প্রকৃতির অবলীলায় বাংলাদেশের পলল সমভূমি গঠিত, ভাটি অঞ্চলের দেশ হওয়ায় অসংখ্য নদীর প্রবাহ রয়েছে এ দেশে, পদ্মা, মেঘনা আর যমুনার সম্মিলনে গড়ে উঠেছে পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ যা গাঙ্গেত্রিয় ব-দ্বীপ হিসেবেই বেশি পরিচিত। ছোট বড়ো সব মিলিয়ে এ দেশে নদ-নদীর সংখ্যা দুই হাজারের মতো, প্রতি বছর উজান থেকে অর্থাৎ হিমালয় থেকে নেমে আসা পলি বাংলাদেশের ভূ-অভ্যন্তরে প্রবেশ করে যা পদ্মা, মেঘনা, যমুনার প্রবাহমানে বি¯তৃত হয়ে জমা হচ্ছে নীম্নাঞ্চলে, নদীর বুকে জেগে উঠছে অসংখ্য চর, ফলে নদীর নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে, প্রতি বৎসরই বর্ষা মৌসুমের পর নতুন নতুন চর জেগে উঠার ফলে বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে, যা নদী বিধৌাত বাংলাদেশের নদী পথ হারিয়ে যাচ্ছে নিত্য দিনের জীবন থেকে এটা এক দিকে যেমন কষ্টের অন্য দিকে খুশির বিষয় হচ্ছে বিস্তৃর্ণ এ বালিকারাশির চরের বালির সঙ্গে মিশে আছে মূল্যবান অর্থকরী ভারি খনিজ, যা দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির চেহারা পাল্টে দেয়া সম্ভব। এতোদিন চরের বালিকে সাধারন মানের বালি হিসাবে ভাবা হতো, এ নিয়ে খুব একটা গবেষনা কর্ম ও অনুসন্ধান কার্যক্রম হয়নি, স¤প্রতি সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চরের বালি নিয়ে গবেষনা শুরু করেছে, প্রাথমিক সমীক্ষায় মূল্যবান ভারী খনিজের উপ¯িহতি নির্ণয়ের পর কিছু এলাকায় ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে এ সকল খনিজের ধরন, প্রকৃতি, গুনগত মান ও মজুদের পরিমাণ র্নিণয় করা সম্ভব বলে মনে করেন ভূ-বিজ্ঞানিরা । চরের বালিকে খনিজ বালি হিসেবে অবহিত করে ভূ-তত্ত্ব বিজ্ঞানিরা বলেছেন, চরের বালিতে জিরকন, রিউটাইল, গারনেট, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট ও লিউকোক্্িরনের মতো মূল্যবান ভারি খনিজ মিশ্রিত রয়েছে। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার প্রবাহের উপরের দিকের চরগুলোতে মূল্যবান এ ভারী খনিজ আবিস্কৃত হয়েছে যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে, যদিও সৈকত বালিতে কালো সোনা নামে এসকল ভারী খনিজের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে ১৯৬৭ সালে, মূল্যবান এ খনিজের রক্ষনাবেক্ষন, উন্নয়ন ও বানিজ্যীকিকরনের লক্ষ্যে ১৯৬৮ সালের গোড়ার দিকে সরকার আনবিক শক্তি কমিশনের কক্সবাজারে স্থানীয় অফিস প্রতিষ্ঠা করে। “সৈকত বালি আহরন কেন্দ্র” নামে এ প্রতিষ্ঠানটির মূল কাজই হচ্ছে ভারি খনিজ নিয়ে গবেষনা ও এর বহুমূখী বানিজ্যীকিকরনের উপায় উদ্ভাবন। বাণিজ্যীকিকরনের লক্ষ্যে সৈকত থেকে মূল্যবান এ সম্পদ আহরনের বিভিন্ন সরকারি পদক্ষেপ ও বাস্তবিক অর্থে তেমন কোনো কাজে আসেনি। সৈকত থেকে এ খনিজ আহরনের ফলে সৈকত ক্ষয় বা ভাঙ্গন প্রবণতা বৃদ্ধি, পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংকা, জীব-বৈচিত্র্যের আবাস¯হল বিনষ্ট ইত্যাদি প্রতিকুলতার কথা চিন্তা করে সরকার সৈকত থেকে মূল্যবান এ খনিজ আহরনের সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রয়েছে, কিন্তু চরাঞ্চলের বেলায় এ চিত্র ভিন্নতর, জনবসতিহীন বিশাল বিশাল এ চরসমূহ বর্ষা মৌসুমে পানির নীচে থাকে আর শুস্ক মৌসুমে নদীর বুকে এসব চরকে বিরান ভূমি হিসেবে পরে থাকতে দেখা যায় । বালি মহল ইজারার মাধ্যমে