ষাট শতকের বাংলা সিনেমার গানগুলোর প্রতি আমার আলাদা এক ধরনের দুর্বলতা আছে। মাহমুদুন্নবী, বশির আহমেদ, খন্দকার ফারুক আহমেদ, আব্দুল জাব্বার, সাবিনা ইয়াসমিন প্রমুখ শিল্পীদের গাওয়া সেসময়ের জনপ্রিয় গানগুলো এখনো আমাকে নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত করে।
১৯৯২ সালের এক ঘটনার কথা বলি। এখনকার মতো সেসময় সিডি/ডিভিডির তেমন একটা প্রচলন ছিলোনা। আমরা তখন ক্যাসেট প্লেয়ারেই গান শুনতাম বেশী। কোন এক বৃষ্টির দিনে অফিস থেকে বের হয়ে আমি হাজির হলাম পাটুয়াটুলীর এক গান রেকর্ডিং এর দোকানে। আমার কাছে খুব উন্নতমানের একটা SONY -90 মিনিট এর Blank ক্যাসেট।
আমি দোকানের রেকর্ডিং এর কাজে নিয়োজিত লোকটিকে বললাম- আপনাদের কাছে ষাট শতকের বাংলা সিনেমার গানের যতো রেকর্ড আছে তার একটা তালিকা দেন। আমি সেখান থেকে পছন্দ করে এই ক্যাসেটে কিছু গান রেকর্ড করাবো। লোকটি প্রথমে বুঝতে পারলোনা আমি কি বলছি। পরে আমি যখন আবার তাকে বুঝিয়ে বললাম তখন অবাক বিস্ময়ে সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।
সম্ভবতঃ লোকটি তার সারা জীবনে কখনো দেখেনি যে বাংলা সিনেমার গান কেউ এতো দামী ও উন্নতমানের SONY-৯০ মিনিটের ক্যাসেটে রেকর্ড করাতে চায়। এই দোকান থেকে যারা বাংলা সিনেমার গান রেকর্ড করায় তারা সাধারনত কম দামী Ordinary ৬০ মিনিটের ক্যাসেটেই তা রেকর্ড করায়। তাই আমার দিকে কতোক্ষণ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ করেই সে যেন খুব আনন্দিত হয়ে তীব্র সক্রিয় হয়ে উঠলো ।
সে বারবার আমাকে নিশ্চয়তা দিতে থাকলো, আমার ক্যাসেটটি সে স্পেশাল যত্ন নিয়ে খুব সুন্দরভাবে রেকর্ড করে দেবে। বহুদিন পর বাংলা সিনেমার গানের এমন আগ্রহী এক শ্রোতা পেয়ে সে যেন মহাখুশী।
আমি তাকে গান নির্বাচন করে দেওয়া শুরু করলাম। পুরনো প্রিয় গানগুলো যেন একটাও বাদ না পরে, সে চেষ্টা চালাতে শুরু করলাম। ‘‘ভুলে গেছি সুর ওগো, স্বরলিপি নেই’’ আমার খুব প্রিয় একটা গান। আচ্ছা এই গানটা কি আপনার কাছে আছে? হ্যা, আছে, লোকটি আশ্বস্ত করলো আমাকে। আর ঐ গানটা? ঐ যে, “....সুরের ভুবনে- আমি আজো পথচারী, ক্ষমা করে দিও, যদি না তোমায়, মনের মতো গান শোনাতে পারি... ”। ঐ গানটা কি আছে? জ্বী, ওটাও আছে।
আমি আনন্দে নেচে উঠলাম । কী আশ্চর্য্য, এই দোকানটাতে আমার প্রিয় ষাট-সত্তর দশকের প্রায় সবগুলো সিনেমা গানেরই রেকর্ড অথবা লং-প্লে আছে। এখন শুধু সেসব থেকে বেছে বেছে ক্যাসেটের ফিতায় নিতে পারলেই হলো।...
