আমার প্রিয় পোস্ট

মা

৩০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:২৯

                       

মা আকাশের দিকে সজোরে নিঃশ্বাস টেনে নিশ্চিত হলো, আসছে ফাজিলটা। সে তার অসম্ভব ছোট চোখ কিঞ্চিত বড় করে পূর্ণ দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করল, নাহ কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মা অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তাদের এত অল্প দৃষ্টি দিয়ে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে কেন, কেন শকুনের দৃষ্টি দিয়ে পাঠানো হলো না!

মা’র বাচ্চাটা এলো ঝড়ের গতিতে। পেছনে সে রেখে এসেছে দোমড়ানো-মোচড়ানো শিশু বৃক্ষ, ঘন ধুলোর মেঘ। আর রেখে এসেছে একরাশ হাহাকার।

মা হাতি শুঁড় ঝেড়ে বিরক্তি প্রকাশ করল, এভাবে দৌড়ায় পাগল-পাগলু। তুই কি পাগলু?
হাতির বাচ্চা থমকে দাঁড়াল। রাগ চেপে কর্কশ গলায় বলল, সবার তো দেখি দুটা কান একটা মুখ। তোমার কি একটা কান দুটা মুখ? তাই তুমি শোন কম, বল বেশি!
মা হাতি বেয়াদব সন্তানকে শাসন করার জন্য শুঁড় দিয়ে চড় দিতে এগিয়ে এলো। চড় দেয়া হল না। পা থেকে মাথা পর্যন্ত কেঁপে উঠল। তার প্রিয়জনের সমস্ত শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। খোকা কোত্থেকে রক্তারক্তি কান্ড করে এলো!

মা হাতি ছলছল চোখে বলল, তোর এ অবস্থা হলো কি করে?
বাচ্চা হাতি শুঁড় দিয়ে চোখ মুছে বলল: মা-মা, অ মা, আমি না রেললাইন পার হচ্ছিলাম। তাড়াহুড়োয় হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। হঠাৎ করে একটা রেলগাড়ি ধাক্কা দিয়ে এ অবস্থা করেছে। কী নিষ্ঠুর মা, থামাবার চেষ্টা করে দাঁড়ানো দূরের কথা একবার ফিরেও তাকায়নি! আমার এই অবস্থা দেখে মানুষগুলো হইহই করছিল।

মা হাতির পা থেকে শুঁড় পর্যন্ত অসহ্য রাগে জ্বলে গেল। মানুষ পেয়েছেটা কী! দিন দিন এরা কী অমানুষই না হচ্ছে। তাদের দাঁত (আইভরী) কেটে নেয়। এটা-ওটা ঘোড়ার ডিম বানায়। আরে বদ, দাঁত দিয়ে শখের জিনিস বানালে নিজেদের দাঁত খুলে বানা না, নিষেধ করছেটা কে!
জঙ্গলের জমিদার হাতি অথচ হাতিকে গাধার পর্যায়ে নামিয়ে আনে। টনকে টন কাঠ টেনে নিয়ে যেতে বাধ্য করে। ধরে ধরে চিড়িয়াখানায় আটকে রাখে। কী দুঃসাহস, হাতিদের বলে শুঁড় উঠিয়ে মানুষকে সালাম দাও, চার পা তুলে ছোট কাঠের টুকরায় উঠে দাঁড়াও। কী কষ্ট-কী কষ্ট!

মা হাতি (সরোষে): দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা। আসুক আজ রেলগাড়ি। হাতি চেনে না! দেখাচ্ছি, হাউ মেনি কলা গাছ, হাউ মেনি ব্যানানা।
বাচ্চা হাতি (ভীত গলায়): মা-মা, দোহাই তোমার ওমন করো না। রেলগাড়ির কি শক্তি তুমি জান না, স্রেফ কলাগাছের ভর্তা হয়ে যাবে।

মা হাতি এর উত্তর দিল না। মনে মনে বলল, এ জীবন কোন দিনের জন্যে? যে মা তার সন্তানের জন্যে প্রতিশোধ নিতে জানে না তার বেঁচে থাকার কোন অধিকার নাই! খোকা জানে না ওর জন্যে রয়েছে কী অসম্ভব মমতা। এটা বলা হয় না। হাতি তো আর মানুষ না যে দিনে একশবার বলবে, খোকা রে, তুই আমার চোখের মনি, কুনকুনি, ঠুনঠুনি, ভুনভুনি, ঝুনঝুনি। তার মাথায় কেমন ভোঁতা যন্ত্রণা হচ্ছে, চারপাশে এতো বাতাস অথচ ফুসফুসটা খালি মনে হচ্ছে। আজ তাকে আটকায় এমন সাধ্য কারও নাই।

