চার্লস ডারউইন আমার প্রথম গুরু। ডারউইন দিয়েই আমার আত্মানুসন্ধান তথা মানব সন্ধান তথা দর্শন চর্চার শুরু। তার কারণে আমরা জানি জগতে মানুষ আর দশটা প্রণীর মতোই বিবর্তনের ফসল, একটা আদী এককোষি জীবের বিকাশের ফসল। তিনিই প্রথম আমাদের উপলোদ্ধি ঘটান যে জগতে মানুষের আবির্ভাব, টিকে থাকা এবং অন্যান্য প্রাণীর জীবন চক্রে কোন ক্ষমতাবান স্রষ্টার সয়ম্ভু আধিপত্ত্ব বা খবরদারী নাই। তারপরও ইশ্বর বিষয়ে তিনি অজ্ঞেয়বাদী অবস্থান গ্রহণ করেন।
“যদি ইশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকারের প্রশ্ন আসে তাইলে আমি কখনোই ঠিক নাস্তিক ছিলাম না, এইক্ষেত্রে আমার চিন্তাভাবনারে বরং অজ্ঞেয়বাদ হিসাবে চিহ্নিত করা সঠিক হবে” – চার্লস ডারউইন।
আমার দ্বিতীয় গুরু নিৎসে। ডারউইন চর্চার কারণে এবং মানব জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিষয়ে নিহিলজমে পতিত হওয়ার পর ফ্রেডরিক নিৎসের দর্শনই আমারে এই নিহিলিজম থেইকা উদ্ধার পাইতে সহযোগীতা করে। নিৎসে ছিলেন প্রবল খ্রীষ্টান ধর্ম বিরোধী ব্যাক্তি। খ্রীষ্টান ধর্মে যেই ইশ্বরের কথা আছে তারে তিনি মোটেই বিশ্বাস করতেন না, এই প্রশঙ্গে তিনি নিজেরে প্রবৃত্তিগতভাবেই একজন নাস্তিক দাবি করেন। আবার নিৎসেই সোসিওলোজিকাল আরেক ইশ্বরের কথা আমাদের কাছে পারেন, যেই ইশ্বর কল্পিত হইলেও সমাজে তার বাস্তব অস্তিত্ব আছে। নিৎসে অবশ্য এই ইশ্বরের মৃত্যু ঘোষনা করেন এবং বলেন যে আমরা আধুনিক যুগের প্রাক্যালে এই ইশ্বর’রে মাইরা ফালাইছি। নিৎসে এই ইশ্বরের জায়গায় মানুষের উত্থান কামনা করেন। তবে বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পুরা মাত্রায় সংশয়বাদী এবং নাস্তিকতা বলতে তিনি যা বুঝাইতেন তাও ছিল আসলে অজ্ঞেয়বাদ, এই বিষয়ে প্রধানতম নিৎসে গবেষক ওয়াল্টার কফম্যান বিস্তর আলোচনা করেছেন।
জগতের সেরা বুদ্ধিজীবীরাই সংশয়বাদী – ফ্রেডরিক নিৎসে।
আমার তৃতীয় গুরু লালন। নিৎসে মানুষের মাঝে যেই মহামানুষের আবির্ভাব কামনা করেন লালন বলেন যে সেই মহামানুষ মানুষের মাঝেই আছে, তিনি এরে ডাকেন সহজ মানুষ নামে, আর এই সহজ মানুষরেই তিনি দেন পরম অথবা ইশ্বরের মর্জাদা। লালন বস্তুবাদী ছিলেন না ভাববাদী এই নিয়া বহুজনে বহু ক্যাচাল করছে আজ অব্দি, যেমন ক্যাচাল হইছে ওমর খৈয়াম নাস্তিক ছিলেন না সূফী ছিলেন এই নিয়া। লালন মনে করতেন ধর্ম, ধর্ম পুস্তক, ধর্মীয় ইশ্বরের ধারণা মানুষের তৈরি।
“আল্লাহ হরি ভজন পূজন
সকলই মানুষের সৃজন” – ফকির লালন শাহ
“এক এক দেশে এক এক বাণী
পাঠান কি সাঁই গুনমনী
মানুষের রচিত জানি
তাই তো ভিন্ন হয়”। - ফকির লালন শাহ
মৃত্যু পরবর্তী জীবন আর পরকালেও যে তিনি বিশ্বাস করতেন না এইটা তার গানেই আছে।
“ভজ মানুষের চরণ দু’টি
নিত্য বস্তু হবে খাঁটি
মরিলে সব হবে মাটি
ত্বরায় এই ভেদ লও জেনে”।। - ফকির লালন শাহ
তাইলে কি লালন পুরাদস্তুর বস্তুবাদী ছিলেন? ঐ আমাদের বস্তুবাদ আর ভাববাদের সরলীকরণ চিন্তা ভাবনা দিয়া তা মনে হইতে পারে। ইশ্বর সম্বন্ধে তার ধারণা কি ছিল? তিনি কি নাস্তিক ছিলেন?
