আনফর আলীর বয়স সেঞ্চুরির দিকে ছুটতে ছুটতে নার্ভাস নাইনটিনে উপনীত। কিন্তু শারিরিকভাবে এখনও যথেষ্ট সক্ষম। সেই বাষট্টি সালে অবসরে গেছেন। তারো ছয় বছর আগে হয়েছেন বিপত্নীক। অনেকের পরামর্শ সত্বেও দ্বিতীয় বিয়েটা করার আগ্রহ হয়নি। অবসর পরবর্তী সময়টা ভালই কাটছিল দুই মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে।
দিন কাল আর বছরের আবর্তনের সাথে সাথে আনফর আলীর একাকীত্ব বাড়তে থাকে। মেয়েদের বিয়ে হয়। ছেলে ব্যবসা নিয়ে হয় ঢাকাবাসী। একাকিত্ব কাটাতে প্রথম প্রথম তিনি বইয়ের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাক এই বন্ধু সময় কাটানোর অনুষঙ্গ হলেও নি:সঙ্গতা তাঁকে ছাড়েনি। এসময় তিনি ভাবেন একটা বিয়ে করলে কেমন হয়! যেই ভাবা সেই কাজ। খবর দেন ঘটককে_
- স্যার! এই বয়সে বিয়ে করলে তো মেয়েকে কিছু জমি-জমা লিখে দিতে হবে।
- এইটা কোন ব্যাপার না! তুমি মিয়া দেখ, কাউকে রাজি করাতে পার কিনা! মনে মনে ভাবেন বিয়ের সাথে জমির সম্পর্কটা কীসের?
মাত্রই পাঁচ দিনের মধ্যেই ষাটোর্ধ্ব এক বিধবার সাথে নতুন সংসার শুরু করেন আনফর আলী। এতে সন্তানরা বেশ খুশিই হয়।
কিন্তু বিধি বাম! ছয় মাসের মধ্যে আনফর আলীর ঘরের নানা মূল্যবান জিনিস পত্রের সাথে টাকা পয়সার হিসাবে শুরু হয় গরমিল।
এক রাতে_ আনফর আলী শুনতে পান তাঁর স্ত্রী কাজের লোকের সাথে আলাপ করছে-
- দেখ! আমার কোন সন্তান হইবনা।উনি মরলে আমারে কেউ এই বাড়িতে জায়গাও দিতনা। তাই আমি যা পারি এহনই জমাই!
পরদিন সকালে আনফর আলী তালাকনামা লিখেন। পাঁচ কাটা জমি, এক লাখ টাকার দেনমোহরসহ আনফর আলীর ঘর ত্যাগ করেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী।
এবার তিনি মনস্থির করলেন ছেলের কাছে ঢাকায় চলে যাবেন। এ কথায় নাতী-নাত্নীরা বেশ উৎফুল্ল হলেও ছেলে ও বউ- মা’র মুখ দেখে আনফর আলীর উৎসাহ কিছুটা কমে আসে। তবুও ঈদেও ছুটির পর নাতিদের তীব্র আবদারে তিনি ঢাকা যেতে রাজী হলেন। ঘর-দরজায় তালা ঝুলিয়ে তিনি ঢাকার পথ ধরলেন।
ঢাকায় এসে তো তিনি অবাক! সবকিছুই নতুন লাগছে। অচেনা হয়ে যাচ্ছে চেনা নামের সব পথ! কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে নিজের কেনা আরামবাগের বাসার রাস্তাটাও ভুলে গেছেন। মাত্র বাইশটি বছর আগেও এই অঞ্চলের সবাই চিনতো আনফর আলীকে। এখন কেউ তাঁকে চেয়েও দেখছেনা। প্রতিটা মূহুর্ত তিনি আশ্চর্য হচ্ছেন এবং অনাহুত ভাবছেন নিজেকে, এই শহরে। কোথাও কোন প্রাণ নেই; আছে চিৎকার-জটলা-ব্যস্ততা। পুরনো দিনের ক্লাবগুলোও উধাও। খেলার মাঠ উধাও। গতির আঘাতে উধাও হয়ে গেছে মানুষের আবেগ! যে শিশুদেও সাথে তিনি এখনো খেলতে ভালবাসেন; সেই শিশুদের তো দেখাই যায়না স্কুলের সময় ছাড়া। ঢাকাকে তাঁর কাছে এক প্রেত-পুরীর মত লাগছে ...
ঢাকা পদার্পনের তৃতীয় দিন: ছোট্ট নাতনীর সাথে কথোপকথন-
- দাদু তুমি তো এই মাত্র স্কুল থেকে এসেছো, চলো খাবার-দাবার শেষে আমরা একটু গল্প করি।
- দাদা! গল্প এখন শুনা যাবেনা। ছুটির দিনে শুনব।
- কেন দাদু?
