somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার তিন গুরুর বাণী (ইশ্বর, ধর্ম, অজ্ঞেয়বাদ এবং সংশয়বাদ প্রশঙ্গে)

২০ শে মে, ২০১১ রাত ১২:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ডারউন, নিৎসে এবং লালন, আমার তিন গুরু। আমার ব্যক্তিগত চিন্তা ভাবনা এবং দার্শনিক অবস্থানে এই তিনজনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ইশ্বর এবং ধর্ম বিষয়ে এই তিন মহাত্মার কিছু উক্তি স্মরণ করছি।

চার্লস ডারউইন আমার প্রথম গুরু। ডারউইন দিয়েই আমার আত্মানুসন্ধান তথা মানব সন্ধান তথা দর্শন চর্চার শুরু। তার কারণে আমরা জানি জগতে মানুষ আর দশটা প্রণীর মতোই বিবর্তনের ফসল, একটা আদী এককোষি জীবের বিকাশের ফসল। তিনিই প্রথম আমাদের উপলোদ্ধি ঘটান যে জগতে মানুষের আবির্ভাব, টিকে থাকা এবং অন্যান্য প্রাণীর জীবন চক্রে কোন ক্ষমতাবান স্রষ্টার সয়ম্ভু আধিপত্ত্ব বা খবরদারী নাই। তারপরও ইশ্বর বিষয়ে তিনি অজ্ঞেয়বাদী অবস্থান গ্রহণ করেন।

“যদি ইশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকারের প্রশ্ন আসে তাইলে আমি কখনোই ঠিক নাস্তিক ছিলাম না, এইক্ষেত্রে আমার চিন্তাভাবনারে বরং অজ্ঞেয়বাদ হিসাবে চিহ্নিত করা সঠিক হবে” – চার্লস ডারউইন।


আমার দ্বিতীয় গুরু নিৎসে। ডারউইন চর্চার কারণে এবং মানব জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিষয়ে নিহিলজমে পতিত হওয়ার পর ফ্রেডরিক নিৎসের দর্শনই আমারে এই নিহিলিজম থেইকা উদ্ধার পাইতে সহযোগীতা করে। নিৎসে ছিলেন প্রবল খ্রীষ্টান ধর্ম বিরোধী ব্যাক্তি। খ্রীষ্টান ধর্মে যেই ইশ্বরের কথা আছে তারে তিনি মোটেই বিশ্বাস করতেন না, এই প্রশঙ্গে তিনি নিজেরে প্রবৃত্তিগতভাবেই একজন নাস্তিক দাবি করেন। আবার নিৎসেই সোসিওলোজিকাল আরেক ইশ্বরের কথা আমাদের কাছে পারেন, যেই ইশ্বর কল্পিত হইলেও সমাজে তার বাস্তব অস্তিত্ব আছে। নিৎসে অবশ্য এই ইশ্বরের মৃত্যু ঘোষনা করেন এবং বলেন যে আমরা আধুনিক যুগের প্রাক্যালে এই ইশ্বর’রে মাইরা ফালাইছি। নিৎসে এই ইশ্বরের জায়গায় মানুষের উত্থান কামনা করেন। তবে বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পুরা মাত্রায় সংশয়বাদী এবং নাস্তিকতা বলতে তিনি যা বুঝাইতেন তাও ছিল আসলে অজ্ঞেয়বাদ, এই বিষয়ে প্রধানতম নিৎসে গবেষক ওয়াল্টার কফম্যান বিস্তর আলোচনা করেছেন।

জগতের সেরা বুদ্ধিজীবীরাই সংশয়বাদী – ফ্রেডরিক নিৎসে।


আমার তৃতীয় গুরু লালন। নিৎসে মানুষের মাঝে যেই মহামানুষের আবির্ভাব কামনা করেন লালন বলেন যে সেই মহামানুষ মানুষের মাঝেই আছে, তিনি এরে ডাকেন সহজ মানুষ নামে, আর এই সহজ মানুষরেই তিনি দেন পরম অথবা ইশ্বরের মর্জাদা। লালন বস্তুবাদী ছিলেন না ভাববাদী এই নিয়া বহুজনে বহু ক্যাচাল করছে আজ অব্দি, যেমন ক্যাচাল হইছে ওমর খৈয়াম নাস্তিক ছিলেন না সূফী ছিলেন এই নিয়া। লালন মনে করতেন ধর্ম, ধর্ম পুস্তক, ধর্মীয় ইশ্বরের ধারণা মানুষের তৈরি।

