জানার জন্য সংবাদপত্রের সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক তার শুরুর সময়টা দিনক্ষণ হিসেবে মনে নেই বটে; তবে ১৯৯৭ সালের শীতের দিনগুলো মনে পড়ে। ক্লাশের ফাইনাল পরীক্ষা শেষে লম্বা ছুটি। তাই সকাল বেলা মিষ্টি রোদে বসে ৭৫ পার করা নানাকে খবরের কাগজ পড়িয়ে শোনানোর একটা দায়িত্ব তাই কাঁধে চাপলো। মনে হয় তখন থেকেই খবরেরকাগজ পড়া শুরু। আর খবরের কাগজ দিয়ে মানুষকে খবর জানানোর ব্যাপ্তিকাল আমার খুব বেশি নয়, ৬ বছর। এই সময়কালে কত ঘটনা জেনেছি, কত ঘটনা পড়েছি, কত ঘটনা জানিয়েছি। কোন কোনটি যে মনে দাগ কাটে নি বা ব্যথিত করেনি তা কিন্তু নয়। তবে ফেলানী বোধহয় একটু বেশিই জ্বালাচ্ছে। নামটা খুবই ছোট। কারো কারো কাছে নামটি ফেলনাও বটে। কিন্তু এই ফেলনা ফেলানীই যেনো বুকের ভেতর আঙুল নাড়িয়ে জানিয়ে দিচ্ছে আমাদের সীমান্ত আর আমাদের মানবিতকার বাস্তবতাকে।
খবরের কাগজে কাজ করার আগে মানুষের দুর্বিষহ জীবনের খবর পড়ে আহা, ইস্, আহারে ইত্যকার নানা শব্দ আওড়াতাম। খবরের কাগজের কর্মী হিসেবে নাম লেখানোর পর ধীরে ধীরে যেনো সেই আফসোসমাখা শব্দগুলো পেটের ভেতরেই আটকে ছিলো। মনে হতো, সব সময় তো এমনই হয়। এ আর নতুন কী। কিন্তু গত শুক্রবার রাতে ফেলানীর সংবাদটি যখন কাগজে ছাপার উপযোগী করে গড়বার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, তখন থেকেই কেনো যেনো বুকের ভেতরটা খচখচ করছিলো। একটি মেয়ে পেটের দায়ে বাবার সঙ্গে ভীনদেশে থাকে। তার বিয়ে। পাত্র-পাত্রী দেখার পর্ব হয়েছিলো কি না জানি না। তবে বিয়ের ক্ষণটা ঠিক হয়েছিলো শুক্রবার সন্ধ্যায়। তাই বাবা নুরুল ইসলাম নুরুর সঙ্গে ভারতীয় সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া লুকিয়ে পার হচ্ছিলো ফেলানী। বাবা নুরুর জীবনের বহু সময় কেটেছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এপার-ওপার যাতায়াতে। তাই কন্যাদায়গ্রস্থ মানুষটি শুক্রবারেও নিমিষেই পার হয়েছিলেন কাঁটাতারের বেড়াটি। বিয়ের খবরে লাজুক ফেলানীও বাবাকে অনুসরণ করছিলো। বিএসএফ তখনো টের পায়নি বিষয়টি। কিন্তু হায় ফেলানী! তোমার কাপড়টাই যে সব নষ্টের গোড়া! কাঁটাতারে আটকে যায় ওর জামা। বিয়ের কথা পাকাপাকি বটে, কিন্তু কিশোরী ফেলানী যে জগত সংসার নিয়ে অতটা অভিজ্ঞ নয়। তাইতো সেই পিঁপড়ার মতো এক ফোঁটা পানিতে পড়ে সেটিকে সমুদ্র ভেবে আতঙ্কে-চিৎকারে দিগি¦দিক নিজেকে জানান দেয় ফেলানী। চোখে যা-ই হোক কানে নিশ্চয় খাটো ছিলো না বিএসএফ সদস্যরা। ঠিকই বুঝে গেছে। যেনো শিকারও আয়ত্বে। তাই তাদের আর দেরি হয়নি কিশোরীটির ছোট্ট দেহটা বুলেটে ঝাঁঝড়া করে দিতে। এবার ভয়ার্ত কিশোরীটির চিৎকার বিএসএফ’র ভয়ে নয়; যমদূতের ভয়ে। একদিকে বিএসএফ আর তার গুলি অন্যদিকে যমরাজ। ছোট্ট কিশোরীটি আর নড়তে পারে না।
