somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আগস্টের অন্যরকম কয়েকটি দিন-০২

০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৩:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২২ আগস্ট রাত ৮ টা থেকে কারফিউ শুরু। ওইদিন তাই সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টার মধ্যে রুমে ফিরলাম। হল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাতে মেসে আমার রুমে থাকলেন যায়যায়দিনের কামরুজ্জামান শাহীন আর আলী আজগড় খোকন। সারা রাত কাটলো অজানা আতঙ্কে। নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় কারো সঙ্গে যেগাযোগ হচ্ছিল না। বুঝদে পারছিলাম অনেকেই টেনশনে আছে। আমি নিজেও বাদ নেই। এভাবেই কাটলো সারারাত।
২৩ আগস্ট ঘুম থেকে উঠেই পাশের রুমের ছেলেরা আমার রুমে হাজির। ওদের মুখে শুনলাম পুলিশ-সেনা-রব ছাত্রদের বের হলেই পেটাচ্ছে। একটু টেনশনেই পড়লাম। সাংবাদিকদের ব্যাপারে সরকারের কোন নির্দেশনা এখনো পাই নি আমরা। তাই কী করবো বুঝতে পারছি না। শাহীন ভাই ফোন দিলেন মহানগর পুলিশ কমিশনারকে। আমি দিলাম রবের কোম্পানী অধিনায়ককে। তারা দুজনেই আমাদের আইডি কার্ড ঝুলিয়ে বের হতে বললেন।
সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে বের হলাম বিনোদপুর থেকে। বড় রাস্তার মুখে আসতেই রবের একটি গাড়ি থেকে আমাদের সরে যেতে বলল। সাংবাদিক পরিচয় দিলাম, তবুও। গাড়ি চলে গেলে ফাকা মহাসড়কে হাটা শুরু করলাম আমি, শাহীন ভাই, খোকন। সঙ্গে যোগ দিলেন প্রথম আলোর কুদরাত-ই-খুদা বাবু, আমারদেশের আনিসুজ্জামান উজ্জল আর জনকণ্ঠের শহীদুল ইসলাম।
বিনোদপুর বাজার পার না হতেই রবের একটি টহল দল আমাদের দিকে লাঠি হাতে ছুটে এলো। ছয়জন তখন গলায় ঝুলানো আইডি কার্ড হাতে ধরে উচু করলাম। তারা কাছে এসে পরিচয় পেয়ে বললো একসঙ্গে যাওয়া যাবে না, দুজন দুজন করে যান। তাদের কথামতো আমরা তাই করে রওনা দিলাম শহরের দিকে। রাস্তার মাঝে দলছুট হলেন বাবু, শহীদ আর উজ্জল ভাই। তারা বললেন, শহরে যাবো না। রুমে ফিরবো।
এরপর পায়ে হেটে যাত্রা শুরু হলো আমাদের বাকি তিনজনের। শাহীন ভাই সামনে। একটু দূরত্ব বজায় রেখে আমি আর খোকন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইনগেট, কাজলা, আলুপট্টি মোড়সহ কয়েক জায়গায় পুলিশ আটকালো। কার্ড দেখে ছেড়েও দিলো। মেইনগেট পার হবার সময় আমার মেস থেকে একজন ফোন করে বললেন, ভাই, সেনাসদস্যরা মেসে ঢুকে পেটাচ্ছে। মেসে থকতে দিচ্ছে না। কী করব? তারন কোন জবাব আমি দিতে পারলাম না। শুধু বললাম, দরজা লাগিয়ে রুমে থাকেন। এছাড়া করার কিছু নেই। পরে শুনেছি বহু ছাত্র সেদিন মার খেয়েছে রুমে। আগের রাত ৮ টা থেকে কারফিউ থাকায় তারা কেউই বাড়ি যেতে পারছিলো না।
