গ্রামের নাম হাটকয়েড়া।
সেই গ্রামেরই বড়ো গেরস্থ মাজম মেম্বার।
মাজম মেম্বার নামী দামী অবস্থাসম্পন্ন লোক, তার বাড়ীতে আর কিছু না হোক, অন্ততঃ খাবার দাবারের কোন অভাব নেই।
সেকারণেই চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ পরবর্তী সময়ে ক্লাস সিক্সে পড়া এক অভাবী কিশোর সে বাড়ীতে উঠে আসে লজিং থাকতে।
নিজ বাড়িতে অনাহারে অর্ধাহারে সেই কিশোরটির যাতে পড়ালেখার কোন ব্যাঘাত না ঘটে সেই আশা নিয়েই তার প্রিয়তম বাবা তাকে পাঠিয়ে দেন লজিং থাকতে সেই বহুদূরের মাজম মেম্বারের বাড়িতে।
সেই থেকেই শুরু হয় সেই কিশোরের অন্য এক আবাসের গল্প।
তার মর্মবেদনা, তার প্রতি মুহুর্তের আহত অনুভব আর অবাক অন্তর্যাতনাময় উপলব্ধির স্পর্শমাখা-‘জায়গীরনামা’র গল্প।
গল্পের সেই কিশোর আর কেউ নন, আমাদের সবার চেনা, এই ব্লগের প্রিয় কবি-শেখ জলিল।
এবারের বইমেলায় গত ১০ই ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় মোড়ক উন্মোচন হল শেখ জলিল এর স্মৃতিচারণমূলক গল্পগ্রন্থ ‘জায়গীরনামা’র।
শেখ জলিল মূলতঃ কবি হিসেবে পরিচিত হলেও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের অনেক মেধাবী শাখাতেই তার স্বাচ্ছন্দ্য বিচরণ আমাদের নজরে পড়ে। পারিবারিক এক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল তার সকল কর্মকান্ডের অফুরান প্রেরণা হতে পেরেছে।
এ কারণেই আমরা কখনো দেখি জলিল ভাইয়ের অসামান্য কাব্যের স্ফূরণ-‘দুঃখ তোমার অভিসারে যাবো’, কখনো দেখি সুসংবদ্ধ গল্পের উচ্ছাস-‘অতৃপ্ত আকাঙ্খা’, কখনো বা ‘কবিতার ছন্দ’ বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ পাঠের সুঠাম গাম্ভীর্য্য।
সামহয়্যার ইন ব্লগের একেবারে শুরু থেকেই নানা আঙ্গিকের লেখায় এই লেখকের এক অদ্ভুত শ্রমসাধ্য ডেডিকেশান লক্ষ্য করা যায়। বিশেষতঃ তার লোকজ কবিতার সংগ্রহ এবং সে সংগ্রহের পেছনে তার বিপুল শ্রম আমাদের মুগ্ধ না করে পারে না। বিস্মৃতির আড়ালে ঢেকে যাওয়া পুরাতন প্রতিভাধর লেখকদের খুঁজে বের করে তাদেরকে তার লেখার মাধ্যমে উজ্জল আলোর সামনে নিয়ে আসার মহতী কাজটিও বারবার নীরবেই সম্পন্ন করে গেছেন শেখ জলিল।
আত্মনিমগ্ন এই কবি ঢাকা বেতারের তালিকাভূক্ত গীতিকার হিসেবে তার প্রাণের আবেগেই একসময় বেশ কিছু গানও রচনা করেছিলেন। তবে এবারের বইমেলায় তার যে গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচিত হল-তাকে তার কথা-কবিতা-আর গানসহ সব অনুভূতি আর আবেগের মিশ্র সঙ্কলন-ই বলা চলে, কেননা এখানে শেখ জলিল মূলতঃ স্মৃতিচারণমূলক আত্মকথনের সাথে সাথে তার কৈশোর সময় থেকে ক্রমশঃ বেড়ে ওঠা পর্যন্ত এক বিরাট সময়ের সামগ্রিক আবহটিকেই তুলে ধরেছেন।
যে কিশোরটিকে তার প্রিয়তম বাবা খাওয়া পড়ার সমস্যা দূর করার আশা নিয়ে জায়গীর থাকতে অন্য আবাসে পাঠিয়েছিলেন, আমরা দেখেছি ক্রমশঃ সেই কিশোরকে থাকতে হয়েছে বাড়ীর বারোমাসী কামলাদের সাথে। খাটতে হয়েছে কামলাদের মতোই।
গরু-ছাগল মাঠে চরানো থকে শুরু করে মুগুর দিয়ে মাঠের ইটা-ঢেলা পিটানো ও ধান-পাট-গম কাটার মতো শক্ত প্রাণান্তকর কাজে যখন সেই কিশোরকে আমরা পর্যুদস্ত ও ঘর্মাক্ত দেখে সমবেদনায় আহা বলে উঠি ঠিক সেই মুহূর্তেই সেই কিশোরের স্কুলের গণি মাষ্টার এর মুখ থেকে শুনতে পাই সেই কিশোর বৃত্তি পরীক্ষায় সারা টাঙ্গাইল জেলার মধ্যে প্রথম হয়েছে।
