আমাদের রাজনীতিবিদদের সমস্যাটা মনে হচ্ছে সেখানেই। তাঁরা নিজেদের স্বর্গের দেবতা ভাবেন, তাই নীচে নেমে যাওয়াটাকে খুব বেশী দোষের কিছু দেখেন না। কিন্তু, তাঁরা এটা ভুলে যান যে, দেশের সাধারন মানুষগুলো স্বাভাবিক মর্ত্যবাসীর চেয়ে বেশী কিছু নয়। তাঁদের নীচে নামার সাথে সাথে এই মানুষগুলোও নীচে নামতে থাকে আর নীচে নেমে যেখানে যায় সেটা রসাতলই বটে।
স্বভাববিরুদ্ধভাবে কঠিন কঠিন কথা বলে ফেললাম। সহজ করে বলার আগে একটু ইতিহাস কপচাতে চাই।
১৯৮২ সাল। বিচারপতি সাত্তার তখন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নামকরন করলেন সদ্য প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের (তর্ক এড়াতে ‘শহীদ’, ’ঘোষক’, ’স্বৈরশাসক’ প্রভৃতি বিশেষনের ব্যবহার বর্জন করলাম) নামে। দেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁকে এই সম্মান দেয়াটা খুব বেশী দোষের মনে হয় নি তখন। পরবর্তী দুই সরকারের (জাতীয় পার্টি ও বিএনপি) সময়ও এ নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য হয়েছে বলে শুনি নি।
১৯৯৬ সাল। দীর্ঘ ২১ বছরের বিরতী শেষে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলো। আগের দুই দশক যেমনি ভাবে গনমাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর নাম নেয়া প্রায় অসম্ভব ছিল, তেমনিভাবে ঐ পাঁচ বছর (১৯৯৬-২০০১) জিয়াউর রহমানের নাম সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হলো। এভাবে, অবচেতনভাবেই যেন বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল মাপের নেতার সাথে জিয়াউর রহমানের অসামঞ্জস্যপূর্ণ তুলনা করে চলা বিএনপির রাজনীতির সাথে আওয়ামী লীগও যোগ দিয়ে দিল। এতে কার সম্মান বাড়লো, তা তর্কসাপেক্ষ। যাই হোক, খেয়াল করলাম, সরকারী প্রচার মাধ্যমে “জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর”কে, “ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর” নামে ঘোষনা করা হচ্ছে, যদিও অফিসিয়ালি নাম পরিবর্তন করা হয় নি। সে সময়েই চট্টগ্রামের বিমানবন্দরের আধুনিকায়নের মাধ্যমে নতুন নামকরণ করা হয় “এমএহান্নান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর”। এমএহান্নান স্বাধীনতাপূর্বকালে চট্টগ্রামের আওয়ামী রাজনীতির অন্যতম প্রানপুরুষ ছিলেন, মোটেই জাতীয়ভাবে সুপরিচিত কেউ নন। চট্টগ্রাম হতে তাঁর চেয়ে বড় বড় নেতা জাতীয় পর্যায়ে তখনো ছিলেন, এখনো আছেন। তারপরেও তাঁর নামে ঐ বিমানবন্দরের নামকরণ করার একটাই কারনঃ তাঁকে অযাচিতভাবে জিয়াউর রহমানের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো! (আওয়ামী লীগের দাবী অনুযায়ী), ২৬-২৭শে মার্চ’১৯৭১ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র হতে বঙ্গবন্ধুর নামে বারবার পাঠকৃত স্বাধীনতার ঘোষনাটি এমএহান্নানের মাধ্যমেই প্রথম পঠিত হয়। জিয়াকে এমএহান্নানের সমপর্যায়ে নামিয়ে এনে বঙ্গবন্ধুকে উপরে তুলে ধরার এটা একটা শিশুসুলভ গোঁয়ার্তুমি ছাড়া আর কিছুই নয়। অবশ্য তখনো পুরো ব্যাপারটা এতটা নোংরামির পর্যায়ে নামে নি।
