প্রথম অংশের লিংক
শাহ আবদুল করিম : জীবনধারণা ও সঙ্গীত প্রবণতা
Click This Link
শাহ আবদুল করিম : জীবনধারণা ও সঙ্গীত প্রবণতা
মোস্তাক আহমাদ দীন
বিশ্ববাংলার একই সংখ্যায় প্রকাশিত দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারটি সৈয়দ মবনু নিয়েছিলেন ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ৮ জুন, সিলেট-এর ইসলামপুর থেকে;এতে খোয়াব-এর প্রসঙ্গ ছাড়াও রয়েছে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ, যেখানে করিম তাঁর গানের সুরবিকার, গানের রয়্যালিটি ও অন্যান্য দাবি-দাওয়াসহ এমন কিছু কথাবার্তা বলেছেন যা করিমের ভক্ত, গবেষক সকলেরই উপকারে আসবে বলে মনে হয়, যদিও এর প্রাগ্বিবরণ পড়লে বোঝা যায় এটিও পূর্বে আলোচিত প্রসঙ্গের যাচাই নিরূপণার্থ নেওয়া। সৈয়দ মবনু তাঁর বিবরণে উল্লেখ করেছেন, তাঁর ‘আমি নাস্তিক নই’ শিরোনামক সাক্ষাৎকারটি একটি স্মারকগ্রন্থের জন্যে তাঁর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু (তাঁর অভিযোগ) স্মারকের আড়ালের ব্যক্তিগণ নাকি এর বক্তব্য করিমের হতে পারে না বলে প্রত্যাখান করেছেন; ঘটনাটি জানার পর, তিনি ব্যাপারটির সত্যাসত্য নিয়ে করিমের কাছে গিয়ে জেনে আসতে বলেন; পরে তারা এই বিষয় নিয়ে করিমের সঙ্গে আলাপ করতে গেলে করিম নাকি ধমক দেন, যারা পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয় করিম সাহেবের ‘হুশ-বুদ্ধি জায়গায় নেই’। কার্যত দেখা গেল, স্মারকগ্রন্থে সাক্ষাৎকারটি ছাপা হলো না, আর পরে সেই গ্রন্থটি হাতে নিয়ে গিয়ে সৈয়দ মবনু এই সাক্ষাৎকারটি নিতে যান, যেখানে করিমের ছেলে নূরজালালও উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষাৎকারটির শিরোনাম ‘কিছু কথা আমার কাছ থেকে নিয়েছে নিয়েছে, বাকি তার বানিয়ে ফেলেছে-আমি নাস্তিক নই’; শিরোনামেই স্পষ্ট যে, আগের সাক্ষাৎকারের কিছু পুনরাবৃত্তি কিছু সম্প্রসারণ এতে দেখা যাবে, এবং সাক্ষাৎকারটির শুরুও হয়েছে সেইভাবে। তাই একই বিষয় নিয়ে-বিশেষ করে প্রথমবারের এত স্পষ্ট বক্তব্য উঠে-আসার পরেও-দুইবার আলোচনার বিষয়বস্তু করার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারেন। এই সাক্ষাৎকারটি বাউলপুত্র নূরজালালের মাধ্যমে শুরু, তিনি বলেন :
নূর জালাল : বাবা বেশ কিছুদিন আগে সিলেট থেকে একটা ম্যাগাজিন বেরিয়েছিলো, এতে বিভিন্ন কথা এনেছে যে, আপনি আল্লা মানেন না, রাসুল মানেন না, বেহেস্ত দোযখ মানেন না-এই সেই নানা হাবিজাবি?
একই বিষয় নিয়ে মবনুও বলেন :
মবনু : এটা নূরজালাল ভাইও দেখেছেন যে, একটা ম্যাগাজিন তা লিখেছে। এই বিষয় নিয়ে আপনার সাথে আমার আগে একবার আলাপ হয়েছে, আমি দেখেছি যে, আপনি গানের মধ্যে বারবার আল্লাহ রাসুলের কথা বলেছেন। আধ্যাত্মিক অনেক বিষয় আপনার গানে স্পষ্ট এসেছে।
করিমের গানে আল্লা, রসুল, নামাজ, রোজা এই সবকিছু ব্যবহারের কারণ/তাৎপর্য সম্পর্কে, আগের নিবন্ধকারকে নিয়ে আলোচনায় যেভাবে বিস্তারিত হয়েছে, এখানে আর তার আলোচনা না-করলেও চলে, তারপরও নূরজালাল ও সৈয়দ মবনুর প্রশ্ন উদ্ধৃত করার কারণ হলো, এর জবাবে করিম যে-উত্তরটি দিয়েছেন তার মজা পাঠকের সঙ্গে পুরোপুরি উপভোগ করা; করিম বলেছেন :
শাহ করিম :(হাসেন, শব্দ করেই হাসেন) আল্লাহ রাসুলের কথা না বলে আপনি পীর সাহেবে চুর সাহেব, ডাকাত সাহেব, মোটকথা কিছুই হতে পারবেন না। আপনি আল্লাহর পক্ষে, রাসুলের পক্ষে, আশিকের পক্ষে, বুজুর্গানের পক্ষে কথা বলতে হবে, বুঝতে হবে এবং নিজেও মানতেও হবে। অন্যজন মানুক কিংবা নাই মানুক-আপনাকে অবশ্যই মানতে হবে। আমাকেও অবশ্যই মানতে হবে।
প্রশ্নের জওয়াব দিতে গিয়ে নিজেও যে খুব মজা পেয়েছেন, তার প্রমাণ তাঁর সশব্দ হাসি। কিন্তু বিষয়টি যেহেতু সিরিয়াস, তাই সংবর্ধনাস্মারক-সংক্রান্ত ঘটনার উল্লেখ করে সে-বিষয়ে জানতে চাইলে, করিম বলেন ‘নাস্তিক হয়ে তুমি যাবে কোথায়?’ এরপরও মবনু যখন প্রশ্ন করেন :
মবনু : আমার মনে হচ্ছে আপনি একথা বলেননি যে আপনি নাস্তিক, ওরা তা বানিয়ে বলেছে?
