দৃশ্য পট ১- শিশু মানহা,বয়স ৮; নামকরা একটি স্কুলের প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী। ওকে প্রশ্ন করলাম-‘মানহা, আজ স্কুলে কি কি পড়লে ?
জবাব-names of seven continents-Asia, Europe..blah, blah, blah…
মামনি, বলতো পৃথিবীতে মহাদেশ কয়টি?
জবাব-জানিনা। miss বলেনি তো!
প্রশ্ন ২- ‘মানহা,তোমার দেশের নাম কি?’
জবাব-উত্তর শাজাহানপুর।
মানহার নাম দেয়া হয়েছে ‘স্যাটেলাইট শিশু’। কারণ সে অবিশ্বাস্য গতিতে নির্ভুল হিন্দি বলতে পারে। শাহরুখ খান , ক্যাটরিনা কাইফ অথবা কারিনা কাপুরকে হুবহু নকল করে দেখাতে পারে। যে কোন সিরিয়াল এর কাহিনী তার নখদর্পণে। অসাধারন মেধাবী একটি শিশুর মেধার একটা বড় অংশ অপচয় হয়ে যাচ্ছে।
দৃশ্য পট ২- আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি , সেখানে একটি বাধ্যতামূলক কোর্স আছে। ইংলিশ ১০৩-Listening and Speaking. কোর্সটির পাঠ্যসূচিতে অন্যান্য অনেক কিছু শেখানোর সাথে সাথে আমরা বিভিন্ন বিষয়ের উপর ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন করে থাকি।আমার খুব common একটা প্রশ্ন হল-“Who is your favorite writer?/ What is the name of your favorite book?” হাতে গোনা দুই একজন ছাড়া এ প্রশ্নের কেউই দিতে পারেনা। কেননা এদের অধিকাংশই পাঠ্য বই এর বাইরে কোন বইই পড়েনি। ভাবতে অবাক লাগে একটা পুরো প্রজন্ম বড় হচ্ছে নিজস্ব ভাবনা ও চিন্তা-চেতনা বিকাশের সবচেয়ে বড় হাতিয়ারটি ছাড়াই।
অনেকদিন ধরেই এই বিষয়টা মাথায় বেশ ঘুরপাক খাচ্ছে। লিখবো লিখবো করে আর লেখা হয়ে ওঠেনি। ভাবছিলাম আমাদের ছেলেবেলার(অথবা মেয়েবেলার) আর বই পড়ার অভ্যাসের কথা। আমার এবং আমার ভাইবোনদের ছেলেবেলা কেটেছে মফঃস্বলে। তখনো ক্যাবল কানেকশন এর প্রভাব আমাদের মাথা বিগড়ে দেয়নি অথবা হিন্দি সিরিয়াল এর ভূত আমাদের পেয়ে বসেনি। আজকালকার স্যাটেলাইট শিশুদের মত তখনো আমরা কচি বয়স থেকেই ‘ছাম্মাক ছাল্লো’ বা ‘চিকনি চামেলি’ তে অভ্যস্ত হয়ে উঠিনি। সেই প্রায় অজ পাড়াগাঁয়ে বই পড়া /বিতর্ক করা /ছবি আঁকা বা আবৃতি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করাই ছিল আমাদের প্রধান বিনোদন। আমাদের সাথী ছিল শুরুতে শিশু একাডেমী, আমাদের আব্বুর ব্যক্তিগত বইয়ের সংগ্রহ আর পরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের নানা রকম বই।
এখনো মনে পড়ে কখনো ‘পথের পাঁচালি’ পড়ে অপুর সাথে /কখনো ‘উভচর মানুষ’ পড়ে ইকথিয়ান্ডারের দুঃখে অঝোরে কেঁদেছি। কখনো ঠাকুরমার ঝুলি /গ্রিক মিথ বা আরব্য রজনীর গল্প পড়ে অবাক হয়েছি আর ভেবেছি কি করে সম্ভব এ অসম্ভব সব ব্যাপার। কখনো ফেলুদার সাথে হারিয়ে গিয়েছি রাজস্থানের সোনার কেল্লায়’। কখনো বা কেমিস্ট্রি/ফিজিক্স বা বায়োলজি বইয়ের নিচে লুকিয়ে রেখে পড়েছি ‘সাতকাহন’, ‘এলেবেলে’, ‘ন হন্যতে’, ‘মিসির আলি’, ‘গল্পগুচ্ছ’, ‘রামের সুমতি’, ‘দেবদাস’ , ‘গালিভার’স ট্রাভেলস’ বা ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ । আবার কখনো ‘টেনিদা’ আর ‘চার মূর্তির অভিযান’ পড়ে মধ্য দুপুরে একা একা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেয়েছি; আর আব্বু ভেবে নিয়েছেন হয়ত মেয়েটা তার পাগলাটে থেকে পুরোপুরি পাগল ই হয়ে যাচ্ছে।
কি অদ্ভুত অন্যরকম ছিল আমাদের ছেলেবেলা। ভিডিও গেমস নয়,হিন্দি সিরিয়াল নয়,মোবাইল ফোনের রাতের প্যাকেজ নয়, দিনরাত ফেসবুকিং নয়, এসবের কোনটাই নয়-আমরা সময় কাটাতাম বই পড়ে ।আমাদের তাই ছিল প্রলম্বিত প্রগাঢ় শৈশব। দীর্ঘকাল বেঁচে ছিল আমাদের ভেতরের শিশু। আজকালকার শিশুরা বড় অভাগা। ওদের কোন স্মৃতিময় শৈশব নেই। ওদের শৈশব অকালে মরে যায়। শিশুকাল শেষ হওয়ার আগেই ওরা বুড়ো হয়ে যায়। আমরা কি পারিনা আমাদের শিশুদের ফিরিয়ে দিতে তাদের না পাওয়া শিশুকাল/হারানো শৈশব?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