২০০১ সাল। চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলো। জিয়ার এমন অপমান(!) তাঁরা সইলেন না। চট্টগ্রামের বিমানবন্দরের নতুন নামকরণ করা হলো, “শাহ আমানত (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর”। সেইসাথে সেখানে একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মান করে (মূল নকশায় মসজিদের পরিকল্পনা ছিল না) নিজেদের ইসলামপ্রীতি আর আওয়ামী লীগের ইসলামবিদ্বেষের ভালোই বিপনন হল। বিপদের চূড়ান্ত ঘন্টা তখনোই বেজে উঠেছিল। আমরা আমাদের অপর্যাপ্ত ধর্মজ্ঞানের পূঁজিতে সৃষ্ট সস্তা ধর্মানুভূতির নেশায় বূঁদ থাকায় সে আওয়াজ শুনতে পাই নি।
২০০৯ সাল। দিন বদলের সরকার ক্ষমতায় এলো। এই সব সস্তা ধর্মানুভূতির ধার ধারলে তাঁদের চলে না (বিশেষকরে যখন প্রগতিশীল দলগুলোর সাথে জোট বেঁধেছেন)। তাই, চোখের পলকে অন্যান্য অনেক কিছুর সাথে সাথে চট্টগ্রামের বিমানবন্দর তার পুরানো নাম “এমএহান্নান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর” ফিরে পায়। এর পরের ঘটনা সকলেই জানেন। “জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর” এর নতুন নাম “শাহজালাল(রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর”।”
অপরাধ, তিনি স্বৈরশাসক ছিলেন। তখন আমার বারবার মনে হয়, বাঙলাদেশের বিগত ৩৯ বছরের ইতিহাসে কে স্বৈরশাসক ছিলেন না? হয়তো মোড়ক ভিন্ন ছিল, ভেতরে তো সেই পুরাতন মদই পরিবেশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু বাকশাল কায়েম করেন নি? এরশাদের কথা বলার দরকার নেই; পরবর্তী তিন গনতান্ত্রিক(!) সরকার, গনতন্ত্রের মোড়কে কোন ধরনের সরকার চালিয়েছিলেন?
যাই হোক। এই নামবদল-পূনর্বদলে হয়তোবা তাঁদের প্রতিহিংসা মিটছে, কিন্তু দেশের মানুষের কী হচ্ছে? আমাদের এখন ঐক্যের প্রয়োজন, বিভক্তি নয়। অথচ, প্রতিটি জাতীয় ইস্যুতেই আমরা দ্বিধাবিভক্ত এবং এই বিভক্তি সাধারনের মতের অমিলের পর্যায় ছাড়িয়ে হিংস্র কাদা ছোঁড়াছুঁড়িতে গিয়ে পৌঁছে গিয়েছে। প্রকৃত রসাতল বোধহয় একেই বলে!
এবার, একটু সুদুরপ্রসারী প্রভাব চিন্তা করি-
১.জনগনের ধর্মভীতিকে পুঁজি করে এই যে কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া- আমাদের কোথায় পৌঁছে দিচ্ছে আমরা ভাবতে পারছি না। একটা খারাপ কাজের সাথে যখন ধর্ম কিংবা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ত্বের নাম জড়ানো হয়, তখন ধীরে ধীরে পুরো ধর্মটাই কি বিতর্কিত হয়ে ওঠে।
২.সরকার যদি এ নাম পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত সফলতার সাথে(!) করতে সক্ষম হন, তবে আমি লিখিত দিতে পারি, পরবর্তী সরকার এসে বিমানবন্দরের নাম তো ফিরিয়ে আনবেনই, এক কাঠি সরেস হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতুর নাম রাখা হবে শাহ ‘অমুক’ (রহ) সেতু।
কেউ কেউ বলবেন, ওরা ও তো করেছিল। কে অস্বীকার করেছে? কিন্তু তারা ‘অধম বলিয়া আমি উত্তম হইব কেন?’ একজনকে তো প্রথম পদক্ষেপটা নিতেই হবে। না হয় দিন বদলের শ্লোগানে কী এসে যায়?
এমতাবস্থায়, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতান্তই আত্মঘাতী এবং শিশুসুলভ বলে আমার মনে হচ্ছে। কারন, চেয়ারে বসে থাকা ব্যক্তির দায়িত্ব, দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটির চাইতে বেশী হয়ে থাকে।
শেষ কথাঃ জামায়াত-শিবির আর নামকরন- এই দুই ইস্যুতে মারামারি দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে এ ক'দিনে। বিরক্ত হয়ে একটা ইস্যু নিয়ে লেখার চেষ্টা করলাম। কলেবর বড় হয়ে যাওয়ায় অন্যটি নিয়ে কথা বললাম না। ইচ্ছে হলে, পরে বলব।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


