কুরআন, হাদীস ও বিবেক-বুদ্ধি অনুযায়ী
ঈমান থাকলেই বেহেশত পাওয়া যাবে
বর্ণনা সম্বলিত হাদীসের সঠিক ব্যাখ্যা
প্রফেসর ডাঃ মোঃ মতিয়ার রহমান
মূল বিষয়
হাদীস গ্রন্থসমূহে ঈমানের সাথে বেহেশত পাওয়ার না পাওয়ার সম্পর্ক বর্ণনাকারী বেশ কিছু হাদীস উল্লেখ আছে। ঐ হাদীসগুলোকে দু’ভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা-
ক. ‘ঈমান থাকলেই সরাসরি বেহেশত পাওয়া যাবে’- এ ধরনের বক্তব্যসম্বলিত হাদীস।
খ. ‘ঈমান থাকলে দোযখে যাওয়ার মত বড় গুনাহ করলেও কিছুকাল দোযখে থাকার পর আল্লাহর সরাসরি ইচ্ছা বা অন্যের শাফায়াতের মাধ্যমে চিরকালের জন্যে বেহেশত পাওয়া যাবে’-এ ধরনের বক্তব্যসম্বলিত হাদীস।
ঐ সকল হাদীস থেকে উৎপত্তি হওয়া অসতর্ক ধারণার কারণে বর্তমান বিশ্বে অসংখ্য ঈমানের দাবিদার ব্যক্তি, ইসলামের যে আমল করতে ব্যক্তিগত ত্যাগ বা কষ্ট স্বীকার করা লাগে, তা থেকে এটি ভেবে দূরে থাকছে যে-ঈমান যখন আছে তখন তো সরাসরি বা একদিন না একদিন বেহেশতে যাবই, তাই ত্যাগ স্বীকার করা বা কষ্টের আমল করার দরকার নেই। আর এর ফলস্বরূপ মহান আল্লাহর মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য তথা আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সামনে রেখে কুরআনে বর্ণিত সকল ন্যায়ের বাস্তবায়ন ও অন্যায়ের প্রতিরোধের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ করা এবং নবী-রাসূল (সা.) প্রেরণের উদ্দেশ্য তথা মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যে আল্লাহর দীনকে বিজয়ী করা, কঠিন বা অসম্ভব হচ্ছে।
এটি একটি বাস্তব অবস্থা। সমাজে যারা চোখ খুলে চলাফেরা করে তাদের কেউ এটি অস্বীকার করবে বলে আমার মনে হয় না। তাই ঐ সকল হাদীস পর্যলোচনা করে সঠিক তথ্য জাতির সামনে তুলে ধরা আজ সময়ের দাবি।
বর্তমান প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রথম ধরনের হাদীস তথা যে সকল হাদীস থেকে ‘ঈমান থাকলেই সরাসরি বেহেশত পাওয়া যাবে’ বলে ধারণা হয়, সে সকল হাদীসে রাসূল (সা.) প্রকৃতভাবে কী বলেছেন বা বুঝিয়েছেন, তা কুরআন, হাদীস ও বিবেক-বুদ্ধির আলোকে পর্যলোচনা করে জাতির সামনে উপস্থাপন করা। আর এর মাধ্যমে জাতিকে ঐ হাদীসগুলো থেকে উৎপত্তি হওয়া অসতর্ক ধারণার মহাতি থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করা।
আর যে সকল হাদীস থেকে ধারণা পাওয়া যায় ‘ঈমান থাকলে দোযখে যাওয়ার মত গুনাহ করলেও কিছুকাল দোযখে থাকার পর আল্লাহর সরাসরি ইচ্ছা বা অন্য কারো শাফায়াতের মাধ্যমে চিরকালের জন্যে বেহেশত পাওয়া যাবে’-সে হাদীসগুলোর প্রকৃত অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছি, ‘পবিত্র কুরআন, হাদীস ও বিবেক-বুদ্ধি অনুযায়ী শাফায়াতের মাধ্যমে দোযখ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে কি?’ নামক বইটিতে।
ঈমানের সংজ্ঞা (উবভরহরঃরড়হ)
কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী ঈমান তথা ‘ঈমান আনা’ আমলটির সাধারণ সংজ্ঞা হচ্ছে- কালেমা তাইয়্যেবা অর্থাৎ لاَ اِِلهَ اِلاَّ اللهُ مُحَمَّدُ الرَّسُوْلُ اللهِ কালেমাটি মুখে উচ্চারণ করা এবং ব্যাখ্যাসহ তার অর্থটি অন্তরে বিশ্বাস করা।
কালেমা তাইয়্যেবার সরল অর্থ হচ্ছে-‘আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল’। আর কালেমাটির অত্যন্ত সাধারণ ব্যাখ্যা হচ্ছেমানুষের দুনিয়ার জীবনকে সুখী, সমৃদ্ধ ও প্রগতিশীলভাবে পরিচালনা করে পরকালীন অনন্ত জীবনের সফলতা অর্জনের জন্যে, সকল নির্ভুল তথ্য, বিধি-বিধান দেয়ার ও সকল প্রয়োজন পূরণের একমাত্র স্বাধীন সত্তা মহান আল্লাহ। ঐ সকল তথ্য ও বিধি-বিধান তিনি তাঁর নির্বাচিত ব্যক্তি মুহম্মাদ (সা.) কে কুরআন এবং সূন্নাহের মাধ্যমে জানিয়েছেন। মুহাম্মাদ স. ঐ সকল বিষয় যেভাবে বাস্তবায়ন করেছেন সেটিই হল তা বাস্তবায়নের একমাত্র নির্ভুল পদ্ধতি।
তাহলে ‘ঈমান আনা’ আমলটির দ্বারা বুঝায়, কালেমা তাইয়্যেবাটি মুখে উচ্চারণ করা এবং কালেমাটির উপরোক্ত অর্থ ও ব্যাখ্যা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা।
‘আমলে সালেহের’ সংজ্ঞা (উবভরহরঃরড়হ)
ইসলামের করণীয় কাজ করা এবং নিষিদ্ধ কাজ হতে দূরে থাকাকে আমলে সালেহ বা সৎ কাজ বলে।
আর ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবনকে প্রকৃতভাবে সুখী, সমৃদ্ধ ও প্রগতিশীলভাবে পরিচালনা করার জন্যে করণীয় ও নিষিদ্ধ, ছোট বা বড় সকল কাজ আমলে সালেহের অন্তর্ভুক্ত।
ঈমান ব্যতীত আমলে সালেহ কবুল হওয়া না হওয়া
আল-কুরআন
তথ্য-১.