শাহ করিম : হাসতে হাসতে তিনি বলেন-হ্যাঁ, বানিয়ে লিখেছে। আসল কথা হলো-তারা কিছু কথা আমার কাছ থেকে নিয়েছে, বাকি তারা বানিয়ে ফেলেছে। (তিনি আবার শব্দ করে হাসেন।)
কিন্তু কেন হাসেন করিম? যে-শব্দ তিনি বলেননি, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তার জবাব/ব্যাখা দিতে হচ্ছে বলেই কি এই হাসি? নাকি পুরো ব্যাপারটিকেই তার কাছে হাস্যকর মনে হচ্ছে, আর জবাবও দিচ্ছেন কেউ একজন সূত্র ধরিয়ে দিচ্ছেন বলেই? এই সব বিষয়ে নিশ্চিৎ করে কিছু বলা মুশকিল। কারণ, বার্ধক্যের নানা উপসর্গ তাকে যেমনভাবে ঘিরে ধরেছে যে, এখন কারো পক্ষেই তাঁর কাছ থেকে পূর্বের মতো সুচিন্তিত কোনো মন্তব্য আশা করা ঠিক হবে না। তাঁর এখনকার ছন্ন মন্তব্যগুলোর মাধ্যমে এখন কেউ যদি করিমের জীবনধারণা-বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত পৌঁছাতে চান, তাহলে তা নানা কারণে বিপদজনক হয়ে-উঠতে পারে বলে, তার মর্মগ্রহণেই যে-কারো পক্ষেই প্রশ্নহীন হওয়া মুশকিল। এর প্রমাণ এই সাক্ষাৎকারে যেমন আছে, তেমনি আছে বিশ্ববাংলায় প্রকাশিত তৃতীয় সাক্ষাৎকারেও; তৃতীয় সাক্ষাৎকারটির উত্তর দিতে গিয়ে, তাঁর অনিচ্ছা, বিরক্তি, উল্টাপাল্টা কথা, ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’-গোছের অবস্থা দেখে কেউ তাঁর এখন বুদ্ধি-চেতনা নিয়ে যদি প্রশ্ন তোলে, তবু তাকে দোষ দেওয়া যাবে বলে মনে হয় না। এ-প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ দিলেই কথাটির সত্যতা মিলতে পারে। ১৯৯৯ সালে সৈয়দ মবনুর নেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে, ‘বাউল-মরমী-মালজুরার মধ্যে কি?’ এই প্রশ্নের জবাবে করিম স্পষ্ট উল্লেখ করেছিলেন-‘বাউল হলো এই যে, আমরা রাই শ্যাম ইত্যাদি নিয়ে গেয়ে থাকি। মরমী হলো ভক্তিমূলক ভাবে মনের কথা গানের ভাষায় প্রকাশ।...’ কিন্তু বিশ্ববাংলায় মুদ্রিত তৃতীয় সাক্ষাৎকারটিতে মবনু যখন আবার একই প্রশ্ন করেন ‘মরমিয়া আর বাঊলের মধ্যে ব্যবধান কি?’, তার উত্তরে করিম বলেন, ‘কোনো ব্যবধান নেই গানের মধ্যে’; আবার প্রশ্ন করা হয় ‘দুটা কি এক জিনিস?’, করিম বলেন, ‘হ্যাঁ, দুটা এক জিনিস’; মবনু সূত্র ধরিয়ে আবার বলেন-‘ অনেকে যে বলেন ব্যবধানের কথা, তাদের কথা হলো-মরমী হলো আধ্যাত্মিকতা আর বাউলটা আধ্যাত্মিক নয়। আপনি কি মনে করেন? করিম বলেন, ‘না কোনো ব্যবধান নেই। মরমী আর বাউল দুটাই একজাত’; মবনুও হাল না ছেড়ে আবার সূত্র ধরিয়ে বলেন আপনি কি মনে করেন দুটা এক ঘরের কারবার?’ করিম বলেন-‘হ্যাঁ দুইটাই এক ঘরের কারবার।’
এখন কথা হচ্ছে বারবার সূত্র ধরিয়ে দেওয়ার পরও, করিম যে তাঁর পূর্বের কথার প্রতিধ্বনি করছেন না, এর জন্যে কি করিমকে স্ববিরোধী আখ্যা দেওয়া যায়, না তাঁর এখনকার পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাঁর মতের মূল্যায়ন করা উচিৎ?... এর উত্তর করিমপ্রেমী পাঠকেরা ভালো দেবেন।