মা হাতি শুঁড় উঠিয়ে বুঝতে পারছে একটা ট্রেন আসছে, এখনও অবশ্য বহুদূরে। বাচ্চাকে হিমগলায় বলল, আয় আমার সঙ্গে।
মা হাতি আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে ছুটে গেল। আজ মানুষের নাগাল পেলেই হয়, মাথায় পা তুলে স্রেফ কলার ভর্তা বানিয়ে ফেলবে। মোটাসোটা একটা গাছ ভেঙ্গে বনবন করে মাথার উপর ঘোরাল। রেললাইন জুড়ে আগুন চোখে দাঁড়িয়ে রইল।
ইন্টারসিটি ট্রেনটা ঘনঘন হুইসেল বাজিয়ে আসছে। রেললাইনের উপর বিশাল গাছ দেখে দাড়িয়ে পড়তে বাধ্য হল। মা হাতি গাছটা শুঁড়ে পেঁচিয়ে ইঞ্জিনের গায়ে দমাদম পিটিয়ে ইঞ্জিন অচল করে ফেলল।

এই ট্রেনেই বুকিন ওর বাবা-মার সঙ্গে সিলেট থেকে ফিরছে। জোর ব্রেক কষে হঠাৎ ট্রেনটা থেমে যাওয়ায় বাবা সিট থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেছেন। চশমা কোথায় যেন ছিটকে পড়েছে। বুকিনের বাবা পাগলের মতো এদিক-ওদিক হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, আমার চশমা, আমার চশমা!
বুকিনের মা চেঁচিয়ে বললেন, আল্লাগো কী হলো, হে মাবুদ . . . ।
বুকিনের বাবা আবার বললেন, আমার চশমা!
বুকিনের মা এবার রেগে গেলেন, আল্লা খোদার নাম নাই, খালি আমার চশমা, আমার চশমা। চশমা তোমায় বাঁচাবে!
বুকিনের বাবা কাতর গলায় বললেন, বুকিনের মা, চশমা ছাড়া আমি তো কিছুই দেখতে পাই না।

বুকিনের বুকটা ধ্বক করে উঠল। বাবা চশমা পরেন জানত। বাবা যে চশমা ছাড়া প্রায় অন্ধ এটা আজ বুঝল। আহারে, মানুষটাকে কী অসহায়ই না দেখাচ্ছে!
বাবা সামলে নিয়ে বললেন, বুকিন, বাবা দেখ তো বাইরে কী হচ্ছে। খবরদার জানালা দিয়ে মাথা বেশি বার করবি না।
বুকিন ভয়ে ভয়ে মাথা বের করে বলল, বাবা, লোকজন সব দৌড়াদৌড়ি করছে। হাতিরা নাকি গাড়ি আক্রমণ করেছে। অ-বাবা, দেখ দেখ, একটা হাতির বাচ্চার শরীর থেকে কত রক্তই না ঝরছে। ইস, বেচারা, ইস-স! অজানা কারণে বুকিনের চোখ পানিতে ছাপাছাপি।

বাচ্চা হাতি (আর্দ্র গলায় ): মা, মা, ওই দেখ একটা কী ফুটফুটে মানুষের বাচ্চা! কী মায়া মায়া চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। মা-মা, দেখ, মানুষের বাচ্চাটা আমাকে দেখে কাঁদছে!
মা হাতি (আগুন চোখে): এত কিছু দেখতে হয় না, মন নরম হয়ে যায়। আজ যাকে পাবো তাকেই ভর্তা করে ফেলব। আজ ছাড়াছাড়ি নাই।
বাচ্চা হাতি: মা, তোমার পায়ে পড়ি এদের ক্ষমা করে দাও! মা, মাগো, আমার গা ছুঁয়ে বলো! আহা, বলই না মা, তুমি না আমার লক্ষী মামইন্যা।
মা হাতি পরম মমতায় শুঁড় দিয়ে তার বাচ্চাকে পেঁচিয়ে ধরল। লম্বা শ্বাস ফেলে মা হাতি তার বাচ্চাকে নিয়ে জঙ্গলের দিকে এগুতে এগুতে ভাবল, মানুষদের বড় মজা, এরা ইচ্ছা করলেই চট করে মানুষ থেকে অমানুষ হয়ে যায়। পশুদের কষ্টের শেষ নাই, এরা না হতে পারে মানুষ, না হতে পারে পুরোপুরি পশু!

