আইএনবি: ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনতাযুদ্ধে ৩৯ বছর অতিবাহিত হলেও নির্যাতিতারা কোন ক্ষতিপূরণ পাননি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রস্তাব করেছিলেন, কিন' আজো বাস্তবায়ন হয়নি। এভাবে দীর্ঘ ৩৯ বছরে অনেক সরকারের পরিবর্তন হয়েছে কিন' নির্যাতিতাদের তালিকা প্রস্থত করে তাদের পুনর্বাসনের কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তিনি এখনো খোলা আকাশের নিচে বেড়াহীন চালাঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার নাজিম খান ইউনিয়নের সোমনারায়ন মৌজার পুটিটারী গ্রামের ডাইরকা মামুদ এর কন্যা আনোয়ারা বেগম। এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় আনোয়ারা বেগম শৈশব, কৈশোরের অনেক আনন্দ উল্লাস আর ভালবাসার মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠেছে। এই গ্রামে আমার জন্ম। শুধু আমার নয় আমার বাবা, চাচা, ভাইবোন সবাই এই গ্রামের মধ্যে বেড়ে উঠেছে। এই গ্রামের ধুলাবালি ও মাটির মাঝে জীবন শুরু। মা যেমন আপন তেমনি মাটি ও গ্রাম আপন। তার স্মৃতি যেমন ভোলা যায় না, ঠিক তেমনি ভোলা যায় না সেই ভয়াবহ ’৭১। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ১০ বছর আগে পার্শ্ববর্তী গ্রামের মকবুল হোসেনের সাথে আমার বিবাহ হয়। ৬-৭ বছরের মধ্যেই আমার কোলজুড়ে ২টি সন্তান আসে। তাদের মধ্যে একজন ছেলে অন্যজন মেয়ে। শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী-সন্তান নিয়ে আমার সুখের জীবন ছিল। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাবার বাড়িতে চলে আসি। দেশজুড়ে লুটপাট শুরু হয়। ঠিক তখন পাকিস্তানি মিলেটারি আমাদের গ্রামে ঢুকে পড়ে। তাদেরকে সহায়তা করে দেশীয় রাজাকার আলবাদর পাকিস্তানি মেলেটারির পোষা কুত্তারা। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময় আমাদের গ্রামে মেলিটারি ঢুকে পড়ে। তখন চারিদিকে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। ঠিক ওই সময় আমাদের বাড়িতে ৪/৫ জন মেলিটারি আসে। তখন আমি আমার কন্যা সন্তানটি সাথে নিয়ে পালানোর সময় মেলিটারির হাতে ধরা পড়ি। পরে আমার সন্তানটিকে মাটিতে ফেলে দেয়। আমাকে নিয়ে যায় ঘরের ভেতরে। পাকিস্তানি মেলিটারি ওরে বাবা কি তাদের চেহারা যেমন লম্বা, তেমনি কালো বড় বড় জুতা পড়া চোখ লাল দেখতে ডাকাতের মতো। আমি তাদের কাছ থেকে পালাবার চেষ্টা করি। কিন' পালাতে পাই নি। পরে আমাকে ৪-৫ জন মেলিটারি পালাক্রমে ধর্ষণ করে। কেউ কাপড় খুলছে, কেউ টানাটানি শুরু করে আবার কেউ ব্লাউজ খুলছে। মনে হয় আমি একটা মরা গরু। যেভাবে পাচ্ছে টেনে ছিড়ে খাচ্ছে। মনে হয় তারা বহুদিনের ক্ষুধার্থ। সামান্য একটু খাবার পেয়েছে ঠিক এ রকম ভাবটি করছে। প্রতিবাদ করার ভাষা ছিল না। বাধা দেয়ার সাহস পাইনি। আবার বাধা দিয়ে লাভ কি? ৪-৫ জন যদি এক সঙ্গে ধর্ষন করে। তখন কি আর জান থাকে। এক দিকে বাবা মা ভাই বোন স্বামী অন্য দিকে