আমি একের পর এক নির্বাচন করলাম-(১) ভুলে গেছি সুর ওগো স্বরলিপি নেই (২) তুমি কখন এসে দাড়িয়ে আছো, আমার অজান্তে (৩) আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন (৪) তুমি যে আমার কবিতা (৫) কে আমায় আলোর ঠিকানা বলে দেবে.. (৬) মন যদি ভেঙ্গে যায় যাক যাক কিছু বলবোনা..(৭) আমি যে কেবল বলেই চলি (৮) ডোকোনা আমারে তুমি কাছে ডেকোনা (৯) আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল (১০) গীতিময় সেই দিন চিরদিন বুঝি আর রলোনা (১১) ফুলের মালা পড়িয়ে দিলে আমায় আপন হাতে (১২) গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে... (১৩) ওগো মোর মধুমিতা (১৪) প্রেমের নাম বাসনা সে কথা বুঝিনি আগে (১৫) পীচ ঢালা এই পথটারে ভালো বেসেছি (১৬) সুরের ভুবনে আমি আজো পথচারী (১৭) কোথায় তোমায় যেন দেখেছি (১৮) তুমি যদি বলে যেতে (১৯) এই স্বপ্ন ঘেরা দিন রাখবো ধরে (২০) রোদে পুড়ে পীচ গলে এই শহরে...(২১) নেই অভিযোগ কারো কাছে, নেই কোন অভিমান (২২) আমাকে পোড়াতে যদি এতো লাগে ভালো...
এভাবে প্রাথমিক সিলেকশানের পর লোকটিকে আমি আমার প্রিয় আরো কয়েকটি গানের কথা জিজ্ঞেস করলাম। খুব সম্ভবতঃ বিনিময় ছবির একটি গান শুনেছিলাম এরকম-“তুমি কেন বোঝ না যে, কতো কথা মনে জাগে, কেন যে বলতে চেয়েও পারিনা...”। গানটি আমার খুব ভালো লাগে, তাই সেটাও খোঁজ করলাম। কিন্তু লোকটি জানালো গানটি তার সংগ্রহে নেই।
একেবারে ছোট্ট বয়সে আমার জীবনে প্রথম দেখা ছবির নাম ‘আঁকাবাঁকা’। সেই ছবির একটা গান ছিলো- “মুক্তো সে নয়, মাণিক সে নয়, বলছে আমার মন..”। সেই গানটিও পেলাম না সেখানে। কিন্তু যা পেলাম তাওতো কম নয়।...
একমাস পরের কথা । রেকর্ড হয়ে যাবার পর সেই ক্যাসেট তখন আমার কাছে। ঠিক আমার কাছে বললে ভুল হবে। কারণ ক্যাসেটটি তখন আমার বন্ধু বান্ধব আর আত্মীয় স্বজনদের কাছে হাতে হাতে ঘুরছে। সবাই বলে- এমন সুন্দর ক্যাসেটে এতো মানসম্পন্ন রেকর্ডিং-এ পুরনো ছবির গান! এসব গান তুমি পেলে কোথায়?...
আমি আর পুরোটা ভেঙে বলিনা । আমি যে খুঁজে খুঁজে পাটুয়াটুলীর এক দোকানে গিয়ে এসব গান খুঁজে বের করেছি তা’ আর বলিনা। শুধু বলি- “কোথা থেকে পেলাম-তা জানার দরকার নেই, শুধু গানগুলো কেমন লাগলো তা’ বলেন!”
