মোস্তাক আহমাদ দীন
সোনা মিয়া ও তাঁর গান
সামনের কয়েকটি দাঁত না-থাকায় গান গাওয়ার সময় স্বরটা ঠিকমতো লাগে না তুরন মিয়ার, তারপরও বিচ্ছেদটি যখন ধরলেন তা শুনে একেবারে চমকে গেলাম : গান শুনছি আর ভাবছি, কার লেখা এই গান? একথা জানি যে, শেষে, ভণিতা-পদে গিয়ে একধাক্কায় এটিও পরমার্থে গিয়ে পৌঁছাবে, কিন্তু, এরপরও, কারও পক্ষে এর রূপকায়ত বাস্তবকে ভোলা কি সম্ভব হবে? গানটির বিষয় : বন্ধু বা মাশুক সৌদি আরবে থাকেন, বোঝা যাচ্ছে তার বাড়িও সেখানে, কিন্তু আশিক বা প্রোষিতভর্তৃকা তাকে যাই বলা হোক, সে কিছুতেই তার কাছে পৌঁছাতে পারছে না; তার প্রধান কারণ সাত সমুদ্র তের নদীর দূরত্ব-অপরিসীম দারিদ্র্যের জন্যে, পারানির কড়ি না-থাকায় যা কোনোভাবেই অতিক্রম করা যাচ্ছে না। সৌদি আরব শোনা মাত্র, মুসলিম সমাজের যে-কারও মনে দুটি বিষয়/আবহ জেগে ওঠে, একটি হজের, অন্যটি উপার্জনের; গানটি শুনতে-শুনতে ভাবছিলাম গীতিকার এই দুটি বিষয়ই হয়ত মাথায় রেখেছেন; হয়ত ভেবে থাকবেন, যে যে-ভাবেই বিষয়টিকে গ্রহণ করুক না কেন, সৌদি আরব তো শেষপর্যন্ত স্বপ্নের জায়গা-কারও বন্ধুর বাড়ি, কারও কাছে আল্লার বাড়ি, কারও কাছে তা মুরশিদের বাড়ি, আবার কারও-কারও কাছে তা স্রেফ উপার্জনের; তবে শেষে এই সিদ্বান্তে পৌঁছা যেতে পারে যে, গানটি যখন লিখিত হয়, তখনও পর্যন্ত সৌদি আরবই ছিল সকলের-বিশেষত দরিদ্রের-আকাঙিক্ষত জায়গা। ফলে, দারিদ্র্যের বাস্তবকে উপলক্ষ্য করে অন্য আরেক বাস্তব যখন তৈরি করেন সোনা মিয়া তখন তা একদিকে যেমন তাঁর বাণী কাঙিক্ষত রূপ পেয়ে যায়, অন্যদিকে তা পাঠক-শ্রোতাকেও সহজেই আগ্রহী করে তোলে। গানটি হলো :
নয়ন জলে বুক ভেসে যায়
আমি ঠেকছি গরিব এই ভবে। অভাবে
কেমন কইরা যাইতাম গো
বন্ধুর বাড়ি সৌদি আরবে
সুজন বন্ধুর ঘর,
দেখতে অতি মনোহর। হায়রে
খেওয়ার কড়ি জোটে না মোর
পাড়ি দিতাম কিভাবে
গানটির শেষ অন্তরা :
বন্ধুর বাড়ির ফুল বাগিচা
চতুরঙ্গে ফুল
গন্ধে ধায় অলিকুল। হায়রে
সোনা মিয়ার মন আকুল
সুবাস কি তার পাইবে
এই গানটি শোনার প্রথম অভিজ্ঞতা ছাতকের মঈনপুরে, একটি গানের মজলিসে। আমরা শুনেছিলাম সেখানে নাকি শাহ আবদুল করিমের এমন-কিছু গান নাকি গাওয়া হয় যা অন্যত্র গাওয়া হয় না; মনে ক্ষীণ আশা জেগেছিল যে, শাহ আবদুল করিমের দুষ্প্রাপ্য আফতাব সঙ্গীত-এর অশ্রুত কোনও গান হয়ত সেখানে পাওয়া যেতে পারে যে-গুলো একসময় গ্রন্থিত ও গীত হলেও করিম বা করিম-শিষ্য কারও স্মৃতিতে না-থাকায় তার কোনও হদিস পাওয়া যাচ্ছে না; কিন্তু এখানে এসে সেই উদ্দেশ্য পূরণ না-হলেও সেই রাতটিই হয়ে উঠল আমাদের জীবনের অতিসুখকর অভিজ্ঞতার একটি অংশ। সে ছিল এক পূণিমার