অর্থ: আর (পরকালে) যুলুম বা হক নষ্ট হওয়ার ভয় থাকবে না সেই ব্যক্তির যে আমলে সালেহ (সৎ কাজ) করবে এবং সাথে সাথে মু’মিন হবে। (ত্বাহা : ১১২)
ব্যাখ্যা: এ আয়াতেকারীমার মাধ্যমে আল্লাহ পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, পরকালে শাস্তি পাওয়া বা পাওনা নষ্ট হওয়ার ভয় থাকবে না শুধু সেই আমলে সালেহকারীদের, যাদের ঈমান থাকবে। অর্থাৎ ঈমান ছাড়া যারা সৎ কাজ করবে, পরকালে তাদের শান্তি পেতে হবে এবং সৎ কাজ করার জন্যে যে পুরস্কার তাদের পাওয়ার হক ছিল, সে হক থেকে তাদের বঞ্চিত হতে হবে। সুতরাং এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, আমলে সালেহ গ্রহণযোগ্য বা কবুল হতে হলে ঈমান অবশ্যই থাকতে হবে।
তথ্য-২
অর্থ: যে ব্যক্তিই সৎ কাজ করবে, পুরুষ হোক বা নারী হোক-সে যদি মু’মিন হয় তবে তাকে দুনিয়ার পবিত্র জীবন-যাপন করাব এবং (পরকালে) তার উত্তম কাজের জন্যে প্রাপ্য পুরস্কার দেব। (নাহল : ৯৭)
ব্যাখ্যা: এ আয়াতের মাধ্যমেও মহান আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন, আমলে সালেহকারী পুরুষ হোক আর মহিলা হোক, তার যদি ঈমান থাকে, তবে দুনিয়াতে আল্লাহ তাকে পবিত্র জীবন দিবেন এবং পরকালে তাকে ঐ কাজের জন্যে যোগ্য পুরস্কার দিবেন। অর্থাৎ আল্লাহ এখানেও জানিয়ে দিয়েছেন, আমলে সালেহের সাথে ঈমান থাকলেই শুধু দুনিয়ায় শান্তি ও পরকালে যোগ্য পুরস্কার পাওয়া যাবে।
তথ্য-৩
অর্থ: এখন যে লোক সৎকাজ করবে এবং মু’মিন হবে তার কোন প্রচেষ্টাই (কাজই) অস্বীকার করা হবে না এবং আমি তা লিখে রাখি। (আম্বিয়া:৯৪)
ব্যাখ্যা: এখানে আল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি সৎ কাজ করবে এবং সাথে সাথে মু’মিন হবে অর্থাৎ যে ব্যক্তি ঈমানের দাবির সাথে সঙ্গতি রেখে সৎকাজ করবে, তার কোন চেষ্টা-সাধনাই অস্বীকার করা হবে না। অর্থাৎ তার সকল চেষ্টা-সাধনা কবুল করা হবে। তাই এ আয়াত থেকেও পরোভাবে বুঝা যায়, আমলে সালেহের সাথে ঈমান না থাকলে ঐ আমল অস্বীকার করা হবে এবং তার জন্যে মানুষ কোন পুরস্কার পাবে না।
তথ্য-৪.
অর্থ: আর যারা ঈমান আনবে এবং সৎ কাজ করবে, তাদের (ছোট-খাট) গুনাহ মাফ করে দিব এবং তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের প্রতিফল দিব।
(আন-কাবুত : ৭)
ব্যাখ্যা: এখানে মহান আল্লাহ বলেছেন, যারা ঈমান আনবে এবং সৎ কাজ করবে, তাদের ছোট-খাট গুনাহ মাফ করে দিবেন এবং সৎ কাজের পুরস্কার দিবেন। লণীয় যে, আল্লাহ ‘ঈমান আনবে এবং সৎ কাজ করবে’ বলেছেন, ঈমান আনবে অথবা সৎ কাজ করবে বলেননি। তাই এখান থেকেও বুঝা যায়, সৎ কাজের সঙ্গে ঈমান থাকলে তাদের ছোট-খাট গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দিবেন এবং তাদের ঐ কাজের পুরস্কার দিবেন। অতএব বুঝা যায়, যারা ঈমান ছাড়া সৎ কাজ করবে তাদের ঐ কাজের কোন পুরস্কার দেয়া হবে না এবং তাদের ছোট-খাট গুনাহও মাফ করা হবে না। অর্থাৎ সৎ কাজ কবুল হওয়ার জন্য ঈমান শর্ত।
তথ্য-৫
অর্থ: যারা ঈমান আনবে এবং সৎ কাজ করবে তাদের প্রতি আল্লাহ ওয়াদা করছেন যে, তাদের (ছোট-খাট ভুল-ভ্রান্তি বা গুনাহ) মাফ করে দেয়া হবে এবং বিরাট প্রতিফল বা পুরস্কার দেয়া হবে। (মায়েদা : ৯)
ব্যাখ্যা: এখানে মহান আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, যারা ঈমান আনবে এবং (অথবা নয়) আমলে সালেহ করবে, তাদের ছোট-খাট গুনাহ মাফ করে দিবেন এবং তাদের ঐ আমলে সালেহের জন্যে অনেক বড় পুরস্কার দিবেন। এখান থেকেও বুঝা যায়, আমলে সালেহ করে মা ও পুরস্কার পেতে হলে তার সঙ্গে ঈমান থাকা লাগবে।
তথ্য-৬
অর্থ: নিশ্চয়ই মানুষ তির মধ্যে আছে। তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে, সৎ কাজ করে এবং একে অপরকে সত্য উপদেশ ও ধৈর্য ধারণের উৎসাহ দেয়। (আসর : ২,৩)