আমরা বুঝে ফেলি সেই কিশোরের অনেক কষ্টের অন্য আবাস একেবারে ব্যর্থ হয়নি।
ব্যর্থ হয়নি তার জায়গীর থাকা।
অবশ্য ‘জায়গীরনামা’ গ্রন্থের নানা গল্পের প্রেক্ষাপট শুধুমাত্র একজন জায়গীরদাতার আবাসস্থল নিয়ে নয়। শেখ জলিল তার সেই কৈশোরের সময়গুলোর বাস্তবধর্মী সাবলীল বর্ণনায় ফুটিয়ে তুলেছেন কিভাবে ঘটনা পরম্পরায় এক জায়গীরদাতার বাড়ী থেকে বেড়িয়ে এসে তাকে ছুটতে হয়েছে নতুন আরেক জায়গীরদাতার বাসায়।
শুধু জীবনের জন্য, শুধু ভালো খাওয়া পড়ার জন্য, অন্য বাড়ীর ঘাত- প্রতিঘাতময় পরিবেশের মধ্যে এই যে কর্মক্লীষ্ট জীবনের বেড়ে ওঠা, শেখ জলিল তার গ্রন্থে সেই বেদনাময় সংগ্রামের স্বরূপটি ভালভাবেই চিত্রিত করতে পেরেছেন।
জায়গীরনামা মূলতঃ স্মৃতিচারণমূলক রচনা হলেও গল্পের অন্যান্য উপাদান যথা হিউমার, থ্রিল অথবা ‘শেষের চমক’-এর কোন কমতি নেই এ গ্রন্থে। এছাড়াও কিশোর বয়সের নানা কৌতুহলের শিহরণ, আর অজানা বিষয়ে আগ্রহের বিদ্যুত ঝলক গল্পর ডালপালা ভেঙ্গে বেড়িয়ে এসেছে স্বাভাবিকবাবেই।
গল্পের কিশোর যখন কুড়িপাড়া হাই স্কুলের পাশের গ্রামের জায়গীরদাতার বাড়ী থেকে খুব ভোরে ফুফাতো ভাই লতিফের সঙ্গে হাত ধরে পালিয়ে আসে, তখনকার ঘটনাপ্রবাহ কিছুক্ষণের জন্য হলেও পাঠককে প্রশ্নের মাঝে রাখে-কি হবে এরপর? এরপর কোথায় যাবে এ কিশোর? আবার নতুন কোন্ অন্য আবাসে?
আবার নতুন কোন জায়গীরস্থলে?
জায়গীরনামার সকল পৃষ্ঠা জুড়ে একের পর এক স্মৃতি বর্ণনায় শেখ জলিল এভাবেই পাঠকের প্রশ্ন আর কৌতুহলকে ধরে রাখতে পেরেছেন শেষ অবধি।
একজন গল্পকার, একজন লেখকের সার্থকতা বোধহয় এখানেই।
..................................................................................
১০ই ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় একুশের বইমেলায় শেখ জলিল-এর ‘জায়গীরনামা’র মোড়ক উন্মোচণ করেন বিশিষ্ট লেখক ও চলচ্চিত্রকার জনাব আমজাদ হোসেন। অনুষ্ঠানে জনাব আমজাদ হোসেন, শেখ জলিল ছাড়াও আরো বক্তব্য রাখেন বইয়ের প্রকাশক শুদ্ধস্বরের জনাব আহমেদুর রশীদ। সমগ্র অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন জনাব নজরুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই বইটি সম্পর্কে প্রাথমিক পরিচিতি তুলে ধরেন বিশিষ্ট কবি ও গল্পকার জনাব মাহবুব লীলেন। ‘জায়গীরনামা’র মোড়ক উন্মোচণের এই স্মরণীয় মুহুর্তটিতে শেখ জলিলের কাছাকাছি ছিলেন সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য ব্যক্তিত্বসহ সামহয়্যার ও সচলায়তনের বহু কৃতী ব্লগার। অনুষ্ঠানে সচলায়তনের জনাব আবু রেজা, আখতার আহমেদ, সবজান্তাসহ সামহয়্যারের কৌশিকদা, নাঈম, শামীম, লীনা ফেরদৌস, সুলতানা শিরীন সাজি সহ বেশ কয়েকজন ব্লগার উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও শেখ জলিলের স্ত্রীর বড়বোন কবি রেজওয়ানা বুলবুলও এসময় উপস্থিত ছিলেন যাঁর একটি কবিতার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয় ঐ একই দিনে।
.....................................................................................
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সকাল ১০:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


