somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আগস্টের অন্যরকম কয়েকটি দিন-০১

২৭ শে আগস্ট, ২০০৭ দুপুর ১:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২২ আগস্ট সকালে ঘুম ভাঙলো মায়ের ফোনে। মা বললেন, ঢাকায় তো কাল গণ্ডগোল দেখলাম, তুমি পারলে বাড়ি চলে আসো। মাকে আশ্বাস দিয়ে ফোন কাটলাম। তখন সাতটা বাজে। জানি আজ ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ধর্মঘট ডেকেছে। তাই তাড়াতাড়ি ক্যাম্পাসে ঢুকতে হবে। কিন্তু দুদিন আগে অসুস্থতা শেষ হওয়ায় শরীর ঝিমঝিম করছিলো। তাই আবার ঘুমিয়ে গেলাম।
সকাল ৯ টায় সহকর্মী আনিসুজ্জামান উজ্জল ফোন দিলেন। বললেন, এখনো ঘুমাচ্ছিস? ক্যাম্পাস রণক্ষেত্র। এখনই চলে আয়। ওপাশ থেকে গুলির শব্দ কানে আসলো। কোনমতে দাঁতে ব্রাশ চালিয়ে ঢুকলাম ক্যাম্পাসে।
বিনোদপুর গেট দিয়ে ঢোকার সময় চোখে পড়লো অনেকে ক্যাম্পাস থেকে বের হচ্ছেন স্বাভাবিকভাবে। গেটের পুলিশও চুপচাপ। ভাবলাম গণ্ডগোল কি আসলেই হচ্ছে? তবুও এগুলাম দুরুদুর বুকে। মোবাইলে টাকা নাই। কোন সাংবাদিককেও তাই পাচ্ছিনা। কী ভেবে এগুলাম প্রশাসন ভবনের দিকে। অডিটোরিয়ামের কাছে যেতেই চোখে পড়লো ছাত্রদের ছোটাছুটি। আমিও ছুটলাম সেদিকে। ঢুকে গেলাম গণ্ডগোলের মাঝখানে। খুজলাম সহকর্মীদের। খুজতে গিয়ে টের পেলাম আমি কাদছি। বুঝলাম টিয়ার সেল কাদাচ্ছে। কোনক্রমে সহকর্মীদের অবস্থান পেয়ে গেলাম। আতঙ্ক নিয়ে যোগ দিলাম তাদের সঙ্গে।
দাড়িয়ে দাড়িয়ে ঘটনা বোঝার চেষ্টা করছি আর দুহাতে চোখ মুছছি। দেখলাম হাজার হাজার ছাত্র লাঠি হাতে মেইনগেটের দিকে পুলিশকে তাড়া করছে। পুলিশ ছুড়ছে টিয়ারসেল। ১০ টার দিকে ছাত্ররা আক্রমন করলো ভিসির বাড়ি। ক্যাম্পাস তখন পুলিশ শূন্য। অনেকক্ষন চেষ্টা করোও গেট না ভাংতে পেরে তারা ছুট দিলো জিমনেশিয়ামে পুলিশ ক্যাম্পের দিকে। আমরা সাংবাদিকরা তখনো প্রশাসন ভবনের সামনে। হঠাত পুলিশের এক পিকাপ ভ্যান খুব দ্রুত কাজলা গেট দিয়ে ঢুকলো ক্যাম্পাসে। গাড়িটি থেকে অনবরত ছোড়া হচ্ছিল টিয়ার সেল। সাধারণ ছাত্রদের সঙ্গে আমরাও ছুট দিলাম। মাত্র ১০ হাত দূরত্বে গাড়িটির চাপা থেকে বাচলাম আমি। গাড়িটি জিমনেশিয়ামের দিকে চলে গেলে আমরাও ধীরপায়ে এগুলাম সেদিকে। কাছাকাছি যেতে বুঝলাম সেখানে ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ চলছে। আমাদের সেখানে যেতে বাধা দিলো পুলিশ। আমরা উল্টো ঘুরে গেলাম মেডিক্যাল সেন্টারের দিকে।
মেডিক্যাল সেন্টারে তখন অন্য রকম পরিবেশ। একেরপর এক আহতরা আসছে। কারো হাত-পায়ে টিয়ারসেল বা রাবার বুলেটের আঘাত। কারো মাথায় রক্ত। এখানে আমরা প্রায় জনা পনের সাংবাদিক দাড়িয়ে কোন দিকে যাবো ভাবছি। এ সময় হঠাত পুলিশের সেই গাড়ি রাবার বুলেট আর টিয়ার সেল ছুড়তে ছুড়তে হাজির। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা বুলেট লাগলো সেখানে দাড়ানো রিকশাচালকের মাথায়। সাথে সাথে রক্তের বন্যা। ধরাধরি করে তাকে মেডিক্যালে পাঠানোর পথে মারা গেলো লোকটি।
দুপুর ১২ টার দিকে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সংঘর্ষ আবার বাড়লো। ছাত্ররা তখন ভিসির বাড়ি হামলা করলো- খবর পেলাম। সাংবাদিকরা তখন আটকা বঙ্গবন্ধু হলের ছাদে। বের হবার সুযোগ নেই। ওদিকে ছাত্ররা ভিসির বাড়ির কম্পিউটার, টিভি, ফটোকপি মেশিন, দরজা-জানালার কাচ, ফুলের টব ভেঙে বানিয়ে ফেলেছে স্তুপ। ভেঙেছে ৪ টি গাড়ি। পুড়িয়েছে আরো ২ টি। বেলা দেড়টার দিকে নিহত রিকশা চালক আফজাল হোসেনের লাশ নিয়ে ছাত্ররা বের করলো মিছিল। তখনো ক্যাম্পাস পুলিশ শূন্য। ছাত্ররা মিছিল নিয়ে ভিসির বাড়ি তৃতীয়বারের মতো আক্রমণ করলো। সেখানে তারা পোড়ালো ডিজিএফআই-এর একটি জিপ। এরপর মেইনগেটে গেলো মিছিলটি। সেখান থেকে পুলিশের সঙ্গে হালকা সন্ধি করলো ছাত্ররা। তারপর লাশ নিয়ে ছুট লাগালো মেডিক্যাল সেন্টারে। সেখানে লাশ রেখে ছাত্ররা চলে গেলো এদিক সেদিক। পরিস্থিতি হয়ে গেলো শান্ত। তখন প্রায় বিকেল ৩ টা।
৩ টার পর আমরা অফিসে এসে নিউজ পাঠানোর সময় থেকেই শুনছিলাম হল ভ্যাকান্ট হবে। সাড়ে ৫ টার পর তা নিশ্চিতও হলাম। সঙ্গে শুনলাম কারফিউ। বন্ধুদের সে কথা আর জানানো হলো না। তার আগেই বন্ধ মোবাইল নেটওয়ার্ক। আমরা সংবাদকর্মীরাও আতঙ্কে সাড়ে ৬ টার পর অফিস ছাড়লাম। কারফিউ শুরুর আগেই ঢুকে পড়লাম রুমে রুমে। কারণ, কারফিউ চলাকালীন সংবাদকর্মীদের অবস্থান নিয়ে তখনো পর্যন্ত সরকারী কোন নির্দেশ ছিলো না। হল ছাড়া কয়েকজন সাংবাদিক সেদিন রাত কাটালেন আমার মেসে আমার রুমে। সারারাত আমাদের কাটলো অজানা আতঙ্কে।
(চলবে...)
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×