এমন ব্যাপার নানা রূপে, নানা ভাবে এখন চলমান; আমাদের ধারণা, করিম আগের মতো প্রকৃতিস্থ থাকলে, এখন যে-প্রক্রিয়ায় তিনি ব্যবহৃত, ব্যবস্থিত ও ব্যবচ্ছেদ হয়ে চলেছেন, তিনি তার প্রতিবাদ করতেন; আর প্রতিটি সংবর্ধনার আগে, তাতে তাঁর অঞ্চলের মানুষের উপকারের প্রশ্নটি বড় করে তুলে সংবর্ধনাদাতাদের বেকায়দায় ফেলে দিতেন, তা না হলে এইসব তুচ্ছতাকে তিনি অবশ্যই বর্জন করতেন; তার প্রমাণ হিসেবে লেখার শুরুতে উদ্ধৃত তাঁর বক্তব্য ছাড়াও আরো কিছু নজির নিচে উপস্থাপিত হতে পারে।
৩.
করিমের এখনকার অবস্থান, সংবর্ধনা প্রভৃতির পেছনে প্রচারমাধ্যমসূত্রে তাঁর কিছু জনপ্রিয় গানের জনপ্রিয়তর হয়ে-ওঠা, কিছু গানের সুরের মর্মস্পর্শিতা, অনেক গানের চিরকালীন বাণীরূপ যতটা কাজ করেছে, তার শত ভাগের পাঁচ ভাগও তাঁর গণমুখী চেতনা কাজ করেছে বলে মনে হয় না। ফলে, তাঁকে নিয়ে অধিকাংশ আলোচকের আলোচনাই হয়ে ওঠে খণ্ড মূল্যায়ন, নয়ত বিমূল্যায়নের চরম উদাহরণ। যে-কোনো প্রতিভা প্রভাবশীল হয়ে উঠলে তাকে নিয়ে অতিমূল্যায়ন যেমন হয়, তেমনি বিমূল্যায়নের সম্ভাবনাও দেখা দেয়, তবে আশার কথা এই, এগুলোতে নানা অযুক্তি এবং আড়ালে অসূয়াপ্রবণতা কাজ করে বলে তা ততটা স্থায়ী হতে পারবে বলে মনে হয় না; কিন্তু মূল্যায়ন যদি কোনো কারণে খণ্ডিত হয়, তাহলে তা কখনো-কখনো বিমূল্যায়নের চেয়েও বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে, কারণ এক্ষেত্রে-আলোচকের আন্তরিকতা সত্ত্বেও-সাধারণ পাঠকের পক্ষে তা অতিক্রম করে মূলাধারে পৌঁছা অসম্ভব হয়ে ওঠে।
একটি লেখা অনেক কারণে খণ্ড মূল্যায়নের দৃষ্টান্ত হতে পারে, এর মধ্যে প্রধানতম একটি কারণ হলো : লেখক যে-সমাজে তার জীবন যাপন করে লেখাগুলো লিখেছেন, তার পরিপ্রেক্ষিত মাথায় না-রেখে, তার লেখাকে বিচার করা; করিমের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। আলোচকেরা তাঁর গানের বিষয়ের উপর নির্ভর করে যে-করিমকে উপস্থাপন করেন, তাতে তাঁর বহুমুখী প্রবণতা স্পষ্ট হলেও, করিমের আগ্রহের মূল জায়গাটি এখানে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এইসব ক্ষেত্রে, গানকে নিছক পাঠবস্তু হিসেবে বিবেচনা করলে, আলোচককে খুব-একটা দোষ দেওয়া যায় না হয়ত, কিন্তু করিমের গানকে তাঁর জীবনযাপন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে, করিমের জীবন-দর্শনগত বেদনাটি কেউ কোনোদিন বুঝে উঠতে পারবেন বলে মনে হয় না।
গান ও করিম-এই দুই এতটাই পরস্পরলিপ্ত যে, এককে বাদ নিয়ে অন্যের বিচার অসম্ভব; দীর্ঘ ছয় যুগেরও অধিক দুর্লভ সঙ্গীতজীবনে করিম লিখেছেন প্রচুর গণসঙ্গীত ও প্রচলিত বাউলধারার অনেক গান; এর মধ্যে গণসঙ্গীতই যে তাঁর পরম আরাধ্য-এই বিষয়টি তাঁর জনপ্রিয় বাউল গানের প্রভাবে ধীরে ধীরে ঢাকা পড়ে-যাওয়ার উপক্রম; জনপ্রিয় ও সুকণ্ঠ শিল্লীরা গণসঙ্গীত গেয়ে থাকেন না বলেই যে শুধু এরকম হয়েছে এমন একপেশে মন্তব্য করা ঠিক হবে না, এর জন্যে তাঁর বাউল গানের আকুল-করা সুর ও তার অন্তরালবর্তী ভাবসম্পদও কিছুটা দায়ী। তারপরও, ভাটিজীবনের অশেষ টানাপেড়েন আর চরম বাস্তবতার কারণে করিমের আগ্রহ যে শেষপর্যন্ত গণমুখী গানের দিকে, তার প্রমাণ তাঁর অনেক গান ও সাক্ষাৎকারে ব্যক্ত করেছেন। একটি সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ এখানে তুলে দিলে ব্যাপারটি স্পষ্ট হতে পারে :
আমরা আপনাকে বাউল হিসেবেই জানি। আপনি কি শুধু বাউল গানই করেন?