২০০৪ সালঃ চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারে
১২ (বারো) বছর পরের ঘটনা। ২০০৪ সাল। চাকুরীতে একটা প্রমোশন হবার পর আমাকে ঢাকা থেকে বদলী হয়ে যেতে হলো চট্টগ্রামে। আমার সংসার পড়ে রইলো ঢাকায় আর আমি চট্টগ্রামে গিয়ে উঠলাম আমার ছোট এক ভাইয়ের বাসায়। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা দীর্ঘ ট্রেন জার্নি । চট্টগ্রাম থেকে বৃহস্পতিবার রাতের ট্রেনে চড়ে শুক্রবার ভোরে ঢাকায় পৌঁছে যাই, আবার শুক্রবার রাতেই ট্রেনে উঠে শনিবার সকালে পৌছে যাই চট্টগ্রামে।
সে এক আশ্চর্য্য সময় গেছে আমার জীবনে। একের পর এক ট্রেন জার্নির নানা সব অভিজ্ঞতা জমা হতে লাগলো আমার ভান্ডারে। ট্রেন জার্নির দীর্ঘ ছয় ঘন্টা সময় পার করার জন্য এক একদিন এক এক রকমের বিষয় বেছে নিতাম আমি। তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সনি ওয়াকম্যানে গান শোনার বিষয়টাই প্রধান্য পেতো । তখন এমন একটা সময় আমরা অতিক্রম করছি যখন ক্যাসেটে গান শোনার চল প্রায় উঠে যেতে বসেছে আর সে জায়গাটি আস্তে আস্তে দখল করে নিচ্ছে সিডি-ডিভিডি। কিন্তু আমার ওয়াকম্যানটি যেহেতু ক্যাসেট প্লেয়ার তাই আমাকে সিডির বদলে ক্যাসেট কেনার দিকেই মনোনিবেশ করতে হতো তখনো।
প্রায়ই অফিস শেষে আমি চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারে গিয়ে এটা সেটা কিনে সময় কাটাতাম। রাস্তার পাশে দাড়িয়ে নানা অডিও ক্যাসেটও কিনেছি সেখান থেকেই। ঢাকার পাটুয়াটুলী থেকে রেকর্ড করে আনা আমার সেই অনেক শখের বাংলা সিনেমার গানের ক্যাসেটটি তখন আর আমার কাছে নেই। দীর্ঘ বারো বছরের ব্যবধানে কখন যে কীভাবে ক্যাসেটটি হারিয়ে গেছে তা আমি নিজেও সঠিক বলতে পারিনা।...
রিয়াজউদ্দিন বাজারের পাশ থেকে অডিও ক্যাসেট কিনতে গিয়ে আমি আবার খুঁজতে থাকি কোন ক্যাসেটে ষাট-সত্তর দশকের বাংলা সিনেমার গান আছে। খুব বেশী কষ্ট করতে হলোনা।...শেষপর্যন্ত পেয়ে গেলাম। একটি নয়, দুটি নয়, তিন তিনটি ক্যাসেট, যেখানে সেসময়কার বাংলা সিনেমার অসাধারণ সব মেলোডিয়াস গান রয়েছে।... ক্যাসেট তিনটি কেনার সময় ক্যাসেটের পেছনের কাভারে প্রিন্টেড গানের তালিকা দেখেই আমার মনে হয়েছিলো- ক্যাসেটের দু একটি গান যেন আমার কাছে একেবারেই নতুন, আগে কখনো শুনেছি বা কোথাও এ গানের লাইন লেখা দেখেছি বলেও মনে হয়না।..... অথচ এমনটি হবার কথা নয়।... কেননা ছোটবেলায় আমি ছিলাম ঢাকা রেডিওর কমার্শিয়াল সার্ভিস (যা পরে ‘বিজ্ঞাপন তরঙ্গ’ নামে অভিহিত হয়)-এর একজন একনিষ্ঠ শ্রোতা। অতএব ষাট-সত্তর দশকের কোন বাংলা সিনেমার ভালো কোন গান আমার একেবারেই শোনা হয়নি, এটা আমার কাছে রীতিমতো অবিশ্বাস্যই ছিলো। তাই ক্যাসেটগুলো কেনার পর পরই আমার ঝোঁক তৈরী হয়ে গেলো- ‘না শোনা গানগুলো’ আগে শোনার জন্য।
কিন্তু ক্যাসেট তিনটি যেদিন কিনলাম সেদিন বৃহষ্পতিবার। ঢাকায় আসার জন্য রাতের ট্রেনের টিকিট কিনেছি। তাই ট্রেনে চড়ার আগে আর গানগুলো শোনা হলোনা। রাত এগারোটার দিকে ট্রেনে বসে ওয়াকম্যানে ভরলাম সেই ক্যাসেট। ক্যাসেটের ফিতা ফার্ষ্ট ফরোয়ার্ড আর রিওয়াইন্ড করে টেনে নিয়ে গেলাম ঠিক সেখানটাতে- যেখানে আমার না শোনা একটি গান রয়েছে।...