এটুটু পড়ে হয়তো ভাবছেন-আহারে কী বেদনাদায়ক বর্ণনা। কিন্তু একবার ভাবুন তো এপারে আগেই পার হয়ে আসা বাবা নুরুর মনের অবস্থাটি তখন কেমন ছিলো! চোখের সামনে মেয়েরে শরীরের বুলেট। মাত্র ক’হাত দূরে মেয়েটি ঝুলছে এক ঠুনকো বেড়ায়। অথচ বাবার সাধ্য নেই মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করা মেয়েটিকে অন্তত øেহের হাত বুলিয়ে কিছুটা আশ্বস্ত করতে। সেই øেহটুকু করতে গেলেই যে তারও প্রাণ যায়। ওদিকে পরিবারের আরো মানুষ। সংসার। এতসব ভেবে তো আর øেহ নিয়ে এগুতে পারেন না তিনি। ততক্ষণে সীমান্তের কাছাকাছি চলে এসেছে বিএসএফ সদস্যরাও। নুরু হয়তো তখন একটু আড়াল হয়ে যন্ত্রনাকে বুকে অনেক কষ্টে চাপা দিয়ে নীরবে চোখের পানি গড়াচ্ছেন।
ভয়াবহতার এখানেই শেষ নয়। খবরের কাগজগুলোতে খবর এসেছে শুক্রবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে এই গুলির ঘটনার পর প্রায় আধা ঘন্টা বেঁচেছিলো ফেলানী। কাগজগুলো বলছে, এই সময়টাতে আর্তচিৎকারের সঙ্গে ফেলানীর মুখ দিয়ে বারবার একটি শব্দই বের হচ্ছিলো-‘পানি’, ‘পানি’। হায়রে অভাগী, তোমার জন্য এক ফোঁটা পানি নিয়ে কেউ যেতে পারেনি তোর কাছে। এমনকি তোমার বাবাও। একবার কল্পনা করুন তো, আপনার মেয়ে বা আপনার বোন আধাঘন্টা ধরে মৃত্যুযন্ত্রনায় ছটফট করে পানি চাচ্ছে, আপনি ক’হাত দূরে থেকেও তা দিতে পারছেন না। এর চেয়ে একজন বাবার কষ্টটা আর কত বড় হতে পারে? নুরুল ইসলাম নুরু সেই কষ্টটি হজম করে ফেলেছেন। ফেলেছেন বললে ভুল বলা হবে। ফেলতে বাধ্য হয়েছেন।
এভাবে বর্ণনা দিলে বহুপাতা লিখে ভরিয়ে ফেলা যাবে। তাই সেদিকে না যাওয়াটা মন্দ হবে না। আমি আইন-কানুন খুব একটা বুঝি না। সীমান্তের বিষয়তো আরো বুঝিনা। মানবকিতা যে খুব বেশি বুঝি তাও নয়। কিন্তু ফেলানীর এই মর্মন্তুদ ঘটনা আমার কাছে কিছু জিজ্ঞাসাকে হাজির করিয়ে দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে সংবাদমাধ্যমগুলোতেও বলা হয়েছে এবং আমরাও ধরে নিচ্ছি নুরু আর ফেলানী অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছিলো। কিন্তু তার শাস্তি কি মৃত্যুদ-? তার শাস্তি কি গুলিবিদ্ধ হয়ে পাখির মতো সাড়ে ৪ঘন্টা ঝুলে থাকা? যদি তা-ই হয় তাহলে সেই আইন আমি মানিনা। আপনাদেরও মানা উচিত বলে মনে করি না। বিএসএফ তো ফেলানীকে তার বাবাসহ অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দেয়া সংক্রান্ত আইনী জটিলতায় আটকিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু এমন অবৈধ কাজ করলেই তাকে গুলি করতে হবে-এমন অধিকার কোন দেশ তার কোন অস্ত্রধারী বাহিনীকে দিয়েছে? অবস্থাদৃষ্টে মেনে নিলাম গুলিটা