somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাষ্ট্রের সুনির্বাচিত দেবতাগণের অধ্বঃগমনে আমাদিগের রসাতলে পদার্পন

১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১০:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

“স্বর্গ হতে দেবতারা মধ্যে মধ্যে ভূতলে অবতীর্ণ হওয়াতে কেউ আপত্তি করেন না, কিন্তু মর্ত্যবাসীর পক্ষে রসাতলে গমন করাটা বিশেষ নিন্দনীয়। (সাহিত্যে খেলা- প্রমথ চৌধুরী)”

আমাদের রাজনীতিবিদদের সমস্যাটা মনে হচ্ছে সেখানেই। তাঁরা নিজেদের স্বর্গের দেবতা ভাবেন, তাই নীচে নেমে যাওয়াটাকে খুব বেশী দোষের কিছু দেখেন না। কিন্তু, তাঁরা এটা ভুলে যান যে, দেশের সাধারন মানুষগুলো স্বাভাবিক মর্ত্যবাসীর চেয়ে বেশী কিছু নয়। তাঁদের নীচে নামার সাথে সাথে এই মানুষগুলোও নীচে নামতে থাকে আর নীচে নেমে যেখানে যায় সেটা রসাতলই বটে।

স্বভাববিরুদ্ধভাবে কঠিন কঠিন কথা বলে ফেললাম। সহজ করে বলার আগে একটু ইতিহাস কপচাতে চাই।

১৯৮২ সাল। বিচারপতি সাত্তার তখন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নামকরন করলেন সদ্য প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের (তর্ক এড়াতে ‘শহীদ’, ’ঘোষক’, ’স্বৈরশাসক’ প্রভৃতি বিশেষনের ব্যবহার বর্জন করলাম) নামে। দেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁকে এই সম্মান দেয়াটা খুব বেশী দোষের মনে হয় নি তখন। পরবর্তী দুই সরকারের (জাতীয় পার্টি ও বিএনপি) সময়ও এ নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য হয়েছে বলে শুনি নি।

১৯৯৬ সাল। দীর্ঘ ২১ বছরের বিরতী শেষে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলো। আগের দুই দশক যেমনি ভাবে গনমাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর নাম নেয়া প্রায় অসম্ভব ছিল, তেমনিভাবে ঐ পাঁচ বছর (১৯৯৬-২০০১) জিয়াউর রহমানের নাম সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হলো। এভাবে, অবচেতনভাবেই যেন বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল মাপের নেতার সাথে জিয়াউর রহমানের অসামঞ্জস্যপূর্ণ তুলনা করে চলা বিএনপির রাজনীতির সাথে আওয়ামী লীগও যোগ দিয়ে দিল। এতে কার সম্মান বাড়লো, তা তর্কসাপেক্ষ। যাই হোক, খেয়াল করলাম, সরকারী প্রচার মাধ্যমে “জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর”কে, “ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর” নামে ঘোষনা করা হচ্ছে, যদিও অফিসিয়ালি নাম পরিবর্তন করা হয় নি। সে সময়েই চট্টগ্রামের বিমানবন্দরের আধুনিকায়নের মাধ্যমে নতুন নামকরণ করা হয় “এমএহান্নান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর”। এমএহান্নান স্বাধীনতাপূর্বকালে চট্টগ্রামের আওয়ামী রাজনীতির অন্যতম প্রানপুরুষ ছিলেন, মোটেই জাতীয়ভাবে সুপরিচিত কেউ নন। চট্টগ্রাম হতে তাঁর চেয়ে বড় বড় নেতা জাতীয় পর্যায়ে তখনো ছিলেন, এখনো আছেন। তারপরেও তাঁর নামে ঐ বিমানবন্দরের নামকরণ করার একটাই কারনঃ তাঁকে অযাচিতভাবে জিয়াউর রহমানের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো! (আওয়ামী লীগের দাবী অনুযায়ী), ২৬-২৭শে মার্চ’১৯৭১ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র হতে বঙ্গবন্ধুর নামে বারবার পাঠকৃত স্বাধীনতার ঘোষনাটি এমএহান্নানের মাধ্যমেই প্রথম পঠিত হয়। জিয়াকে এমএহান্নানের সমপর্যায়ে নামিয়ে এনে বঙ্গবন্ধুকে উপরে তুলে ধরার এটা একটা শিশুসুলভ গোঁয়ার্তুমি ছাড়া আর কিছুই নয়। অবশ্য তখনো পুরো ব্যাপারটা এতটা নোংরামির পর্যায়ে নামে নি।