২০০৪ সালঃ রাতের তূর্ণা নিশীথায় সেই এক গানের আবিস্কার
রাতের ছুটে চলা তূর্ণা নিশীথায় তখন দুরন্ত এক গতি। কেন জানি আকাশটা মেঘলা ছিল বিকেল থেকেই। আমি ট্রেনের জানালা গলে একটু বাইরে তাকালাম- বেশ বৃষ্টি পড়ছে বাইরে। বৃষ্টির মধ্যে আকাশের পূর্ণ চাঁদের আলো যেন অপরূপ এক রহস্যের আলো-আঁধার তৈরী করেছে প্রকৃতিতে। কি আশ্চর্য্য এক মাদকতাময় পরিবেশ! কী আশ্চর্য্য এক মাধুরী মন্ডিত রাত!
আমার হাত ওয়াকম্যানের প্লে-বাটন স্পর্শ করল। এক মুহূর্ত মাত্র! তারপর বেজে উঠলো সেই গান-“ তুমি আমায় ভালোবাসো, তাইতো জীবন মধুর হলো, স্বপ্ন আমার তোমায় নিয়ে রঙে রঙে- রঙ ছড়ালো....”। গলা শুনেই বুঝলাম গানটির শিল্পী মাহমুদুন্নবী আর সাবিনা ইয়াসমিন। এরপর রাত যতো বাড়তে লাগলো আমি বারবার ক্যাসেট রিওয়াইন্ড করে সেই এক গানই বারবার শুনতে লাগলাম। কেমন এক আশ্চর্য্য মিষ্টি সুর এই গানের! কেমন এক আশ্চর্য্য মাদকতা জড়িয়ে আছে এ গানের সর্বাঙ্গে! এ গান শুনলে কেমন যেন অদ্ভুত এক ভালোলাগা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র সত্তায় !
কোথায় ছিল এ গান এতোদিন? পুরনো দিনের বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় ডুয়েট গান বলতে আমরা সবাই মাহমুদুন্নবী আর সাবিনা ইয়াসমিন এর গাওয়া “ তুমি যে আমার কবিতা, আমার বাঁশীর রাগিনী ” গানটিকেই জানি। কিন্তু ঐ দুজন শিল্পীর-ই গাওয়া আরেকটি গান যে এতোটা সুন্দর, তা আমরা অনেকেই জানিনা। কেন যে এ গানটি পুরনো দিনের অন্যান্য গানের তুলনায় তেমন পরিচিতি পায়নি, তা আমি ভেবে পেলাম না। তবে কি এ গানটি শুধু আমার কাছেই ভালো লাগলো? আর কারো কাছে কী এ গানটি তেমন সুন্দর বলে প্রতীয়মান হয়নি বা ভবিষ্যতেও হবে না?.....
কী জানি! আমি ভেবে পেলাম না, কেন এ গানটি পুরনো দিনের জনপ্রিয় রোমান্টিক ডুয়েট গানের তালিকায় তেমন জোরালো ভাবে স্থান পায়নি। অবশ্য এরপর যে কয়েক মাস আমি চট্টগ্রাম-এ ছিলাম, সে কয়েকমাস এ গানটি হয়ে উঠলো আমার নিত্য শোনা এক প্রিয় গান। শুধু তাই নয়, আমার ঢাকা-চট্টগ্রাম আর চট্টগ্রাম-ঢাকা ট্রেন জার্নির সময়েও এ গান হয়ে উঠলো আমার সনি ওয়াকম্যানে বেজে চলা নিত্য সুরেলা এক পথ সঙ্গী।....