ব্যাখ্যা: এখানে আল্লাহ বলেছেন, যারা ঈমান এনেছে এবং (অথবা নয়) আমলে সালেহ করেছে, তারা ছাড়া অন্য সবাই তিগ্রস্ত। সুতরাং এ আয়াত দু’খানি থেকেও বুঝা যায়, আমলে সালেহের সঙ্গে ঈমান না থাকলে সকলকে তিগ্রস্ত হতে হবে।
এভাবে আল-কুরআনের যত স্থানে আমলে সালেহের জন্যে পুরস্কার, সওয়াব বা বেহেশতের ঘোষণা দেয়া হয়েছে সেখানে আমলে সালেহের সঙ্গে ঈমান থাকার কথা কোন না কোনভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। কোথাও শুধু আমলে সালেহের জন্যে পুরস্কার বা বেহেশতের ঘোষণা দেয়া হয়নি।
আল-হাদীস
৫০ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত হাদীসসমূহ থেকে পরিষ্কারভাবে জানা ও বুঝা যায় কাফির ব্যক্তি তাদের কৃত সৎকাজের জন্যে পরকালে কোন পুরস্কার পাবে না। অর্থাৎ ঈমান ছাড়া কেউ তার কৃত সৎকাজের কোন পুরস্কার পরকালে পাবে না।
কুরআন, হাদীস ও বিবেক-বুদ্ধির উল্লিখিত তথ্যসমূহের আলোকে তাই পরিষ্কারভাবে জানা ও বুঝা যায়, ঈমান ছাড়া কোন আমলে সালেহ তথা সৎকাজ আল্লাহর নিকট কবুল হবে না। তাই ঐ সৎকাজের কোন পুরস্কারও পরকালে মিলবে না।
ঈমান আমলে সালেহ কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হওয়ার কারণ
অহরহ এ প্রশ্নটি শুনা যায় বা মানুষের মনে উদয় হয় যে, একজন অমুসলিম (ইহুদী, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, হিন্দু ইত্যাদি), যে মানুুষের কল্যাণের জন্যে কিছু বা অনেক ভাল কাজ করছে, সে বেহেশতে কেন যাবে না বা সে বেহেশত কেন পাবে না? প্রশ্নটির উত্তর জানা ও বুঝা তেমন কঠিন নয়। আর তা জানা ও বুঝা সহজ হবে, ঈমান আমলে সালেহ কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হওয়ার কারণগুলো জানতে ও বুঝতে পারলে। বিষয়টি প্রত্যেক ঈমানদারের নিজের মনের প্রশান্তি ও অপরের প্রশ্নের সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত উত্তর দেয়ার জন্যে ভালভাবে জানা ও বুঝা দরকার।
আল্লাহ চান সকল মানুষ দুনিয়ার জীবন সুখী, সমৃদ্ধ ও প্রগতিশীলভাবে পরিচালনা করে আখিরাতের জীবনে অনন্ত সুখ-শান্তি লাভ করুক। আর মানুষের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ জানেন পুরুষ, নারী, ধনী, গরিব, উচ্চশিতি, অর্ধশিতি, অশিতি, কালো, সাদা এবং বিভিন্ন বংশ, গোত্র, জাতি বা দেশে জন্মগ্রহণ করা সকল মানুষের জীবনের সকল (ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, পারলৌকিক, আন্তর্জাতিক ইত্যাদি) দিকে সমানভাবে কল্যাণকর, চিরসত্য তথ্য ও বিধি-বিধান দেয়ার জন্যে যে জ্ঞান ও গুণ থাকা দরকার তা মানুষের নেই বা তা মানুষকে দেয়া হয়নি।
মহান আল্লাহ এটিও জানেন মানুষ যদি তাদের সীমাবদ্ধ জ্ঞান নিয়ে জীবনের সকল দিকের তথ্য ও বিধি-বিধান তৈরী করে তবে তাতে অনেক মৌলিক ভুল থাকবে। ঐ ভুল তথ্য ও বিধি-বিধান অনুযায়ী জীবনের বিভিন্ন দিক পরিচালনা করলে জীবন সুখী, সমৃদ্ধ ও প্রগতিশীল না হয়ে পুরোপুরি ব্যর্থ হবে। কারণ কোন বিষয়ে মৌলিক একটিও ভুল থাকলে ঐ বিষয়টি পুরোপুরি (১০০%) ব্যর্থ হয় এটি আল্লাহর নিজের তৈরী একটি প্রাকৃতিক আইন (ঘধঃঁৎধষ ষধ)ি। এ জন্যেই মহান আল্লাহ ঈমান আনাকে আমল কবুল হওয়ার পূর্ব শর্ত করেছেন। কারণ যারা ঈমান আনবে তারা জীবনের সকল দিকের তথ্য ও বিধি-বিধান গ্রহণ করবে নির্ভুল উৎস কুরআন ও সূন্নাহ থেকে এবং তারা ঐ তথ্য ও বিধি-বিধান বাস্তবায়ন করবে রাসূল স. এর দেখিয়ে দেয়া নির্ভুল পদ্ধতি অনুযায়ী। ফলে তাদের জীবন সকল দিক দিয়ে সুখী, সমৃদ্ধ ও প্রগতিশীল হবে।
আর যারা ঈমান আনবে না তারা জীবনের সকল দিকের তথ্য ও বিধি-বিধান গ্রহণ করবে এমন সব উৎস থেকে যাতে অনেক মৌলিক ভুল থাকবে। ফলে তাদের জীবন সুখী, সমৃদ্ধ ও প্রগতিশীল না হয়ে পুরোপুরি ব্যর্থ হবে।
