প্রিয় হামিদুর রহমান,
কেমন আছ তুমি? তোমার কি মনে আছে তুমি কে? কতটা করেছো দেশের জন্য? ২৮ সে অক্টোবর, কুমিল্লায় পাকিস্তান শিবিরে গ্রেনেড মেরেছিলে। একা এগিয়ে গিয়েছো। পেছনে মুক্তিযোদ্ধাদের কেউই তোমার সাথে ছিল না। এরপর দেখা গেল, একটি নদীর পারে তোমার খুলি, রক্ত, মিশে যাচ্ছে সেই নদীর পানিতে। তুমি শহীদ হয়েছিলে।
কেন করেছিলে দেশের জন্য এত? আমরা তোমার দেওয়া দেশটিকে কিছুই দিতে পারিনি, লাঞ্চনা আর বঞ্চনা ছাড়া। তোমার প্রিয় দেশটি স্বাধীন হয়েছিলো ঠিকই। কিন্তু তোমার মত মুক্তিযোদ্ধারা না খেয়ে দিন কাটায়। হয়তো তুমি বেঁচে থাকলেও তাই করতে হত তোমাকে। একবার কেউ খবরও নিতে যেত না। অথচ তোমার মনে তো কোন ভয় ছিলো না। কেন এভাবে ঝাপিয়ে জীবন দিতে গেলে?
দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক কিছু বানানো হয়েছে। অথচ তোমার কথা মনে পরলো আজ ৩৬ বছর পর। ভারতে শুয়ে আছ তুমি। কেউ খবর নেয়নি।
আজ নাহয় কাল হয়তো তোমাকে এই পরিহাসের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। তবু তুমি বেঁচে গেছ, তোমাকে এই কন্টক বিধ্য করবে না।
জান? আমাদের দেশে আওয়ামীলীগ আর বিএনপির ক্যাডার আছে। তারা মানুষ মারে। জান? এই দেশের সেনাবাহিনীতে স্বাধীনতার পর অনেক মানুষকে মারা হয়েছে। অথচ কেউ যুদ্ধাপরাধীদেরকে মারার সাহস করেনা। তারা আজ বলতে চায় তুমি মুক্তিযোদ্ধা নও। দেশে কোন মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। হামিদুর শুনতে পাচ্ছ, ভেঙ্গে পড়ছো কি? কেউ একবার চিন্তা করেনি তোমাদের অবদানের কথা। কেন আসবে দেশে?
মতিউর রহমানের কবরও এই দেশে খোড়া হয়েছে। তাঁকে এখানে সমাহিত করা হয়েছে। আমি মাঝে সেখানে গিয়ে ওনার পাশে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে এসেছিলাম। তুমি কি তোমার কাছে ওভাবে আমাকে বসতে দেবে?
তোমার অমন নিষ্পাপ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে না? আমি সেই ব্যাথা কিভাবে সহ্য করবো হামিদুর? তুমি শুনতে পাও আমাদের কান্না? আমি যুদ্ধ করিনি। তবু তার ভয়াবহতা বাবার চোখে দেখেছি। আমাদের পৈতৃক বাড়িটা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এই আগষ্ট মাসেই। বাবা এখনও রাতে স্বপ্নে দেখে শিয়রে ওঠেন। মা তাঁকে সান্ত্বনা দেন।
দেখো বাংলাদেশকে যদি কেউ শেষ করে দেয়, যদি এই দেশ আগের মতই হয়ে যায়, ধরো কেউ বেঁচে নেই আমাদের মত, তোমাদের চেতনা ধরে রাখার। আমি একা তোমার পাশে বসে থাকবো হামিদুর। আমাকে একটু বসতে দিবে না? ভয় হয়, যদি তোমার নিষ্পাপ চোখ প্রশ্ন করে বসে, যার উত্তর দিতে গিয়ে শুধু কেঁদে ফেলি। তবু তোমার কাছে জীবনের শেষ সময় গুলো কাটাতে চাই।
বিধাতার সাথে কথা হয় দিনে পাঁচ বার করে। সত্য কথা বলি আজই প্রথম তোমার জন্য দোয়া করেছি। জান? এই দেশের কোন মসজীদেই তোমাদেরকে স্মরণ করা হয় না। মিলাদ পড়ানো হয় না। কিন্তু আমার দোয়া চিরদিনই তোমার সাথে থাকবে। তোমাদের সাত জনের সাথে থাকবে। তুমি ভাল থেক ভাই।
ইতি
তোমারই আপন কেউ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