২০০৬ সালঃ প্রিয় গান যখন পুনঃবন্দী হলো সামিনার কণ্ঠে
কেটে গেছে আরো অনেকগুলো বছর।
আমি চট্টগ্রাম থেকে বদলী হয়ে ঢাকা এসেছি। সেই ক্যাসেট বাক্সবন্দী হয়ে আরো অনেক পুরনো ক্যাসেট-এর সাথে স্থান নিয়েছে আমার বাসার স্টোর রুমে। এখন স্বাভাবিকভাবেই ক্যাসেট আর কেউ শোনে না বলে সেগুলো আর বের করা হয়না।... যা কিছু গান শুনি, কম্পিউটারে সিডি বা ডিভিডি চালিয়েই শুনি।...
খুব সম্ভবতঃ ২০০৬ সালের শেষ দিকের কথা। জানলাম- ওয়ার্ল্ড মিউজিক এর বিশেষ প্রযোজনায় সামিনা চৌধুরীর অডিও গানের এক সিডি বের হবে বাজারে। সিডির শিরোণাম- ‘ সুরে রঙ ’। সেই সিডিতে নাকি সামিনা চৌধুরীর সেরা ১৮ টি গান সংযোজিত হবে। আমি অনেকদিন আগে থেকেই সামিনা চৌধুরীর গানের খুব ভক্ত। তাঁর গাওয়া- “বাঁশী আমার বেজে বেজে হলো সারা- সেতো এলোনা ” গানটি আমাকে বরাবরই ভীষণভাবে বিমোহিত করে।..
তাই সামিনা চৌধুরীর সিডির অপেক্ষায় থাকলাম। বের হলো সিডি। সেই সিডি পেয়ে সবচেয়ে যে বিষয়টি ভালো লাগলো তা হলো সামিনার খুবই জনপ্রিয় গান “কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে...” গানটি সেই সিডিতে রিমেক করা হয়েছে এবং সেখানে সামিনার সাথে লাকী আখন্দের হামিং খুবই চমৎকার হয়েছে।... কিন্তু আমি জানতামনা সেই সিডিতে বিস্ময় আছে আরো।... অবাক হয়ে খেয়াল করলাম সেই সিডিতে সামিনার কন্ঠে রিমেক হয়েছে- মাহমুদুন্নবী ও সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া ষাট শতকের সেই অসাধারণ অথচ কম-পরিচিত গান -“তুমি আমায় ভালোবাসো, তাইতো জীবন মধুর হলো...”।
আমি সামিনার কণ্ঠে গানটি পেয়ে ভীষণ আবেগে আন্দোলিত হলাম। ভীষণ ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করলাম- যা ভালো, যা সুন্দর- তা চিরকালই ভালো...। তা চিরকাল সবার কাছেই ভালো....। তাই যে গানটি নিয়ে আমি কিছুটা দ্বিধান্বিত ছিলাম- যে গানটি নিয়ে ভাবছিলাম- তা শুধু আমার কাছেই ভালো লেগেছে কীনা- আসলে দেখলাম, সেই ভাবনার কোন প্রকৃত যৌক্তিকতা নেই। আসলে আমার পছন্দ কখনোই কোনকালে এতোটা খারাপ ছিলোনা...। যে গানটি আমার কাছে এতো ভালো লেগেছিলো, সেই গানটি আসলে সবার কাছেই ভালো লাগার মতো এক গান। সে গানের আবেদন নিশ্চয়ই শাশ্বতঃ.... নিশ্চয়ই চিরন্তন! তা’ না হলে সামিনা চৌধুরীই বা এতো কম পরিচিত এ গানটি রিমেক করতে যাবেন কেন?
