কবিতা:
আমি কবিতার পঠক কেমন- এই প্রশ্ন নিজেকে ইদানিং প্রায়ই করি। সম্ভবত ভালো না। ইদানিং আমার তাই মনে হয়। কারণ কবিতা আর আগের মত পাঠ করা হচ্ছেনা। বই মেলার উপলক্ষে দুইটি কবিতার বই কেনা হলো।
প্রথমটি হলো আমাদের নারায়ণগন্জের কবি কাজল কাননে’র ‘পালকে পালকে ছেয়ে গেছে ঘর’ বইটি। কাজল দা দীর্ঘদিন ধরে কাব্য চর্চা করে আসছেন। বাইটির কবিতাগুলো এখনো ভালো ভাবে পাঠ করা হয়ে উঠে নাই। বইটি আমি অনেকটা খামখেয়ালির ভঙ্গিতে পড়িছি। মানে কবিতার বই হলে যে সুবিধাটা পাওয়া যায়, ওইটা আর কি। মাঝখান থেকে র্যা নডম ভাবে একটা কবিতা বের করে পড়ি, দেন তারপরেরটা, দেন তারপরেরটা- এই ভাবে যে কয়টা ভালো লাগে। এই মূহুর্তে আমি অফিসে থাকায় কাজল দা’র কবিতা থেকে কিছু কোট করতে পারলাম না। পরে দিবো আশা করি।
এরপর যে বইটি বেশ আগ্রহ নিয়ে এইবারের বইমেলা থেকে কিনেছি, সেটি হল মজনু শাহ’র ‘জেব্রামাস্টার’। মজনু শাহ’র কবিতার পাঠকদের আর নতুন করে তার কবিতা সর্ম্পকে বলে দিতে হবে না আশা করি। তবে আমার নিজের অভিজ্ঞাতার কথা একটু বলি।
আমি প্রথম মজনু শাহ’র কবিতা পড়ি, উনার ‘লীলাচূর্ণ’ কাব্যগ্রন্থটি যখন প্রকাশিত হয় তখন। আমার ব্যাডলাক, আমি গ্রন্থটি সংগ্রহ করতে পরি নাই এবং সত্যি বলতে আমি ঠিক মত এই কবিতাগুলো পড়তেও পরি নাই। তবে এক বসায় যতটুকু পড়েছিলাম, সেই অভিজ্ঞতার অনুভূতি এখনও যখন মনে করার চেস্টা করি- অসাধরণ মনে হয়। এটা অনেক দিন আগে কথা। এখন এমন হতেও পারে ‘লীলচূর্ণ’ হাতে পেলে কবিতাগুলো হয়তো সেই আগের মত নাও মনে হতে পারে। যাই হোক, এরপর আমি ওনার কবিতা মূলত বিচ্ছিন্ন ভাবে, বিভিন্ন ভাবে পাঠ করেছি- কখনও লিটল ম্যাগে, কখন দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতায়। ‘জব্রামাস্টার’ প্রকাশিত হওয়ার আগেই ফেসবুক ও বিভিন্ন বাংলা ব্লগে এইটা নিয়ে নানান জনের মন্তব্য, কমেন্ট ইত্যাদি চোখে পড়েছে। ফলে বইটি সংগ্রহ করার ইচ্ছাটা পাকা-পোক্ত হয়। এবং কিনেও ফেলি।
এই বইটির কবিতাগুলোও এখনও ঠিক-ঠাক পাঠ করা হয়ে ওঠেনি। ফলে কবিতাগুলো নিয়ে কিছু বলা এই মূহুর্তে সম্ভব না। আমি এইখানে এই গ্রন্থটির একটি রিভিও এবং একটি কবিতা শেয়ার করছি, কেউ আগ্রহী হলে পড়ে নিতে পারেন –
কোনো কোনো বিকেলবেলা, ইচ্ছে হয়, শয়তানের সঙ্গে বসে কফি
খাই। তার জীবনে কোনো প্রেম এসেছিল কিনা, আমার মতো তার
ঘুমের ভেতর দিয়েও সুড়ঙ্গ আছে কিনা এসব জানার ইচ্ছে হয়।
কিন্তু মুশকিল হলো, যে কোনো বিকেলবেলাই চট করে ফুরিয়ে
আসে। আমি এইসব বিষণ্ন রঙের সন্ধ্যায়, কাগজের তৈরি জোকারের
লম্বা টুপি পরে, ঝুমঝুমি হাতে, নূপুর পায়ে বেশ্যাবাড়ির পাশ দিয়ে
হেঁটে যাই। আর অকারণে মনে হতে থাকে, সব বেশ্যাবাড়িতেই
একটা করে পূর্ণবয়স্ক জামগাছ থাকা উচিত। প্রতিটি জামগাছের নিচে
এত অন্ধকার জমা হয় যে, তাকেই মনে হয় অভিভাবক! মহাব্যস্ত
শয়তানের সঙ্গে, রাতে, কফি নয়, পাকা পাকা জাম খেতে খেতে এই
মানবজন্ম কিম্বা অশ্বডিম্ব নিয়ে অনেক কথা বলার ইচ্ছে হয়। কিন্তু
মুশকিল হলো, চট করে রাতও ফুরিয়ে আসে। দিনে সাধারণত আমি
চালাই বুলডোজার,কেননা প্রত্যেক রাতেই অদৃশ্য কারা ইদানীং গড়ে
তুলছে খুলির পাহাড়...
