মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগে বর্তমানে বিচার চলছে তার মধ্যে অন্যতম আলোচিত ঘটনা হল ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যা। মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে পাক আর্মি ১৯৭১ সালের ৮ মে পারেরহাট বাজারে ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যা করে বলে দুইজন সাক্ষী আদালতে সাক্ষী দিয়েছেন। এ দুইজন সাক্ষী নিজেদের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু আজ বুধবার মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীরা আদালতে তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করে দেখিয়েছেন ইব্রাহীম কুট্টি পারেরহাট বাজারে ৮ মে নিহত হননি। তিনি তার শ্বশুর বাড়িতে থাকা অবস্থায় ১ অক্টোবর ১৯৭১ সালে নিহত হন। ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই পিরোজপুর আদালতে ১৩ জনকে আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ১৩ জন আসামীর মধ্যে মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম নেই।
অথচ দুইজন সাক্ষী ঘটনার চাক্ষুস বর্ণনা দিয়ে আদালতে বলেছেন, তারা দেখেছেন মাওলানা সাঈদী পারেরহাট বাজারে উর্দুতে পাক আর্মিদের সাথে কিছু কথা বলার পরই পাক আর্মি ইব্রাহিমকে গুলি করে লাশ নদিতে ফেলে দেয়। তারা গুলির শব্দ এবং চিৎকার শুনেছে বলেও আদালতকে জানান। তারা জানান মাওলানা সাঈদীসহ অন্যান্য রাজাকার এবং পিস কমিটির নেতাদের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানের মাধ্যমে ইব্রাহিম কুট্টিকে ধরা হয় এবং তাদেরই নির্দেশে পাক আর্মি তাকে হত্যা করে নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেয়।
কিন্তু মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীরা আজ আদালতে যে তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করলেন তাতে দেখা যায়, সাক্ষীদের বর্ণিত ইব্রাহীম কুট্টির হত্যা ঘটনার পরও ৫ মাস বেঁচে ছিলেন তিনি। মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীদের আদালতে উপস্থাপিত তথ্য প্রমাণের সাথে সাক্ষীদের বর্ণনার কোনো মিল নেই। পিরোজপুর আদালতে ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম স্বামীর হত্যার বিচার চেয়ে যে মামলা করেছিলেন ১৯৭২ সালে তার এজহার আদালতে দাখিল করেছেন মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীরা। এজহারে ১৩ জন আসামীর নাম উল্লেখ রয়েছে। শ্বশুর বাড়িতে হত্যা ঘটনার বিবরণ এবং ঘটনার তারিখ ১ অক্টোবর ১৯৭১ সাল লেখা রয়েছে। মামলার নম্বর ৯।
গতকাল মঙ্গলবার আদালতে ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন মানিক পসারী। আজও মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীরা তাকে জেরা করেন। আদালতে সাক্ষী দেয়ার সময় মানিক পসারী ইব্রাহিম কুট্টির হত্যার বিবরণ দিয়ে বলেন, ইব্রাহিম তাদের বাড়িতে কাজ করত। ১৯৭১ সালে ১৮ মে পাক সেনাবাহিনী নিয়ে দেলোয়ার শিকদার বর্তমানে সাঈদী, সেকেন্দার শিকদার, দানেশ আলী মোল্লা, মোসলেম মাওলানা, রেজাকার মবিন, হাকিম কারী, সোবহান মাওলানাসহ আরো অনেক রেজাকার আমার বাড়িতে প্রবেশ করে। তাদের আসতে দেখে আমি বাড়ির পাশে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকি এবং সব ঘটনা দেখতে থাকি। তারা আমার বাড়িতে প্রবেশ করে আমার ফুফাত ভাই মফিজ উদ্দিন (বাড়িতে কাজ করত) এবং অপর কাজের লোক ইব্রাহিম কুট্টিকে আর্মিরা ধরে একই দড়িতে বাঁধে। তারপর ঘরে লুটপাট করে সোনাদানা দেলু শিকদার, সেকেন্দার শিকদার, মোসলেম মাওলানা নিয়ে যায়। লুটের পর দেলোয়ার শিকদারের (একেই বর্তমান সাঈদী হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি) নেতৃত্বে রাজাকার বাহিনী ঘরে কেরোসিন ছিটায়। তারপর দেলোয়ার শিকদার ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। মফিজ ও ইব্রাহিম কুট্টিকে বেঁধে পারেরহাট নিয়ে যাবার সময় আমি তাদের পেছনে পেছনে যেতে থাকি। তাকে পারেরহাট বাজারের মধ্যে ব্রিজের ওপারে নিয়ে গেলে আমি এপারে বসে তাদের লক্ষ্য করি। দেলোয়ার হোসেন শিকদারকে আর্মির সাথে পরামর্শ করতে দেখি। তারপর দেলোয়ার হোসেন শিকদার, সেকেন্দার শিকদারের সাথে পরামর্শক্রমে পাক আর্মিরা ইব্রাহিম কুট্টিকে গুলি করে। ইব্রাহিম চিৎকার মারে। তারপর লাশ নদীতে ফেলে দেয়।
