ভূমিকম্প নিয়ে আতঙ্ক নয়ঃ প্রয়োজন সচেতনতা
হাসান কামরুল
ভূমিকম্প নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর কিছু নেই | দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেখেছি মানুষ ভূমিকম্প নিয়ে কতোটা ভীতির মধ্যে আছে | এক শ্রেনীর মানুষ সাধারন জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে | মানুষও ভয়ের মধ্যে আছে, এই বুঝি ভূমিকম্প হলো | আসলে দেশের সব অঞ্চলই ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে নেই| বাংলাদেশের ৮০শতাংশ এলাকা ভূমিকম্প ঝুঁকিমুক্ত এলাকা হিসেবে বিবেচিত| তাছাড়া ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক ব্যাপার | প্রকৃতির কথা আগে থেকে কেউ বলতে পারেনা| আমরা যা বলছি তা অনুমান নির্ভর| ভূমিকম্পের মাত্রা কতোটা প্রকট হবে তা নির্ভর করে উৎপত্তি স্থলের উপর | বাংলাদেশের কোথায় ভূমিকম্প হলে কতোটা ক্ষয় ক্ষতি হবে তা আগে জানতে হবে| ঢাকা ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা কারণ ঢাকার সব খাল দখল করে এখানে অট্রালিকা বানানো হচ্ছে| ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির আধার দিন দিন এতো নীচে নামছে যে এমন দিন আসবে ঢাকার মাটির নীচ থেকে আর পানি পাওয়া যাবেনা| চাহিদা মত পানির সরবরাহ করতে গিয়ে ঢাকা একদিন পরিত্যক্ত নগরিতে পরিণত হবে| তাই ঢাকা নিয়ে ভূমিকম্পের ভয় আছে| কারণ বড় মাত্রায় ভূকম্পন হলে ঢাকার কোন কোন অঞ্চল কয়েক মিটার পর্যন্ত দেবে যেতে পারে | যার ফলে দেবে যাওয়া এলাকায় স্থাপনাগুলো হেলে পড়তে পারে বা দেবে যেতে পারে যা ক্ষয় ক্ষতির মাত্রাকেও বাড়িয়ে দিবে কয়েকগুন । ঢাকা তুরাগ ফাটল এলাকা বলে এমনিতেই রিস্কজোন হিসেবে চিহ্নিত। তাছাড়া ঢাকার অদূরে মধুপুর ফাটল থাকায় তা ভূমিকম্পের আশংকাকে আরো বাড়িয়ে দেয়।যদি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল মধুপুর বা আশে পাশের কোন অঞ্চলে হয় এবং তার মাত্রা যদি রিক্টার স্কেলে ৬ এর উপরে হয় তাহলে ঢাকা স্মরনকালের ভয়াবহতার স্বাক্ষি হবে। ঢাকার মিরপুর ও বাসাবো এলাকা অপেক্ষাকত কম ঝুকি পূর্ণ এলাকা। উত্তরা, গুলশান, ধানমন্ডি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, যাত্রাবাড়ি, জুরাইন ও পুরাণ ঢাকা অপেক্ষাকত বেশি ঝুকি পূর্ণ এলাকা । বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে এসব এলাকা অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঢাকার অন্যসব এলাকাকে মাঝারি মানের এলাকা হিসেবে ধরা যায়।আমরা নদী দখল করার কারণে আমরা ভয়াবহ বিপদের মধ্যে আছি। ভুমিকম্পের সাথে নদী দখলের কি সম্পর্ক? এমন প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক।ভূমিকম্প হয় মাটির গভীরে। দুই ধরনের তরঙ্গ মাটির ভীতকে আন্দোলিত করে, প্রথম তরঙ্গটি খুব হাল্কাভাবে মর্হুতেই সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ভূপৃষ্ঠকে স্পর্শ করে ফিরে যায়।এতে ধ্বংসযজ্ঞ বা ক্ষয় ক্ষতির সম্ভবনা থাকেনা| দ্বিতীয় তরঙ্গটির যখন ব্যাপক শক্তি নিয়ে ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসে তখনই তার মাত্রার পরিব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়ে মর্হুতের মধ্যে।যার ব্যাপকতা ভয়াবহতার জন্ম দেয়। কিন্তু ভূকম্পন প্রবন এলাকায় নদী বা ডোবা বা জলাশয় থাকলে তরঙ্গ শক্তির ব্যাপকতার বিনাশ ঘটে। যা ক্ষয় ক্ষতির মাত্রাকে হ্রাস করে দেয়।