আর এই বইটি নিয়ে আলোচানার লিংটি পাওয়া যাবে এইখানে।
গল্প:
আমি গল্পগ্রন্থ পড়া শুরু করি উপন্যাস ও কবিতা পাঠের অনেক পরে। সম্ভবত অনুবাদ ছোটগল্প পাঠের মধ্যে দিয়ে আমার গল্পপাঠের জগতৎ উন্মোচিত হয়। বহু আগে, একদম প্রথম দিকের পড়া একটা গল্পগ্রন্থ ছিল, জ্যাক লন্ডনের শ্রেষ্ট গল্পের সংগ্রহ। তারপর আনেক অনুবাদ পড়েছি এবং অনুবাদ ছাড়াও আমার এইখানকার গল্পকারদের গল্পও পড়া হয়েছে কিছু।
তো এই বারের বইমেলায় যে গল্প গ্রন্থটি সংগ্রহ করলাম সেটি সালাহ উদ্দিন শুভ্র’র ‘মানবসঙ্গবিরল’। শুভ্র’র একটা গল্প আমি ওনার সামুর ব্লগে পড়েছিলাম- ফরহাদ মজহারের লুঙ্গি সংক্রান্ত বিষয়টিকে কেন্দ্র করে; গল্পটি পাঠ করে আমার ভালো লেগেছিলো। তাই কিনে ফেললাম। এখনো পড়া হয়ে ওঠেনি।
উপন্যাস:
এইবারের বইমেলা থেকে দুইটি উপন্যাস কিনেছি। একটি হলো, শাহ্যাদ ফিরদউসের ‘শাইলকের বাণিজ্য বিস্তার’ সংহতী প্রকাশন থেকে প্রকাশিত। এবং অন্যটি হলো মামুন হুসাইনের ‘নিক্রপলিস’।
শাহ্যাদ ফিরদউসের কোন লেখাই আমি পড়ি নাই। তবে এই উপন্যাটির কথা শুনেছি। পড়ে বলতে পারবো কেমন। তার আগে কিছু বলতে পারছিনা। তাই এইটা নিয়ে আর বেশি কিছু বলার নাই।
দ্বিতীয়টি সর্ম্পকে একটু বলি। এইবারের বইমেলা থেকে যে কয়টি বই কিনেছি তার মধ্যে এই উপন্যাসটি আমি এখন পড়ছি। মামুন হুসাইন ইতিমধ্যেই গল্পকার হিসাবে সুখ্যাতি অর্জণ করেছেন। এটি তার প্রথম উপন্যাস। বুহদিন আগে, বছর দুই হবে- উনি একবার নারায়ণগন্জে এসেছিলেন, আমাদের এক বড়ভাই হাসান জাফরুলে গল্পগ্রন্থের প্রকাশনা উৎসবে আলোচক হয়ে। তখনি জেনেছিলাম, ওনি উপন্যাস লিখছেন। তো, এইবারে উপন্যাস প্রকাশিত হলে আর দেরি করিনি এটি সংগ্রহ করতে।
মামুন হুসাইনের কোন গল্প পড়া আমার হয়নি। বিষয়টা হাস্যকর। আমি নানান মানুষের কাছে শুনেছি ওনি ভালো গল্প লেখেন। তো, গল্প না হোক, এখন উপন্যাস পাঠ করে নিয়ে গল্প পাঠ করবো।
তবে আমি উনার প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘কথা ইশার’ পাঠ করেছিলাম, কিন্তু ভাষাটা ঠিক মত ধরতে পারি নাই। আমার ভালো লাগে নাই। এবং উপন্যাসটি পাঠ করতে গিয়ে লক্ষ করলাম, উপন্যাসটা ওনার ‘কাথা ইশার’র ভাষার মত অনেকটা। তবে মজার বিষয় হলো, উপন্যাস হিসেবে এই ভাষ পড়তে খারাপ লাগছেনা। বরং মজা পেতে শুরু করেছি। ছোট ছোট সরল বাক্য। অনেক অনেক দৃষ্যকল্পো চোখের সামনে তুলে ধরেছে। আরো মজার বিষয় হলো গল্পের পটভূমিতে আমার পরিচিত অনেক ক্যারেক্টার উনি বন্দি করে ফেলেছেন। আমি যদিও ৩০ পৃষ্টার মত পড়েছি, এবং উপন্যাসটার পটভূমিতে টাইম এবং স্পেসের ভাংচুর উপভোগ করতে শুরু করছি। আমি কয়েক লাইন কোট করি, পাঠকদের ভাষাটার স্বাদ দিতে –