২০০১ সাল। চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলো। জিয়ার এমন অপমান(!) তাঁরা সইলেন না। চট্টগ্রামের বিমানবন্দরের নতুন নামকরণ করা হলো, “শাহ আমানত (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর”। সেইসাথে সেখানে একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মান করে (মূল নকশায় মসজিদের পরিকল্পনা ছিল না) নিজেদের ইসলামপ্রীতি আর আওয়ামী লীগের ইসলামবিদ্বেষের ভালোই বিপনন হল। বিপদের চূড়ান্ত ঘন্টা তখনোই বেজে উঠেছিল। আমরা আমাদের অপর্যাপ্ত ধর্মজ্ঞানের পূঁজিতে সৃষ্ট সস্তা ধর্মানুভূতির নেশায় বূঁদ থাকায় সে আওয়াজ শুনতে পাই নি।

২০০৯ সাল। দিন বদলের সরকার ক্ষমতায় এলো। এই সব সস্তা ধর্মানুভূতির ধার ধারলে তাঁদের চলে না (বিশেষকরে যখন প্রগতিশীল দলগুলোর সাথে জোট বেঁধেছেন)। তাই, চোখের পলকে অন্যান্য অনেক কিছুর সাথে সাথে চট্টগ্রামের বিমানবন্দর তার পুরানো নাম “এমএহান্নান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর” ফিরে পায়। এর পরের ঘটনা সকলেই জানেন। “জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর” এর নতুন নাম “শাহজালাল(রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর”।”

অপরাধ, তিনি স্বৈরশাসক ছিলেন। তখন আমার বারবার মনে হয়, বাঙলাদেশের বিগত ৩৯ বছরের ইতিহাসে কে স্বৈরশাসক ছিলেন না? হয়তো মোড়ক ভিন্ন ছিল, ভেতরে তো সেই পুরাতন মদই পরিবেশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু বাকশাল কায়েম করেন নি? এরশাদের কথা বলার দরকার নেই; পরবর্তী তিন গনতান্ত্রিক(!) সরকার, গনতন্ত্রের মোড়কে কোন ধরনের সরকার চালিয়েছিলেন?

যাই হোক। এই নামবদল-পূনর্বদলে হয়তোবা তাঁদের প্রতিহিংসা মিটছে, কিন্তু দেশের মানুষের কী হচ্ছে? আমাদের এখন ঐক্যের প্রয়োজন, বিভক্তি নয়। অথচ, প্রতিটি জাতীয় ইস্যুতেই আমরা দ্বিধাবিভক্ত এবং এই বিভক্তি সাধারনের মতের অমিলের পর্যায় ছাড়িয়ে হিংস্র কাদা ছোঁড়াছুঁড়িতে গিয়ে পৌঁছে গিয়েছে। প্রকৃত রসাতল বোধহয় একেই বলে!

