সকালে ঘোষন করা হলো এখন থেকে দেশে পুরুষ শাসিত শাসন ব্যাবস্থা চলবে না। এখন থেকে নারী শাসিত শাসন ব্যবস্থা চলবে। অর্থাৎ পুরুষরা আগে যা করতো তা এখন থেকে নারীরা করবে এবং নারীরা যা করতো পুরুষরা এখন থেকে তা করবে, তবে সন্তান ধারণ করা ছাড়া। কারণ এটাতে কারও কোন কিছু করার ক্ষমতা নেই যেহতু। সকালে দশজন পুরুষ উপদেষ্টা নয়জন নারী উপদেষ্টার কাছে ক্ষমতা অর্পন করেছেন এবং একজন নুতন পুরুষ উপদেষ্টা নেয়া হয়েছে। কারণ বর্তমানের এগারজনের মধ্যে যেহেতু একজন নারী ছিল সেহেতু এখন একজন পুরুষকে নিয়ে নারী পুরুষের ব্যালাস এইভাবে ঠিক রাখা হয়েছে।
সকালে ঘোষনা শুনে আব্দুল কুদ্দুস এবং তার বউ মাথায় হাত দিয়ে চিন্তা করছে, এটা কি হইলো? কুদ্দুসের বউ বলে, "ও আবুলের বাপ, এইটা কেমুন কতা? পুরুষের কাম মাইয়া মানুষ করবো, আর মাইয়া মানুষের কাম পুরুষ মানুষ করবো? কিছুই বুঝলাম না তো।"
কুদ্দুস বলে, "বুঝলা না? কেন নারী আন্দোলনের মিছিলে যে প্রায় প্রায় যাইতাছো আর কইতাছো, নারীর সমান অধিকার চাই, নারীর সমান অধিকার চাই। এই লাইগা পুরুষেরা কইছে সমান অধিকার নেওনের দরকার নাই, এখন থেইকা পুরুষ নারীর কাম করবো, আর নারীরা পুরুষের কাম করবো। সরকার এই ডিসিশন লইছে। বুজচ্চো? এখন থেইকা আমি ঘরে বইসা রান্না বাড়ি করুম আর পুলাপান সামলাইমু আর তুমি রিক্সা চালাইয়া কামাই কইরা আনবা এবং আমাগো খাওয়াইবা। কি, বুঝবার পারছো?"
পুরাটা শুনার পর কুদ্দুসের বউ বলে, "ওহ এই কথা? যাক আপারা আন্দোলন কইরা আমাগো লাইগা ভালই করছে। তার মানে এখন থেইকা তুমরা হইলা আমাগো অধীন, যেমুন এতদিন আমরা ছিলাম তোমাগো অধীন। তাই তো?"
কুদ্দুস তার বউয়ের কথার উত্তরে বললো, "হ, এখন থেইকা আমরা তোমাগো অধীন। তয় কথা আছে, আমরা পুরুষরা যেমুন নারীগো সব সুযোগ সুবিধা পুরণ কইরা আইছি এখন থেইকা তুমরাও আমাগো সব সুযোগ সুবিধা পুরণ করবা। এই যেমুন খাওয়া-দাওয়া, কাপড়-চোপড়, চা, বিড়ি, পান যা লাগে তাই দিবা। বুঝবার পারছো তো? লও এখন আর কথা কইয়া কাম নাই বেলা উঠছে, রিক্সাটা লইয়া বাহির হও।"
কুদ্দুসের বউ রিক্সাটা নিয়ে বাহির হলো রাস্তায়। কুদ্দুস রিক্সা নিয়ে ফেরত আসলে সে মাঝে মাঝে খালি রিক্সাটা চালানোর চেষ্টা করতো। সেই সুবাদে তার রিক্সা চালানোর অভ্যাস আছে। রাস্তায় এসে দেখে চারিদিকে মেয়ে মানুষে ভর্তি, কোন পুরুষ মানুষই নজরে আসছেনা। খালি রিক্সাটা নিয়ে কিছু দুর এগুতেই একজন ডাক দিল, "এই রিক্সা মতিঝিল যাবে?" কুদ্দুসের বউ তার সামনে গিয়ে রিক্সা দাঁড় করালো এবং বললো, "হ আপা যামু, দশটাকা লাগবো।" রিক্সা নিয়ে বের হবার সময় কুদ্দুস তাকে ভাড়ার কথা বলে দিয়েছিল। দুইজন মহিলা তার রিক্সায় উঠে বসলো।
এখন দুই প্যাসেঞ্জারের ওজন নিয়ে কুদ্দুসের বউ রিক্সা আর নড়াইতে পারে না। কিছুদুর পর্যন্ত টানতে টানতে নিয়ে আসলো। এদিকে প্যাসেঞ্জারেরও তাড়া। প্যাসেঞ্জারও কিছু বলতে পারছে না কারণ এটা ছেড়ে অন্যটা ধরবে, সেটাও মেয়ে রিক্সাওয়ালা। গেলেতো একই অবস্থা হবে। কি আর করার, চুপচাপ বসে থাকলো। কুদ্দুসের বউ তার মত করে কিছুক্ষন পেডেল মেরে আবার কিছুক্ষন হাতদিয়ে টেনে রিক্সা নিয়ে চললো। যাহোক এক সময় গন্তব্যে এসে পৌঁছে। এইভাবে সারাদিনে সে যা কামাই করলো তাতে দাঁড়লো এই যে, রিক্সার ভাড়া মিটেয়ে তার কাছে টিকে মাত্র আঠাশ টাকা।