“আল্লাহ হরি ভজন পূজন
সকলই মানুষের সৃজন” – ফকির লালন শাহ

“এক এক দেশে এক এক বাণী
পাঠান কি সাঁই গুনমনী
মানুষের রচিত জানি
তাই তো ভিন্ন হয়”। - ফকির লালন শাহ


মৃত্যু পরবর্তী জীবন আর পরকালেও যে তিনি বিশ্বাস করতেন না এইটা তার গানেই আছে।

“ভজ মানুষের চরণ দু’টি
নিত্য বস্তু হবে খাঁটি
মরিলে সব হবে মাটি
ত্বরায় এই ভেদ লও জেনে”।। - ফকির লালন শাহ


তাইলে কি লালন পুরাদস্তুর বস্তুবাদী ছিলেন? ঐ আমাদের বস্তুবাদ আর ভাববাদের সরলীকরণ চিন্তা ভাবনা দিয়া তা মনে হইতে পারে। ইশ্বর সম্বন্ধে তার ধারণা কি ছিল? তিনি কি নাস্তিক ছিলেন?

“পাবে সামান্যে কি তার দেখা?
বেদে নাই যার রুপরেখা”। - ফকির লালন শাহ।

অর্থাৎ ইশ্বর যদি থাকেও তবে তারে ধর্ম পুস্তকে খুজে পাওয়া যাবেনা। অথবা ‘পরম’ বলতে যা আছে তারে ‘সামান্যে’ বা আমাদের মানবিক বা নৈতিক প্যারামিটার দিয়া বোঝা যাবেনা, এমন কোন পরম বা ইশ্বরের অস্তিত্ব নাই। তিনি বরং মানুষরেই পরমের অংশ হিসাবে চিহ্নিত করেন, যেহেতু মানুষ এই জগতেরই অংশ, এবং মানুষের মাঝেই সহজ মানুষ রূপে পরমের সন্ধান করেন।

এইসব আলোচনা কেন করলাম? আমি আমার এই তিন গুরুরে সবকিছুতেই সমর্থন করি তা না। আমি ওনাদের চিন্তা ভাবনা বা দর্শনের উদাহরণ দিয়া এইসবই সঠিক বলছিনা, বা কাউরে অনুসরণ করতে বলছিনা। ইশ্বর, ধর্ম, আস্তিকতা, নাস্তিকতা এইসব নিয়া ব্লগে যেই অতি সরলীকৃত ক্যাচাল চলে তাতে বিরক্ত হইয়াই পোস্টখানা দিলাম। আমাদের ব্লগে যারা আস্তিক-নাস্তিক বিতর্ক লড়ে তাদের বেশিরভাগেরই ধারণা ইশ্বর, ধর্ম, ওহী, বিশ্বাস, পরকাল এইসব সমার্থক এবং পরস্পর নির্ভরশীল বিষয় অথবা যুক্তি, বিজ্ঞান, নাস্তিকতা, বস্তুবাদ ইত্যাদি সমার্থক এবং পরস্পর নির্ভরশীল বিষয়। এত সরলীকৃত ধারণা নিয়া যে আসলে এইসব বিষয়ে আলোচনা কখনো অর্থবোধক হয় না সেই বোধদয় যত তারাতারি হয় আমাদের জন্য ততই মঙ্গল।

একজন মুক্তমনা যেদিন নিজের ধ্যান ধারণা নিয়া সংশয় করতে ভুলে যায় সেইদিনই মুক্তমনা হিসাবে তার মৃত্যু ঘটে। ধারাবাহিক এবং অবিরত সংশয় আর নিজেরে নিজের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোই মুক্তবুদ্ধি চর্চার সবচেয়ে বড় সাধনা এবং মানব প্রগতির জন্য সবচেয়ে জরুরি গুনাবলি।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মে, ২০১১ রাত ১:৪৬
২৫টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×