তবে মহান আল্লাহ ঈমান আনার ব্যাপারে কাউকে জোর-জবরদস্তি করতে নিষেধ করেছেন। কারণ জোর-জবরদস্তি করে কাউকে মন দিয়ে বা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করানো যায় না। ইসলাম চায় প্রত্যেক ঈমানদার মনের থেকে নিষ্ঠার সঙ্গে ইসলামের সকল আমলে সালেহ বাস্তবায়ন করুক। তাই ঈমান আনার জন্যে উদ্বুদ্ধ করার ইসলাম সম্মত পদ্ধতি হল আল্লাহর অস্তিত্ব, একত্ব, জ্ঞান, মতা, যোগ্যতা, মানুষের জন্যে কল্যাণ কামনাকারী সত্তা হওয়া, কুরআন আল্লাহর কিতাব তথা নির্ভুল কিতাব হওয়া, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল হওয়া, ইসলামের সকল বিধি-বিধান মানুষের দুনিয়ার জীবনের জন্যে কল্যাণকর হওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো যুক্তির মাধ্যমে একজনের সামনে উপস্থাপন করা। যাতে বিষয়গুলো সস্তুষ্টচিত্তে সে মেনে নিতে পারে এবং মনের প্রশান্তি সহকারে ও দৃঢ়পদে তা আমল করতে পারে।
আমল অন্তরে ঈমান থাকার প্রমাণ
বিবেক-বুদ্ধি
বিবেক-বুদ্ধির চিরসত্য (ঊঃবৎহধষ ঞৎঁঃয) রায় হচ্ছে কোন ব্যক্তি যদি একটি বিষয় বিশ্বাস করে, তবে সেটি তার কথা ও কাজে অবশ্যই প্রকাশ পাবে। অর্থাৎ ব্যক্তির ঐ বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যশীল কথা ও কাজ প্রমাণ দিবে যে, সে অন্তরে বিষয়টি বিশ্বাস করে। তাই যদি দেখা যায় কোন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বা খুশি মনে তথা ওজর (ঊীপঁংব) ও অনুশোচনা ছাড়া কোন বিষয়ের বিরুদ্ধ কথা বলছে বা কাজ করছে, তবে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে যে, সে ঐ বিষয়টি অন্তরে বিশ্বাস করে না।
ঈমান হল কালেমা তৈয়েবার অর্থসহ ব্যাখ্যাটি অন্তরে বিশ্বাস করা। তাহলে বিবেক-বুদ্ধি অনুযায়ী সহজেই বলা যায় কোন ব্যক্তি অন্তরে ঈমান এনেছে কিনা তা বোঝা যাবে তার কথা ও কাজ দেখে। যদি দেখা যায় ব্যক্তিটি ইচ্ছাকৃতভাবে বা খুশী মনে তথা কোন ওজর ও অনুশোচনা ছাড়া ঈমানের দাবী বিরুদ্ধ কোন কাজ করছে বা কথা বলছে তা হলে বুঝতে হবে ব্যক্তির অন্তরে ঈমান নেই। সে যদি ঈমানের দাবীদার হয় তবে সে মুনাফেক। তাই বিবেক-বুদ্ধির আলোকে সহজেই বোঝা যায় আমল হল অন্তরে ঈমান থাকা না থাকার প্রমাণ।
আল-কুরআন
তথ্য-১
অর্থ: মানুষের মধ্যে এমন অনেকে আছে যারা (মুখে) বলে, আমরা ঈমান এনেছি কিন্তু (প্রকৃতপ)ে তারা ঈমানদার নয় বা ঈমান আনেনি।
(বাকারা : ৮)
ব্যাখ্যা: এখানে আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন, মানুষের মধ্যে এমন অনেকেই আছে বা থাকবে, যারা মুখে ঈমানের দাবি করলেও অন্তরে ঈমান আনেনি। অর্থাৎ তারা মুনাফিক। তবে এ ধরনের ব্যক্তি আসলে অন্তরে ঈমান এনেছে কিনা তা কিভাবে প্রমাণিত হবে বা বুঝা যাবে, সে ব্যাপারে এখানে কিছু বলা হয়নি।
তথ্য-২
অর্থ: যে ব্যক্তি ঈমান আনার পর (বাধ্য হয়ে) কোন কুফরী কথা বা কাজ করে অথচ অন্তরে সে ঈমানের প্রতি দৃঢ় আস্থাবান থাকে (তবে তার কোন গুনাহ নেই)। কিন্তু যে মনের সন্তোষসহকারে কুফরী কথা বা কাজ করে তার উপর আল্লাহর গযব বর্ষিত হবে। এদের জন্যে রয়েছে কঠিনতম আযাব। (নাহাল : ১০৬)
ব্যাখ্যা: এখানে মহান আল্লাহ পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দিয়েছেন ঈমানদার ওজরের কারণে বাধ্য হয়ে কোন কুফরী কথা বা আমল করলে তাতে তার কোন গুনাহ হবে না। কিন্তু ঈমানের দাবিদার ব্যক্তি মনের সন্তোষসহকারে তথা ইচ্ছাকৃতভাবে বা খুশী মনে কুফরী কথা বললে বা কাজ করলে তাকে কাফির বা মুনাফিক বলে গণ্য করা হবে এবং কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। এখান থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় আমল ছাড়ার ধরন প্রমাণ করবে অন্তরে ঈমান আছে কি নেই। অর্থাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে বা খুশীমনে আমল ছাড়লে প্রমাণিত হবে যে অন্তরে ঈমান নেই। আর ওজরের কারণে অনুশোচনাসহকারে আমল ছাড়লে প্রমাণিত হবে অন্তরে ঈমান আছে।
তথ্য-২
.
