলে গণ্য করেছেন। ইব্রাহিমী ধর্ম ও নৈতিকতা মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট তথা স্বভাবধর্মকে গুরুত্ব দেয় না, মানুষের স্বভাবজাত গুন, ক্ষমতা এবং নৈতিকতার সন্ধান করে না বরং বেহেশতি আরামের লোভ আর দোযখী আযাবের ডর ভয় দিয়া মানুষের নৈতিকতা নিয়ন্ত্রন করে। নিৎসের মতে মানুষ অপার সম্ভাবনাময় প্রাণী, নিজের অন্তর্গত যোগ্যতা এবং ক্ষমতার পূর্ণ বিকাশের মাধ্যমে সে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। কিন্তু ইব্রাহিমী ধর্ম এবং নৈতিকতা মানুষকে মনে করে পাপি এবং অসহায়। নিজের পাপ, অসহায়ত্ব এবং দুর্বলতা থেইকা বাঁচতে এবং অপূর্ণতা দূর করতে সে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল। নিৎসের মতে এই ধরণের আদর্শের প্রচার চরম অবক্ষয়ের সৃষ্ঠি করে, কারণ এই ধরণের আদর্শের অনুগত মানুষ নৈতিকতা এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রে নিজের জ্ঞান, বিবেক এবং সাধণার উপরে নির্ভর করা শেখে না, ভয় এবং লোভের বশবর্তী হয়ে নৈতিকতার অনুসরণ করে। আর এই কারণেই নিৎসে ভীত এবং ব্যথিত। তার মতে, ইব্রাহিমী নৈতিকতার অনুপস্থিতিতে জনমানুষ আদর্শহীণতার পাগলামীতে আক্রান্ত হবে, কারণ ইব্রাহিমী ধর্ম এবং নৈতিকতা মানুষ হিসাবে তার মধ্যে অবক্ষয়এর সৃষ্ঠি করেছে, নিজের জ্ঞান এবং বিবেক খাটিয়ে নৈতিকতা নির্ধারণের ক্ষমতা এখন আর তার নাই। নিৎসে তাই নৈরাশ্যবাদে আক্রান্ত হন। কিন্তু যেই সময়ে দুনিয়ায় মানুষের জ্ঞান আর মুক্তবুদ্ধির চরম বিকাশ হচ্ছে, নয়া নয়া বৈজ্ঞানিক আবিস্কারে দুনিয়ার চেহারা যখন পালটে যাচ্ছে সেই সময়টাতো ইতিবাচক একটা সময়, পুরো ইউরোপ সেই সময়টাকে গণ্য করছে আশাবাদের সময় বলে। কিন্তু নিৎসে তা বলছেন না, আধুনিক দুনিয়াকে তিনি দেখেছেন চরম নৈরাশ্যবাদী দুনিয়া হিসাবে, যেই সময়ে অবক্ষয় অত্যন্ত প্রবল। পুরণো আদর্শবাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়া নতুন কোন আদর্শবাদের জন্ম হচ্ছে না, আল্লাহর মতো সম্পূর্ণতা নাই হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু নতুন কোন পূর্ণতা তৈরি হচ্ছে না। নিৎসে একে বলেছেন এনার্কি অফ এটম অর্থাৎ আনবিক নৈরাজ্য বলে। পূর্ণতার যায়গায় বিচ্ছিন্নতার এই বিজয়কে নিৎসে গণ্য করেছেন অবক্ষয় হিসাবে। নিৎসের মতে এমন অবক্ষয়ের সমাজে ভাল মন্দের বোধ লোপ পাবে, উপর-নিচ বলে কিছু থাকবেনা, জোর যার মুল্লুক তার হবে, গোষ্ঠিগত শাসন এবং লুটপাটই হবে স্বাভাবিক ঘটনা। আল্লাহ’হীণ দুনিয়া তাই নিৎসের কাছে চরম নৈরাশ্যময়।