ভূকম্পনপ্রবন এলাকাসমূহঃ ঢাকা অঞ্চলের মধ্যে ঢাকার ৬০% এলাকা বিশেষ করে উত্তরা, গুলশান, ধানমন্ডি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, যাত্রাবাড়ি, জুরাইন ও পুরাণ ঢাকা অপেক্ষাকৃত বেশি ঝুকি পূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ শহর ও তার আশে পাশের এলাকা, ডিএনডি বাঁধ এলাকা, রুপগঞ্জের নিম্নাঞ্চল, গাজিপুরের কাপাসিয়া এলাকা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। ঢাকার যেসব এলাকা জলাশয় ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মান করা হয়েছে সেসব এলাকাকে ভূমিকম্পের জন্য রেড জোন বা বিপদজনক এলাকা হিসেবে হিসেবে গণ্য করতে হবে।আর যারা উপযুক্তভাবে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরন না করে বহুতল ভবন বা বাণ্যিজিক ভবন নির্মান করছে তাদেরকে ভূমিকম্পের ক্ষয়্জাত প্রবৃত্তির মাশুল গুনতে হবে।ঢাকা, চট্রগ্রাম ও সিলেট নগরী সবচেয়ে ঝুকিঁপূর্ণ এলাকা| ইউএনডিপি এ তিন শহরে ভূমিকম্পের সম্ভাবনা ও ক্ষয় ক্ষতির পরিমান নিরুপন নিয়ে গবেষনা করছে|যা থেকে নিকট ভবিষ্যতে ভূমিকম্পের পূর্বাপর ফলাফল সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে।
ভূমিকম্প কেন হয়ঃ পৃথিবী নামক গ্রহটি বিভিন্ন সাংঘার্ষিক বিভাজনে বিভক্ত।বাংলাদেশের অবস্থান ভারত ও মিয়ানমারের সাংঘার্ষিক বিভাজনে ।আর সাংঘার্ষিক বিভাজনের সংঘর্ষের ফলইে মাটির নীচে ক্রমাগতহারে শক্তির উদ্ভব হচ্ছে আর শক্তির ধর্ম হলো উপরে উঠে আসা। দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জিভূত শক্তি যখন পৃথিবীর পৃষ্ঠে ফাটল পায় তখন মহাশক্তির বিস্ফোরন ঘটে ঐ ফাটল দিয়ে।যার ফলে নির্দিষ্ট অঞ্চলজুড়ে ভূকম্পন অনুভূত হয়। যা কখনো কখনো ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি করে।
ভূমিকম্পে করণীয়ঃ ভূমিকম্পের মাত্রা ও স্থায়ীত্বের উপর নির্ভর করে কতোটা ক্ষতি হবে। যদি মাঝারি মানের ভূমিকম্পও দীর্ঘক্ষন ধরে হয় তবে তা মারাত্নক ক্ষয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।সাধারণত ভূমিকম্পের স্থায়ীত্ব কয়েক সেকেন্ড হয়। কিন্তু এই কয়েক সেকেন্ডের ভূমিকম্পের নৃশংসতা একটা জাতিকে পিছিয়ে দিতে পারে শত বছরের জন্য।ভূমিকম্প কখন হবে তা আগে থেকে বলা সম্ভব না। এখনো আর্থকোয়াক ওর্য়ানিং সিস্টেম গড়ে ঊঠিনি।তবে ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার সময় রিক্টার স্কেলে এর ইন্টেনসিটি বা মাত্রা পরিমাপ করা যায়।ভূমিকম্প হলে তাড়াহুড়া না করে মাথা ঠান্ডা রেখে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।চলন্ত অবস্থায় থাকলে ফাঁকা জায়গায় অবস্থান করতে হবে।