-না। বাউল গান ছাড়াও এক সময় আমি গণসঙ্গীত গাইতাম। একসময় কাগমারী সম্মেলন হয়েছিল তখন আমি গণসঙ্গীত গেয়েছি। সে সময় মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও আমার গানের ভক্ত। তাই গণসঙ্গীত সবাই পছন্দ করতো। পরে আমার বাউল গানগুলোই বেশি জনপ্রিয়তা পায়।
অন্য এক সাক্ষাৎকারে, একটি প্রশ্নের জবাবে করিম যা বলেন, তা একটু দীর্ঘ হলেও, তাকে বুঝতে সহজ হবে বলে নিচে উদ্ধৃত করছি :
আপনারা আমার গায়ে এসেছেন, দেখে যান এখানে, এই বিশাল ভাটি অঞ্চলজুড়ে মানুষগুলো কী অপরিসীম দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে বাস করে। যখন মাঝে মাঝে শহরে যাই, স্তম্ভিত হয়ে এই ব্যবধান লক্ষ করি। লোকে কয়, আমি নিরন্ন, দুস্থ মানুষের কবি, আমি আসলে তাক ধরে দুস্থদের জন্যে কিছু লিখি নি। আমি শুধু নিজের কথা বলে যাই, ভাটি অঞ্চলের একজন বঞ্চিত, নিঃস্ব, দুঃখী মানুষ আমি, আমার কথা সব হাভাতে মানুষের কথা হয়ে যায়। ...দ্যাখেন তো এই অঞ্চল ঘুরে, মানুষের আয়ের কোনো উৎস আছে কি না? (করিম শাহ ক্রমে উত্তেজিত হয়ে এবং চোখ দুটো আর্দ্র হয়ে উঠেছে।) চারদিকে ভাসান পানি। জলে থই থই করেছে প্রতিটি বাড়ির উঠোন। মানুষ কী খেয়ে বাঁচবে? (করিম শাহের চোখে অশ্রুধারা) দিনে তিনবেলা নয়, শুধু একবেলা যদি দু’মুঠো খেতে না পারে, এই জন্ম কি মানুষের জন্ম? জিজ্ঞাস করি তোমার কাছে বলো ওগো সাঁই/এই জীবনে যত দুঃখ কে দিয়েছে বলো তাই /দোষ করিলে বিচার আছে সেই ব্যবস্থা রয়ে গেছে/দয়া চাই না তোমার কাছে আমরা উচিৎ বিচার চাই/ দোষী হলে বিচাবে সাজা দিবাতো পরে/এখন মারো অনাহারে কোন বিচারে জানতে চাই?/দয়াল বলে নাম যায় শোনা কথায় কাজে মিল পড়ে না।/তোমার মান তুমি বোঝো না আমরা তো মান দিতেই চাই।’ ...আমি বেহেশত চাই না দোযখ চাই না, জীবিত অবস্থায় আমি আমার ভাটি অঞ্চলের বিপন্ন মানুষের সুখ দেখতে চাই। এই মানুষগুলোর সুখ যারা কেড়ে নিয়েছে, আমার লড়াই তাদের বিরুদ্ধে। একদা তত্ত্বের সাধনা করতাম, এখন দেখি তত্ত্ব নয়, নিঃস্ব বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। দেহতত্ত্ব, নিগুঢ় তত্ত্ব, আর সোনার বাংলা, সোনার মানুষ বললে হবে না। লোভী, শোষক, পাপাত্মাদের আঘাত করতে হবে।
এরকম অনুভূতি ব্যক্ত করার পেছনে যে-অঞ্চলের দুঃখ-বেদনার বিষয়টি প্রধান হয়ে আছে, সেই ভাটির সঙ্গে করিমের সম্পর্কটি ছিল অত্যন্ত অবিচ্ছেদ্য; ‘সন্দেহ নেই করিম শাহনূর, শীতালং, আরকুম, হাসন, লালনের উত্তরসূরি, তাদের ভাববৃত্তের অনুগামী, তারপরও কেবল বাউল বললে করিমের পরিচয় যেন ঠিক ফুটে ওঠে না। এই পরিচয়ের ভিতর দিয়ে ভাটির সঙ্গে, ভাটির মানুষ ও প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর নাড়ির যোগ ও বন্ধুতাকে ঠিক চেনা যায় না। অথচ যারা করিমের গানের