পাগলি নদীর ধার ধরে হাঁটছেআর বিড় বিড় করে বলছে ও আসবে , কিন্তু আসছে না কেন?এই তো,এ নদীপথেই তো ওরা গিয়েছিল বদমাশদের মারতে । না ,আমি অপেক্ষা করি ,ভীতুটা এসে আমাকে না পেলে আবার অভিমান করে বসে থাকবে ।বেটাছেলে এত বোকা ও ভীতু হয় কি করে , ভেবে পাই না ।
আমাকে ভালোবাসে ,আবার ভালোবাসার কথা শুনলে লজ্জায় লাল হয়ে যায় ,হি:হি:হি: ।ভীতুর-ভীতু ঘোড়ার ডিম কোথাকার ।পাগলি আপন মনে এসব আউড়িয়ে সম্মুখ পথে হেঁটে চলে ।একটি আট -নয় বছরের ছেলে পাগলির কাছে গিয়ে বলছে,ফুফু আম্মু তোমাকে বাড়ি যেতে বলছে ।সেই যে সকালে বের হয়েছ , এখন দুপুড় গড়িয়ে বিকেল হয়ে যাচ্ছে , টুমি কিছু খাওনি,চলো ,খেয়ে না হয় আবার আসবে ।পাগলি চেলেটার প্রতি চেয়ে বলে , যা , তুই বাড়ি গিয়ে ভাত খা গিয়ে,আমি আসছি ।ছেলেটি তবুও পাগলির হাত ধরতে যায় এবং বলে,আমি তোমাকে না নিয়ে যাব না,তাহলে মা আমাকে বকবে ,চলো আমার সঙ্গে । পাগলির এবার রাগ উঠে যায় , প্রায় তেড়ে আসে ছেলেটির দিকে এবং চিৎকার করে বলে , যা এখান থেকে ।ছেলেটি এবার ভয় পেয়ে যায়,পাগলিকে আর কিছু বলার সাহস পায় না ।একটু সময় কী যেন ভাবে , তারপর বাড়ির পথ ধরে ।
২.
পাগলির নাম পারু ।একদিন সে পাগলি ছিল না ।নদীসংলগ্ন জীবন নগর গ্রামের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে পারু ।ওর বড় চাচার ছেলে নূরু ছিল ওর পিঠাপিঠি ও দু-এক বছরের বড় ।অসম্ভব রকমের ভীতু,বোকা ও লাজুক ছেলে,মেয়ে দেখলেই লজ্জায় লাল হয়ে যেত ।একই পরিবারে একসঙ্গে ওরা বড় হয় ।
ছোটবেলায় ভীতু ও বোকা বলে নুরুকে ও খুব জ্বালাতন করত ।তারপর খেলার ছলে দিন কেটে গিয়ে বর হলে ও বুঝতে পারে ,এ বোকা ও ভীতুর হদ্দটাকে সে ভালোবেসে ফেলেছে ।পারিবারিকভাবে একাত্তরের মার্চে ওদের বিয়েও ঠিক হয় , কিন্তু এরই মধ্যে শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ । তাই ওদের বিয়ে স্থগিত হয়ে যায় ।পারু একদিন দেখতে পায় ওদের গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে ভীতু ,লাজুক ও বোকা চেলটি মুক্তিযুদ্ধার সাজে তার সামনে দাঁড়িয়ে পরিবারের সবার কাচ থেকে বিদায় নিচ্ছে ।সেদিন আনন্দ ও গর্বে ওর বুক ভরে গিয়েছিল । যাকে সে ভবিষ্যতের চলার পথের সাথী হিসেবে পেতে চায় তাকে তো এমনই দেখতে চায় ।নুরু যুদ্ধে চলে যায় ।পারুর হাতদুটি তখন সপ্তাকাশের একজনের প্রতি নরুর মঙ্গল কামনায় প্রায় ওপরে উদ্বেলিত হয়ে থাকে ।যুদ্ধ তখন আনাচে-কানচে ছড়িয়ে পড়েছে ।বাংলার বীর মুক্তিযুদ্ধাদের কাছে হিংস্র হায়েনারা নাকানি চুবানি
খেয়ে পিচু হটছে ,এমনি একদিন ওদের গ্রাম থেকে মাইল দুয়েক দূরে নদীর অপর পাড়ে শত্রু ঘাটিতে এক অপারেশন পরিচালিত হয় ।এ অপারেশনের কমান্ডার ছিল নূরু ।সেদিন সন্ধ্যার পরই মুক্তিযোদ্ধার দলটি খন্দকার বাড়িতে আসে ।পারুর সেদিন আনন্দ দেখে কে? মুক্তিযোদ্ধার দলটি সবার দোয়া নিয়ে নদীপথে এগিয়ে যায় ,পারুও সবার সঙ্গে নদী পর্যন্ত ওদের এগিয়ে দেয় ।সেদিন পারুকে নুরু আড়ালে ডেকে বলেছিল,দেখিস,দেশ স্বাধীন করে একদিন আমি তোর কাছে ফিরে আসবোই ।এ কয়দিন প্রতীক্ষায় থাকিস ।
সেদিন অনেক কষ্টে মুক্তিযোদ্ধার দলটি সে অপারেশনে বিজয় লাভ করে কিন্তু যার সাহসিকতা,বীরত্ব ও বুদ্ধিমত্তার জন্য এ বিজয় , সে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায় অন্য এক জগতে ।যে জগতে গেলে কেউ আর কোনো দিন ফিরে আসে না ।পরের দিন সকালে নূরু ফিরে আসে জীবন নগর গ্রামে,তবে জীবিত নয় ।এ আঘাত পারুর পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হয় না,সে নির্বাক হয়ে যায় ।দেশ কিছুদিন পরই স্বাধীন হয়ে যায়,সবাই ঘরে ফেরে,শুধু ফেরে না নূরু ।সেদিন থেকেই পারুর মস্তিস্ক বিকৃতি ঘটে ।প্রতিদিন সে নদীর ধারে ঘুরে বেড়ায় ,নূরুর আগমনের প্রতিক্ষায় অস্থিরভাবে পায়চারি করে আর বুকের ভিতর এক ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়ায় ।যার রক্তক্ষরণ কেউ কোনদিন দেখতে পায় না।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মার্চ, ২০০৯ দুপুর ১:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