এবার, একটু সুদুরপ্রসারী প্রভাব চিন্তা করি-
১.জনগনের ধর্মভীতিকে পুঁজি করে এই যে কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া- আমাদের কোথায় পৌঁছে দিচ্ছে আমরা ভাবতে পারছি না। একটা খারাপ কাজের সাথে যখন ধর্ম কিংবা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ত্বের নাম জড়ানো হয়, তখন ধীরে ধীরে পুরো ধর্মটাই কি বিতর্কিত হয়ে ওঠে।

২.সরকার যদি এ নাম পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত সফলতার সাথে(!) করতে সক্ষম হন, তবে আমি লিখিত দিতে পারি, পরবর্তী সরকার এসে বিমানবন্দরের নাম তো ফিরিয়ে আনবেনই, এক কাঠি সরেস হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতুর নাম রাখা হবে শাহ ‘অমুক’ (রহ) সেতু।

কেউ কেউ বলবেন, ওরা ও তো করেছিল। কে অস্বীকার করেছে? কিন্তু তারা ‘অধম বলিয়া আমি উত্তম হইব কেন?’ একজনকে তো প্রথম পদক্ষেপটা নিতেই হবে। না হয় দিন বদলের শ্লোগানে কী এসে যায়?

এমতাবস্থায়, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতান্তই আত্মঘাতী এবং শিশুসুলভ বলে আমার মনে হচ্ছে। কারন, চেয়ারে বসে থাকা ব্যক্তির দায়িত্ব, দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটির চাইতে বেশী হয়ে থাকে।

শেষ কথাঃ জামায়াত-শিবির আর নামকরন- এই দুই ইস্যুতে মারামারি দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে এ ক'দিনে। বিরক্ত হয়ে একটা ইস্যু নিয়ে লেখার চেষ্টা করলাম। কলেবর বড় হয়ে যাওয়ায় অন্যটি নিয়ে কথা বললাম না। ইচ্ছে হলে, পরে বলব।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১১:২৯
২৯টি মন্তব্য ৩০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেশে কোনো সমস্যা খুঁজে পাওয়া যায় না

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:২৩


সরকারি দলের দায়িত্বপ্রাপ্তরা যখন মিডিয়ার সামনে কথা বলেন, তখন তাদের কথায় দেশে কোনো সমস্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। বাতাবি লেবুর বাম্পার ফলনের খবর পাওয়া যায় শুধু। কিন্তু যখন সমাজের কাছে যাওয়া হয়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন অবস্থানে বাংলাদেশ

লিখেছেন ঢাকার লোক, ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:১৬

দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন অবস্থানে বাংলাদেশ। ইউনেস্কো প্রকাশিত বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যানের তথ্যে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান এবং মালদ্বীপের মাধ্যমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে করা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিজয় দিবস, সংবিধান, পহেলা বৈশাখ, পান্তা-মাছ কিছুই ভালো লাগে না

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৪১


ধরুন আপনি একদিন ঘুম থেকে উঠলেন আর সিদ্ধান্ত নিলেন যে আপনার চারপাশের সবকিছুই ভুল। ক্যালেন্ডারের তারিখ ভুল, রান্নাঘরের খাবার ভুল, দেশের সংবিধান ভুল, এমনকি বাইরে যে ঝড়ো হাওয়া বইছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

পরীক্ষায় নকল ও বাস্তবতা

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:১৬



শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন সাহেবের বক্তব্য পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধের বিষয়টি গত কিছুদিন যাবত সোশ্যাল মিডিয়াতে খুব আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। এমনকি সামহো্য়্যারইন ব্লগেও সমালোচনা হয়েছে! বাংলাদেশে স্কুল কলেজ পরীক্ষা সহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইচ্ছেগুলো

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৩৩

ইচ্ছেগুলো অনিচ্ছেতে হঠাৎ বদলে যাক।
তোমায় পাওয়ার ইচ্ছে আমার অনিচ্ছেতে থাক।
ইচ্ছেরা সব ছুটি নিয়ে যাক না বহু দূরে।
অনিচ্ছেরা কাছে এলে হতেম ভবঘুরে।
মনের যত গোপন কথা মনের মাঝেই থাক।
ইচ্ছেগুলো অনিচ্ছেতে হঠাৎ বদলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×