ভেবেছিনু কোথা, তুমি স্বর্গের দেবতা,
কেমনে প্রকাশিব তব প্রণয়ের কথা।
শিখা চিরতন্তন। এখানে আগুনের পরশমনি ছুয়ে যায় তাকে ঘেরা কাঁচ ঘরকে। এই চিরন্তন শিখার মতই সেদিন আলো জ্বলছিলো একটি ঘরের মধ্যে। মুখোমুখি বসেছিলাম, আমি ও একজন। এই একজন হলেন, স্বর্ণ। আমি মেয়েদের নাম শুনেছি স্বর্ণা। কিন্তু স্বর্ণ নামটা কখন শুনিনি।
স্বর্ণের সাথে আমার দেখা হয়েছিল আমারই এক আত্মীয়ের বাসায়। সেখানে আমি পড়তে যেতাম। স্বর্ণ আমার থেকে বয়সে অনেক বড়। প্রায় পাঁচ বছরের ডিফারেন্স। অথচ এই স্বর্ণের চুলের মাঝেই কিনা আমি অনিন্দিতাকে খুজে পেলাম।
লম্বা কালো চুলই আমাকে পাগল করে ফেলত। আর স্বর্ণের ছিল সেইরকম দীঘল কালো চুল। যেন সন্ধ্যার মেঘ, আর আমার দৃশ্যপটে একে দেওয়া অনন্ত স্বপ্ন। স্বর্ণকে আমি বুঝতে পারিনি কখনও। কেনই বা পারব? সমবয়সী মেয়েদের ম্যাচুরিটি নাকি সমবয়সী ছেলেদের থেকে বেশি হয়ে থাকে। আর সে তো আমার পাঁচ বছরের বড়।
এই স্বর্ণকে নিয়ে আমার অনিন্দিতার স্বপ্ন আরো প্রখর হয়ে উঠলো। আমি রাতস্বপ্নে জ্যোৎসার সাথে স্বর্ণের সাথে বসে কতবার গল্প করেছি। সে কথা কেউ জানে না। বলতে পারেন, অনেকটা এরকম,
ভেবেছিনু মনে মনে দূরে দূরে থাকি,
চিরজন্ম সঙ্গপনে পূজিব একাকি।
কেহ জানিবে, মোর গভীর প্রণয়, কেহ দেখিবে না মোর অশ্রু বারিচয়
সুতরাং স্বর্ণ কোনদিনও জানতে পারলো না, তার মাঝে আমি অনিন্দিতার ছায়া শরীর আবিষ্কার করে যাচ্ছি। ক্রমেই তাকে হারাতে হলো। সে এ-লেভেলস শেষ করে, তখন সিলেট মেডিক্যাল এ ভর্তি হলো। আর আমি সবে এইট পাশ করে নাইনে পা দিলাম।
দিবা স্বপ্ন, রাতস্বপ্ন, সব স্বপ্নই যখন চুরমার হয়ে গেল, তখন বিধাতার সাথে হেসে হেসেই একদিন কথা হলো। বললাম, যাক তুমি ভালোই করলে। আমার কাছে কাউকে এনে, ছাড়িয়ে নিলে নিজেরই অজান্তে।
শেষবার স্বর্ণের সাথে দেখা হলো। তাও হলো কি করে? স্বর্ণকে আমি কতবার শাড়িতে কল্পণা করেছিলাম, তার ইয়োত্তা নাই। বিধাতা হয়তো আমার এই গোপণ আকাঙ্ক্ষার কথা বুঝতেন। তিনিই ব্যবস্থা করেছিলেন। সেদিন ছিল আগষ্ট মাসের কোন এক সন্ধ্যাবেলা। কোন এক বিয়ের আসরে দেখা হলো দুজনার।
এবং সারাটা সময় ওর পাশে বসে জম্পেশ গল্প জুড়েছিলাম। আসার সময় তার নাম্বরটা নিয়ে আসিনি ইচ্ছে করে। যা কখনও হবার নয়, তাই কি হয়? এ হলো আমার ভাগ্যের খেলা।
একদিন এভাবেই রাত স্বপ্নগুলো থেকে স্বর্ণ হারিয়ে গেল। কিন্তু তবুও তার মুখছবি, তার অসাধারণ সুন্দর হাসি আমাকে প্রায়ই চিন্তার জগতের এক অলিখিত সন্ধ্যায় নিয়ে চলল। অনেক অনেক ভূবন দূরের, কোন এক আগষ্ট মাসের মধ্যে। যেখানে শুধুই ও আর আমি।
বাস্তবিক প্রেম কি জিনিস, এই অনর্থক জীবনে আমি টের পেতাম। হাহুতাশ আর নিজের মধ্যে প্রায়শই নিস্তেজ হতে দিতাম নিজেকে। হারিয়ে খুজে বেড়াতাম সময়ের বিবর্ণ জালে। সে কি ফিরে ফিরে আসতে পারে না?
কোন অলোক্ষণে যে আমাকে কে, জীবনান্দ দাসের বইখানা দিয়েছিল, বলতে পারি না। এত কবিতা থাকতে, কেন যেন বার বার বনলতা সেনই আমার সামনে হাজির হত, নতুত্বের দ্বিগবিজয়ী স্রষ্টা হয়ে।
মুখ তার শ্রাবস্তির কারুকার্য...সে আবার কি? অথচ কত চমৎকার উপমা। আমি ভুলেও ভুলে যেতে পারলাম না কিছুই।
জীবন চলতে লাগলো। চলে গেল এক এক করেই দিনগুলো। আমার ম্যাট্রিক তখন দ্বারে কড়া নেড়ে যাচ্ছে। আর আমাকে কেউ পড়ার টেবিল ছাড়া খুজে পেত না। পড়ায় আমার এত মনোযোগ। আর মাঝে মাঝে, ভুলে ভালে যদি জুটে যেত সন্ধ্যার চিন্তা, তখন জীবনান্দদাসের বইটা খুলে বনলতা সেনের শেষ লাইনটা বার বার কি পড়তাম না?
"থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন"।
ম্যাট্রিকটা পাশ করতে হয়েছে অনেক কষ্টের ভেতর। বনিবনা ছিল না বাবা মায়ের মধ্যে। নানা পারিবারিক ক্যাচালে অহেতুক জড়াতে হয়েছিল। আর কিছু পরগাছা আত্মীয়স্বজনদের ভাড়ে, দিনে দিনে অসহ্য হয়ে উঠলো জীবনটা। তখনই সিগারেটের হাতে খড়ি।
মনে পড়ে, সকাল সাড়ে সাতটায় একদিন বাড়ির জঞ্জাল ফেলে একটি নীরব নিথর স্থানে গিয়ে সুখটান দিয়েছিলাম সিগারেটে। সেই থেকেই সিগারেট হয়ে উঠে আমার অকৃত্তিম বন্ধু। ম্যাট্রিক পাশ করলাম রেজাল্টও ভালো হলো। শুধু আটকে গেলাম কোথাও আবার...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