অর্থ: মানুষেরা কি মনে করেছে যে, ঈমান এনেছি এ কথাটি বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদের পরীা করা হবে না? অথচ তাদের পূর্বে যারা দুনিয়া থেকে চলে গিয়েছে, তাদের সকলকেই আমি (আমলের মাধ্যমে) পরীা করেছি। আল্লাহকে তো অবশ্যই (আমলের মাধ্যমে) পরীা করে জেনে নিতে হবে, কে (ঈমানের ব্যাপারে) সত্যবাদী আর কে মিথ্যাবাদী। (আন-কাবুত : ২)
ব্যাখ্যা: আল্লাহ এখানে উদাহরণের মাধ্যমে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, কালেমা তৈয়্যেবা মুখে উচ্চারণ করার মাধ্যমে ঈমানের দাবিদার সকলকে কাজের মাধ্যমে পরীা দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে, সে ঈমান আনার ব্যাপারে সত্যবাদী। যার সকল কাজ ঈমানের দাবির সঙ্গে সঙ্গতিশীল হবে, সে পরীায় পাস করবে অর্থাৎ সে অন্তরেও ঈমান এনেছে বলে প্রমাণিত হবে। আর যার কাজ ঈমানের দাবির সঙ্গে সঙ্গতিশীল হবে না বা বিপরীত হবে, সে পরীায় ফেল করেছে বলে ধরা হবে। অর্থাৎ প্রমাণিত হবে, মুখে ঈমান আনার দাবি করলেও অন্তরে সে ঈমান আনেনি। অর্থাৎ সে মুনাফিক।
তথ্য-৩
অর্থ: তোমরা মুখ পূর্ব দিক করলে না পশ্চিম দিক করলে, এটি কোন সওয়াবের (কল্যাণের) কাজ নয়, বরং কল্যাণের কাজ সে-ই করে যে আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতা, কিতাব ও নবীদের বিশ্বাস করে। আর শুধু আল্লাহর ভালবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ধন-সম্পদ আত্মীয়-স্বজন, মিসকিন, পথিক, সাহায্যপ্রার্থী ও ক্রীতদাস মুক্তির জন্যে ব্যয় করে এবং নামাজ কায়েম করে, জাকাত আদায় করে, ওয়াদা করলে তা পূরণ করে, দরিদ্রতা, বিপদ-আপদ ও হক-বাতিলের দ্বন্দ্বের সময় হকের পে ধৈর্য ধারণ করে। এরাই (ঈমানের ব্যাপারে) সত্যবাদী এবং এরাই মুত্তাকী। (বাকারা:১৭৭)
ব্যাখ্যা: আয়াতেকারীমাটিতে মহান আল্লাহ প্রথমে বলেছেন, নামাজের সময় মুখ পূর্ব বা পশ্চিম দিকে ফেরানো অর্থাৎ শুধু অনুষ্ঠান করার মধ্যে কোন সওয়াব নেই। এরপর তিনি যে সকল কাজে সওয়াব আছে, তার কয়েকটির নাম উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হচ্ছে-
ক. আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতা, কিতাব ও নবীদের প্রতি ঈমান আনা,
খ. শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে ধন-সম্পদ গরিব আত্মীয়-স্বজন, মিসকিন, পথিক, সাহায্যপ্রার্থী ও ক্রীতদাস মুক্তির জন্যে ব্যয় করা,
গ. নামাজ কায়েম করা,
ঘ. জাকাত আদায় করা,
ঙ. ওয়াদা করলে তা পূরণ করা এবং
চ. দারিদ্র্য, বিপদ-আপদ ও হক-বাতিলের দ্বন্দ্বের সময় হকের পে ধৈর্য ধারণ করা তথা দৃঢ়পদে দাঁড়িয়ে থাকা।
আয়াতখানির শেষে আল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তিরা খ. গ. ঘ. ঙ. ও চ. বিভাগের কাজগুলি করে, তারাই শুধু ঈমান আনা দাবির ব্যাপারে সত্যবাদী এবং প্রকৃত মুত্তাকী। অর্থাৎ মহান আল্লাহ এই আয়াতেকারীমার মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন, যে সকল কাজ তিনি পালন করতে আদেশ দিয়েছেন বা নিষেধ করেছেন এবং ঐ কাজগুলো যেভাবে তিনি পালন করতে বলেছেন, সেভাবেই যারা তা পালন করবে, শুধু তারাই ঈমানের দাবির ব্যাপারে সত্যবাদী ও প্রকৃত মুত্তাকী। আর যারা তা করবে না, তারা ঈমানদার ও মুত্তাকী নয়। অর্থাৎ এক ব্যক্তি প্রকৃত ঈমানদার ও মুত্তাকী কিনা, তা তার কাজের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে। যদি সে তা প্রমাণ করতে না পারে তবে বুঝতে হবে, মুখে দাবি করলেও সে অন্তরে ঈমান আনেনি। অর্থাৎ সে মুনাফিক।
তথ্য-৪
অর্থ: আল্লাহর নামে কসম খায় যে, তারা (সে কথা) বলেনি, অথচ নিঃসন্দেহে তারা কুফরি কথা বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর কুফরি অবলম্বন করেছে। আর তারা সে সব কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করেছিল, যা তারা করতে পারেনি। (তওবা : ৭৪)
ব্যাখ্যা: এখানে ইসলাম গ্রহণের পর তথা ঈমান আনার পর (ইচ্ছাকৃতভাবে) কুফরি কথা তথা ইসলাম বিরুদ্ধ কথা বলাকে কাফির তথা মুনাফিক বলে গণ্য হওয়ার বিষয় বলে মহান আল্লাহ উল্লেখ করেছেন।
তথ্য-৫
অর্থ: তারা যখন ঈমানদারদের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন বলে আমরা ঈমান এনেছি। কিন্তু যখন তাদের শয়তান বন্ধুদের সঙ্গে নিরিবিলিতে মিলিত হয়, তখন তারা বলে আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি। আমরা তো (মুসলমানদের সাথে) ঠাট্টা-উপহাস করি মাত্র। (বাকারা : ১৪)