রাত, সামনের খোলা প্রান্তরকে মুখোমুখি করে দাঁড়ালে, বাঁয়ে পড়ে হুশিয়ার আলি পিরের আউলি ও হালকাখানা; আমরা বসেছি তারই পাশে ছাতা-হয়ে-থাকা গাছের নিচে-জোছনা-প্লাবিত সেই মজলিসে গান গাইলেন আলতাব আলি, আমির উদ্দিন, তুরন মিয়া এবং আরো দু-একজন। সে-রাতে আলতাব আলি শুনিয়েছিলেন আজর আলি, উকিল মুন্সী, দুর্বিন শাহ ও সফর আলির কয়েকটি গান; আমির উদ্দিন করিমের গানই বেশি গেয়েছিলেন, মাঝে-মধ্যে দুর্বিন শাহ ও উকিল মুন্সীর; কিন্তু তুরন মিয়া অন্যদের গান গাইতে গাইতে হঠাৎ যখন সোনা মিয়ার বিচ্ছেদটি ধরলেন তখনই এই অখ্যাত কবির গানের কথায় অনুপ্রাসে সুরে একদম চমকে গেলাম; এরপর আমাদের অনুরোধে তিনি গেয়ে শোনান সোনা মিয়ার বেশ কয়েকটি গান-কোনওটি মানভাষার কাছাকাছি, কোনওটি আঞ্চলিক। লক্ষযোগ্য ব্যাপার হলো, এই গানগুলোর অনুষঙ্গ প্রচলিত বাউলধারার হলেও, গানগুলির বিষয়-উপস্থাপনের জন্যে যে শব্দ-প্রতীক নির্বাচিত হয়েছে, তা সকল বাউলের গানে দেখা যায় না। এখানে তাঁর একটি গানের উল্লেখ করা যেতে পারে :
অভাগিনী ডাকি রে, কইয়া যাও কইয়া যাও রে
অভাগিনীর মনের আগুন কেন আর জ্বালাও (কোকিল)
চুপে আস চুপে বস
ঐনা তমাল শাখে
কুহু স্বরে বারে বারে
ডাকো তুমি কাকে
ঘন ঘন আমার দিকে
কেন তুমি চাও (কোকিল)
গানটির তৃতীয় অন্তরা :
প্রেমজ্বালা মদন জ্বালা
যৌবন জ্বালা আর
বন্ধুয়ার বিচ্ছেদ জ্বালা
পুড়িয়া অঙ্গার।
এসময়ে তুমি আবার
কেন গো পোড়াও
আশিকের মনের খবর মাশুকের কাছে পৌঁছে-দেওয়ার জন্যে পাখিকে দূত-বানানোর রীতি বাউল গানে বহু প্রচলিত : আমরা জানি রাধারমণের গানে রাধা বলেছিল-‘ভ্রমর কইও গিয়া/শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে আমার অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে ভ্রমর কইও গিয়া’; কালিদাস অবশ্য পাখি নয় মেঘকেই দূত বানিয়েছিলেন, মালিক মুহম্মদ জায়সী বা আলাওল পদ্মাবতীর রূপ-বর্ণনার জন্যে নির্বাচন করেছিলেন হিরামন নামের শুকপাখিকে; এখানে সোনা মিয়াও কোকিলকে নিয়ে এসেছেন, কিন্ত তা দূতালির জন্য নয়, নিয়ে এসেছেন সরাসরি বন্ধু বা মাশুকেরই প্রতীকে; ফলে আগের অন্তরায় তার উদ্দেশ্যে অনুযোগ ব্যক্ত করার পর ভণিতা-পদে বলেন :
সোনা মিয়ে কয় রে কোকিল
দেওরে পরিচয়
তোমাকে দেখিয়া মনে
জাগেরে সন্দয়
পাখির বেশে বন্ধু বোধ হয়
ফাঁকি দিয়া যাও
বিচ্ছেদের প্রচলিত ধারায় লিখিত সোনা মিয়ার আরও অনেক গানে রয়েছে উপমা ও চিত্ররূপগত বিশেষত্ব, যেগুলো গ্রামসমাজে হয়ত অপরিচিত নয় কিন্তু শব্দ ও অন্ত্যমিল-অনুপ্রাসের যথার্থ ব্যবহারে তাও হয়ে ওঠে অনবদ্য। নিচে তার একটি গানের নজির তোলা যেতে পারে :
