যার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে
পরে তাকেই মনে হয় ১ তলা প্রাচীন দালান
তাই রোজ মধ্যরাতে যাও ওই দালানের ভেতর
কিছু একটা প্রাপ্তির আশায়; অথচ-
প্রাচীন ঘরগুলোতেই সম্ভাবনা বেশি সাপখোপ থাকার।
-আগুনের ওম/ খ
সন্দেহ অমূলক নয়। কে না জানে সৃষ্টিশীল মানুষ মাত্রই সন্দেহপ্রবণ! কেননা সন্দেহের সঙ্গে দর্শনের যোগ আছে। প্রশ্ন বা সন্দেহ না করলে মনে দর্শন জাগবে কী করে? প্রশ্নকেই সুযোগ দেয়া উচিত, কেবল প্রশ্নটি একরৈখিক। উত্তর- সে তো পাত্রভেদে এক এক রকম! ফলে রহুরৈখিকতার পরিচয়ে 'উত্তর' নিজেই একটি সন্দেহজনক প্রশ্ন নয় কি?
আহারে, আবার সন্দেহ!
২.
ফেরদৌসের কবিতা পাঠের পর, অকস্মাৎ, নিজের প্রতি সন্দেহ আরও তীব্র হয় এই ভেবে (যেহেতু সন্দেহ ছিল বরাবরই), পাঠক হিসেবে নিজের রুচিকে আজও কি তবে সনাতন রুচি থেকে আলাদা করতে পারিনি? নইলে এমন বাধো বাধো ঠ্যাকে কেন?
বাস থেকে নামার সময় জোনাকি আলোর ধাক্কা খেয়ে ঢুকলাম
মহিলা ডাক্তারের ভ্যানিটিব্যাগে। হাজারবার হলাম নদীর মতো
অসুস্থ অথবা স্বাস্থ্যবান; হৃদয়ে জন্ম নিলো চটপটে আগুন, মৃত্যু হলো
মনে বাঘের। আমরা খুব ভোরে জাগালাম নিজেদের সাহসী গাছ নামে
ডেকে ঘুম থেকে।
- ঘুড়ির মতো রঙিন চিল/ ৩
না-কি আমার আপন রুচির সীমানার কাছাকাছি পৌঁছোতে পারেনি বলেই কখনও কখনও তার কিছু কবিতা অমূলক ঠেকেছে, মনে হয়েছে 'নির্মাণ'? আবার ফূর্তি লাগে, কৌতূহলী হয়ে উঠি, যখন একাত্ম হয়ে যাই তারই রচিত কোনও পংক্তির চমৎকারিত্বে- 'পুরনো কবরে শুয়ে রয় আমাদের হারানো টর্চলাইট।/ আমরা মেঘের জগতে ধানগাছ কাটতে কাটতে করি উপভোগ মেঠোইঁদুরের ছদ্মবেশ' (হেমন্তের চিত্রনাট্য); কিংবা, 'পৌষের গিটার একা শুয়েছিল বনে।/ কাছে বনঘুঘু গাইছিল দুপুরের গান; গিটারটা নিজেই দাঁড়িয়ে গেল/ হঠাৎ শূন্যের উপর; আমরা গুঁড়ো হয়ে ঝরে গেলাম বালি দিয়ে বানানো/ সামুদ্রিক খেলাঘরের মতো' (প্রেম মানে ভুত) ইত্যাদি।
ফেরদৌস মাহমুদের কবিতার একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে তার শৈশব। শৈশবের স্মৃতিকাতরতা এবং তার পাশাপাশি 'আমিময় আমি' ও 'আমিহীন আমি'র উপস্থিতিও দুর্লক্ষ্য নয়। কবিতা থেকে কবিতায় জগত ও মানুষ সম্পর্কে দ্বিধা, প্রশ্ন, অবিশ্বাস আর এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাবের যত্রতত্র প্রকাশ দেখতে পাই; কিটস্ যাকে 'নেগেটিভ ক্যাপাবিলিটি' বলেছেন। জগত ও মানুষ সম্পর্কে কখনও তার অনিচ্ছুক-উদাসীনতা কবিতার ব্যক্তিত্বকে করেছে সৌন্দর্যমণ্ডিত। কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক-
তোমার হত্যাকারীরা দেখো চেঁচাচ্ছে কীভাবে
ফুল হাতে ঘাস ভর্তি প্লাস্টিকের লাল চেয়ারে বসে।
তুমি তাদের সব্জির সুপ, মাখন, গোশত ও মদ খাওয়াতে
চাইলেওফুল খাইয়ে তারা তোমাকে ঠিকই পাঠাবে
ভিখারীর থালা থেকে পয়সা চুরি করতে।
-চাকুরিরত বাদ্যযন্ত্র
কবরের ভেতর থেকে শিয়ালের সাথে বেরিয়ে আসছে
পুলিশ আর চন্দ্রজ্যোৎস্না একত্রে পাশাপাশি।
অথচ, আজ আমাদের পথ হাঁটা নিষিদ্ধ। পৃথিবীর মানচিত্রে
চুল উড়িয়ে দিয়ে সাপের মৈথুন ভঙ্গের মতো সূর্যকে
ডাকা নিষেধ।
-জোড়া চোখের প্রতিকৃতি
একা থাকার আনন্দ ও বেদনা পাওয়ার জন্য
একটি নির্জন রাষ্ট্র খুঁজে পেয়েছি;
...
তুমি বিদায়ের ট্রেনে উঠে যাও,
মিথ্যা আনন্দের শ্লোক
আকাশে ভাসানোর প্রয়োজন নাই।
- প্রেম, ডাকঘর ও স্বপ্ন
কবিতা পাঠ একটি বৈচিত্রময় অভিজ্ঞতা। কবিতার পাঠককে সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, কখনো থামতে হয়, নামতে হয়, অবগাহন করতে হয়, নিজের লালিত ধারণাকে নস্যাৎ করে দাঁড়াতে হয় অন্যতর ধারণার মুখোমুখি। ফেরদৌসের কবিতা পাঠ আমার এক নান্দনিক অভিজ্ঞতা। 'সাতশো ট্রেন এক যাত্রী' কাব্যগ্রন্থ থেকে 'টমাস মানের একটি গল্প পড়ে' কবিতার সম্পূর্ণ অংশ তুলে ধরছি-
বাতাসে সবকিছু নিশ্চয় থেকে যায়, তা-না হলে
আমাদের অনুপস্থিতিতে আমাদের নিয়ে
কথা হয় কীভাবে?
মৃত্যুর পর
নিশ্চয় জেনে ফেলে মানুষ
জীবিতদের সমস্ত গোপনীয়তা।
গতজন্মে আমি কোকিলের ডিম হয়ে কাকের ঘরে জন্মেছিলাম,
আজ মানুষ হয়ে কাক শিকারের বিরুদ্ধে বলছি কথা, আমাকে
সবাই জানে
কোকিলের মতো কবি বলেই।
দায়িত্ব নিয়েই লিখছি, ফেরদৌস মাহমুদ আমাদের সময়ের একজন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি। এ কথায় যদি কারো সন্দেহ থাকে, তবে আমি তার সন্দেহকে স্বাগত জানাই। তাকে বলতে চাই, প্লিজ পড়–ন, এবং তা আপনার সন্দেহের নামে। আর যদি নিঃসন্দেহ হোন- তবুও আহ্বান রইলো 'সাতশো ট্রেন এক যাত্রী' পাঠের।
বি.দ্র: এই লেখাটি আমজাদ সুজন সম্পাদিত ছোটকাগজ 'উল্লেখ' ৩য় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