সঙ্গে পরিচিত, বিশেষ করে গানের আসরে গান গাওয়ার আগে নাতিদীর্ঘ বক্তব্যে করিম যে গান পটভূমি সৃষ্টি করেন প্রায়শই, এর সঙ্গে যারা পরিচিত তারা নিশ্চয় স্বীকার করবেন : করিম প্রথম ভাটির মানুষ, অতঃপর বাউল, তার শরীরে, তার কণ্ঠে, তার বচনে ভাটির জল-হাওয়া-মাটির গন্ধ। এই গন্ধকে বাদ দিলে করিমের বাউলত্ব থাকে না। ভাটির জল-হাওয়া গায়ে মেখেই করিম বাউল'’-চিহ্নায়নের ক্ষেত্রে তাঁর মূল প্রবণতা প্রপঞ্চায়িত হবে বলেই হয়ত দূরদ্রষ্টা করিম নিজে তাঁর আত্মপরিচয় তুলে ধরেছিলেন :
তত্ত্বগান গেয়ে গেলেন যারা মরমি কবি
আমি তুলে ধরি দেশের দুঃখ দুর্দশার ছবি
বিপন্ন মানুষের দাবি করিম চায় শান্তি বিধান
মন মজালে রে বাউলা গান।
বহুমুখী গান/পাঠ-এর কারণে চিহ্নায়নের এরকম সমস্যা যে শুধু করিমের বেলায়ই হলো তা নয়, রমেশ শীল, নিবারণ পণ্ডিত, গুরুদাস ঠাকুর-এদের সকলের বেলায়ই এমনটি হয়েছে; অধ্যাত্মবাদী গান রচনার মধ্য দিয়ে তাঁদের সঙ্গীতজীবনের সূত্রপাত হলেও বাস্তব/সংকটের তাড়নায় তারা ক্রমশ গণমুক্তির চেতনায় নিজেদের জীবন উৎসর্জন করে করতে দ্বিধা করেননি।
ছোটবেলা থেকে গান-বাজনা ও ধর্মীয় ভাবধারায় পাগল ছিলেন রমেশ শীল; যখন প্রাইমারিতে পড়তেন তখন গান বাজনার প্রতি প্রচণ্ড ঝোঁক দেখে তাঁর বাবা তাকে বৃহৎ তরজার লড়াই নামক একখানি বই কিনে দেন; সেই সময় তাঁদের পাড়ায় শ্যামাচরণ নামে আরও এক ছেলে ছিল. তারা দুই জন মিলে তরজার গান মুখস্ত করে পাড়ার লোকদের শোনাতেন; সেই গানগুলোর বিষয়বস্তু ছিল রাধা ও কৃষ্ণ। এইরূপ পরিবেশে শৈশব কাটিয়ে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত চট্টগ্রামের মাদারবাড়ি এলাকার নসু মালুমের ভক্ত ছিলেন রমেশ, পরে ছেচল্লিশ বছর বয়সে চট্টগ্রামের বিখ্যাত মাইজভাণ্ডারের দরবারের গিয়ে তাঁর যে-অভিভূতি ঘটে, তা তাঁর নিজের ভাষায় পড়া যেতে পারে :
হযরত গাউচুল আজম কেন যে আমার মতন নিরক্ষর লোকের উপর এমন মহান কাজের ভার দিলেন তাহা তিনিই জানেন। আমি কি শুভ মুহূর্তে শ্রীযুক্ত সারদা বাবুর সঙ্গ নিয়াছিলাম তাহা বাবা জান ভিন্ন অন্য কেহ জানিবার কারণ নাই। গত ১৩৩০ সালের ৯ই মাঘ শ্রীযুক্ত সারদা বাবু আমাকে মাইজ ভাণ্ডার ওরসে লইয়া যান। তথায় উপস্থিত হওয়া মাত্র প্রাণ যেন কি একটা অনির্ব্বচনীয় আনন্দে হিল্লোলে খোলতে লাগিল এবং কে যেন কানে কানে বলিল, রমেশ এই মাইজভাণ্ডারের ভক্তগণকে তোর গান শুনাইতে হইবে। প্রাণ কাঁপিয়া উঠিল, শরীর আড়ষ্ট হইল।