গাড়ির মধ্যে থাকা অবস্থায় ভূমিকম্প হলে গাড়ি থেকে নেমে শূন্য স্থানে আশ্রয় নিতে হবে । বহুতল ভবনে থাকলে লিফটে উঠা যাবেনা কারণ ভূমিকম্পের সময় ঝাকুনির কারণে লিফট ছিঁড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে। লিফটে না উঠে হয় ভবনের উপরের তলায় অবস্থান নিন না হয় ছাদে অবস্থান করুন। আর ঘরের ভিতর থাকলে খাট বা টেবিলের নীচে অবস্থান করুন। ভূমিকম্পের সময় বিদ্যুতের লাইন বন্ধ করে দিতে হবে।সাধারণত ভূমিকম্পের কারণে গ্যাস লাইন, বিদ্যুত লাইন ও পানির পাইপ ফেটে যায়। যার ফলে আগুন ধরে ভয়াবহতার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।ভূমিকম্পের কারণে ভবন ধ্বসে পড়ার সম্ভবনা যতো থাকে তার চেয়ে বেশি থাকে ভবন হেলে পড়ার সম্ভাবনা।তাই এ ধরনে ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে ছোটা ছোটি না করে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করাই শ্রেয়। বাসায় শিশুদেরকে আগে নিরাপদ স্থানে নেয়ার ব্যবস্থা করুন।বহুতল ভবনে থাকাকালীন সময়ে কিছু শুকনো খাবার ও পানির বোতল হাতের নাগালে রাখুন।
ভূমিকম্পে সরকারের করণীয়ঃ দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু করতে হবে। জনগনের মাঝে সচেতনা সৃষ্টির লক্ষে গণ মাধ্যমে ব্যাপকহারে প্রচারনা চালাতে হবে। আক্রান্ত স্থানে মেডিকেল টীমকে প্রয়োজনীয় ওষুধ সামগ্রি দিয়ে দ্রুত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর চৌকষ টিমকে আগ থেকেই পূর্ণাঙ্ঘ প্রশিক্ষণ প্রদান ও প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। বেসরকারি পর্যায়েও নিরাপত্তা বাহিনীকে ভূমিকম্পের প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। থানা ভিত্তিক ক্যাম্পাইন করে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদেরকে প্রাথমিক ধারণা প্রদান করা যেতে পারে।দূর্যোগ ও ব্যবস্থাপনা মন্ত্রনালয়ে ভূমিকম্প নিয়ে আলাদা সেল করলে সারা দেশে সচেতনা বৃদ্ধির কাজটা নির্বিঘ্নে করা যাবে।
পরিশেষে বলা যেতে পারে বাংলাদেশ আসলে কতোটা ভূমিকম্পের ঝুকির মধ্যে রয়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা যাবেনা। বড়ো বড়ো ভূমিকম্পগুলো হিসেব করলে দেখা যায় ৯০ শতাংশেরও বেশি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের বাইরে।গ্রেট আসাম ভূমিকম্পের কারণে ১৮৮৫ সালে সিলেট অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হয়েছিল। এরপর অবশ্য ভূমিকম্পের কারণে বাংলাদেশ ভয়াবহতার মুখোমুখি হয়নি।সাম্প্রতিক সময়ে সিকিম আর্থকোয়াক বা সিকিম ভূমিকম্প বাংলাদেশের জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। আর সিকিম আর্থকোয়াক এর মাত্রা ও স্থায়ীত্ব বেশি হওয়ায় বিস্তৃন অঞ্চলজুড়েই এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে বড় মাত্রার ভূমিকম্প প্রতি ১০০ থেকে ২০০ বছরের মধ্যে হয়। সিকিম ভূমিকম্পের ফলে এ অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা কমে গেছে বলে ধারণা ভূবিজ্ঞানীদের ।
হাসান কামরুলঃ ভূতত্ত্ববিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

