somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পড়ো, তোমার সন্দেহ'র নামে

০৫ ই মে, ২০০৮ দুপুর ১:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে
পরে তাকেই মনে হয় ১ তলা প্রাচীন দালান
তাই রোজ মধ্যরাতে যাও ওই দালানের ভেতর
কিছু একটা প্রাপ্তির আশায়; অথচ-
প্রাচীন ঘরগুলোতেই সম্ভাবনা বেশি সাপখোপ থাকার।
-আগুনের ওম/ খ

সন্দেহ অমূলক নয়। কে না জানে সৃষ্টিশীল মানুষ মাত্রই সন্দেহপ্রবণ! কেননা সন্দেহের সঙ্গে দর্শনের যোগ আছে। প্রশ্ন বা সন্দেহ না করলে মনে দর্শন জাগবে কী করে? প্রশ্নকেই সুযোগ দেয়া উচিত, কেবল প্রশ্নটি একরৈখিক। উত্তর- সে তো পাত্রভেদে এক এক রকম! ফলে রহুরৈখিকতার পরিচয়ে 'উত্তর' নিজেই একটি সন্দেহজনক প্রশ্ন নয় কি?

আহারে, আবার সন্দেহ!

২.
ফেরদৌসের কবিতা পাঠের পর, অকস্মাৎ, নিজের প্রতি সন্দেহ আরও তীব্র হয় এই ভেবে (যেহেতু সন্দেহ ছিল বরাবরই), পাঠক হিসেবে নিজের রুচিকে আজও কি তবে সনাতন রুচি থেকে আলাদা করতে পারিনি? নইলে এমন বাধো বাধো ঠ্যাকে কেন?
বাস থেকে নামার সময় জোনাকি আলোর ধাক্কা খেয়ে ঢুকলাম
মহিলা ডাক্তারের ভ্যানিটিব্যাগে। হাজারবার হলাম নদীর মতো
অসুস্থ অথবা স্বাস্থ্যবান; হৃদয়ে জন্ম নিলো চটপটে আগুন, মৃত্যু হলো
মনে বাঘের। আমরা খুব ভোরে জাগালাম নিজেদের সাহসী গাছ নামে
ডেকে ঘুম থেকে।
- ঘুড়ির মতো রঙিন চিল/ ৩
না-কি আমার আপন রুচির সীমানার কাছাকাছি পৌঁছোতে পারেনি বলেই কখনও কখনও তার কিছু কবিতা অমূলক ঠেকেছে, মনে হয়েছে 'নির্মাণ'? আবার ফূর্তি লাগে, কৌতূহলী হয়ে উঠি, যখন একাত্ম হয়ে যাই তারই রচিত কোনও পংক্তির চমৎকারিত্বে- 'পুরনো কবরে শুয়ে রয় আমাদের হারানো টর্চলাইট।/ আমরা মেঘের জগতে ধানগাছ কাটতে কাটতে করি উপভোগ মেঠোইঁদুরের ছদ্মবেশ' (হেমন্তের চিত্রনাট্য); কিংবা, 'পৌষের গিটার একা শুয়েছিল বনে।/ কাছে বনঘুঘু গাইছিল দুপুরের গান; গিটারটা নিজেই দাঁড়িয়ে গেল/ হঠাৎ শূন্যের উপর; আমরা গুঁড়ো হয়ে ঝরে গেলাম বালি দিয়ে বানানো/ সামুদ্রিক খেলাঘরের মতো' (প্রেম মানে ভুত) ইত্যাদি।
ফেরদৌস মাহমুদের কবিতার একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে তার শৈশব। শৈশবের স্মৃতিকাতরতা এবং তার পাশাপাশি 'আমিময় আমি' ও 'আমিহীন আমি'র উপস্থিতিও দুর্লক্ষ্য নয়। কবিতা থেকে কবিতায় জগত ও মানুষ সম্পর্কে দ্বিধা, প্রশ্ন, অবিশ্বাস আর এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাবের যত্রতত্র প্রকাশ দেখতে পাই; কিটস্ যাকে 'নেগেটিভ ক্যাপাবিলিটি' বলেছেন। জগত ও মানুষ সম্পর্কে কখনও তার অনিচ্ছুক-উদাসীনতা কবিতার ব্যক্তিত্বকে করেছে সৌন্দর্যমণ্ডিত। কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক-
তোমার হত্যাকারীরা দেখো চেঁচাচ্ছে কীভাবে
ফুল হাতে ঘাস ভর্তি প্লাস্টিকের লাল চেয়ারে বসে।
তুমি তাদের সব্জির সুপ, মাখন, গোশত ও মদ খাওয়াতে
চাইলেওফুল খাইয়ে তারা তোমাকে ঠিকই পাঠাবে
ভিখারীর থালা থেকে পয়সা চুরি করতে।
-চাকুরিরত বাদ্যযন্ত্র

