ইসরাইলের ইতিহাসবেত্তা ও “ইসরাইল এন্ড দ্য বোম্ব” বইয়ের লেখক আবনার কোহেন এবং মার্কিন পরমাণু অস্ত্রনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম বার যৌথভাবে এই নিবন্ধটি লেখেন। এতে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে গোপনীয় বিদেশনীতি “ইসরাইলের পারমানবিক কর্মসূচী” সম্পর্কে তৎকালীন নিক্সন প্রশাসনের গোপন দলিল থেকে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। ইরান ও উত্তর কোরিয়া পারমানবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) তে স্বাক্ষর করেছে, অথচ ইসরাইল কখনোই এনপিটি তে স্বাক্ষর করেনি। এর ফলে তারা রাষ্ট্রসংঘের অবরোধ আরোপের হুমকীর সম্মুখীন নয় এবং তাদের পারমাণবিক স্থাপনাসমূহে আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থাকে তদারকি চালাতে দিতেও বাধ্য নয়। স¤প্রতি প্রকাশিত দলিলগুলোতে ১৯৬৯ সালে হোয়াইট হাউসের গোপন আলোচনার গূঢ় তথ্য বর্ণনা করা হয়েছে। এই সময়টিতে এনপিটি ’র ভবিষ্যত এবং এতে স্বাক্ষর নিয়ে প্রায় অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এর প্রায় চার দশক পর যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের তার পারমানবিক কর্মসূচী বন্ধ রাখার জন্য চেষ্টা করছে, তখন এই আলোচনার তথ্য বেরিয়ে আসে। প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মায়ার ১৯৬৯ সালে এমন এক গোপন সমঝোতায় উপনীত হন, যার ফলে ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচী বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগের অবসান ঘটে।
১৯৫৮ সাল থেকে ইসরাইল গোপনে নেগেভ মরু অঞ্চলে ডিমোনা পারমাণবিক চুল্লিতে কাজ শুরু করে। সি আই এ বুঝতে পারে, ইসরাইল এক দশকের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বানিয়ে ফেলবে। সিআইএ’র এই তথ্যের প্রেক্ষিতে কেনেডি ও জনসন প্রশাসন অভিনব কার্যক্রম শুরু করে। ইসরাইল যাতে পারমাণবিক বোমা বানাতে না পারে, সেজন্য তারা বছর বছর ডিমোনা সফর শুরু করলেন। জনসন প্রশাসনের কর্মকর্তারা ইসরাইলকে এনপিটি'’তে স্বাক্ষরের জন্য চাপ দিতে থাকেন। তারা হুমকী দেন, এ চুক্তিতে স্বাক্ষর না করলে ইসরাইলকে এফ-৪ ফ্যান্টম বিমান সরবরাহ বন্ধ করে দেবেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইসরাইল এনপিটিতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করে। তারা সুকৌশলে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচী গোপন করে ফেলে এবং মিথ্যা প্রতিশ্র“তি দেয় যে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম পারমাণবিক বোমার মালিক হতে চায় না। কোহেন ও বারের প্রকাশিত নিবন্ধের তথ্যানুযায়ী, ১৯৬৯ সালে নিক্সনের নির্বাচন অভিযানকালে মার্কিন নীতির পরিবর্তন হয়। নিবন্ধে বলা হয়, নিক্সন প্রশাসন একটি গোপন দলিল তৈরী করে, যাতে ইসরাইলের পারমাণবিক উচ্চাভিলাষের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়। ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে তৎকালীণ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মেলভিন আর. লায়ার্ড লেখেন, “এই ধরণের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে নয় এবং সম্ভব হলে তা বন্ধ করতে হবে।” ইসরাইল তার পারমাণবিক ক্ষমতা প্রকাশ্যে প্রদর্শন করতে পারে এই চিন্তায় যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন ছিল।
১৯৬৯ সালের সেপ্টেম্বরে গোল্ডা মায়ারের ওয়াশিংটন সফরের আগেই নিক্সন প্রশাসন বুঝতে পারে যে, ইসরাইল ইতোমধ্যে পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে দুই নেতার মধ্যে গোপন বৈঠক হয়। বৈঠকের বিস্তারিত বিবরণ জানা না গেলেও এটা প্রকাশ পায় যে, ঊভয়পক্ষে একটা সমঝোতা হয়। নিক্সনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের বক্তব্য অনুযায়ী জানা যায়, নিক্সন গোল্ডামায়ারকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ইসরাইল পারমাণবিক অস্ত্র প্রদর্শন করতে এবং পারমাণবিক পরীক্ষা চালাতে পারবে না। এর অর্থ দাঁড়ায়, যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে গোপনে তার পারমাণবিক কর্মসূচী চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেবে এবং যতদিন তেলআবিব তার পারমাণবিক কর্মসূচী গোপন রাখবে, ততদিন সে তা চালিয়ে যেতে পারবে। ওয়াশিংটনে ইসরাইলের তৎকালীণ রাষ্ট্রদূত ইজাক রবিন কিসিঞ্জারকে অনুুরোধ করেন যে, কিসিঞ্জার যেন নিক্সনকে বলেন, এনপিটিতে স্বাক্ষর করার ইচ্ছা ইসরাইলের নেই। নিক্সন মায়ার চুক্তিতে সেই থেকে ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচী বিশ্বের সবচেয়ে গোপন এবং ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র কর্মসূচী হিসেবে টিকে রয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই এপ্রিল, ২০১১ বিকাল ৩:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