মাইজভাণ্ডারের ভক্তিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার পরও, রমেশ শীলের সহজাত গণমুখী চেতনা এতটা আচ্ছন্ন হয়নি; ১৯১৪ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় তখন তাঁর বয়স ৩৭, সেই সময়কার যুদ্ধপরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের অনটন ও হাহাকার দেখে তাঁর গণমুখী গানের সূচনা, এর নয় বছর পর উনিশ শ তেইশ কি চব্বিশে তিনি মাইজভাণ্ডারের দরবারে যাবেন, অথচ এই সময়কালেই যুদ্ধপরিস্থিতিতে-তৈরি-হওয়া তাঁর সমাজ-চেতনা, ‘অসহযোগ ও খিলাফৎ আন্দোলন (১৯২১), আসাম-বেঙ্গল রেল ধর্মঘট (১৯২২), চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ (১৯৩০) প্রভৃতির মধ্য দিয়ে ক্রমান্বয়ে বিপ্লবী চেতনায় উত্তীর্ণ হয়েছিল’, যার ধারাবাহিতায় একসময় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সভ্যপদ লাভ করেন তিনি। ধীরে ধীরে তাঁর চেতনা এতটাই শাণিত হয় যে, তাঁর কোনো-কোনো লেখায় পার্টির রাজনৈতিক ভ্রান্তির বিষয়টিও সমালোচিত হতে দেখা যায় ।
একই ভাবে, নিবারণ পণ্ডিত (১৯১২-১৯৮৪)- এর আত্মকথনের মাধ্যমে জানা যায় যে, প্রেম ও ভক্তিরসের গান রচনা করে প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করার পরেও, রূঢ় বাস্তবের চাপে তাঁর চিন্তাক্ষেত্রে পরিবর্তন আসে; এবং একসময় তার মনে হয়, ‘বাস্তব জগৎ ও সামাজিক কাঠামোর অভ্যন্তরেই মানবমুক্তির মূল সূত্রটি নিহিত’। তাঁর বাবা ভগবানচন্দ্র পণ্ডিত স্কুলে শিক্ষকতা করলেও তাঁদের পরিবার ছিল মূলত কৃষিনির্ভর; বাবার মৃত্যুর পর বিড়ি বেঁধে অচলপ্রায় সংসার চালাবার চেষ্টা করতেন যে-নিবারণ, তাঁর পক্ষে গারো পাহাড়ের উপজাতি কৃষকদের দারিদ্র্য, রাস্তাঘাটে লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুদের পাশবিক জীবন যাপনের যন্ত্রণা, পূর্ব পাকিস্তানের লীগ সরকার আনীত ভূমি বিলের কৃষক-স্বার্থবিরোধী দিকগুলির ভয়াবহতা উপলব্ধি করাটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। নিচের গানটি অন্য প্রসঙ্গে লিখিত হলেও, তার কয়েকটি পঙ্ক্তি পাঠ করলে মনে করা যেতে পারে যে, এমন কঠিন জীবনবাস্তবতা চাপ না থাকলে হয়ত তাঁরও মুখে আজীবন ভক্তি ও প্রেমরসের গানই প্রধান হয়ে থাকত :
কাঁয় হরিল তোর ক্ষেতের ধান
কাঁয় কাড়িল তোর মুখের গান রে
দোষমনক তুই না রাখলু চিনিয়া
ঐ পূর্ণ গোলাটা পূর্ণ হইল
হাজার ভিটা শুন্য হইল রে
(বুঝি দেখ) তোর বুকের রক্ত খাইলকরে চুষিয়া রে
তেমনিভাবে গুরুদাস পালেরও সঙ্গীতজীবনের শুরু অধ্যাত্মতাত্ত্বিক গান-রচনার মধ্য দিয়ে; এমনকী-বংশগত পেশা মৃৎশিল্পে জীবন চলে না বলে-মেটিয়াবুরুজের মজুর হওয়ার পর জাগরণী গানও যখন লিখতেন, তখনো তার গানে অধ্যাত্মপ্রভাব থেকে গিয়েছিল। হেমাঙ্গ বিশ্বাস লিখেছেন :
‘১৯৪৫ সনে কলকাতায় প্রগতি লেখক ও শিল্পীসংঘের আয়োজিত সংস্কৃতি সম্মেলনে কবিয়াল রমেশ শীল শেখ গুমানির কবির পালা শোনার গুরুদাস পাল পশ্চিমবঙ্গের তরজার লৌকিক পদ্ধতিকেই তাঁর ভাব প্রকাশের যোগ্য মাধ্যম বলে বেছে নিলেন’;