তারা করেই ফেললেন। কিন্তু গুলি করার পরও যে মেয়েটি আধাঘন্টা বেঁচেছিলো তাকে বাঁচাতে কেনো বিএসএফ এগিয়ে এলো না? সে বাংলাদেশী না ভারতীয় সেটিই কি তাহলে ভারতীয়দের কাছে বড় বিষয়? সে যে একজন মানুষ এই বিষয়টি কি একবারও ভাবা যেতো না? আগেই বলেছি, সীমান্তের কালা-কানুন আমি ভালো বুঝিনা। তাই বলি-ধরেই নিলাম মৃত্যু পথযাত্রী কাউকে পানি দেয়ার কোন বিধান বিএসএফ’র আইনে নেই। সেকারণে এক ফোঁটা পানিও জোটেনি ফেলানীর জিহ্বায়। কিন্তু এরপরও কেনো একটি কিশোরীর লাশ সাড়ে ৪ঘন্টা কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা হলো? গল্প শুনেছি, আগের যুগে ধনী ব্যক্তিরা হরিণ মেরে তার চামড়া বাড়ির বসার ঘরে টানিয়ে দিতো বীরত্ব জানাতে। তাহলে কি ধরে নেবো এক নিরীহ কিশোরীকে হত্যা করে তার লাশটি ঝুলিয়ে রেখে বিএসএফ সেই বীরত্ব দেখালো? নাকি লাশটি নামানো যাবে কি না এজন্য তাদের উর্ধ্বতন কারো অনুমতি আনতে ঘন্টাচারেক সময় লেগেছে? যদি সেটিও হয় তাহলেও তো জিজ্ঞাসা পিছু ছাড়ে না-গুলি করার অনুমতি অস্ত্রে গুলি ভরার সময়ই মগজে ভরে যায়, আর লাশ নামানোর অনুমতি প্যান্টের গোপন পকেট থেকে বের করতে হয় বিএসএফ’র?
এত জিজ্ঞাসার জবাব দেয়ার সময় বিএসএফ’র নেই। কিন্তু আমাদের কি জানার অধিকার নেই নাকি সেটিও ওই কাঁটাতারেই আটকে আছে? আমাদের দেশে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ানের ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে আমার ব্যক্তিগত মতামত নেই। কিন্তু দেশীয় আর বিদেশী অর্থে পরিচালিত অনেক সংগঠনই তো র্যাবের ‘ক্রসফায়ার’কে ‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড’ বলে ব্যাপক ফিরিস্তি দেন, তদন্তের দাবি করেন। কিন্তু একজন ফেলানী যে বিনা বিচারে বিয়ের স্বপ্ন, নতুন সংসারের স্বপ্ন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেলো তাকে নিয়ে তো ওই সংগঠনগুলো গত দুদিনে কিছু বললনা। অবৈধ উপায়ে দেশের আসছিলো বলেই কি তবে এই কিশোরীটির জন্য তাদের মানবাধিকার-মানবতা সব চাপা পড়ে গেলো? আমাদের স্বভাব আজো সেই কুকুরের মতোই থেকে গেলো, যে কুকুর নিজের পাড়ায় ঘেউ ঘেউ করে পাড়াটাকে মাথায় তুলে নাচে। আর অন্য পাড়ায় কামড় খেয়ে লেজ গুটিয়ে মৃদু আওয়াজে কিউ কিউ করে পালিয়ে আসে।
লেখাটাকে ‘কুকুরে’র পর্যায়ে নিয়ে যাবার জন্য হয়তো মনে মনে একটু কই পেলেন। কিন্তু ভাবুন তো একটি কিশোরী বাংলাদেশীকে কুকুরের মতো গুলি করে মারলো আর আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র, শাসনযন্ত্র, রাজনীতিবিদ-সবাই সেদিকে না তাকিয়ে উন্নয়ন কতটুকু হলো-ধ্বংস কতুটুকু হলো সেই পরিমাণ নিয়েই বাটখারা হাতে ব্যস্ত। আমাদেরও সীমান্ত রক্ষী