somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভালবাসুন সঠিক ভাবে (আধুনিক ঈশপের গল্প) !!

১০ ই জুলাই, ২০১১ রাত ১১:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দাইফ জীবনে কোন দিন দ্বিতীয় হয়নি, বিশ্ববিদ্যালয়েও সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম, একেবারে সোনায় সোহাগা ছেলে যাকে বলে। এরপর জার্মেনী থেকে পিএইচডি করে দেশের টানে ফিরে এল। বড় এক বহুজাতিক কোম্পানিতে এক ম্যানেজেরিয়াল পোস্টে সার্কুলার দেখে সে আবেদন করেই ফেলল। বাবা মায়ের অনেক আদরের একমাত্র ছেলে, যদিও বাবাকে হারিয়েছে খুব ছোট বেলায়। মা তাকে মানুষ করেছেন অনেক যত্নে, কোন দিন অভাব অভিযোগ বুঝতেই দেন নি। সেই আদরের ছেলে আজ তার কর্মজীবনে পদার্পণের দোর গোরায়।

সাক্ষাৎকারের প্রথম ধাপ ভাল ভাবেই উৎরে গেল দাইফ। শেষ সাক্ষাৎকারটা পরিচালক নিজেই নিলেন। জীবন বৃত্তান্ত দেখে বিগ বস যারপরনাই সন্তুষ্ট ! এসএসসি থেকে শুরু করে পিএইচডি পর্যন্ত, সব পরীক্ষায়ই অত্যন্ত ভাল ফলাফল।

বস জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তো অনেক ভাল স্কুলে পড়াশোনা করতে, তোমার স্কুলের খরচ কি তোমার বাবাই বহন করতেন?
আমার বাবা আমার বয়স যখন এক বছর ছিল তখনই মারা গেছেন, আমার মা ই আমার সব খরচ দিতেন।
তোমার মা কোথায় কাজ করতেন?
আমার মায়ের একটা ছোট্ট লন্ড্রি আছে, তিনি নিজেই সেখানে কাপড় পরিস্কার করেন।
তোমার হাত দুটো দেখি? দাইফ তার হাত দুটো দেখাল, একেবারে মসৃণ দুটো হাত !
তুমি কি কখনো তোমার মাকে কাপড় ধুতে সাহায্য করেছ?
নাহ, আমার কখনোই সে সুযোগ হয় নি। আমার মা সব সময় চাইতেন আমি শুধু ভাল করে পড়াশোনা করি। তাছাড়া আমার মা আমার চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি কাপড় ধুতে পারেন।
তোমার প্রতি আমার একটা অনুরোধ, তুমি আজ বাসায় গিয়ে তোমার মায়ের হাত দুটো পরিস্কার করে দিবে। আর কাল সকালে আমার সাথে দেখা করবে।

দাইফ মনে মনে অনেক পুলকিত এই ভেবে যে ওর চাকরিটা মনে হয় এখানে হয়েই যাবে !
মা তোমার হাত দুটো দাও তো, দাইফ অনেক উচ্ছ্বসিত ! তোমার হাত দুটো আজ আমি ধুয়ে দেব।
মায়ের চোখে বিস্ময় ! তিনি আনন্দিত কিন্তু একটা মিশ্র অনুভূতি নিয়ে ছেলের দিকে হাত দুটো বাড়িয়ে দিলেন।
দাইফ আস্তে আস্তে তা মায়ের হাত দুটো ধুয়ে দিতে লাগল...
তার দুচোখ বেয়ে অশ্রুধারা নেমে এল...

এই প্রথম দাইফ দেখল, তার মায়ের হাত দুটো কত অমসৃণ ! কত ক্ষত বিক্ষত !! কিছু কিছু ক্ষত এতটাই বেশী যে তার মা ব্যাথায় কুকড়ে উঠলেন যখন দাইফ তার মায়ের হাত দুটো পানি দিয়ে ধুয়ে দিচ্ছিল !

এই প্রথম দাইফ বুঝতে পারল, তার মায়ের এই ক্ষত বিক্ষত হাত দুটোই তার পড়ার খরচ জুগিয়ে আসছে... তার আজকের এই ভাল ফলাফল, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পেছনে তার মায়ের কোমল হাত দুটোকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে...