২০০৯ সালঃ সেই গান যখন ব্লগার সহেলীর পোস্টে
আমার এ লেখার শেষ প্রান্তে এসে বলবো ২০০৯ সালের এপ্রিল মাসের কথা। বলবো সামহয়্যার ইন ব্লগের ব্লগার সহেলীর কথা। বলবো তার পোস্ট করা ‘প্রিয়-গান বিষয়ক’ একটি পোস্টের কথা....।
অনেকেই জানেন সামহয়্যারইন ব্লগে আমার বিচরণ খুব একটা নিয়মিত নয়। অনেকদিন পর পর আমি হঠাৎ করেই এখানে আসি।.... সেভাবেই সেদিন অনেকদিন পর সামহয়্যারে এসেছি। পরিচিত ভক্ত ব্লগারদের ব্লগগুলো বিচরণ করতে গিয়ে হঠাৎ করেই সহেলীর ব্লগে ঢুকে লক্ষ্য করলাম সামিনা চৌধুরীর গাওয়া সেই রিমেক গানটি নিয়েই সহেলী একটি লেখা পোস্ট করেছেন। পোষ্টের শিরোনাম-
তুমি আমায় ভালবাসো...(সামিনা চৌধুরী)
সহেলী সম্ভবতঃ জানেন না যে সামিনার কণ্ঠের গানটি মূল গান নয়- মূল গানটি গেয়েছিলেন মাহমুদুন্নবী ও সাবিনা ইয়াসমিন সেই ষাট শতকের আমলে ‘আগন্তুক’ ছবিতে। সম্ভবতঃ না জানার কারণেই তাঁর পোস্টে তিনি বা তার পোস্টের মন্তব্যে অন্য ব্লগাররা কেউ মূল গানটির কথা উল্লেখ করেননি।..
যাই হোক, সহেলীর এই লেখা আবার আমাকে মনে করিয়ে দিলো- যা ভালো, যা সুন্দর- তা চিরকালই ভালো...। তা চিরকাল সবার কাছেই ভালো....। একারণেই আমার সেই চট্টগ্রামের নানা স্মৃতি বিজড়িত এ গানটি এতো বছর পর আরো একজনের প্রিয় হয়ে উঠলো....। আরো একজন ভাবতে পারলো....এ গানটি নিয়ে পোস্ট দেয়া যায়...।
একেই বোধহয় বলে অনুভব আর অনুভূতির মিল। একেই বোধহয় বলে এক সমান্তরালে বয়ে চলা। ... লক্ষ্য করলাম এই গান বিষয়ে সহেলীর পোস্ট পড়ার পর অনেক ব্লগারই সহেলীকে এ গানটির লিঙ্ক দিতে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু সহেলী তা’ দিতে পারেননি। এমনকি মৃণ্ময় আহমেদ- যিনি সহেলীর বিভিন্ন লেখায় গানের লিঙ্ক দিয়ে সহায়তা করেন তিনিও এ গানের কোন লিঙ্ক খুঁজে পাননি।.....