আছে। বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ-বিজিবি। সীমান্ত নিয়েই তারা থাকেন। কই তাদের পক্ষ থেকে লাশ ফেরতের আহ্বান সম্বলিত তীব্র প্রতিবাদের একটি পত্র ছাড়া আর তো কিছু নেই। রাগ করবেন না, ছোট মুখে বড় কথা বলে ফেলি। আজ যদি ওটি ফেলানী না হয়ে ধরুন হরিদাসী বা গঙ্গা নামের কোন কিশোরী হতো, আর বিএসএফ’র ভূমিকায় বিজিবি থাকতো-তাহলে দেখতেন এই দুদিনে কতগুলো পতাকা বৈঠক হতো সীমান্তে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও কেঁদে নয়ন ভাসাতো। ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোও ফুঁসে উঠতো একজন কিশোরীর এমন মৃত্যু নিয়ে। আর আমরা? ভেতরের পাতায় এক কলামের একটি সংবাদ ছেপে ফেলানীর শেষকৃত্যানুষ্ঠান সেড়ে ফেলেছি।
খবরের কাগজে কয়েকদিন ধরেই খবর আসছে গত বছরে সীমান্ত এলাকায় ৭৪ জন বাংলাদেশীকে গুলি করে মেরেছে বিএসএফ। এবছর সেই মিছিলে প্রথম আর্তনাদ ফেলানীর। বিয়ে বাড়িতে মৃত্যুর ৩০ ঘন্টা পর ফেলানীর লাশ পৌঁছেছে। কুড়িগ্রামের সেই বাড়িটির দৃশ্য কল্পনা করুন। বেশি সময় নিবেন না কল্পনা করতে। কারণ, ওই কান্নার আওয়াজ বাতাসে মিলিয়ে যাবার আগেই রাজশাহী সীমান্তে দুই যুবকের পরিবারে উঠেছে কান্নার রোল। ফেলানীর মিছিলে ওরাও যে আর্তনাদের স্লোগান তুলেছে গত শনিবার রাতে। জানিনা এই মিছিল আরো কত লম্বা হবে। আরো কত ফেলানীর বিয়ের রক্তরং আলতা হাতে-পায়ে না লেপে ছিটকে পড়বে বুকে। ততদিন লাশ ফিরিয়ে দেয়ার মতো ন্যুনতম মানবিকতা থাকবে তো ওপারের সীমান্ত রক্ষীদের?
মেহেরুল হাসান সুজন
জানার জন্য সংবাদপত্রের সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক তার শুরুর সময়টা দিনক্ষণ হিসেবে মনে নেই বটে; তবে ১৯৯৭ সালের শীতের দিনগুলো মনে পড়ে। ক্লাশের ফাইনাল পরীক্ষা শেষে লম্বা ছুটি। তাই সকাল বেলা মিষ্টি রোদে বসে ৭৫ পার করা নানাকে খবরের কাগজ পড়িয়ে শোনানোর একটা দায়িত্ব তাই কাঁধে চাপলো। মনে হয় তখন থেকেই খবরেরকাগজ পড়া শুরু। আর খবরের কাগজ দিয়ে মানুষকে খবর জানানোর ব্যাপ্তিকাল আমার খুব বেশি নয়, ৬ বছর। এই সময়কালে কত ঘটনা জেনেছি, কত ঘটনা পড়েছি, কত ঘটনা জানিয়েছি। কোন কোনটি যে মনে দাগ কাটে নি বা ব্যথিত করেনি তা কিন্তু নয়। তবে ফেলানী বোধহয় একটু বেশিই জ্বালাচ্ছে। নামটা খুবই ছোট। কারো কারো কাছে নামটি ফেলনাও বটে। কিন্তু এই ফেলনা ফেলানীই যেনো বুকের ভেতর আঙুল নাড়িয়ে জানিয়ে দিচ্ছে আমাদের সীমান্ত আর আমাদের মানবিতকার বাস্তবতাকে।
খবরের কাগজে কাজ করার আগে মানুষের দুর্বিষহ জীবনের খবর পড়ে আহা, ইস্, আহারে ইত্যকার নানা শব্দ আওড়াতাম। খবরের কাগজের কর্মী হিসেবে নাম লেখানোর পর ধীরে ধীরে যেনো সেই আফসোসমাখা শব্দগুলো পেটের ভেতরেই আটকে ছিলো। মনে হতো, সব সময় তো এমনই হয়। এ আর নতুন কী। কিন্তু গত শুক্রবার রাতে ফেলানীর সংবাদটি যখন কাগজে ছাপার উপযোগী করে গড়বার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, তখন থেকেই কেনো যেনো বুকের ভেতরটা খচখচ করছিলো। একটি মেয়ে পেটের দায়ে বাবার সঙ্গে ভীনদেশে থাকে। তার বিয়ে। পাত্র-পাত্রী দেখার পর্ব হয়েছিলো কি না জানি না। তবে বিয়ের ক্ষণটা ঠিক হয়েছিলো শুক্রবার সন্ধ্যায়। তাই বাবা নুরুল ইসলাম নুরুর সঙ্গে ভারতীয় সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া লুকিয়ে পার হচ্ছিলো ফেলানী। বাবা নুরুর জীবনের বহু সময় কেটেছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এপার-ওপার যাতায়াতে। তাই কন্যাদায়গ্রস্থ মানুষটি শুক্রবারেও নিমিষেই পার হয়েছিলেন কাঁটাতারের বেড়াটি। বিয়ের খবরে লাজুক ফেলানীও বাবাকে অনুসরণ করছিলো। বিএসএফ তখনো টের পায়নি বিষয়টি। কিন্তু হায় ফেলানী! তোমার কাপড়টাই যে সব নষ্টের গোড়া! কাঁটাতারে আটকে যায় ওর জামা। বিয়ের কথা পাকাপাকি বটে, কিন্তু কিশোরী ফেলানী যে জগত সংসার নিয়ে অতটা অভিজ্ঞ নয়। তাইতো সেই পিঁপড়ার মতো এক ফোঁটা পানিতে পড়ে সেটিকে সমুদ্র ভেবে আতঙ্কে-চিৎকারে দিগি¦দিক নিজেকে জানান দেয় ফেলানী। চোখে যা-ই হোক কানে নিশ্চয় খাটো ছিলো না বিএসএফ সদস্যরা। ঠিকই বুঝে গেছে। যেনো শিকারও আয়ত্বে। তাই তাদের আর দেরি হয়নি কিশোরীটির ছোট্ট দেহটা বুলেটে ঝাঁঝড়া করে দিতে। এবার ভয়ার্ত কিশোরীটির চিৎকার বিএসএফ’র ভয়ে নয়; যমদূতের ভয়ে। একদিকে বিএসএফ আর তার গুলি অন্যদিকে যমরাজ। ছোট্ট কিশোরীটি আর নড়তে পারে না।
এটুটু পড়ে হয়তো ভাবছেন-আহারে কী বেদনাদায়ক বর্ণনা। কিন্তু একবার ভাবুন তো এপারে আগেই পার হয়ে আসা বাবা নুরুর মনের অবস্থাটি তখন কেমন ছিলো! চোখের সামনে মেয়েরে শরীরের বুলেট। মাত্র ক’হাত দূরে মেয়েটি ঝুলছে এক ঠুনকো বেড়ায়। অথচ বাবার সাধ্য নেই মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করা মেয়েটিকে অন্তত øেহের হাত বুলিয়ে কিছুটা আশ্বস্ত করতে। সেই øেহটুকু করতে গেলেই যে তারও প্রাণ যায়। ওদিকে পরিবারের আরো মানুষ। সংসার। এতসব ভেবে তো আর øেহ নিয়ে এগুতে পারেন না তিনি। ততক্ষণে সীমান্তের কাছাকাছি চলে এসেছে বিএসএফ সদস্যরাও। নুরু হয়তো তখন একটু আড়াল হয়ে যন্ত্রনাকে বুকে অনেক কষ্টে চাপা দিয়ে নীরবে চোখের পানি গড়াচ্ছেন।