কবরের ভেতর থেকে শিয়ালের সাথে বেরিয়ে আসছে
পুলিশ আর চন্দ্রজ্যোৎস্না একত্রে পাশাপাশি।
অথচ, আজ আমাদের পথ হাঁটা নিষিদ্ধ। পৃথিবীর মানচিত্রে
চুল উড়িয়ে দিয়ে সাপের মৈথুন ভঙ্গের মতো সূর্যকে
ডাকা নিষেধ।
-জোড়া চোখের প্রতিকৃতি

একা থাকার আনন্দ ও বেদনা পাওয়ার জন্য
একটি নির্জন রাষ্ট্র খুঁজে পেয়েছি;
...
তুমি বিদায়ের ট্রেনে উঠে যাও,
মিথ্যা আনন্দের শ্লোক
আকাশে ভাসানোর প্রয়োজন নাই।
- প্রেম, ডাকঘর ও স্বপ্ন

কবিতা পাঠ একটি বৈচিত্রময় অভিজ্ঞতা। কবিতার পাঠককে সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, কখনো থামতে হয়, নামতে হয়, অবগাহন করতে হয়, নিজের লালিত ধারণাকে নস্যাৎ করে দাঁড়াতে হয় অন্যতর ধারণার মুখোমুখি। ফেরদৌসের কবিতা পাঠ আমার এক নান্দনিক অভিজ্ঞতা। 'সাতশো ট্রেন এক যাত্রী' কাব্যগ্রন্থ থেকে 'টমাস মানের একটি গল্প পড়ে' কবিতার সম্পূর্ণ অংশ তুলে ধরছি-

বাতাসে সবকিছু নিশ্চয় থেকে যায়, তা-না হলে
আমাদের অনুপস্থিতিতে আমাদের নিয়ে
কথা হয় কীভাবে?
মৃত্যুর পর
নিশ্চয় জেনে ফেলে মানুষ
জীবিতদের সমস্ত গোপনীয়তা।
গতজন্মে আমি কোকিলের ডিম হয়ে কাকের ঘরে জন্মেছিলাম,
আজ মানুষ হয়ে কাক শিকারের বিরুদ্ধে বলছি কথা, আমাকে
সবাই জানে
কোকিলের মতো কবি বলেই।

দায়িত্ব নিয়েই লিখছি, ফেরদৌস মাহমুদ আমাদের সময়ের একজন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি। এ কথায় যদি কারো সন্দেহ থাকে, তবে আমি তার সন্দেহকে স্বাগত জানাই। তাকে বলতে চাই, প্লিজ পড়–ন, এবং তা আপনার সন্দেহের নামে। আর যদি নিঃসন্দেহ হোন- তবুও আহ্বান রইলো 'সাতশো ট্রেন এক যাত্রী' পাঠের।

বি.দ্র: এই লেখাটি আমজাদ সুজন সম্পাদিত ছোটকাগজ 'উল্লেখ' ৩য় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।
১৪টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ক্লাস ফাকি দিয়ে তারা আড্ডা মারছে। এই দিকে পিতা মাতা হয়তো মনে করবে যে আমার মেয়ে ক্লাস করতে গিয়েছে।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:২৫



ক্লাস ফাকি দিয়ে তারা আড্ডা মারছে। এই দিকে পিতা মাতা হয়তো মনে করবে যে আমার মেয়ে ক্লাস করতে গিয়েছে। এই স্থানটি খুবই নিরিবিলি। দেশের আইন-শৃঙ্খলার অবস্থা খুবই খারাপ। এমন ফাকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×