তরজার শ্লেষ ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ শোষক-শাসককে আক্রমণ করার হাতিয়ার হয়ে উঠল, আর তিনি হয়ে উঠলেন একজন অদ্বিতীয় গণশিল্পী। তাঁর এ-পর্যায়ের একটি গানের কয়েকটি পঙ্ক্তি পাঠ করলে তাঁর বিদ্রূপাত্মক প্রকৃতির পরিচয় পাব :
আমি কত্তা-ভজার দলে
বাইরেতে বোষ্টুমি আমি, ভেতরে দুর্নীতি চলে
বাস্তুহারার ক্যাম্পে গিয়ে ভাসি চোখের জলে
যদি কচে-বারো করতে পারি ইলেকশনটা তলে তলে।
আমি হিংসার উপর বড্ড চটা মাঝে মাঝে ক’রে ঘটা
বাক্যচ্ছটায় পটিয়ে লোককে ভেড়াই নিজের দলে;
গরিব-গুবরোর ওপর ঐ যে লাঠিগুলি চলে,
সেটা তোমার বুঝলে কিনা, সেরেফ তাদের কর্মফলে
এখানে লক্ষ-করার বিষয় এই যে, রমেশ শীল ও নিবারণ পণ্ডিত-এই দুই জন নিপীড়িতদের অবস্থার উন্নতির জন্যে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছিলেন, আর গুরুদাস পাল সরাসরি জড়িত না হলেও, প্রগতি লেখক ও শিল্পীসংঘের সংস্পর্শে এসে তাঁর ভাবান্তর হয়েছিল, কিন্তু এ-ক্ষেত্রে শাহ আবদুল করিম একটু ব্যতিক্রম : তিনি মাঝে-মাঝে বামধারার সম্মেলনে গান গাইলেও, নিজে কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হননি; ফলে, এই তিনজনের গানে একাধিক প্রবণতা মূর্ত-হওয়ার পরও, রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার কারণে, তাঁদের মূল প্রবণতা চিহ্নায়নের সংকট খুব-একটা প্রবল হয়ে ওঠেনি, যা আবদুল করিমের বেলায় হয়েছে।
এমনিতে, যখন যে-ব্যক্তি বা দল বা আন্দোলকারীদের মধ্যে শুভচেতনার পরিচয় পেয়েছেন, তাঁদের চেষ্টাকে গানের মধ্যে স্বাগত জানিয়েছেন করিম, শেখ মুজিব ও ওসমানীকে-নিয়ে-লেখা গান তারই নজিরবহ; এর বাইরে তিনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয়, নিজেকে জড়িয়েছেন বাঁচতে চাই নামক সামাজিক সংগঠন এর সঙ্গে; বলা উচিৎ সংগঠনটি তাঁর তৈরি, তার উদ্দেশ্য : ভাটির মানুষের দু-বেলা দু-মুঠো ভাত খেয়ে বেঁচে-থাকার ব্যবস্থা তৈরি করা। ভাটি-জনপদের এমন মৌলিক/সামান্যতম দাবি, আর তাঁদের জীবনভর বঞ্চনার সঙ্গে তাঁর সংগ্রামশীল জীবন অবিচ্ছিন্ন বলেই তাঁর পক্ষে রচনা-করা সম্ভব হয়েছে অবিস্মরণীয় তিনটি বই গণসঙ্গীত, ধলমেলা, ভাটির চিঠি ছাড়াও কালনীর ঢেউ, কালনীর কূলে ও আফতাব সঙ্গীত-এ অন্তর্ভূক্ত বেশ কিছু গান। এই সব গণমুখী গানের মধ্য থেকে কিছু-কিছু গান শুনে কাগমারি সম্মেলনে জননেতা ভাসানী বলেছিলেন: ‘কখনো একাগ্রতা ছাড়িও না, তুমি একদিন গণমানুষের শিল্পী হবে’, সিলেটের রেজিস্টারি মাঠে শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন : ‘করিম ভাই জনসভায় গান গাওয়ার পর আমার আর কিছুই বলার থাকে না, কারণ গানে গানেই করিম ভাই সবকিছু বলে দিয়েছেন’, সুনামগঞ্জের এক জনসভায় শেখ মুজিব আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন : ‘করিমভাই যেখানে, মুজিব থাকবে সেখানে’।
৩.