ইজ্জতের ভয়াবহ ছিল সে সব দিন। এ সব কথা লজ্জার তাছাড়া বলে কি হবে। নারীর জীবনের মূল্যবান সম্পদ তা কি আর ফিরে পাবার। তাছাড়া এসব কথা মনে পড়লে আমার চোখে পানি আসে, মাথা খারাপ হয়ে যায়। আমার স্বামী আমাকে আর গ্রহন করেনি। এ সমাজের মানুষেরা দিয়েছে ধিক্কার আর লজ্জা। তাদের কোন সহযোগিতা পাইনি। অবশেষে সন্তান দুটি নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে আসি। সব ভুলতে চাই কিন' ভুলতে পাই না। আমার স্বামী-শাশুড়ি দেবর সবই ছিল। একটি কালবৈশাখী ঝড় এসে আমার জীবনকে তছনছ করে দিয়ে যায়। কারণ নারীর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হারাতে হয় আমাকে তারপর মাঝে মাঝে আজেবাজে কথা শুনতে হয় আমাকে। ৭১ এর কথা জানতে চাইলে কেন জানি প্রথমে চমকে ওঠে পড়ে চুপচাপ বসে থাকে। সেদিনের নরকীয় জঘন্য ঘটনা সম্পর্কে জানার জন্য তার চাচাতো ভাই ইউনুছ আলীর সাথে কথা বলে জানা যায় তিনি বলেন আমি তখন তাগড়া যুবক ছিলাম বয়স ২৪-২৫ হবে। আমাদের গ্রামে যখন মেলিটারি আসে আমি বাড়ি পাশে রাস্তায় বসেছিলাম। এলাকার লোকজন চারিদিকে ছুটাছুটি করছে। আর বলছে গ্রামে মিলিটারি ঢুকে পড়েছে। আমি পালানোর সময় মিলিটারি সামনে পড়ে যাই। ৪ জন মিলিটারি আমাকে ধরে ফেলে পরে আরো ৭ জন মিলিটারিকে দেখতে পাই। সেদিন আমাদের এলাকায় ১১ জন মিলিটারির একটি দল এসেছিল। আমার পাশাপাশি আরো ২ জনকে ধরে আনে তার আমাদের গ্রামের লোক। আমাদের ৩ জনকে বেঁধে মারতে থাকে আর মুক্তি বাহিনীর আস্তানা সম্পর্কে জানতে চায়। ওই সময় আমাদের গ্রামে ৪-৫ জায়গায় মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প ছিল। এ বাহিনীর প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন রংপুরের সূর্য সন্তান শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক খন্দকার বদিউজ্জামান (সাপ্তাহিক রণাঙ্গন) বর্তমানে তার কবরটি নাজিমখান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে পারিবারিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। পরে আল্লাহর অশেষ মেহেরবাণীতে পাকিস্তানি মিলিটারিরা আমাকে ছেড়ে দেয়। পড়ে আমরা বাড়িতে এসে জানতে পাই আনোয়ারকে মিলিটারি ধরে নিয়ে গেছে। গ্রামের সবাই বলাবলি করছে। আমি তাদের বলি মিলিটারি সবাই খালি হাতে চলে গেছে। তারপর আমরা আনোয়ারাকে খুঁজতে থাকি। পড়ে গোলাঘরের ভেতরে পাটের ওপর বিবস্ত্র ও রক্তাক্ত সঙ্গাহীন অবস্থায় আনোয়ারকে পাই। পরে এলাকার গ্রাম্যডাক্তারের চিকিৎসায় আনোয়ারা আস্তে আস্তে সুস্থ হতে থাকে। এরপর তার স্বামী তাকে আর গ্রহণ করেননি। অবশেষে কলঙ্কের বোঝা কাঁধে নিয়ে বাবার বাড়িতে অবস্থান করেছে।
এই পাকিস্তানি জানোয়ার গুলি এভাবে ৫ লক্ষ মা বোন এর সম্মানহানী ঘটিয়েছে । তাদের দোসর আল বাদর আল শামস জামায়াতে মওদূদী গং তারা পথ দেখিয়েছে এবং নিজেরা অংশগ্রহন করেছে ।এরা জীবিত অবস্থাতেই উপযু্ক্ত শাস্তি চাই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