- আমি এখনই কোচিংয়ে যাব। কোচিংয়ে আজ ইংলিশ ক্লাস।
- তুমি তো ক্লাস টু’তে পড় এখনই কোচিং করা লাগে! তোমাদের কী মন-মনন গড়ে ওঠতে হবেনা!
নাতনীর আর জবাব দেয়া হয়না-
- বাবা, আপনাদের সেই লাফাঙ্গা যুগ আর নেই যে, টইটই কইরা ঘুরতে ঘুরতে বাইশ বছরে তিনবারে মেট্রিক পাশ। এর পর একটা চাকরী। এখন বিশাল প্রতিযোগীতা! সারভাইব করার জন্য এখন শুধু কোচিং না স্যারদের বাসায়্ও যেতে হয়। ছেলের বউয়ের কণ্ঠে স্পষ্ট ঝাঁঝালো শ্লেষ।
- ওহ তাই! আমার বয়স হইছে এইসব তো এখন আমার বুঝার কথা না!
- জ্বী বাবা! এদের সাথে গল্প-গুজব করে সময় নষ্ট করা যাবেনা। কারণ, গল্পের মজা একবার পাইলে পড়াশুনা লাটে উঠবে।
আনফর আলী কিছু একটা বলতে চেয়েও থেমে যান। ভাবেন সময়ের ভাষা বোঝার ক্ষমতা এখন অনেকটাই তাঁর কমে এসেছে। কিন্তু মনে মনে সারভাইব, প্রতিযোগিতা, লাফাঙ্গা শব্দ কয়টা বার বার উচ্চারণ করতে থাকেন। ‘তিনবারে মেট্রিক’ কথাটা মনের কোনায় একটা তীব্র হাহাকার সৃষ্টি করে আনফর আলীর। এইট পাশ বউ তাকে অপমান করল। কষ্টটা তিনি চেপে যান সময়ের হাওয়া বলে। ঢাকায় নিজের আগামী দেখে ফেলেন বউয়ের বক্তব্যে।
বিকালে ছেলে বাসায় আসলে প্রস্থানের কথা বলার একটা ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ছেলে বলে- “বাবা তোমার নাতিরা তোমাকে নিয়ে স্কুলে যেতে চায়! তো তুমি যদি ওদের সাথে স্কুলে যাও তাইলে তোমার সময়টা ভাল কাটবে। ঘরে বসে বসে তো তুমি হাপিয়ে উঠবে। স্কুলে এমন আরো অনেকেই আসে তাদেও সাথে তোমার গল্প-গুজব ভালই জমবে।
- তাইলে তো ভালই হইল রে! বাসায় বসে বসে আর ভাল লাগছিলনা। একটু বাইরে যাইতে পারলে মন্দ হয়না!
বাইরে যেতে পারবেন ভেবে আনফর আলী দুপুরের ভাবনাটাকে একটু দুরে সরিয়ে দেন।
এর পরদিন তিনি নাতিদেও সাথে স্কুলে যান। নানা ধরনের মানুষ নানা আলাপ। তিনি শুধু শুনেন। তবে একটা শব্দ তাঁর কানে বাজে। শব্দটা ‘ফেইসবুক’। এটা তিনি আরও শুনছেন। তবে এটা কার লেখা, ইংরেজি না বাংলা বই, এটা তিনি এখনো জানেন না। তবে তাঁর ধারণা এটা একটা পপুলার বইই হবে। পড়তেও ভাল লাগবে। এই ভেবে তিনি সিদ্ধান্ত নেন একদিন ‘বাংলা বাজারে’ গিয়ে বইটা কিনবেন। তার আগে ছেলেকে জিজ্ঞাস করা যেতে পারে! কিন্তু নাতিকে বাসায় নিয়ে এসে দেখেন খাবার সহ মেঝ নাতনীও রেডি কোচিংয়ে যেতে। ভুলে যান ‘ফেইসবুক’ বিষয়ক ভাবনা।
রাতে বাসায়ও তিনি ফেইসবুক’র আলোচনা শুনেন। তখনই তিনি ছেলের কাছে জানতে চান-
- কীরে ‘ফেইসবুক’ বইটা কার লেখা রে! বইটা কী খুব পপুলার হইছে নাকি?
দাদার এই কথা শুনে নাতিরা হাসতে হাসতে শেষ! এর পর তিনি যখন বুঝলেন তখন শুধু বললেন ‘অ’!
