মেঘের আড়ালে সূর্য লুকায়, কিছুক্ষণ পর মেঘ আপনাতেই সরে যায়, সূর্য আবার দেখা দেয়।
মানুষের জীবনে সুখ দুঃখের এইতো খেলা। অনেক বার আমার জীবনেও এমনটাই হয়েছে। কখনও মেঘ কখনও রদ্দুর। তবে কখনও কি এমন হয়? যে মানুষের জীবনে কখনই মেঘ আসবে না। শুধু রোদের আনাগনাই হবে? কি জানি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এমন একটি বন্ধুর সাথে আমার দেখা হয়। যার সাথে বেশ ভালো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। কিন্তু হিংসা ও ঈর্ষা কখনই তাকে আমার খুব কাছে আনতে পারেনি।
তার বাবা ছিল ভীষণ টাকার মালিক। এমনই তাদের টাকার জোয়ার যে প্রতি বছর বাসায় নতুন টেলিভিশন নতুন গাড়ি এসবের গড়াগড়ি। শুধু তাই নয়, বন্ধুটির একটি ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিল প্রায় ৬ বছরের। সেই সম্পর্কের পরিণতি হলো বিয়ে।
এই একটা সময় আমার মনে হতে লাগলো, মানুষের অভ্যন্তরীণ আবেগ, আকর্ষণ, ভালোবাসা সমস্ত কিছুই যেন টাকার ধাঁচে মোড়ানো। সুখ সে কেবলই টাকার খেলা। টাকায় টাকায় সুখ শান্তি সমৃদ্ধি আসে। আসলে কতটাকা হলে একজন মানুষ সুখি হতে পারে? উত্তরটা কারও জানা নেই।
তখন বুঝতে পারলাম, আমার এই যে জীবনের দৌড়, সমস্ত কিছুই যদি সুখের জন্য হয়ে থাকে, তাহলে টাকা আগে প্রয়োজন। মজার ব্যাপার হলো, টাকা এমনই একটি জিনিস যেটা হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় না। যেটার জন্য অনেক কষ্ট করতে হয়। এই কষ্ট করার পরেও অনেক মানুষ ন্যায্যটা পায় না।
আমি নিজেও পাইনি কখনও। অনেক ঘুরলাম টাকার পেছনে।
ছোট বেলা থেকে টাকার জন্য হাহাকার আমাদের সংসারে। কোন কিছু কিনতে গেলে আগে হিসেব করে নিতে হত। আমি খুব বেহিসেবি। যখন যেটা মন চায়, আমি সেটা করে ফেলি। টাকা জমিয়ে রাখার মন মানসিকতা আমার মধ্যে কেন যেন নেই। তবে প্রচুর টাকার দরকার, এই চেতনায় বড় হয়েছি।
মানুষের দীনতা আমাকে অনেক কষ্ট দেয় ঠিকই, তবু ধনী মানুষের দিকেই ধাবমান এই মনটা। বাবা মা কে দেখি, এখনও তারা কত কষ্ট করে টাকা উপার্জন করে যাচ্ছেন। তবু সংসারে টানাটানি লেগেই থাকে। এটা আনতে গেলে ওটা ফুরায়ে যায়।
একবার আমার খুব কান্নাকাটির জের ধরে, বাবা মা ঠিক করলেন, আমার জন্মদিনে আমার স্কুলের বন্ধুদের দাওয়াত করবেন। সবাই জন্মদিন পালন করে, আমি কেন করব না? আমার ছোট্টমনে তখনও যে উদয় হয়নি, একটি জন্মদিনের অনুষ্ঠান করার মত পয়সা আমাদের নেই।
বাবা বাসায় সেদিন তিনটি মুরগী আর কয়েক কেজি গরুর মাংস নিয়ে এসেছিলেন। তার আগেরদিন আমার সবাইকে দাওয়াত করা শেষ। সবাই আসবে এমনটাই শোনা গেল।
বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করল, "কতজন দাওয়াত দিলি"?
উত্তরে বললাম, ত্রিশ জন।
আমার কথা শুনে বাবার তো মাথায় হাত। এখন? ত্রিশজনের রান্না কে করবে?
আমার মা সেটা সামলে নিলেন। অগত্যা বাবাকে আরও টাকা খরচ করে আরও বাজার করে আনতে হলো।
পরিবারের মধ্যে একটা অশান্তির তীব্র গন্ধ পাচ্ছিলাম। এবং হলোও তাই। আমাদের মত গরীব মধ্যবিত্তের বাড়িতে ত্রিশজন মেহমান আসবে এমনটা চিন্তা করা আগে আমার বোঝা উচিৎ ছিল, আমি যাদের দাওয়াত করছি তারা বেশিরভাগই সমাজের উচ্চ শ্রেণীর মানুষজন। ধানমন্ডি গুলশান এলাকায় তাদের বসতবাড়ি। তারা কি এই গরীবের ঘরে আসবে?
সেবার আমার জন্মদিনে মোটে দশজন এসেছিল। আমার বাবার করা বাজারের অধিকাংশ রান্না করাতে অনেক খাবারই নষ্ট হলো। আমার প্রিয় বন্ধু যারা, কেউই তো এলো না। এলো যারা মিরপুরেই থাকত, অথবা মিরপুর থেকে বেশি দূরে যাদের বাড়ি নয়।
সে ঘটনার পর থেকে আমি আর কোনদিন জন্মদিন পালন করিনি। আর সে মাসে আমাদের খাবারের তালিকায় আলুভর্তা আর ভাত ছাড়া আর কিছুই জোটেনি। তবে, আমার কিছু বন্ধুকে আমি চিনতে পেরেছিলাম। তাদের সাথে যোজন যোজন দূরত্ব সৃষ্টি করেছিলাম। এখনও তাদের বন্ধু বলে মেনে নিতে পারিনা...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