ব্যাখ্যা: এখান থেকে বুঝা যায়, মুনাফিকির একটি বিষয় হচ্ছে ইসলাম নিয়ে ঠাট্টা-উপহাস করা। অর্থাৎ ঈমানের দাবিদার কেউ ইসলামের কোন বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-উপহাস করলে তাকে মুনাফিক বলে গণ্য হতে হবে।
তথ্য-৬
অর্থ: (এটা) এ কারণে যে, তারা আল্লাহর নাযিল করা বিষয়কে অপছন্দকারী ব্যক্তিদের বলে কিছু কিছু বিষয়ে আমরা তোমাদের অনুসরণ করব। (মুহাম্মাদ : ২৬)
ব্যাখ্যা: এই আয়াতে কারীমার আগের আয়াতখানিতে (২৫ নং) আল্লাহ এক ধরনের আচরণ অর্থাৎ আল্লাহর নাযিল করা বিষয়ের (ইসলামের) কিছু অনুসরণ করা আর কিছু অনুসরণ না করাকে শয়তানের পছন্দনীয় আচরণ বলে উল্লেখ করেছেন। আর পরের দু’টি (২৭ ও ২৮ নং) আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, যারা ইসলামের ব্যাপারে (ইচ্ছাকৃতভাবে) ঐ রকম আচরণ করবে, তাদের সকল আমল বিনষ্ট বা বিফল করে দিবেন এবং তাদের শাস্তি পেতে হবে।
এখান থেকে তাই পরিষ্কারভাবে বুঝা যায়, ঈমান আনার দাবি করলেও যারা ইসলামের কিছু বিষয় অনুসরণ করবে আর কিছু বিষয় (ইচ্ছাকৃতভাবে বা খুশী মনে) অমান্য করবে বা অনুসরণ করবে না, তারা আল্লাহর নিকট মুনাফিক বলে গণ্য হবে। আর তাই তাদের শাস্তি পেতে হবে।
আল-কুরআনের উল্লিখিত এ তথ্যসমূহ এবং এ ধরনের আরো অনেক তথ্য থেকে সহজেই বোঝা যায় যে আমল হল অন্তরে ঈমান থাকার প্রমাণ। তাই যে ইচ্ছাকৃতভাবে বা খুশীমনে ঈমানের দাবী বিরুদ্ধ কোন কথা বলবে বা কাজ করবে সে কাফির বা মুনাফিক বলে গণ্য হবে।
আল-হাদীস
তথ্য-১
অর্থ: আবু সাইদ খুদরী (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যে কেউ অন্যায় কাজ হতে দেখে সে যেন তা নিজ হাত দিয়ে বন্ধ করে। যদি ঐ মতা না থাকে তবে সে যেন নিজ জিহ্বা দ্বারা তার প্রতিবাদ করে। আর যদি তার ঐ মতাও না থাকে সে যেন নিজের অন্তরে তা ঘৃণা করে। আর এটা ঈমানের দুর্বলতম স্তর। (মুসলিম)
ব্যাখ্যা: অন্যায়কে প্রতিরোধ করা ইসলামের অত্যন্ত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি আমলে সালেহ। হাদীসখানির মাধ্যমে রাসূল (সা.) জানিয়ে দিয়েছেন-অন্যায়কে শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে। ওজরের কারণে তা না পারলে মুখে তার প্রতিবাদ করতে হবে। ওজরের কারণে তাও না পারলে মনে তা ঘৃণা করতে হবে। শেষে রাসূল (সা.) জানিয়ে দিয়েছেন ঐ ঘৃণা হচ্ছে ঈমানের দুর্বলতার স্তর। অর্থাৎ অন্যায় দেখে যার মনে ঘৃণাও হবে না তার ঈমান নেই। ঈমানের দাবিদার হলে সে হবে মুনাফিক।
আমল না করতে পারার জন্যে যার মনে ঘৃণা হবে তার মনে অনুশোচনাও হবে। আর যার অনুশোচনা হবে সে ঐ অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্যে চেষ্টাও করবে।
সুতরাং হাদীসখানির মাধ্যমে রাসূল (সা.) জানিয়ে দিয়েছেন, ঈমানের দাবিদার ব্যক্তি যদি কোন রকম ওজর, অনুশোচনা বা উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা ছাড়া অর্থাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে খুশি মনে, একটি আমলে সালেহও ছেড়ে দেয় তবে সে মুনাফিক বলে গণ্য হবে। হাদীসখানি থেকে তাই সহজেই বোঝা যায় আমল ছাড়ার ধরন প্রমাণ করবে যে ব্যক্তির অন্তরে ঈমান আছে কি নেই।
তথ্য-২
অর্থ: আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক অবস্থা ও ধন-সম্পদের দিকে দৃষ্টিপাত করেন না, বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও কাজ। (মুসলিম)
ব্যাখ্যা: হাদীসখানির মাধ্যমে রাসূল (সা.) পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন মহান আল্লাহ মানুষের বাহ্যিক চেহারা-ছবি, পোশাক-পরিচ্ছদ, ধন-সম্পদ ইত্যাদি দেখেন না। তিনি দেখেন অন্তর অর্থাৎ মনে কালেমা তৈয়্যেবার বিশ্বাস এবং সে বিশ্বাসের প্রমাণস্বরূপ বাস্তব আমল।
তথ্য-৩
অর্থ: আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেছেন, মু’মিন হওয়ার আকাক্সা করা এবং মু’মিনের মত অবয়ব বানিয়ে নিলেই ঈমান সৃষ্টি হয় না। বরং তা (সেই সুদৃঢ় বিশ্বাস) যা হৃদয়ের মাঝে পূর্ণরূপে বদ্ধমূল হয়ে যায় এবং যাবতীয় কাজ তার সত্যতার স্যা বহন করে।
ব্যাখ্যা: হাদীসখানির মাধ্যমে রাসূল (সা.) স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, ঈমান শুধু কালেমা তৈয়্যেবা মুখে উচ্চারণ করা ও চেহারা-ছবি বা পোশাক-পরিচ্ছদের কিছু পরিবর্তনের নাম নয় বরং তা হচ্ছে কলেমা তৈয়্যেবা ব্যাখ্যাসহ অন্তরে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা এবং বাস্তব আমলের মাধ্যমে সে বিশ্বাসের প্রমাণ দেখান।