চর থেকে বালি উত্তোলনের ফলে ভারী খনিজের মতো মূল্যবান সম্পদ অবহেলায়, অযতেœ নষ্ট হচ্ছে, বিশাল পরিমানে রাজস্ব থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে। সময়োপযুগি পদক্ষেপই এ চিত্র বদলে দিতে পারে সম্পূর্নরুপে, বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে চরের বালি থেকে অর্থকরি খনিজ আহরণ করা গেলে একদিকে যেমন কর্ম সং¯হানের সুযোগ সৃষ্টি হবে অন্যদিকে কাঁচামালের সহজলভ্যতায় গড়ে উঠবে নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান। বিশ্ব জুড়ে এ সকল ভারী খনিজের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, সমাদৃত এ সকল খনিজের বৃহৎ বাজার গড়ে উঠেছে চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, সৌদি-আরব ও আরব-আমিরাতে। চরের বালিতে আবিষ্কৃত খনিজ সমূহ টাইলস ও সিরামিক শিল্পে, রং তৈরীতে, জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পে ও ইস্পাত শিল্পে বহুল ব্যবহৃত খনিজ। বাংলাদেশেও এ শিল্পের আভ্যন্তরীন চাহিদা দিন দিন বাড়ছে, প্রতিবৎসর সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে হাজার কোটি টাকার মূল্যের এসকল কাঁচামাল চীন, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, সৌদি-আরব, আরব-আমিরাত ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আমদানী করা হচ্ছে। সুষ্ঠ ব্যব¯হাপনার মধ্য দিয়ে এ সম্পদ আহরণ করা গেলে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানীর করে বৈদিশিক মূদ্রা আয়ের সুযোগ রয়েছে। চরাঞ্চলের বালিতে ভারি খনিজ ছাড়াও মূল্যবান গ্লাস স্যান্ড বা কাঁচ বালির অস্তিত রয়েছে¡, যা দিয়ে গ্লাস শিল্পের ব্যাপক প্রসার সম্ভব। চরের বালিতে গ্লাস তৈরির উপকরনের পরিমান,ও গুনগত মান নির্নয়ে অনুসন্ধান ভিত্তিক গবেষনা কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন । চরাঞ্চলের গ্লাস স্যান্ড বা কাঁচ বালি নিয়ে ভাবা যেতে পারে, বাংলাদেশের গ্লাস শিল্পের প্রসার বাড়ছে, আন্তর্জাতিক মানের গ্লাস তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে, যদি গ্লাস তৈরির উপকরণ চরাঞ্চলের বালি থেকে সংগ্রহ করা যায় তাতে বাংলাদেশের গ্লাস শিল্পে কাঁচা মালের সহজ লভ্যতায় নতুন মাত্রা যোগ হবে। এ নিয়ে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে গবেষনা কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে কাঁচ বালির মজুদ নির্ণয় সহ সম্পদের সঠিক ব্যবহারের কর্ম পন্থা অবলম্বনের মধ্য দিয়ে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখা যেতে পারে। পদ্মার চরগুলোতে গারনেটের মতো ভারি খনিজের উপ¯িহতি লক্ষণীয়, এক টন গারনেটের আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য রয়েছে পাঁচশত থেকে এক হাজার ডলার, আর মিলিয়ন টনেরও বেশি গারনেটের মজুদ রয়েছে পদ্মার চরে, অন্যান্য ভারি খনিজের মূল্যমান হিসেব করলে এ সংখ্যা বেড়ে যাবে কয়েকগুন। মেঘনা নদীর অববাহিকায় ঢেউয়ের বিস্তৃতে জমা হচ্ছে ম্যাগনেটাইটের মতো মূল্যবান ভারী খনিজ, যা সারা দুনিয়াজুড়ে বহুল ব্যবহৃত খনিজ, আর এ সকল খনিজে আয়রণ ও টাইটানিয়ামের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়াতে বিশুদ্ধিকরণ ছাড়াই ইস্পাত কারখানায় কাচাঁমাল হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। যমুনার উপরিভাগের চরগুলোতে রিউটাইল ও