কেউ তোরা আর প্রেম সাধিতে পাতিও না ফাঁদ
আমি একটা প্রেম করিয়া বুঝেছি তার স্বাদ
প্রেম বড়ই জ্বালা
আন্দোয়া পুকুরের মাঝে খাই শিংগের গালা
বিষে তনু মোর কালা,
সইতে নারি মুই অবলা
কইতে সাজে বাদ
গানটির ভণিতা-পদ :
আমার উপায় না দেখি
ছটফট করিগো যেন আহত পাখি
যখন বিছানায় থাকি,
সোনা মিয়ার বন্দে সখি লইল
প্রেমের দাদ
সোনা মিয়ার গানের এমন সুমিত উপস্থাপনা আর তাতে অভিব্যক্ত বিরহ-দগ্ধ অভিজ্ঞতার বর্ণনার উদ্দিষ্ট যাই থাকুক, এর পেছনে তার ব্যক্তিজীবনের যোগটা অস্বীকার করার মতো নয়। কোনও কোনও বাউল/গীতিকার আনপড় থেকেও গানরচনায় অব্যর্থ কুশলতার পরিচয় যে দিয়েছেন এমন কথা ইতিহাসে বিরল নয়, কিন্তু সোনা মিয়ার গান রচনায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সম্বন্ধ আছে, কোনও কোনও গানের আবহ ও পঙ্ক্তিবিন্যাসে নজরুলের উপস্থিতিকেও মনে করিয়ে দেয়; এছাড়া আমরা জেনেছি তিনি তাঁর গ্রামে ‘অগ্নিবীণা’ একটি নাট্যসংগঠনেরও জন্ম দিয়েছিলেন, যার কর্মকাণ্ডে তিনি নিজেকে যুক্তও রেখেছিলেন অনেক দিন-এই সব অভিজ্ঞানের ছাপ তার গানে অস্পষ্ট নয়। আর বিষয়ের ক্ষেত্রে-বিশেষত বিচ্ছেদমূলক গানে-তাঁর জীবনের নানা অভাব-বোধ, অন্তত শেষ জীবনের দারিদ্র্যগত অভিজ্ঞতা ক্রিয়াশীল ছিল।
গত শতকের চল্লিশের দশকে মঈনপুরে জন্মগ্রহণকারী সোনা মিয়া তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনে আধার-আধেয় উভয় ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও পরিমিতির পরিচয় দিলেও তার
সংসারজীবন ছিল বিশৃঙ্খল : কখনও পরনির্ভরতায় কেটেছে, কখনও অপরিসীম দারিদ্র্যে। তাঁর গানে পারানির কড়ির যে-দৈন্য, আক্ষরিক অর্থে তা তাঁর জীবনে ছিল সত্য। তাই শেষজীবনে যক্ষাপীড়িত হয়ে যক্ষা হাসপাতালে অনেক দিন থেকেও দারিদ্র্যের জন্যে কাঙিক্ষত চিকিৎসা করাতে না-পেরে বাড়িতে ফিরে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে তাঁকে। মৃত্যুর আগে তাঁর বন্ধুদের উদ্দেশ্যে লিখিত একটি চিঠিতে উল্লেখ করেন-‘সোনা মিয়ার টাকা নাই/যক্ষা রোগে ভোগে তাই’।
সোনা মিয়ার ছেলে বায়েজীদ আহমদ এখন প্রবাসী; তাঁর কাছে একটি সাধারণ ডায়েরিতে-লিখিত তাঁর পিতার ৯৯ টি গানের একটি পাণ্ডুলিপি আছে, গানগুলো নানা আসরে সাদরে গাওয়া হয়ে থাকলেও, এগুলো ইতঃপূর্বে কোথাও মুদ্রিত হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই; আমাকে সেই পাণ্ডুলিপি থেকে আমার পূর্বে-পছন্দকৃত কয়েকটি গান কপি করে পাঠিয়েছেন মঈনপুরের জনাব মুতিউর রহমান, এই জন্যে তাঁকে সবিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই। এই লেখায় উদ্ধৃত গানগুলোর পূর্ণাঙ্গ রূপ নিচে মুদ্রিত হলো।
১.