তথ্য-৪
অর্থ: আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ মু’মিন হতে পারবে না, যতণ না সে নিজের প্রবৃত্তিকে (খেয়াল-খুশিকে) আমার আনীত বিধানের অধীন না করে।
(মেশকাত)
ব্যাখ্যা: এ হাদীসখানিতেও রাসূল (সা.) বলেছেন, মু’মিন হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে হলে একজনের সকল কর্মকাণ্ডকে কুরআন ও সুন্নাহের বিধানের অধীন আনতে হবে। অর্থাৎ বাস্তব আমলের মাধ্যমে ঈমানের দাবির সত্যতা প্রমাণ করতে হবে।
তথ্য-৫
অর্থ: আনাস (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) আমাদের এমন নসিহত খুব কমই করেছেন, যার ভিতর তিনি এ কথা বলেননি যে, ‘খিয়ানতকারীর ঈমান নেই এবং ওয়াদা ভঙ্গকারীর দীন নেই।’ (বায়হাকী)
ব্যাখ্যা: খিয়ানত করা ঈমানের দাবিবিরুদ্ধ একটি কাজ। তাই হাদীসখানিতে রাসূল (সা.) (খুশী মনে) খিয়ানতকারীর ঈমান নেই বলে ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ ঈমানের দাবিদার হলে তাকে মুনাফিক বলে ঘোষণা করেছেন।
তথ্য-৬
অর্থ: নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ মু’মিন হতে পারবে না যতণ না সে নিজের জন্যে যা পছন্দ করে তার মু’মিন ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করবে। (বুখারী)
ব্যাখ্যা: নিজের জন্যে যা পছন্দ হয় মু’মিন ভাইয়ের জন্যেও তাই পছন্দ করা ঈমানের একটি দাবি। তাই (ইচ্ছাকৃতভাবে বা খুশি মনে) নিজের জন্যে যা পছন্দ করে কিন্তু মু’মিন ভাইয়ের জন্যে তা পছন্দ করে না, এমন ব্যক্তিকে আলোচ্য হাদীসখানির মাধ্যমে রাসূল (সা.) মু’মিন নয় বলে জানিয়ে দিয়েছেন।
এ হাদীস ক’খানি এবং হাদীস গ্রন্থে উল্লেখ থাকা এ ধরনের আরো অনেক হাদীসের আলোকে নিশ্চয়তা দিয়েই বলা যায়, কোন একটি আমলে সালেহ ইচ্ছাকৃতভাবে বা খুশি মনে অর্থাৎ কোন রকম ওজর, অনুশোচনা ও উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা ব্যতীত ছেড়ে দিলে একজন ঈমানের দাবিদার ব্যক্তি মুনাফিক বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ আমল হল অন্তরে ঈমান থাকার প্রমাণ।
কুরআন, হাদীস ও বিবেক-বুদ্ধির উল্লিখিত তথ্যসমূহ থেকে তা হলে নিশ্চয়তাসহকারে জানা ও বুঝা যায়আমলে সালেহ হচ্ছে অন্তরে ঈমান থাকার প্রমাণ। আর তাই ঈমানের দাবিদার ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বা খুশি মনে অর্থাৎ কোন রকম ওজর, অনুশোচনা ও উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা ছাড়া কোন একটি আমল ছেড়ে দিলে মুনাফিক বলে গণ্য হবে।
আমলে সালেহ ছেড়ে দেয়ার কারণে গুনাহ হওয়া না হওয়া এবং হলে কী ধরনের গুনাহ হবে তা যে সকল শর্তের উপর নির্ভরশীল
ইসলামে আমলে সালেহ ছেড়ে দেয়ার পর একজন মু’মিনের গুনাহ হওয়া বা না হওয়া এবং হলে কোন ধরনের গুনাহ হবে তা নির্ভর করে তিনটি শর্তের উপস্থিতি এবং তা পূরণের ধরনের উপর। শর্ত তিনটি হল-
১. ওজর (ঊীপঁংব) বা বাধ্য-বাধকতা,
২. অনুশোচনা,
৩. উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা।
এ তিনটি শর্ত উপস্থিত থাকা না থাকা এবং উপস্থিত থাকলে তার ধরনের উপর ভিত্তি করে একজন মু’মিনের আমলে সালেহ ছেড়ে দেয়ার কারনে গুনাহ হওয়ার ব্যাপারে নিম্নোক্ত অবস্থানের যে কোন একটি হতে পারে-
১. গুনাহ না হওয়া,
২. ছগীরা গুনাহ হওয়া,
৩. কবীরা গুনাহ হওয়া,
৪. মাধ্যম (না কবীরা না ছগীরা) গুনাহ হওয়া ,
৫. কুফরীর গুনাহ হওয়া।
আমলে সালেহ ছেড়ে দেয়ার পর একজন মু’মিন গুনাহের উল্লিখিত চারটি অবস্থানের কোনটিতে থাকবে তা নির্ধারিত হবে নিম্নোক্তভাবে-
১. যে অবস্থায় আমলে সালেহ ছেড়ে দিলে মু’মিনের কোন গুনাহ হবে না
কুরআন, সূন্নাহ ও বিবেক-বুদ্ধি অনুযায়ী আমলে সালেহ ছেড়ে দেয়ার পর একজন মু’মিনের কোন গুনাহ হবে না যদি তার
ক. আমলটির সমান গুরুত্বের ওজর (ঊীপহব) থাকে।
অর্থাৎ বড় আমলের জন্যে জীবন বাঁচানোর ওজর বা বড় ওজর এবং ছোট আমলের জন্যে ছোট ওজর থাকে।
খ. আমলটির গুরুত্বের সমান পরিমাণের অনুশোচনা থাকে।
অর্থাৎ বড় আমলের জন্যে প্রচণ্ড এবং ছোট আমলের জন্যে অল্প বা কিছু অনুশোচনা থাকে।
গ. আমলটির গুরুত্বের সমান পরিমাণের উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা থাকে।
অর্থাৎ বড় আমলের জন্যে প্রচণ্ড এবং ছোট আমলের জন্যে কিছু না কিছু উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা থাকে।