ভয়াবহতার এখানেই শেষ নয়। খবরের কাগজগুলোতে খবর এসেছে শুক্রবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে এই গুলির ঘটনার পর প্রায় আধা ঘন্টা বেঁচেছিলো ফেলানী। কাগজগুলো বলছে, এই সময়টাতে আর্তচিৎকারের সঙ্গে ফেলানীর মুখ দিয়ে বারবার একটি শব্দই বের হচ্ছিলো-‘পানি’, ‘পানি’। হায়রে অভাগী, তোমার জন্য এক ফোঁটা পানি নিয়ে কেউ যেতে পারেনি তোর কাছে। এমনকি তোমার বাবাও। একবার কল্পনা করুন তো, আপনার মেয়ে বা আপনার বোন আধাঘন্টা ধরে মৃত্যুযন্ত্রনায় ছটফট করে পানি চাচ্ছে, আপনি ক’হাত দূরে থেকেও তা দিতে পারছেন না। এর চেয়ে একজন বাবার কষ্টটা আর কত বড় হতে পারে? নুরুল ইসলাম নুরু সেই কষ্টটি হজম করে ফেলেছেন। ফেলেছেন বললে ভুল বলা হবে। ফেলতে বাধ্য হয়েছেন।
এভাবে বর্ণনা দিলে বহুপাতা লিখে ভরিয়ে ফেলা যাবে। তাই সেদিকে না যাওয়াটা মন্দ হবে না। আমি আইন-কানুন খুব একটা বুঝি না। সীমান্তের বিষয়তো আরো বুঝিনা। মানবকিতা যে খুব বেশি বুঝি তাও নয়। কিন্তু ফেলানীর এই মর্মন্তুদ ঘটনা আমার কাছে কিছু জিজ্ঞাসাকে হাজির করিয়ে দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে সংবাদমাধ্যমগুলোতেও বলা হয়েছে এবং আমরাও ধরে নিচ্ছি নুরু আর ফেলানী অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছিলো। কিন্তু তার শাস্তি কি মৃত্যুদ-? তার শাস্তি কি গুলিবিদ্ধ হয়ে পাখির মতো সাড়ে ৪ঘন্টা ঝুলে থাকা? যদি তা-ই হয় তাহলে সেই আইন আমি মানিনা। আপনাদেরও মানা উচিত বলে মনে করি না। বিএসএফ তো ফেলানীকে তার বাবাসহ অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দেয়া সংক্রান্ত আইনী জটিলতায় আটকিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু এমন অবৈধ কাজ করলেই তাকে গুলি করতে হবে-এমন অধিকার কোন দেশ তার কোন অস্ত্রধারী বাহিনীকে দিয়েছে? অবস্থাদৃষ্টে মেনে নিলাম গুলিটা তারা করেই ফেললেন। কিন্তু গুলি করার পরও যে মেয়েটি আধাঘন্টা বেঁচেছিলো তাকে বাঁচাতে কেনো বিএসএফ এগিয়ে এলো না? সে বাংলাদেশী না ভারতীয় সেটিই কি তাহলে ভারতীয়দের কাছে বড় বিষয়? সে যে একজন মানুষ এই বিষয়টি কি একবারও ভাবা যেতো না? আগেই বলেছি, সীমান্তের কালা-কানুন আমি ভালো বুঝিনা। তাই বলি-ধরেই নিলাম মৃত্যু পথযাত্রী কাউকে পানি দেয়ার কোন বিধান বিএসএফ’র আইনে নেই। সেকারণে এক ফোঁটা পানিও জোটেনি ফেলানীর জিহ্বায়। কিন্তু এরপরও কেনো একটি কিশোরীর লাশ সাড়ে ৪ঘন্টা কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা হলো? গল্প শুনেছি, আগের যুগে ধনী ব্যক্তিরা হরিণ মেরে তার চামড়া বাড়ির বসার ঘরে টানিয়ে দিতো বীরত্ব জানাতে। তাহলে কি ধরে নেবো এক নিরীহ কিশোরীকে হত্যা করে তার লাশটি ঝুলিয়ে রেখে বিএসএফ সেই বীরত্ব দেখালো? নাকি লাশটি নামানো যাবে কি না এজন্য তাদের উর্ধ্বতন কারো অনুমতি আনতে ঘন্টাচারেক সময় লেগেছে? যদি সেটিও হয় তাহলেও তো জিজ্ঞাসা পিছু ছাড়ে না-গুলি করার অনুমতি অস্ত্রে গুলি ভরার সময়ই মগজে ভরে যায়, আর লাশ নামানোর অনুমতি প্যান্টের গোপন পকেট থেকে বের করতে হয় বিএসএফ’র?