“পাবে সামান্যে কি তার দেখা?
বেদে নাই যার রুপরেখা”। - ফকির লালন শাহ।
অর্থাৎ ইশ্বর যদি থাকেও তবে তারে ধর্ম পুস্তকে খুজে পাওয়া যাবেনা। অথবা ‘পরম’ বলতে যা আছে তারে ‘সামান্যে’ বা আমাদের মানবিক বা নৈতিক প্যারামিটার দিয়া বোঝা যাবেনা, এমন কোন পরম বা ইশ্বরের অস্তিত্ব নাই। তিনি বরং মানুষরেই পরমের অংশ হিসাবে চিহ্নিত করেন, যেহেতু মানুষ এই জগতেরই অংশ, এবং মানুষের মাঝেই সহজ মানুষ রূপে পরমের সন্ধান করেন।
এইসব আলোচনা কেন করলাম? আমি আমার এই তিন গুরুরে সবকিছুতেই সমর্থন করি তা না। আমি ওনাদের চিন্তা ভাবনা বা দর্শনের উদাহরণ দিয়া এইসবই সঠিক বলছিনা, বা কাউরে অনুসরণ করতে বলছিনা। ইশ্বর, ধর্ম, আস্তিকতা, নাস্তিকতা এইসব নিয়া ব্লগে যেই অতি সরলীকৃত ক্যাচাল চলে তাতে বিরক্ত হইয়াই পোস্টখানা দিলাম। আমাদের ব্লগে যারা আস্তিক-নাস্তিক বিতর্ক লড়ে তাদের বেশিরভাগেরই ধারণা ইশ্বর, ধর্ম, ওহী, বিশ্বাস, পরকাল এইসব সমার্থক এবং পরস্পর নির্ভরশীল বিষয় অথবা যুক্তি, বিজ্ঞান, নাস্তিকতা, বস্তুবাদ ইত্যাদি সমার্থক এবং পরস্পর নির্ভরশীল বিষয়। এত সরলীকৃত ধারণা নিয়া যে আসলে এইসব বিষয়ে আলোচনা কখনো অর্থবোধক হয় না সেই বোধদয় যত তারাতারি হয় আমাদের জন্য ততই মঙ্গল।
একজন মুক্তমনা যেদিন নিজের ধ্যান ধারণা নিয়া সংশয় করতে ভুলে যায় সেইদিনই মুক্তমনা হিসাবে তার মৃত্যু ঘটে। ধারাবাহিক এবং অবিরত সংশয় আর নিজেরে নিজের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোই মুক্তবুদ্ধি চর্চার সবচেয়ে বড় সাধনা এবং মানব প্রগতির জন্য সবচেয়ে জরুরি গুনাবলি।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মে, ২০১১ রাত ১:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


