বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সেনানিবাসের বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। ইতিমধ্যে ওই বাড়ির মালামাল স্থানান্তর করা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
সেনাবাহিনীর একজন পদস্থ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, সেনানিবাসের বাড়ি থেকে ২৯ মিন্টো রোডের বাসভবনে মালামাল স্থানান্তরের জন্য বেগম জিয়ার পক্ষ থেকে সেনা প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। ২৯ মিন্টো রোড বিরোধীদলীয় নেত্রীর সরকারি বাসভবন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তাতে মনে হচ্ছে, সরকার আইনের তোয়াক্কা না করে খালেদা জিয়াকে বাড়ি ছাড়া করতে যাচ্ছে। সরকার যদি চায়, তাহলে আমাদের পক্ষে কী করার আছে। তবে আমরা আমাদের মতো করে প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
গতকাল শুক্রবার রাতে সেনাসূত্র জানায়, আদালতের আদেশ পাওয়ার পর থেকেই বিরোধীদলীয় নেত্রী বাড়িটি ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গত ১ নভেম্বর থেকে তাঁর বাসার মালামাল সরানো শুরু হয়। এর মধ্যে ১, ৪, ৯ ও ১০ নভেম্বর ছোট-বড় অর্ধ শতাধিক কার্টন, কয়েকটি বড় ব্যাগ, বড় স্টিলের ট্রাঙ্ক ইত্যাদি সরিয়ে নেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, এসব মালামালের বেশির ভাগই তাঁর ভাই মেজর (অব.) সাঈদ এস্কান্দারের বাসায় নেওয়া হয়। কিছু জিনিস ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর শাশুড়ির বাসায় নেওয়া হয়।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বেগম জিয়া শিগগিরই সেনানিবাসের বাড়ি ছাড়বেন বলে মনস্থির করেছেন। তবে আজ শনিবারও বাড়ি ছাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
যেভাবে বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়: ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। ওই বছরের ১২ জুন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের সভা হয়। এ সভায় জিয়াউর রহমানের পরিবারের জন্য বাসস্থান, ছেলেদের পড়াশোনা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা দিতে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত হয়। এর সূত্র ধরে ’৮১ সালের ১০ জুন সেনা সদর কিউএমজি শাখা, এমঅ্যান্ডকিউ পরিদপ্তর থেকে শহীদ মইনুল সড়কের ৬ নম্বর বাড়িটি বেগম জিয়াকে হস্তান্তরের প্রস্তাব করা হয়। একরপ্রতি জমির মূল্য তিন লাখ টাকা ধরে দুই একর ৭২ শতাংশ জমির মোট মূল্য আট লাখ ১৬ হাজার টাকা ধার্য করা হয়। একই বছরের ২৪ জুন বাড়িটি সামরিক ভূ-সম্পত্তি সার্কেল অধিদপ্তরের অনুকূলে হস্তান্তরের জন্য প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই বছরের ৮ জুলাই জমিসহ স্থাবর সম্পত্তি বেগম জিয়ার অনুকূলে ইজারা দলিল ও নিবন্ধন শেষ হয়। তবে এর আগে থেকেই বেগম জিয়া ওই বাড়িতে বসবাস করছিলেন।
নোটিশ ও মামলা: বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত বছরের ৮ এপ্রিল মন্ত্রিসভার বৈঠকে বেগম খালেদা জিয়ার নামে দেওয়া সেনানিবাসের বাড়ির ইজারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো প্রস্তাবে ইজারার শর্ত ভঙ্গ ও ইজারা দেওয়ার বৈধতা নেই বলে অভিযোগ করে তা বাতিলের কথা উল্লেখ করা হয়।
মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সামরিক ভূমি ও সেনানিবাস অধিদপ্তর থেকে নির্দেশ দেওয়ার পর সামরিক ভূ-সম্পত্তি প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ইজারা বাতিল করে বাড়িটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুকূলে ফেরত নেওয়ার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। এরপর আইন মন্ত্রণালয় থেকে ইজারা বাতিল ও বাড়ি ফেরত নেওয়ার প্রস্তাবে মতামত নেওয়া হয়। আইন মন্ত্রণালয় তাদের মতামতে জানিয়ে দেয়, যেহেতু ইজারার বৈধতা নেই এবং অবৈধ ইজারার আবার শর্ত লঙ্ঘিত হয়েছে, তাই বাড়ি ছাড়তে বেগম জিয়াকে নোটিশ দেওয়া যায়। তবে নোটিশ দেওয়ার আগে ইজারা বাতিলের পরামর্শ দেয় আইন মন্ত্রণালয়।
সূত্র জানায়, এ সিদ্ধান্তের পর সামরিক ভূমি ও সেনানিবাস অধিদপ্তরের সামরিক ভূ-সম্পত্তি প্রশাসকের কার্যালয় থেকে গত বছরের ২০ এপ্রিল খালেদা জিয়াকে বাড়িটি ছেড়ে দিতে নোটিশ দেওয়া হয়। একই বছরের ৭ ও ২৪ মে দুই দফায় তাঁকে নোটিশ দেওয়া হয়।
এরপর নোটিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে খালেদা জিয়া হাইকোর্টে রিট করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ২৭ মে হাইকোর্ট নোটিশের কার্যকারিতা স্থগিত করে রুল জারি করেন। গত ৬ জুন রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি গ্রহণ শুরু হয়। শুনানিকালে ২৩ আগস্ট হাইকোর্ট বাড়িটির ইজারা-সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র তলব করেন। দীর্ঘ ২২ কার্যদিবস শুনানি শেষে হাইকোর্ট ১৩ অক্টোবর রিটটি খারিজ করে রায় দেন। রায়ে খালেদা জিয়াকে বাড়ি খালি করার জন্য কমপক্ষে ৩০ দিন সময় দিতে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়। গতকাল সেই ৩০ দিনের সময়সীমা শেষ হয়েছে।
এদিকে হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে ৮ নভেম্বর আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন খালেদা জিয়া। পরদিন বিষয়টি শুনানির জন্য চেম্বার বিচারপতির আদালতে আসে। ওই দিন আদালত ১০ নভেম্বর বিষয়টি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠিয়ে দেন। ওই দিন খালেদা জিয়ার আইনজীবী শুনানি মুলতবির আরজি জানালে প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে গঠিত তিনজন বিচারপতির বেঞ্চ ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেন।
সুত্র প্রথমআলো

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