মায়ের হাত ধোয়ার পর সেদিন দাইফ মায়ের লন্ড্রিতে থাকা বাকী সবগুলো কাপড় ধুয়ে ফেলল।

রাতে মা ছেলে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করল।

পরদিন সকালে, দাইফ বসের রুমে। বস খেয়াল করলেন, দাইফের চোখের কোনায় অশ্রু।
তুমি কি আমাকে বলতে পার, কাল তুমি তোমার বাড়ীতে কি করেছ আর কি শিখেছ? বসের জিজ্ঞাসা।

আমি আমার মায়ের হাত দুটো ধুয়ে দিয়েছি আর মায়ের লন্ড্রির বাকী কাপড়গুলোও ধুয়ে দিয়েছি।

আমাকে তোমার অনুভূতিগুলো বল।

দাইফ বলে যায়,
প্রথমতঃ আমি মানুষকে মূল্যায়ন করতে শিখেছি, তার কাজের স্বীকৃতি দিতে শিখেছি। আমি বুঝেছি, আমার মা ছাড়া আমি আজ এতটা সফল হতে পারতাম না।

দ্বিতীয়তঃ আমার মায়ের সাথে কাজ করে এবং তাকে সাহায্য করে আমি শিখেছি কোন কাজে সফল হতে কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয় !

তৃতীয়ত্বঃ আমি পারিবারিক বন্ধন এর গুরুত্ব এবং মূল্য উপলব্ধি করতে পেরেছি !


বস বললেন, আমি এমন কাউকেই আমার ম্যানেজার হিসেবে চাই !

আমি এমন একজনকে আমার ম্যানেজার হিসেবে চাইছিলাম যে কিনা অন্যের সাহায্যকে মূল্যায়ন করবে, অন্যের দুঃখ কষ্ট বুঝবে যখন তাদের দিয়ে কাজ করাবে এবং যে তার জীবনে অর্থ উপার্যনই একমাত্র লক্ষ হিসেবে নেবে না ! তুমি আজ থেকে আমাদের একজন ! :)

নীতিকথাঃ
একটি শিশু যে কিনা যা চায় তাই পেয়ে যায়, সে “আপোষহীন মানসিকতা” নিয়ে বেড়ে উঠবে এবং নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বুঝবে না। সে তার বাবা মায়ের ত্যাগকে মূল্যায়ন করতে শিখবে না। সে যখন তার কর্মজীবনে প্রবেশ করবে, ভাববে, সবাই তার কথা শুনতে বাধ্য ! এবং সে যখন ম্যানেজার হবে, সে তার অধস্তনদের প্রয়োজনকে বুঝবে না এবং অন্যকে দোষারোপ করার মনোভাবাপন্ন হবে। এই ধরনের মানুষ, হয়ত সে পড়োশোনায় খুব ভাল, সাময়িকভাবে সে হয়ত সফল হবে, কিন্তু কিছু অর্জন করার যেই মূল্য সেটা বুঝতে পারবে না ! সে অভিযোগপ্রবণ হবে এবং সবসময় নিজে ওপরে ওঠার জন্য চেষ্টায় থাকবে। আমরা যদি আমাদের সন্তানদের এভাবে বড় করি তবে আমরা কি আসলে তাকে ভাল ভাবে বড় করছি না তার ভবিষ্যতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করছি, সেটা ভাবা দরকার !

আপনি আপনার সন্তানকে হয়ত অনেক প্রাচুর্যে বড় করছেন, কিন্তু আপনি যখন বাগানে ঘাস কাটছেন বা ঘরে কোন ধোয়া মোছা করছেন, সেটা তাদেরও করতে দিন। খাওয়ার পর তাকে তার ভাই বোনদের সাথে নিজের প্লেট নিজের হাতেই ধুতে দিন। এটা এমন নয় যে আপনার কাজের লোক রাখার সামর্থ্য নেই, বরং এটা এজন্য যে আপনি তাদের সঠিকভাবে ভালবাসেন ! আপনি তাদের এটা শেখান, তাদের বাবা মা যত ধনীই হোক না কেন, একদিন তারা বার্ধক্যে উপনীত হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, আপনি আপনার সন্তানদের শেখান, কিভাবে অন্যের কাজকে মূল্যায়ন করতে হয়, কোন কাজে সফল হতে হলে কিভাবে অন্যের সাথে মিলে মিশে কাজ করতে হয় এবং ত্যাগ স্বীকার করতে হয় !!

বি.দ্র.: গল্পটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত এবং অনূদিত। গল্পের নায়কের নাম আমার একজন প্রিয় ব্লগার দাইফ এর নামেই রাখলাম এবং তাকে উৎসর্গ করলাম !
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুলাই, ২০১১ সকাল ১০:২৯
৪৭টি মন্তব্য ৪৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×