ইব্রাহিক কুট্টিকে মাওলানা সাঈদীর নেতৃত্বে ধরে এবং তারই নির্দেশে হত্যার বিষয়ে এর আগে গত ২১ ডিসেম্বর আদালতে সাক্ষ্য দেন চতুর্থ সাক্ষী সুলতান আহমদ হাওলাদার। তিনিও ইব্রাহিম কুট্টির হত্যার বিষয়ে মানিক পসারীর মত ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, মানিক পসারীর বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে দেখি দানেশ আলী মোল্লা, দেলোয়ার হোসেন শিকদার বর্তমান সাঈদী, মোসলেম মাওলানাসহ অনেক রাজাকার বাহিনী মানিক পসারীর কর্মচারী ইব্রাহিম কুট্টিকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে বাজারের দিকে। আমি তাদের পিছু পিছু যেতে থাকি। বাজারের ব্রিজ পার হয়ে পশ্চিম দিকে যাবার পর আমি এপার বসে থাকি। উত্তর দিকে থানার ঘাট পর্যন্ত নিয়ে যাবার পর দেলোয়ার হোসেন শিকদার বর্তমানে সাঈদী সাহেব পাক আর্মির সাথে কি যেন বলাবলি করছে দেখতে পাই। তখনই বিকট গুলির শব্দ এবং চিৎকার শুনতে পাই। এরপর ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে আসার পর পরের দিন শুনতে পাই মানিক পসারীর বাড়ির কাজের লোক ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যা করে পানিতে ফেলে দিয়েছে।
ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যা বিষয়ে এ দুইজন সাক্ষীর বিবরণের সাথে কোনো মিল নেই আজ মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীদের উপস্থাপিত তথ্য প্রমানের সাথে।
ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রীর মমতাজ বেগম ১৯৭২ সালে পিরোজপুরে যে হত্যা মামলা করেন তার এজহারে উল্লেখ করা হয়েছে ইব্রাহিম কুট্টির বাড়ি বাদুরা। তিনি কিছু হিন্দুকে বাড়িতে আশ্রয় দেয়ার কারণে পাক আর্মি এবং রাজাকারদের রোষানলে পড়েন। সে কারণে জীবন বাঁচাতে তার স্বামী ইব্রাহীম কুট্টি তাকে নিয়ে তার বাপের বাড়ি নল বুনিয়ায় চলে আসেন। অর্থাৎ ইব্রাহিম কুট্টি তার শ্বশুর বাড়ি যান স্ত্রীকে নিয়ে। মমতাজ বেগম মামলার এজহারে বলেন, তিনি তার স্বামীকে নিয়ে বাপের বাড়ি থাকা অবস্থায় ১ অক্টোবর ১৯৭১ সালে আসামীরা তার স্বামী ইব্রাহীম কুট্টি এবং ভাই সিরাজকে গুলি করে হত্যা করে।
মমতাজ বেগম তার স্বামীর হত্যা মামলায় যাদের আসামী করেছেন তারা হলেন, দানেশ মোল্লা, আতাহার আল, আশ্রাব আলী, আব্দুল মান্নান, আইউব আলী কালাম চৌধুরী, রুহুল আমিন, আব্দুল হাকিম মুন্সি, মমিন উদ্দিন, সেকোন্দার আলী শিকদার, শামসুর রহমান এসআই, মোসলেম মাওলানা। আসামীদের তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। যারা আসামী তাদের প্রায় সকলেই কুখ্যাত রাজাকার এবং পিস কমিটির নেতা ছিল বলে স্বাীকার করেছেন মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আসা সাক্ষীরা।
ইব্রাহিম কুট্টি মানিক পসারীর বাড়িতে কাজ করলেও তার স্ত্রী এবং ছেলে মেয়ে কোথায় কি অবস্থায় আছে তার কিছুই জানেন না বলে জেরার সময় জানান সাক্ষী। মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীরা জানান, ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম মামলার সময় আসামীদের বিষয়ে মানিক পসারীকে জানিয়েছেন এবং তার স্বামী কিভাবে নিহত হন তাও জানিয়েছেন। কিন্তু তা জানা সত্ত্বেও মানিক পসারী সত্য গোপন করে ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রীসহ তাদের সন্তান এবং মামলার আসামীদের না চেনার কথা বলেছেন। এ অভিযোগ সত্য নয় বলে জানান মানিক পসারী।
এদিকে মানকি পসারী আদালতের জেরার সময় স্বীকার করেন, তিনি কোনো মুক্তিযোদ্ধা নন। কিন্তু ২০১০ সালে পিরোজপুরের বর্তমান এমপি একেএম আবুদল আউয়াল তাকে মুক্তিযোদ্ধ আখ্যায়িত করে ডিও লেটার দিয়েছেন বলে স্বীকার করেছন মানিক পসারী। ডিও লেটারে এমপি উল্লেখ করেন, ‘মানিক পসারী ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করিয়া আমার সাথে থাকিয়া সুন্দরবন এলাকায় বীরত্বের সাথে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ করিয়াছে।’
মুক্তিযুদ্ধ না করা সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে চাওয়া এবং ডিও লেটার গ্রহণ বিষয়ে মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীর জেরায় মানিক পসারী বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়াইছি, পরাইছি, আশ্রয় দিয়েছি, তাই তালিকাভুক্ত হতে চেয়েছি।
*****যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনালের আইনজীবি, প্রসিকিউটর আর বিচারকরা মিলে এতদিন সময় নিয়ে শেষ পর্যন্ত এই তথ্য গুলো বের করলো?
সামনের দিনগুলোতে আর কি কি বের হয় তার জন্য প্রতীক্ষা............*****
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০১১ রাত ৮:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