ম্যাগনেটাইটের বিশাল মজুদ রয়েছে, যা আহরণে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে বা যৌথ মালিকানায় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হলে এ শিল্পের ব্যাপক প্রসার সম্ভব। ভাটি অঞ্চলের দেশ হওয়ায় প্রতি বৎসরই উপর থেকে নেমে আসা পলির সঙ্গে এ ধরনের মূল্যবান ভারী খনিজ পদার্থ বাংলাদেশের ভূ-অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে, যা নবায়নযোগ্য খনিজ পদার্থ হিসেবে বিবেচনাযোগ্য। ইতোমধ্যেই সরকার বাংলাদেশের নদ-নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নদী খনন, পুন:খননের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে যা নি:সন্দেহে ইতিবাচক, খননকৃত বালি থেকে ভারি খনিজ পদার্থ পৃথক করা গেলে তা আরো বেশি অর্থবহ হবে। নদী খনন প্রক্রিয়ায় অর্থকরী খনিজ বালির প্রক্রিয়াজাতকরণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ রাখা গেলে ড্রেজকৃত বালি থেকে অনায়াসে ভারি খনিজ পৃথক করে এ শিল্পের প্রসার ঘটানো সম্ভব এবং পৃথককৃত খনিজ থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে। নদী অঞ্চলের চরগুলো বাস্তবিক অর্থেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খুব বেশি ভূমিকা রাখেনা বরং নদীর স্বাভাবিক গতি প্রবাহে বাঁধা সৃষ্টি করে নদীর গতি রোধ করছে, এ চরগুলো বিশেষ করে নদীর উপরিভাগের চরসমূহের অপসারন জরুরি কেননা নদীর উপরিভাগের চরের কারণে নদীর পানি নিম্নাঞ্চল অবধি পৌঁছাতে পারছেনা, তাই চরগুলো থেকে যদি মূল্যবান ভারী খনিজ পৃথক করা যায় তাহলে নদীর গতি প্রবাহ স্বাভাবিক হবে, খননের প্রয়োজন হবেনা, যা সামগ্রিক বিবেচনায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে। খনিজ সম্পদ আহরণের যে নীতিমালা রয়েছে তার মধ্যে চরাঞ্চল থেকে খনিজ আহরণের সুর্নিদিষ্ট দিক নির্দেশনার প্রয়োজন এবং তা অপেক্ষাকৃত সহজিকরণ করে আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে অসাধারন এক শিল্পের দ্বার উম্মোচিত হবে। খনি ও খনিজ বিধিমালার আলোকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে অনুসন্ধানের অনুমতি প্রদান করলে চরাঞ্চলের ভারী খনিজের প্রকৃত মজুদ নির্ণয়, এর বাণিজ্যীকিকরন, সরকারের বা দেশের লাভালাভের বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে। প্রকৃতি প্রদত্ত এতো বিশাল মজুদের সম্পদ যা প্রতি বৎসরই পূণঃ নবায়ন পদ্ধতিতে নদীর কোল ঘেষে জমা হচ্ছে তা আহরণের সময়োপযুগি সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক ভাবে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করবে, সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসং¯হান, গড়ে উঠবে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান যা ইতিবাচক এক বাংলাদেশ অপেক্ষারত আগামি প্রজন্মের জন্য, সঠিক সিদ্ধান্তই বদলে দিতে পারে অর্থনীতির চাকা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করতে না পারলে ভবিষ্যত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি হবে হতাশাজনক, তাই বাংলাদেশের খনিজ সম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও আহরণে সময়োপযুগি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন ।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১১ দুপুর ২:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