*মূল ঘটনা সত্য। বছর পনের আগে খবরের কাগজের সংবাদটা ছিল এই রকম: “সিলেট লাইনে ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে একটা হাতির বাচ্চা আহত হয়। পরে হাতি এসে অন্য একটা ট্রেনকে শুঁড় দিয়ে পিটিয়ে ট্রেনের ইঞ্জিন অচল করে ফেলে।”

(আসলে পৃথিবীর সব মা অবিকল এক! কে জানে, এ জন্যই হয়তো এ কথাটা এসেছে: ঈশ্বর তাঁর মমতা বোঝাতে গিয়ে বলছেন, আমার পক্ষে তো সব জায়গায় থাকা সম্ভব না, তাই আমি অজস্র মা সৃষ্টি করেছি)।
**পুরনো লেখা কিন্তু আমার পছন্দের।

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): আমার পছন্দের লেখা ;
প্রকাশ করা হয়েছে: আমার পছন্দের লেখা  বিভাগে ।

 

  • ১৮ টি মন্তব্য
  • ১৪৪বার পঠিত
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ৮ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ৩০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:৩৩
comment by: ত্রিভুজ বলেছেন: অনেক দিন পরে দেখলাম শুভ ভাই (নাকি আমিউ কম আসি..)...

হটাৎ এই কাহিনীর মাজেজা কি? ডা. টুটুল? তাহলে মনে হয় প্লাসটা ভুল করে দিয়ে ফেলেছি....

৩০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:৫৫

লেখক বলেছেন: বিষাদে বলি, আপনার প্লাসটা আমার কাছে অপাত্রে দান মনে হচ্ছে।

এটা ফিরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা আমার নাই, কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করি,
আপনার প্লাসটা যেন আপনাকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দেয়া হয়।

২. ৩০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:৩৪
comment by: ইউনুস খান বলেছেন: অনেক অনেক ভাল লাগলো।

+++++++++
৩০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:৪৭

লেখক বলেছেন: আপনার ভাল লেগেছে জেনে আমারও ভাল লাগছে। ধন্যবাদ।

৩. ৩০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:৪৪
comment by: মমমম১২ বলেছেন: কেন জানিনা চোখ ভিজে গেলো।
৩০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:৫২

লেখক বলেছেন: কার্ও এতটা ভাল লাগবে ...!

৪. ৩০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:৪৯
comment by: তামো ব্লগ বলেছেন: প্রিয়তে গেল ।
৩০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:৫০

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ পড়ার জন্য।

৫. ৩০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:৫০
comment by: ইমরান মামা বলেছেন: ইউনুস খান বলেছেন: অনেক অনেক ভাল লাগলো।
৬. ৩০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:৫৭
comment by: রাসেল ( ........) বলেছেন: অনেক পদের ছাগল আছে,

তবে বিবর্তিত ছাগলদের খুর মোটা ভুলভাল টোকা দিয়ে ফেলে।
০২ রা আগস্ট, ২০০৮ রাত ১২:৪৬

লেখক বলেছেন: যারা রবীন্দ্র সঙ্গীত রচনা করতে পারেন, তাদের তালাশে আছি। পেলে কদমবুসি করি।

৭. ৩০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১:০৯
comment by: আকাশচুরি বলেছেন: +++++
০২ রা আগস্ট, ২০০৮ রাত ১২:৪৭

লেখক বলেছেন: পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

৮. ৩০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১:১০
comment by: এরশাদ বাদশা বলেছেন: অসাধারন!!

মানুষ শব্দের অর্থ কি, শুভ ভাই? মান এবং হুঁশ?

+++
০২ রা আগস্ট, ২০০৮ রাত ১২:৪৮

লেখক বলেছেন: মান এবং হুঁশ?
কি জানি, জানি না তো...।

৯. ৩০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১:৪২
comment by: সলিল বলেছেন: জবাব নাই।
আপনার অনুমতি ছাড়াই প্রিয়তে নিয়ে গেলাম রে ভাই।
০২ রা আগস্ট, ২০০৮ রাত ১২:৪৯

লেখক বলেছেন: ভাইরে, এর জন্য অনুমতি লাগে জানা ছিল না।
কৃতজ্ঞতা।

১০. ০৬ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ৮:৩৯
comment by: ঝড়ো হাওয়া বলেছেন: শুভ ভাই !!
আজ আপনা কে দেখেই লগ-ইন হলাম, অনেক দিন পর।
খুবই ভালো লাগছে, আপনি এসেছেন। (এই ভালো লাগাটা ইমোটিকন দিয়ে বোঝানো যাবে না :( )

লেখা পড়ছি, আবার মনে কইরেন না ফাও মারতেছি ;)
সব সময় দেখতে চাই, আপনা কে।
শুভ কামনা।

 



 


এখানে উঁচুমার্গের কিছু খোঁজা বৃথা- আমার উঁচু ভীতি আছে, এমন কি উঁচু কমোডেও।
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

সর্বমোট হিট

 ১৩৩২৯