এবার তিনি বুঝলেন কেন বড় নাতি পুলা আর বউয়ের সময় নাই! নেশার মত এদেরকে ফেসবুক নামক জিনিসটা আচ্ছন্ন করে রেখেছে। ভাবলেন ছোটরা তো আর ‘ফেইসবুক’ চালায় না। এদের সাথে হয়তো ছুটির দিনটা ভাল কাটানো যাবে!
কিন্তু আনফর আলীর কপালটাই খারাপ! ছোট দুই নাতিও মাশাল্লাহ্! কম্পিউটার নামক এক যন্ত্রের সামনে মূর্তির মতই বসে থাকে ছুটির দিনে। নাওয়া খাওয়া সব ভুলে যায়। চারপাশে দেখার বা খেয়াল করার কোন সুযোগই তাদের নেই। এ এক অদ্ভুত জেনারেশন! অথচ এই সেদিনও ওরা রূপকথার গল্প শুনতো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে। প্রতিটা ছুটিতে আনফর আলীর একমাত্র কাজ ছিল নাতিদেরকে গল্প শুনানো কিন্তু আজ! সব কেড়ে নিল এই যন্ত্র! একবার আনফর আলী ভাবেন সব ভেঙ্গে ফেলবেন। কী প্রয়োজন এই যন্ত্রের যে যন্ত্র সব আবেগ, ভালবাসা, কৌতুহল আর রোমাঞ্চ কেড়ে নেয়। পরক্ষণেই ঘোরটা কেটে যায়- ভাবেন সময় এখন বড্ড অসময়!
এই আধমাস সময়ে তিনি আক্ষরিক অর্থেই কাউকে একান্ত আপন করে কাছে পাননি। না পুত্র না বউ না নাতি-নাত্নী। স্কুলে আনা নেওয়ার সময়ই ভরসা নাতীদের সাথে কথা বলার। আর খাবারের সময় ভরসা বড় নাতি ছেলে আর ছেলের বউ। সবাই ব্যস্ত কেউ গেম, কেউ ফেইসবুক, কেউ বা টিভির সামনে সিরিয়াল গেলায়।
এই যখন অবস্থা! আনফর আলী গ্রামে ফেরার কথা ভাবতে ভাততে দুপুরের খাবার শেষ করেন। এমন সময় সেভেন পড়–য়া নাতি বলে উঠলো-
- দাদা, আজ আমরা ‘দাঁড়িয়াবান্ধা’ খেলব। তুমি দেখবা?
- কেন নয়? অবশ্যই দেখব। তিনি কিছুটা আশাবাদী হয়ে ওঠেন। এরা তাইলে খেলা-ধুলাও করে! আমি কী তাহলে ওদেও ভুল বুঝতেছি! যাক খেলা-ধুলা করলে তো ওদের সাথে মাঠে গিয়ে সময়টা ভালই কাটবে।
- তো চল দাদা! আজকে কোচিং নাই। আজ খেলা হবে। প্রথমে ‘দাঁড়িয়াবান্ধা’ পরে ‘গোল্লাছুট’।
- এই দুপুর রোদে খেলা! বিষ্ময় তাঁর চোখে।
- নাতি হাসতে হাসতে বলে আরে আসো তো! রোদ কই পাইছো? ঐ রুমে আস।
আনফর আলী নাতির রুমে গিয়ে যা দেখলেন- এর জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। নাতি কম্পিউটারে ‘দাঁড়িয়াবান্ধা’ ও ‘গোল্লাছুট’ গেমের সিডি দিয়ে গেম খেলছে।
রাতে আনফর আলী ছেলে ও ছেলের বউকে বললেন-
- হাসান, আমি এখানে থাকতে পারবনা। হাপিয়ে উঠছি। আগামী কালই গ্রামে যাচ্ছি। ব্যবস্থা কর।
- বল কী! বাবা? বাজারের লোকের চুরির জালায় অতিষ্ট হয়ে যাচ্ছিলাম। তুমি আসায় ঐডারে বিদায় দিলাম। ভাবলাম কাল তোমাকে বাজারটা চেনাব। আর তুমি বলতাছো চলে যাবে! ছেলের বউয়ের চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি।
আনফর আলী তড়িতাহতের মত একটু কাঁকিয়ে ওঠেন...... পরক্ষণেই সামলে নেন। বলেন-
-হ্যাঁ, ঠিকই বলছিসরে; বাজার করার লোক হিসেবে আমি খুবই বিশ্বস্ত...
দূরে কোথাও শুনা যায়-
পৃথিবী বদলে গেছে ....... যা দেখি অবাক লাগে ...........
ছবি: গুগল
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ডিসেম্বর, ২০১১ রাত ১১:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