এত জিজ্ঞাসার জবাব দেয়ার সময় বিএসএফ’র নেই। কিন্তু আমাদের কি জানার অধিকার নেই নাকি সেটিও ওই কাঁটাতারেই আটকে আছে? আমাদের দেশে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ানের ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে আমার ব্যক্তিগত মতামত নেই। কিন্তু দেশীয় আর বিদেশী অর্থে পরিচালিত অনেক সংগঠনই তো র্যাবের ‘ক্রসফায়ার’কে ‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড’ বলে ব্যাপক ফিরিস্তি দেন, তদন্তের দাবি করেন। কিন্তু একজন ফেলানী যে বিনা বিচারে বিয়ের স্বপ্ন, নতুন সংসারের স্বপ্ন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেলো তাকে নিয়ে তো ওই সংগঠনগুলো গত দুদিনে কিছু বললনা। অবৈধ উপায়ে দেশের আসছিলো বলেই কি তবে এই কিশোরীটির জন্য তাদের মানবাধিকার-মানবতা সব চাপা পড়ে গেলো? আমাদের স্বভাব আজো সেই কুকুরের মতোই থেকে গেলো, যে কুকুর নিজের পাড়ায় ঘেউ ঘেউ করে পাড়াটাকে মাথায় তুলে নাচে। আর অন্য পাড়ায় কামড় খেয়ে লেজ গুটিয়ে মৃদু আওয়াজে কিউ কিউ করে পালিয়ে আসে।
লেখাটাকে ‘কুকুরে’র পর্যায়ে নিয়ে যাবার জন্য হয়তো মনে মনে একটু কই পেলেন। কিন্তু ভাবুন তো একটি কিশোরী বাংলাদেশীকে কুকুরের মতো গুলি করে মারলো আর আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র, শাসনযন্ত্র, রাজনীতিবিদ-সবাই সেদিকে না তাকিয়ে উন্নয়ন কতটুকু হলো-ধ্বংস কতুটুকু হলো সেই পরিমাণ নিয়েই বাটখারা হাতে ব্যস্ত। আমাদেরও সীমান্ত রক্ষী আছে। বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ-বিজিবি। সীমান্ত নিয়েই তারা থাকেন। কই তাদের পক্ষ থেকে লাশ ফেরতের আহ্বান সম্বলিত তীব্র প্রতিবাদের একটি পত্র ছাড়া আর তো কিছু নেই। রাগ করবেন না, ছোট মুখে বড় কথা বলে ফেলি। আজ যদি ওটি ফেলানী না হয়ে ধরুন হরিদাসী বা গঙ্গা নামের কোন কিশোরী হতো, আর বিএসএফ’র ভূমিকায় বিজিবি থাকতো-তাহলে দেখতেন এই দুদিনে কতগুলো পতাকা বৈঠক হতো সীমান্তে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও কেঁদে নয়ন ভাসাতো। ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোও ফুঁসে উঠতো একজন কিশোরীর এমন মৃত্যু নিয়ে। আর আমরা? ভেতরের পাতায় এক কলামের একটি সংবাদ ছেপে ফেলানীর শেষকৃত্যানুষ্ঠান সেড়ে ফেলেছি।
খবরের কাগজে কয়েকদিন ধরেই খবর আসছে গত বছরে সীমান্ত এলাকায় ৭৪ জন বাংলাদেশীকে গুলি করে মেরেছে বিএসএফ। এবছর সেই মিছিলে প্রথম আর্তনাদ ফেলানীর। বিয়ে বাড়িতে মৃত্যুর ৩০ ঘন্টা পর ফেলানীর লাশ পৌঁছেছে। কুড়িগ্রামের সেই বাড়িটির দৃশ্য কল্পনা করুন। বেশি সময় নিবেন না কল্পনা করতে। কারণ, ওই কান্নার আওয়াজ বাতাসে মিলিয়ে যাবার আগেই রাজশাহী সীমান্তে দুই যুবকের পরিবারে উঠেছে কান্নার রোল। ফেলানীর মিছিলে ওরাও যে আর্তনাদের স্লোগান তুলেছে গত শনিবার রাতে। জানিনা এই মিছিল আরো কত লম্বা হবে। আরো কত ফেলানীর বিয়ের রক্তরং আলতা হাতে-পায়ে না লেপে ছিটকে পড়বে বুকে। ততদিন লাশ ফিরিয়ে দেয়ার মতো ন্যুনতম মানবিকতা থাকবে তো ওপারের সীমান্ত রক্ষীদের?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