নয়ন জলে বুক ভেসে যায়
আমি ঠেকছি গরিব এই ভবে। অভাবে
কেমন কইরা যাইতাম গো
বন্ধুর বাড়ি সৌদি আরবে
আরব সাগর পারে আমার
সুজন বন্ধুর ঘর,
দেখতে অতি মনোহর। হায়রে
খেওয়ার কড়ি জোটে না মোর
পাড়ি দিতাম কিভাবে ঐ
পাপী তাপীর জরা ব্যাধি,
বারণ হয় জানি
খাইলে জমজমের পানি। হায়রে
পাপ দের হয় দীল রৌশনী,
কুদরতি কে বুঝিবে ঐ
বরষা ফাগুণ হাওয়ায়,
ভেজি আসসালাম
পড়ে দরুদ কালাম। হায়রে
মা ফাতেমা দুনু ইমাম
তামাম আহলে আছহাবে।
বন্ধুর বাড়ির ফুল বাগিচা
চতুরঙ্গে ফুল
গন্ধে ধায় অলিকুল। হায়রে
সোনা মিয়ার মন আকুল
সুবাস কি তার পাইবে
২.
কেউ তোরা আর প্রেম সাধিতে পাতিও না ফাঁদ
আমি একটা প্রেম করিয়া বুঝেছি তার স্বাদ ঐ
প্রেম বড়ই জ্বালা
আন্দোয়া পুকুরের মাঝে খাই শিংগের গালা
বষে তনু মোর কালা।
সইতে নারি মুই অবলা কইতে সাজে বাদ ঐ
প্রেম বানায় বেদিশা
রাণী ছেড়ে বাঁদীর প্রেমে মজে বাদেশা
রাণীর ঘটে দুর্দশা।
মোর জীবনে অমাবস্যা কোজার উদয় চাঁদ ঐ
আগে মর্ম না জেনে
সখের মনে প্রেম করে সই, কাঁদি ভুবনে
ধারা বহে নয়ানে।
জ্বলে আগুন হৃদয় বনে বিনে কালা চাঁদ
আমার উপায় না দেখি
ছটফট করিগো যেন আহত পাখি
যখন বিছানায় থাকি,
সোনা মিয়ার বন্দে সখি লইল
প্রেমের দাদ
৩.
অভাগিনী ডাকি রে, কইয়া যাও কইয়া যাও রে
অভাগিনীর মনের আগুন কেন আর জ্বালাও (কোকিল)
চুপে আস চুপে বস
ঐনা তমাল শাখে
কুহু স্বরে বারে বারে ডাকো তুমি কাকে
ঘন ঘন আমার দিকে
কেন তুমি চাও (কোকিল)
প্রেমজ্বালা মদন জ্বালা
যৌবন জ্বালা আর
বন্ধুয়ার বিচ্ছেদ জ্বালা
পুড়িয়া অঙ্গার।
এসময়ে তুমি আবার
কেন গো পোড়াও ঐ
বন্ধু আমার দেখতে যেন
অবিকল তুমি
তোমাতে বন্ধুতে নাই
গরমিল বেশি কমি
তবে কেন আর তুমি
লুকোচুরি খেলাও ঐ
সোনা মিয়ে কয় রে কোকিল
দেওরে পরিচয়
তোমাকে দেখিয়া মনে
জাগেরে সন্দয়
পাখির বেশে বন্ধু বোধ হয়
ফাঁকি দিয়া যাও ঐ
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ১২:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