একদম ফাকা রাস্তা। মাথার ওপর চড়া রোদ। আমরা হাটছি শহরের দিকে। কয়েকজায়গায় চোখে পড়লো নিরাপত্তা কর্মীরা অনেককে কারফিউ ভঙ্গের জন্য পেটাচ্ছেন। প্রায় ঘন্টাখানেক হেটে শহরের কুমারপাড়ায় সমকালের বুরো প্রধান শিবলী নোমানের বাসায় গেলাম। সেখানে শিবলী ভাই আমাদের সকালের নাস্তার জন্য ড্রাইকেক আর ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি দিলেন। সেগুলো নিয়ে হাটা ধরলাম সাহেববাজার যায়যায়দিন অফিসের দিকে।
বাজারের পেছন দিয়ে যাবার সময় কিছু পেয়ারা, শসা আর কলাও কেনা হলো। বেলা ১২ টার দিকে ঢুকলাম যায়যায়দিন অফিসে। অফিসটা একদম বাজারের মাঝে ৫ তলায়। সেখানে ঢুকে নাস্তা সেরে দিনের পেপার পড়া শুরু করলাম। নিউজ দেখে অবশ্য হতাশ হতে হলো আমাদের। ২২ তারিখ জীবনের ঝুকি নিয়ে ক্যাম্পাসের গণ্ডগোল কাভার করলাম, অথচ অনেক কেটে-ছেটে তা ছাপা হইছে ছোট করে। এসব নিয়ে আলোচনা করে কাটলো অনেকক্ষণ। দুপুরে শিবলী ভাই ফোন করে বললেন দুপুরে তার বাসায় খেতে। ওদিকে বন্ধু বনশ্রীও বারবার ফোন করছে তার বাসায় যাবার জন্য। গোটা কারফিউয়ে আমার জন্য ওর আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তা ভোলার নয়।
দুপুরে শিবলী ভাইয়ের বাসায় খেতে যাবার আগে বাজার দেখতে গেলাম। ক্রেতাশূণ্য বাজার। মাথায় হাত দিয়ে দোকানীরা বসে আছেন। তাদের সাথে কথা হলো। অন্যদিনের চেয়ে আজ ক্রেতা নেই বললেই চলে। কারফিউ জানলেও পেটের তাগিদে বাজার খুলেছিলো তারা। কিন্তু নেই কোন ক্রেতা।
দুপুরে শিবলী ভাইয়ের বাসায় খেয়ে ফেরার পথে শুনলাম বিকাল ৪ টা থেকে ৭ টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল। তাই বিকালে গেলাম মেসে। সকালে ব্যাগ গুছালেও নিতে পারিনি সঙ্গে। সন্ধ্যার আগে ব্যাগ নিয়ে আবার যায়যায়দিনে ফিরলাম আমি আর খোকন। ফেরার পথে চোখে পড়লো হাজার হাজার ঘরমুখো ছাত্র-ছাত্রী যারা কারফিউয়ের কারণে বাড়ি যেতে পারেনি। রাস্তা ধরে হাটছেন তারা। কোন যানবাহন নেই। কোথায় যাকেন কেউ জানেন না। সবার উদ্বিগ্ন চাওয়া হলো রাজশাহী মেট্রোপলিটন এলাকা ছাড়া। খুব কষ্ট হচ্ছিলো এসব উদ্বিগ্নদের জন্য।
কারফিউ আবার শুরু সন্ধ্যা ৭ টা থেকে। এর আগেই আমার যাবার কথা বনশ্রীর বাড়ি। খোকন যাবে তার বান্ধবী কলির বাড়ি। শাহীন ভাই থাকবেন তার এক বন্ধুর বাড়ি। সাড়ে ৬ টার দিকে যখন আমি বের হবো বনশ্রীর বাড়ির দিকে তখন জানলাম খোকন তার বান্ধবীর বাড়িটি চেনেনা। তাকে ফোনেও পাচ্ছেনা। কারণ, নেটওয়ার্ক বন্ধ। অগত্যা কারফিউয়ের সেই রাত খিচুরী খেয়ে যায়যায়দিন অফিসেই কাটাতে হলো আমাদের ৩ জনকে।
সারারাত তেমন ঘুম হয় নি। মিনিটকয়েক পর পর সাইরেন বাজিয়ে অফিসের পাশ দিয়ে যাচ্ছে পুলিশ-রবের গাড়ি। অন্ধকার অফিসে আমরা। অফিসের পাশেই বাজারের মূল রাস্তা। গাড়ি চলার সাইসাই শব্দ আর সাইরেনের বিকট শব্দে আতঙ্কিত হলেও ৩ জনই সাহস দিচ্ছিলাম ৩ জনকে। এভাবেই কাটলো কারিফউয়ের দ্বিতীয় রাত।
(চলবে...)
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×