এখন কুদ্দুসের বউয়ের মাথায় হাত। এই আঠাশ টাকা দিয়ে কি হবে? তার তিনটা ছেলে মেয়ে, স্বামী আবার সে। কিভাবে এই আঠাশ টাকা দিয়ে তাদের পেটের ভাত জুটবে? তার চোখ দু'টো দিয়ে যেন ঝরঝর করে পানি বেরিয়ে আসলো। সে বাসায় এসে তার স্বামীর হাতে তার কামায় করা আঠাশ টাকা তুলে দিল। কুদ্দুস গণে দেখে আঠাশ টাকা। সে তো রেগে-মেগে টগবগ। সে বললো, "এই আঠাশ টাকা দিয়া কি হইবো?" ওর বউ উত্তরে বললো, "আইজকা মাফ কর, কাইল থেইকা বেশী কামাই কইরা আনুমনে।" যাক প্রথম দিন বলে কুদ্দুস আর কিছুই বললো না।
রাতে খাওয়া দাওয়ার পর ঘুমাইতে গেল তারা। অবশ্য রান্না-বান্না সব কুদ্দুসেই করেছিল। মাঝরাতে এখন কুদ্দুস তার বউরে কাছে টেনে নেয়, কারণ সারাদিন সে বাসায় বসেই ছিল বলা যায়। শরীরটাও অনেকদিন পর একটু রেস্ট পাওয়াতেও যেন ঝরঝরা হয়ে আছে। সে প্রথম থেকেই ভেবে রেখেছে আজ মজা করে কাজ করবে। কিন্তু যখন সে তার বউকে কাছে টানতে গেল তখন তার বউ সম্পুর্ণ রূপে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমাবেইবা না কেন, সারাদির রিক্সা চালিয়ে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আজ কুদ্দুস ছাড়ার বান্দা না। সে তাকে ডেকে তাকে তুললোই এবং তাকে কাজের প্রস্তাব দিল। কিন্তু তার বউ কোন ভাবেই রাজি না। সে কুদ্দুসকে বুঝানোর চেষ্টা করছিল যে সে ক্লান্ত। কিন্তু কুদ্দুসের একই কথা, "না করা লাগবোই, আমিও রিক্সা চালাইয়া আইছি, তারপর যদি আমি তোর জৈবিক ক্ষুধা মিটাইতে পারি তাহলে তুই পারবি না কেন। ক্লান্ত হইলে চলবো না। আমার খায়েস তোমারে পুরণ করন লাগবো, এটা তোর দায়িত্ব।" কুদ্দুসের বউ ভেবে দেখলো, এতোদিনে তার স্বামী তো কোন দিন না করে নাই, যত ক্লান্তই হোন না কেন। সে তার জৈবিক ক্ষুধা মিটিয়েছে। আবার সকাল হলে সে কাজে চলে গিয়েছে। তাহলে এখন থেইকা আমারেও তা পুরণ করতেই হইবো। কি আর করার কুদ্দুসের কাছে তারে হার মানতেই হলো।
রাতে কুদ্দুসের জন্যে ওর বউয়ের তেমন ভাল ঘুম হয়নি। তারপরেও রক্ষা নেই কাজে তো যেতেই হবে। তাড়াতাড়ি গোছলটা সেরে একটু পান্তা ভাত মুখে ঠুসেই রিক্সা নিয়েই দৌড় দিল। এমনিতেই গতকালের ক্লান্তি এখনও শরীর থেকে যাইনি, তারপরে রাতে ভাল ঘুম না হওয়াতে আজও তার কামায় ভাল হয়নি। রিক্সার ভাড়া মিটিয়ে ছাব্বিশ টাকা বেচেছে। রিক্সা রেখে এসে বস্তিতে ঢুকতেই দেখে সব ঘরে মেয়েরা হাউমাউ করে কাঁদছে। সে প্রথমে বুঝ উঠতে পারেনি। একজনরে জিজ্ঞাসা করলো, "ভ্রাপর কি? সবাই এইভাবে কাঁদতাছে কেন?" তার উত্তরে বললো, "মাইয়া মানুষগুলা কামায়ে গিয়া কেউ ভাল কামায় করবার পারতাছে না তাই।" তাদের রূমের পাশের রূমের মহিলাও একই ভাবে কাঁদছে। কারণ তার স্বামী ইট ভেঙ্গে খোয়া তৈরীর কাজ করতো। দিনে সে বিশ থেকে বাইশ সিএফটি খোয়া ভাঙ্গতে পারতো, তাতে তার কামায় হতো একশ বিশ থেকে ত্রিশ টাকা প্রতিদিন। কিন্তু এই দুই দিনে তার বউ পাঁচ থেকে ছয় সিএফটি খোয়া ভেঙ্গেছে। তাতে পেয়েছে ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ টাকা। এতে সংসার চলবে কি করে, এই নিয়ে কান্নাকাটি শুরু হয়েছে। বস্তির প্রায় ঘরেই একই অবস্থা, তাই ঘরে ঘরে কান্নাকাটি। কানতে কানতে তারা এখন বলে, "চাই না আমাগো মাইয়া মানুষের অধিকার, আমাগো পুরুষেরা যা করবো, যেমনে রাখবো তাতেই আমাগো সুখ। আমরা পুরুষেরই অধীনে থাকবার চাই। চাইনা মাইয়া মানুষের অধিকার।
কুদ্দুসের বউ আস্তে আস্তে এসে তার পাশে বসলেঅ এবং তার হাত থেকে ছাব্বিশ টাকা বের করে দিল। সেও ধিরে ধিরে তার মাথাটা কুদ্দুসের ঘাড়ের উপর রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। কুদ্দুস তারে কোন কথা বললো না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

