গত ১০।১০।১০ তারিখের ঘটনা। বেলা ১১টার সময় তুরাগ নদীতে পড়ে যায় একটি বাস। বাসটিতে ছিলো আনুমানিক ৫০ জনের মত। তাদের মধ্য থেকে ৭ জন বেঁচে ফেরেন। কিন্তু ফেরা হয় না মনোয়ারা খাতুন তারার। সে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭ তম ব্যাচের ছাত্রী।
তারার মৃত্যুতে আমাদের অনেক আক্ষেপ হয়। কারণ তারা ছিল, একটি স্বনাম ধন্য প্রতিষ্ঠানের মাইক্রোবায়োলজির ছাত্রী। মনোয়ারা তারা আমার ব্যাচমেট, যদিও তার সাথে আমার কোন যোগাযোগই কোনদিন হয়নি। আমার এক সহপাঠীর রুমমেট ছিল তারা। প্রীতিলতা হলে তারা থাকত। গত বছর প্রীতিলতা হলের বর্ষপূর্তির সময়কার এক ঘটনা ঘটে।
৩৫তম ব্যাচের কিছু মেয়ে হঠাৎ করেই চড়াও হয় তারার উপর। তারা তাকে ঘিরে ধরে, এবং যাতা বলতে থাকে। সভ্য ভাষায় একেই নাকি রেগিং বলা হয়। রেগিং করে নাকি সিনিয়ররা জুনিয়ারদের শিক্ষা দিয়ে থাকেন। অথচ প্রশ্ন জাগে, শিক্ষা দেওয়ার কাজ কি শিক্ষকের নাকি ছাত্রীদের?
তারা খুব সাধারণ মেয়ে নয়। সে প্রতিবাদ করে বসে, যার উত্তরে তাকে মার খেতে হয়। এবং ৩৫তম ব্যাচের প্রীতিলতা হলের প্রত্নতত্ত্ব, নাট্যতত্ত্ব ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্রীদের মতে, তারাই তাদের গায়ে আগে আঘাত করেছে। তারাকে গত বছর আগষ্ট মাসে, এরই জের ধরে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।
সেই থেকে তারা তার মহাখালির বাসায় থাকত, এবং বাসে করে আসা যাওয়া করত। যারা জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন, তারা সকলেই জানেন, পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীরা হলে থেকে পড়াশোনা করে। অথচ, তারার সেই অনুমতিও ছিল না। সে একপ্রকার অসহায় ছিল। সেদিন অর্থাৎ ১০ই অক্টোবর রবিবার দিন তারার একটি পরীক্ষা ছিল, যার জন্য সে জাহাঙ্গীর নগরে যাচ্ছিলো। পথে তার চলে যেতে হলো, এই জগৎকে ছেড়ে।
আমার যে সহপাঠীর বন্ধু ছিল তারা তার কাছ থেকেই শুনলাম, ৩৫ তম ব্যাচের সেই সব সিনিয়ররা তারার মৃত্যুর খবর শুনে আনন্দে হেসে ফেলেন। তাদের কথায় তারার উচিৎ শিক্ষা হলো।
আমরা আসলে দিনকে দিন অসুস্থ জাতে পরিণত হচ্ছি। আমরা কারণ ছাড়াই মানুষকে আঘাত করতে পছন্দ করি। কারণ ছাড়াই ভাংচুর চালাই, মানুষ পুড়িয়ে পিটিয়ে হত্যা করি। আমরা কারণ ছাড়াই, একটি নক্ষত্রকে দেখিয়ে দিচ্ছি মৃত্যুর পথ।
আমি জানি, তারার মৃত্যুর সাথে তাকে হল থেকে বের করে দেওয়ার কোন সম্পর্ক আপাত দৃষ্টিতে নেই। অথচ, যারা এই কাজ করেছিল তখন, তারা কি জানেন, একটি মৃত্যু কত কঠিন হতে পারে? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। আমার সহপাঠিকেও সেই ৩৫তম ব্যাচের আপাদের হাতে লাঞ্চিত হতে হয়েছিল। এবং আপাদের মহান উক্তি ছিলো, "তারাকে যেভাবে হল থেকে বের করেছি, তোকেও বের করে দেব"।
মেয়েদের হলে র্যাগিং সিস্টেম এখনও চালু রয়েছে। ছেলেদের হলে এর বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিয়েছে, নিয়ম করেছে, কিন্তু মেয়েদের হলের কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এবং হলের এসব তথ্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানা্নো হয় না।
ভাবছেন মেয়েরা আর কিই র্যাগিং দেবে? মেয়েরা প্রচন্ড রকমের মেন্টাল টর্চার করতে পারে, এবং এই উপায়ে তারা র্যাগিং দিয়ে থাকে। একটি মেয়েকে মানসিক ভাবে ধ্বংস করে দেবার জন্য ২০ থেকে ২৫ জন মেয়েই যথেষ্ট। আজেবাজে কথা ও গালাগালি থেকে শুরু করে, নানারকম কুৎসিত ঘটনার জন্ম হয়ে থাকে জাহাঙ্গীর নগরের মেয়েদের হলগুলোতে।
আমরা কি আমাদের মনের ঘৃণ্যতাকে এক মুহুর্তের জন্যও ভুলে থাকতে পারবো না? আজকে যদি তারা হলে থেকে ক্লাস করতে পারত, তাহলে হয়তো তার এই অকাল চলে যাওয়ার ঘটনাটা নাও ঘটতে পারত। এসবের জবাব আসলে এই নৃশংস যুগের মানুষের কাছ থেকে জানতে চাওয়া বৃথা!
যেভাবে নক্ষত্র ঝরে যায়! মনোয়ারা তারার স্মরণে!
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১১টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
পণ্ডশ্রম

এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।
কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,
আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।
দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন
আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?
আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?
ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন
১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে
আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন
নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন
শৃঙ্খল মুক্তি আমার
শৃঙ্খল মুক্তি আমার

ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।