বেশির ভাগ েেত্র উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টাটি হবে নিজ দেশে ইসলামকে বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা তথা ইসলামকে শাসন মতায় বসানোর আন্দোলনে শরীক থাকা। কারণ, বেশির ভাগ েেত্র নিজ দেশে ইসলাম বিজয়ী না থাকার জন্যেই মু’মিনদের ইসলাম বিরুদ্ধ কাজ করতে বা সহ্য করতে বাধ্য হতে হয়।
২. যে অবস্থায় আমলে সালেহ ছেড়ে দিলে মু’মিনের ছগীরা গুনাহ হবে
ইসলামে একজন মু’মিনের ছগীরা গুনাহ হবে যদি বড় আমল ছেড়ে দেয়ার পেছনে তার
ক. আমলটির গুরুত্বের প্রায় সমান গুরুত্বের ওজর থাকে,
খ. আমলটির গুরুত্বের প্রায় সমান পরিমাণের অনুশোচনা থাকে,
গ. আমলটির গুরুত্বের প্রায় সমান পরিমাণের উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা থাকে।
ছোট আমল অল্প বা, কিছু না কিছু ওজর, অনুশোচনা ও উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা সহ ছাড়লে কোন গুনাহ হবে না। কারণ ঐ অল্প পরিমাণ ওজর, অনুশোচনা ও উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা আমলটির গুরুত্বের সমান হয়ে যাবে।
৩. যে অবস্থায় আমলে সালেহ ছাড়লে মু’মিনের কবীরা (বড়) গুনাহ হবে
একজন মু’মিনের কবীরা গুনাহ হবে যদি বড় আমল ছেড়ে দেয়ার পর তার-
ক. প্রায় না থাকার মত ওজর থাকে,
খ. প্রায় না থাকার মত অনুশোচনা থাকে,
গ. প্রায় না থাকার মত উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা থাকে।
৪. যে অবস্থায় আমলে সালেহ ছাড়লে মুমিনের মধ্যম (না কবীরা না ছগীরা) গুনাহ হবে
একজন মু’মিনের বড় আমল ছেড়ে দেয়ার পর মধ্যম ধরনের গুনাহ হবে যদি তার-
ক. আমলটির গুরুত্বের মাঝামাঝি গুরুত্বের ওজর থাকে,
খ. আমলটির গুরুত্বের মাঝামাঝি পরিমাণের অনুশোচনা থাকে.
গ. আমলটির গুরুত্বের মাঝামাঝি পর্যায়ের উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা থাকে।
৫. যে অবস্থায় আমলে সালেহ ছেড়ে দিলে মু’মিনের কুফরীর গুনাহ হয়
ইসলামে একজন মু’মিনের কুফরীর গুনাহ হবে যদি
ক. বড় বা ছোট আমল কোন ধরনের ওজর ব্যতীত তথা ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেয়া হয়,
খ. বড় বা ছোট আমল কোন ধরনের অনুশোচনা ব্যতীত খুশী মনে ছেড়ে দেয়া হয়,
গ. বড় বা ছোট আমল কোন ধরনের উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা ছাড়া ছেড়ে দেয়া হয়।
(এ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে ‘পবিত্র কুরআন হাদীস ও বিবেক-বুদ্ধি অনুযায়ী গুনাহের সংজ্ঞা ও শ্রেণীবিভাগ’ নামক বইটিতে)
ইসলামে গুনাহ মাফ হওয়ার উপায়সমূহ
মহান আল্লাহ নিজেকে মানুষের জন্যে রাহমানুর রাহীম অর্থাৎ পরম দয়ালু ও করুণাময় বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি চান তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণপ্রাপ্ত হোক। তিনি মানুষের সৃষ্টিগত দুর্বলতা সম্বন্ধে পুরোপুরি অবহিত। তাই তিনি জানেন শয়তানের বা নফসের নানা ধরনের ধোঁকায় পড়ে বা না জানার দরুন মানুষ নানা ধরনের গুনাহের কাজ করবে বা করে বসবে। এ জন্যে তিনি ঐ সকল গুনাহ থেকে মুক্ত হয়ে বেহেশত পাওয়ার জন্যে দু’জগতেই ব্যবস্থা রেখেছেন। যথা-
ক. দুনিয়ায় গুনাহ মাফ হওয়ার ব্যবস্থা
দুনিয়ার জীবনে গুনাহ মাফ হওয়ার দুটি ব্যবস্থা আল্লাহ রেখেছেন। ব্যবস্থা দুটি হল-
১. তাওবা,
২. নেক আমল।
তাওবার মাধ্যমে গুনাহ মাফ হওয়া
তওবার মাধ্যমে মানুষের হক ফাঁকি দেয়ার গুনাহ ব্যতীত অন্য সকল ধরনের (র্শিক ও কুফরীর গুনাহসহ) গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে বলে আল্লাহ কুরআন ও সুন্নাহের মাধ্যমে নানাভাবে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন। আল-কুরআনের ঐ সকল বক্তব্যের একটি হচ্ছে-
অর্থ: অবশ্যই আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন, যারা অজ্ঞতা বা ভুলের কারণে গুনাহের কাজ করে বসে। অতঃপর অনতিবিলম্বে তওবা করে নেয়। এরাই হল সে সব লোক, যাদের আল্লাহ মা করে দেন। আল্লাহ সর্ববিষয় অভিজ্ঞ ও অতীব বুদ্ধিমান। আর এমন লোকদের জন্যে কোন মা নেই, যারা অন্যায় কাজ করে যেতেই থাকে যতণ না মৃত্যু উপস্থিত হয়। তখন তারা বলে, এখন তওবা করছি। অনুরূপভাবে তাদের জন্যেও কোন মা নেই যারা মৃত্যু পর্যন্ত কাফির থেকে যায়। এদের জন্যে আমি কঠিন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