২০০৯ সালঃ সেই গান যেভাবে ইন্টারনেটের ই-স্নিপ্সে
প্রিয় গানটির লিংক ইন্টারনেটের কোথাও নেই-এই বিষয়টা আমাকে কিছুটা ভাবিয়েই তুললো। সহেলীর লেখার মন্তব্যে একজন ব্লগার সাজেস্ট করেছিলো ই-স্নিপ্স ডট কমে গানটি আপলোড করতে...। আমি সামহয়্যারের ব্লগারদের জন্য শেষপর্যন্ত সেখানেই গানটি আপলোড করার সিদ্ধান্ত নিলাম।.... ভাবলাম- শুধু সামিনার কন্ঠে গাওয়া রিমেক গানটিই নয়- আমি সাবিনা ইয়াসমিন আর মাহমুদুন্নবীর গাওয়া অরিজিনাল গানটিও আপলোড করবো সেখানে।... কিন্তু কোথায় সেই অরিজিন্যাল গান? কোথায় সেই জরাজীর্ণ ক্যাসেট? ... টানা দুদিন চেষ্টার পর স্টোর রূমের এক বাক্স থেকে খুঁজে পেলাম সেই অডিও ক্যাসেট।... খুঁজে পেলাম সেই গান- “তুমি আমায় ভালোবাসো, তাইতো জীবন মধুর হলো...”।
মাত্র কয়েকমাস হলো এডোব অডিশন দিয়ে সাউন্ড এডিটিং এর কাজ শিখেছি। তাই একটি স্টেরিও ওয়াকম্যান দিয়ে সেই ক্যাসেট থেকে সেই গানের আউটপুট নিয়ে এলাম এডোব অডিশন এর এডিটিং প্যানেলে।... ক্যাসেটের সেই গান প্রথমে WAV ফরম্যাটে, তারপর পুরনো দিনের রেকর্ডের ‘হিস’ আওয়াজ কমানোর জন্য কিছুটা এডিটিং সম্পন্ন করার পর MP3 ফরম্যাটে রেকর্ড করলাম কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে....।
পরের দিনের সকাল। অনেকদিন পর ঢাকার আকাশে বৃষ্টি নেমেছে । আমার খুব ভালো লাগছে সকালের স্নিগ্ধ প্রকৃতির মাঝে এমন বৃষ্টি...। আহা! কতোকাল এমন বৃষ্টি দেখিনা। কতোকাল এমন বৃষ্টি ভেজা মাটির গন্ধ শুনিনা!.....
সকালে নেটের স্পীড ভালো থাকে। ই-স্নিপ্সে ঢুকে একাউন্ট খুলে ফেললাম। গান দুটো আপলোড করার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। কিন্তু তার আগেই বিদ্যুত চলে গেল। খুব বিরক্ত লাগলো। এমন একটি সময়ে বাধা পড়লো!
কেটে গেলো আরো কয়েকদিন। শেষপর্যন্ত বেশ কয়েকদিনের ব্যবধানে আপলোড করলাম গান দুটি। চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারের পাশ থেকে কেনা অডিও ক্যাসেটের সাবিনা ইয়াসমিন আর মাহমুদুন্নবীর কন্ঠে গাওয়া আগন্তুক ছবির সেই গান শেষপর্যন্ত MP3 ফরম্যাটে আপলোড হলো ইন্টারনেটের ই-স্নিপ্সে। একই সাথে সামিনার গলায় গাওয়া রিমেকটিও পাওয়া যাবে সেখানেই। গানদুটির লিংক দিলাম এখানে-
তুমি আমায় ভালোবাসো, তাইতো জীবন মধুর হলো..
যে অনুভব ভালোলাগার, যে অনুভব চিরকালের....
আমাদের ভালো লাগা গানটি সবার কাছেই ভালো লাগবে- এমন কোন কথা নেই.....। তবে কারো কারো কাছে নিশ্চয়ই আমাদের মতোই ভালো লাগবে। যেভাবে ভালো লেগেছে সহেলীর কাছে, যেভাবে ভালো লেগেছে সামিনা চৌধুরীর কাছে (ভালো না লাগলে তিনি নিশ্চয়ই এটা তাঁর কণ্ঠে পুনঃ রেকর্ড করার সিদ্ধান্ত নিতেন না...), সেভাবেই এ গান নিশ্চয়ই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা কোন না কোন বাঙালীর কাছে নিশ্চয়ই ভালো লাগবে একদিন...অনন্তর....।
যা ভালো, তা বোধহয় চিরকালের জন্যই ভালো ।
তা নিশ্চয়ই চিরকাল এগিয়ে যায়-
এক ভালো লাগা অনুভব থেকে আরেক ভালো লাগা অনুভবের
স্পর্শকাতর দরোজায়.....।
.....................................................................................
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মে, ২০০৯ রাত ৯:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