উপরিউল্লিখিত গণমুখী গানগুলি ছাড়াও অধ্যত্মতত্ত্বের আরো অনেক গান লিখেছেন করিম, কিন্তু তার সঙ্গে করিমের জীবন-ধারণা কতটা যুক্ত ছিল, সেই প্রশ্নটা নানা কারণেই এখানে তোলা যেতে পারে। মরমিদের সঙ্গে তাঁর অবস্থান-পার্থক্য একটি গানে স্পষ্টরূপে ব্যক্ত করেছেন বলেই এই প্রশ্ন নয়, এর বাইরে আরো কারণ আছে। এখানে তার কিছু মিছাল উপস্থাপন করা যেতে পারে।
ক. বৃহত্তর সিলেট থেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহের প্রায় সকল স্থানেই মালজোড়ার নামক একপ্রকার গীত-পদ্ধতির ঐতিহ্য চলে আসছে অনেকদিন ধরে, ক্ষীণধারায় হলেও তা আজো চলমান; আমাদের ধারণা করিমের অধ্যাত্মতাত্ত্বিক অনেক গানই মালজোড়ার আসরে গানের পিঠে গান গাইতে গিয়ে লেখা।
খ.তত্ত্বগান-রচয়িতাদের মধ্যে যারা সেই মতগুলিকে অন্তরে লালন করেন, তাঁদের কাছে মুর্শিদ হলো চরমতর মাধ্যম, যাকে ছাড়া পরম পাওয়া যায় না; তাই তাদের কাছে মুর্শিদই পরম বা পরমই মুর্শিদ; অথচ করিম কি না-মুর্শিদ থাকা সত্ত্বেও-তাঁর স্ত্রীকে মুর্শিদ বলে অভিহিত করতেন, এবং তিনি তার প্রথম বইয়ের নামও রাখেন আফতাব সঙ্গীত, আফতাবুন্নেছার নামে। এই কথা বলার উদ্দেশ্য এই নয় যে, করিমের কোনো মুর্শিদ নেই, পির-মুরিদি ধারার রীতি-পদ্ধতি মানতেন না; আমাদের জিজ্ঞাসা হচ্ছে- করিম যে তার মুর্শিদের সঙ্গে অন্য একটি চরিত্রকে নিয়ে এসে শিরকের পরিচয় দিলেন, এই চরিত্র আবার সেই প্রকারের, যাদের রূপ ও আচার-আচরণ বাউল গানে মায়া বা মায়াজাল বলে স্বীকৃত, মানবতরী নিয়ে ওইপারে যাওয়ার পথে যারা হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় অন্তরায়, জলপথে কামকুম্ভিরের সঙ্গে এদের সম্বন্ধ-তাতে মুর্শিদভজনা, পারাপার বা ওইপারের পরমের দেখা পাওয়ার বিষয়গুলো কি নির্দ্বন্দ্ব থাকল? এই সূত্রে, এখনই- করিমের জীবিতকালে-তাঁর ইহজাগতিক প্রেমের প্রসঙ্গটি যদি আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু না হতে পারে, তাহলে, বেঁচে-থাকা-কালেই যিনি কিংবদন্তি, মৃত্যুর পরে সেই সব প্রসঙ্গের উল্লেখ করা যে কতটা সমস্যাজনক হতে পারে, তা এখনকার লোকবিবেচনা থেকে আন্দাজ করা যায়।
গ. করিমের বেশ কিছু তত্ত্বের গান তাঁর স্ত্রীকে উদ্দেশ্য-করে-লেখা, এই গানগুলির শেষ পদটিতেই শুধু তত্ত্বের চিহ্ন, সেটি বাদ দিলে, সেগুলিকে অনায়াসেই প্রেমের গান বলে চিহ্নিত করা যায়।
এরপরও, এই ধরনের গানের সঙ্গে তাঁর অন্তরের যোগ নেই, বা কখনো-কখনো নিরেট অধ্যাত্মতাত্ত্বিক অর্থেও তিনি গান লেখেননি, তা বলা যাবে না; কিন্তু তাঁর সম্পর্কে এই কথাটি ভুলে গেলে চলে না যে, অধ্যাত্মতাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে তাঁর এমন কিছু নিজস্ব ধারণা আছে, যা অন্য বাউলদের মতের সঙ্গে তাঁর মতের স্বাতন্ত্র্যই নির্দেশ করে। তার কারণ, তাঁর চিন্তা ও ধারণার কিছুটা পরম্পরাবাহিত হলেও বেশির ভাগই তার নিজের অভিজ্ঞতার জগৎ ও অন্তঃপ্রকৃতি থেকে আহরিত; এই জায়গায় এসে করিম প্রচলিত ধারাকে অস্বীকার মধ্য দিয়ে তাঁর সংগ্রামশীল চেতনারই আরেকটি নজির স্থাপন করলেন যেন। অজিতকুমার চক্রবর্তী রবীন্দ্র-বিবেচনার ক্ষেত্রে পাঠককে একটি কথা মনে রাখবার জন্যে পরামর্শ দিয়েছিলেন, সেটি হলো : রবীন্দ্রনাথ সবসময় নিজের অন্তর্নিহিত পথ অনুসরণ করে চলেছেন, এর মধ্যে তাঁর কবিপ্রকৃতি, তপস্বীপ্রকৃতি, ত্যাগীপ্রকৃতি, ভোগীপ্রকৃতি পরস্পর ঠেলাঠেলি করতে-করতে পরস্পর সামঞ্জস্য করে নিয়েছে। আবদুল করিম সম্পর্কে একই কথা মনে রাখলে, আপাতভিন্নমুখী চেতনার মধ্যেও তাঁর অখণ্ডচেতনার পরিচয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে অক্টোবর, ২০০৯ ভোর ৪:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