"....অগত্যা আমরা আমাদের হত্যাকাল এড়ানোর জন্য ফেসবুকে নাম লেখাই এবং ফ্রেন্ড সার্কেল তৈরিতে নিশি জগরণ শুরু করি - ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। উনি আমার আন্টি ফ্রেন্ড। ও আমার গার্ল ফ্রেন্ড। এ আমার কোচিং ফ্রেন্ড। ও আামার রেগুলার ফ্রেন্ড। ও আমার আড্ডার ফ্রেন্ড, উনি আমার ক্লাস ফ্রেন্ড। উনি আমার কলিগ ফ্রেন্ড, উনি আমার আপু ফ্রেন্ড। উনি আমার কালচারাল ফ্রেন্ড - এইভাবে আমাদের বন্ধু রাজ্য মেঘমালার মত দীর্ঘতর হতে শুরু করে। এই সব সম্বোধনে আমরা ঝগড়া করি অথবা ভালোবোসতে শুরু করি। আমাদের এক বন্ধু তখন ঘরে বাইরে লুঙ্গি পরতে শুরু করে। এই নিয়ে লুঙ্গি কাহিনী চলতে থাকে অনেকদিন পর্যন্ত। অরূপ ভাইয়া ও রাহী ফ্রেন্ড লুঙ্গি সর্ম্পকে গুরুদর্শন আলোচনা শুরু করলে আমরা অবাক বিস্ময়ে বহুজাতিক কোম্পানির সুশ্রী মনিটেরে লেখাপড়ার আয়োজন গ্রহন করি রাত জেগে। ...... – (পৃষ্ঠা ১৩ থেকে)"।
আশা করি উপন্যাসটা চমৎকার পাঠ্য হয়ে উঠবে।
প্রবন্ধ ও অন্যান্য:
কবিতা, গল্প এবং উপন্যাসের বাইরে যে গ্রন্থগুলো এইবারের বই মেলা থেকে কিনেছি তার একটা হলো আনু মুহাম্মদে’র ‘মানুষের সমাজ’ গ্রন্থটি।
অনু স্যারের লেখা-লেখির সাথে আমার যোগাযোগ অনেক বেশি। এবং ওনার লেখার আমি নিবেদিত পাঠকও। ওনার চিন্তা আমাকে আলোড়িত করে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে ‘তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যু-বন্ধার রক্ষা জাতীয় কমিটি’র নানান কর্মকান্ডের ভুমিকা অত্যান্ত প্রভাবশালী। ওনার এই গ্রন্থটির নামও আমি নানান জনের মুখেই শুনেছি। তখন থেকেই ইচ্ছে ছিল বইটি পড়ার। বইটি নতুন করে প্রকাশিত করেছে ‘সংহতী প্রকাশন’। তবে বইটি এখনো পড়া হয়নি।
বাংলাদেশে ইতিহাস চর্চা অবস্থা ভয়াবহ বলা যায়। ইতিহাসের বিকৃতি কোন নতুন ঘটনা নয়। শাষকগোষ্ঠি তাদের নিজের সুবিধা মত ইতিহাস তৈরি করে জনগনের ইতিহাস দখল করে আছে। ইতিহাস দখন মাথা-মস্তিষ্ক দখলের মতই। ফলে, ইতিহাসের এই দখল থেকে মুক্ত না হয়ে বাংলাদেশের জনগনের মুক্তি ও উন্নয়ণ সম্ভব নয়। বদরুদ্দীন উমর সাহেবের লেখালেখির ধার অন্য রকম। ফলে বইটি কাজে দিবে আশা করি।