কিন্তু এই যে আল্লাহর মৃত্যু হইছে, এইটা তো মানুষ স্বীকার করে না। বেশিরভাগ মানুষই বলবে যে, নিৎসে আদতেই পাগল ছিলেন। সেকুলার আইন আসতে পারে, ধর্মপুস্তক শিক্ষাঙ্গন থেইকা দূর হইতে পারে, মসজিদ এবং মোল্লার আগের দাম না থাকতে পারে, কিন্তু আল্লাহ মানুষের মনে, আল্লাহর আইন মানুষের কাছে যেমন ছিল তেমনি আছে। আল্লাহর হেজিমনিগত অবস্থান এবং তার প্রদত্ত্ব ট্যাবু, এই সবই আছে। আর এইখানেই নিৎসে হতাশ, নিৎসের পাগলও হতাশ। কারণ মানুষ তার ঘোষনার গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ, আস্তিক অথবা নাস্তিক কেউ তার ঘোষনার গুরুত্ব বোঝে নাই। আল্লাহর মৃত্যুর খবরে কেউ উদ্বিগ্ন হয় নাই। বাজারের মানুষ যখন তার কথারে গুরুত্ব দেয় না, পাগল তখন হতাশ হইয়া ফিরা যায়, যাওয়ার আগে পাগল বলে, “আমি বোধহয় অনেক আগে আইসা গেছি। হায়, আমার সময়তো এখনো আসে নাই। মানুষের কানে এই খবর এখনো পৌঁছায় নাই”। নিৎসে মনে করেন যে, চোখের সামনে আল্লাহর মৃত্যু দেখার পরও মানুষ নিজের অন্তরের গোপন কোনায় লুকানো ভয়ের কারণে এখনো নিজেই নিজের কাছে এই ভয়ঙ্কর ঘটনা স্বীকার করতে চায় না। আল্লাহর বেঁচে থাকা নিয়া নিজেরে সে নিজে সান্তনা দেয়। প্রচন্ড ভয়ে এই সত্যরে সে এখনো উপলদ্ধি করতে পারছে না। কিন্তু একদিন এই সত্য উপলদ্ধ হবে, দুনিয়া ব্যাপি তখন পাগলামী, নৈরাজ্য আর নৈরাশ্য বিরাজ করবে। নিৎসে বলেন, “ বুদ্ধের মৃত্যুর শত শত বছর পরও মানুষ এক গুহায় তার ছায়া দেখিয়েছে, এক প্রচন্ড ভীতিকর ছায়া। আল্লাহ মারা গেছে, কিন্তু মানব জাতির অবস্থা বিচারে, হয়তো আরো হাজার বছর কোন না কোন গুহায় তার ছায়া দেখাবে। এই ছায়াকে আমাদের অতিক্রম করতে হবে”। ১৮৮২ সালে দ্যা গে সাইন্স প্রকাশিত হয়, ১৮৮৩ থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয় দাস স্পোক জরাথুস্থ্রা, ১৯০০ সালে নিৎসে মৃত্যুবরণ করেন। আজ অবধি কি সেই সত্য উপলদ্ধ হয় নাই? নিৎসের কোন ভবিষ্যতবাণী কি এখনো পূর্ণতা পায় নাই? হঠাৎ কোন উপলদ্ধি না হলেও ধীরে ধীরে আদর্শহীণতার পাগলামীতে কিন্তু গোটা বিশ্ব ঠিকই আক্রান্ত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পুরাপুরি পূজিবাদী জীবন যাপনে অভ্যস্থ এবং খ্রীষ্টান নৈতিকতার থোড়াই কেয়ার করেও বেশীরভাগ মানুষ নিৎসে কথিত মনের অন্তর্গত ভয়ের কারনে নিজেরে খ্রীষ্টান দাবি করে শান্তী পায়। বাংলাদেশের একজন আধুনিক মানুষ, আস্তিক নাস্তিক নির্বিশিষে পূজিবাদী অবক্ষয়ের সময়ে ব্যক্তি স্বার্থ এবং সুবিধা অনুযায়ী জীবন যাপন করে, কিন্তু নিজের জীবনে আল্লাহ এবং আল্লাহর আইনের মৃত্যু মেনে নিতে একজন মুসলমান প্রস্তুত না, প্রচন্ড ভয়ের কারণে সে তা অস্বীকার করে। তার যুক্তিবোধ এবং জীবনাচার এই আল্লাহকে অস্বীকার করে, কিন্তু তার অবক্ষয় আর অবক্ষয়ের পাগলামী অস্বীকারকে অস্বীকার করে। আদর্শহীণতা আর অনৈতিকতায় সে প্রবলভাবে আক্রান্ত। নিৎসের বক্তব্য অনুযায়ী আল্লাহর মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ উপলদ্ধী যখন সে প্রাপ্ত হবে তখন হয়তো আসলেই নৈরাজ্য আর নৈরাশ্য প্রবল হবে। কোন রকম আদর্শ বা নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে ব্যাক্তি এবং গোষ্ঠির স্বার্থের শাসন অনেক আগেই সমাজের অধিকাংশ মানুষের ওপর কায়েম হয়েছে।
এই নৈরাশ্যই কি তাহলে শেষ কথা? নিৎসে কিন্তু তা বলেন না। নৈরাশ্যবাদকে তিনি বরণ করে নিয়েছেন, সময়ের অবক্ষয়কে তিনি গ্রহণ করেছেন। নিৎসের দার্শনিক পদ্ধতি তাই অবক্ষয়ের পদ্ধতি। বৃহৎ পূর্ণতার বদলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ের রাজত্ব তার লেখা এবং দর্শন জুরে। কিন্তু এই অবক্ষয়ের পদ্ধতির মধ্য দিয়েই তিনি অবক্ষয়ের মোকাবেলা করেছেন। নিজের দার্শনিক প্রজ্ঞার মধ্য দিয়ে নৈরাশ্যকে তিনি জয় করেছেন। আল্লাহ’হীণ দুনিয়ায় আশাবাদের সন্ধান পেয়েছেন। নৈরাশ্যের হাত থেকে এই জয়ের কাহিনী ভিন্ন এক কাহিনি। তবে নিৎসের মতে, আল্লাহ’হীণ দুনিয়ায় রাজত্ব হবে মানুষের রাজত্ব। নতুন দুনিয়ায় আবির্ভুত হবে উবারমেইঞ্ছ, ওভারম্যান, অতিমানুষ। একমাত্র নৈরাশ্যকে জয় করার মাধ্যমেই অতিমানুষ হওয়া সম্ভব। মানুষের অন্তর্গত ক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ বিকাশের মাধ্যমেই মানুষ অতিমানুষ হয়ে উঠবে, আল্লাহ’হীণ দুনিয়ায় আল্লাহর যায়গা দখল করে নেবে। নতুন প্রজন্মের দার্শনিকরা হবে পুরণো দার্শনিকদের চেয়ে নৈতিকতার ক্ষেত্রে অনেক ভিন্ন। বেশিরভাগ পুরনো দার্শনিকরা যেখানে সমাজে প্রচলিত নৈতিকতার দার্শনিক ভিত্তী এবং যৌক্তিকতা নির্মানের চেষ্টা করেছেন, নতুন প্রজন্মের দার্শনিকরা সেখানে নীতির মূল্যায়ন করবে, নতুন নৈতিকতার জন্ম দেবে। নিৎসের পাগল আল্লাহর মৃত্যুর নিদান খোজে তাই মানুষের মাঝে। পাগল তাই বলে-
“যে ছিল এই দুনিয়ার সবচেয়ে পবিত্র, সবচেয়ে শক্তিশালী, আমাগো ছুরির ডগায় হইছে তার রক্তাক্ত মরণ, এই রক্ত আমাগো হাত থেইকা কে ধুইবে? কোন পানিতে এই হাত আমরা পরিস্কার করুম? কোন পবিত্র উৎসব, কোন পবিত্র খেলা আমরা আবিস্কার করুম? এই শ্রেষ্ঠত্ব কি আমাগো লাইগা বড় বেশী শ্রেষ্ঠ না? এই শ্রেষ্ঠত্বের মূল্য দিতে আমাদেরই আল্লাহ হইতে হবে”।
“সব দেবতার মৃত্যু হয়েছে, আমরা চাই অতিমানুষ বেঁচে থাকুক” – ফ্রেডরিক নিৎসে (দাস স্পোক জরাথুস্থ্রা)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