‘সিপিবি’র রাজনীতি ও লেজুরবাদ’ এইটি ঠিক বই নয়, এইটাকে প্রচারপত্র বলা যেতে পারে। আনু মুহাম্মাদের একটি প্রবন্ধ এবং প্রাসঙ্গিক ভূমিকা সংযোজন করে রংপুর থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন এবং এই আন্দোলনে লেজুরবৃ্ত্তির ধরণ এবং ইতিহাস সর্ম্পকে কিছু ধারণা পাওয়া যাবে বলেই আমার বিশ্বায়। তাই এই বইটি বেশ ইনটেরেস্টিং মনে হয়েছে। আর আনু স্যারের লেখা- সো দেখা যাক কি পাওয়া যায়।
বর্তমানে ফরহাদ মজহার সাহেব সর্ম্পকে তার বইয়ের ফ্ল্যাপে তার সর্ম্পকে যে কয়েটা কথা উল্লেখ্য থাকে তার মধ্যে একটা হলো, তিনি কিংবাদন্তিতে রুপান্তরিত হয়েছে। তবে লোকটার যে ব্যাপক পড়াশুনা আছে, সেইটা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করতে পারবেনা। এই বিষেয়ে আমি সলিমুল্লাহ খান সাহেবের গত জন্মদিনে বিড-আর্টিসে প্রকাশিত একটা সাক্ষাতকারের কথা মনে করতে পারি।
‘মার্ক্স পাঠের ভূমিকা’ গ্রন্থে যে সকল লেখাগুলো একত্রিত করা হয়েছে তার সবগুলোই মজহার সাহেব অনেক আগে লিখেছিলেন। বর্তমানে মজহার সাহেব কমিউনিস্ট কিনা, এইটা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে; যদিও তিনি তার প্রকাশিত গ্রন্থ ‘মোকাবেলা’র ভূমিকায় নিজের অবস্থান পরিস্কার করেছেন। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে ওনার লেখা ও বিশ্লেষণ পছন্দ করি। তবে সেই সাথে ওনার লেখার পর্যালোচানাও করতে আগ্রহি। এই বইটি, মাক্সবাদ পাঠ এবং মাজহার সাহেবকে বুঝতে ভালো কাজে দিবো বলে আশা করি।
তো মোটামুটি এইছিল আমার এবারের বইমেলা থেকে সংগ্রহ করা বই-পত্র। আরো একটা বই আছে, তবে ওইটা যেদিন কিনেছি, ওই দিনিই আমার বন্ধু, আদনান নিয়ে গেছে। ওইটা ‘কাল মার্ক্সে’র কিছু নির্বাচিত রচনার সংকলন।
আসলে অনেক দিন কোন পোস্ট দেই না। তাই ভাবলাম, যে বইগুলো কিনেছি ওইগুলো নিয়ে একটা ফাকি বাজি পোস্ট দিয়ে দিবো। কিন্তু ফাকিবাজি হলেও টাইপ করেতে করেতে আঙ্গুল ব্যাথা হয়ে গেল। আর যারা কষ্ট করে লখাটি পড়েছেন এবং মন্তব্যা করবেন তাদের সবাইকে অগ্রিম ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করছি।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মার্চ, ২০১১ দুপুর ১:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



