somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অপচয়, অপব্যয় এবং অর্থনৈতিক সর্বনাশের পরিমাণ কী ভয়াবহ চিত্র এদেশে প্রতিনিয়ত হচ্ছে- তা সব সরকার জানলেও জনগণ জানে না। এবার দরকার- জনগণের জানার।

০৯ ই আগস্ট, ২০১০ সকাল ১১:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২৩শে জুন, ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা সামান্য ভুলের জন্য শুধু বাংলার স্বাধীনতা অস্তমিত হয়নি; বরং বলতে গেলে সেই যে ভুলের শুরু হলো তারপর থেকে স্বাধীনতা উত্তর একই ভুলের ধারাবাহিকতা চলতে থাকলো। সামান্য সামান্য ভুলে মহা মহা সম্পদ অর্জন ব্যর্থ হলো। অথবা মহা অর্জন বা বিরাট বিষয়কে সামান্য ভুলের দ্বারা ব্যর্থ করা হলো। এ ভুল জাতীয় জীবন তথা জাতীয় সম্পদের, জাতীয় সিদ্ধান্তের সর্বক্ষেত্রে।
উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পশ্চিম জার্মানি আর আমাদের অগ্রযাত্রা বলতে গেলে একই সময়ে শুরু হয়েছে। কিন' বলতে গেলে দুনিয়াবী দিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে।
এক্ষেত্রে প্রথমেই ভেবে দেখা দরকার, আমাদের ভুলটা কোথায় হয়েছে? প্রসঙ্গত বলা, নিশ্চয় পশ্চিম জার্মানি যে পন্থা অবলম্বন করে উন্নতি করেছে, আমরা তার উল্টোটা করেছি। ফলে পশ্চিম জার্মানি উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনার মাধ্যমে টাকা খরচ করে উপরের দিকে উঠেছে, উল্টো পন্থায় উন্নয়নের নামে আমরা ৪/৫ গুণ বেশি টাকা খরচ করে নিম্নমুখে ধাবিত হয়েছি।
একথা সহজেই মেনে নেয়া উচিত যে, তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি তার ঋণ বা সাহায্যের সদ্ব্যবহার করেছে। প্রতিটি পয়সা সে হিসাব করে খরচ করেছে। এক টাকার কাজ পনের আনা দিয়ে শেষ করার চেষ্টা করেছে। আমরা অপব্যবহার করেছি, এক টাকার কাজ হাজার টাকা দিয়ে করিয়েছি। একথা বাংলাদেশ চিন্তাই করেনি যে, এই ৬৬ হাজার কোটি টাকা খাটিয়ে বা ব্যবহার করে তাকে লাভ করতে হবে এবং সেই লাভ থেকে মহাজনের টাকা সুদসহ ফেরত দিয়েই তবে স্বনির্ভর হতে হবে। এই ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সর্বস্তরের লোকেরা একে ‘এইড’ বা ‘সাহায্য’ হিসাবে অভিহিত করত, ‘ঋণ’ বা ‘ভিক্ষা’ শব্দটি ব্যবহার করতো না। সুতরাং বিদেশিরা ‘এইড’ দিচ্ছে, তা যেন তেন প্রকারে খরচ করলেই হলো। এই সর্বনাশা দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই বাংলাদেশ পশ্চিম জার্মানির বিপরীত গতি লাভ করেছে অর্থাৎ নিম্নমুখী হয়েছে। নিম্নে অপচয়ের কয়েকটি উদাহরণ দেয়া হলো-
* জিয়া সার কারখানা শেষ করার কথা ছিলো ৬৯ কোটি টাকায়। আমরা শেষ করেছি ১ হাজার ৫০ কোটি কোটি টাকায়।
* চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি শেষ করার কথা ছিলো ৬শ কোটি টাকায়, আমরা শেষ করেছি ১ হাজার ৬শ ৫০ কোটি টাকায়।
সার বিদেশে রফতানি করা হবে এই ধোঁকাবাজি দিয়ে এমন জায়গায় সার- কারখানা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যাতে এমনিতেই খরচ দ্বিগুণ ধরা যায়। গ্যাস লাইন, বিদ্যুতের লাইন, মিঠা পানির লাইন, নতুন রাস্তা নির্মাণ, দুটি জেটি নির্মাণ, মালামাল পরিবহনে একবার ট্রাক থেকে নামাও, বার্জে ভর, বার্জ থেকে নামাও, ট্রাকে ভর, তারপর নির্মাণ স্থানে নিয়ে যাও ইত্যাদি কারণে এই অতিরিক্ত খরচ বা অপব্যয়গুলো হয়েছে।
তারপরও মজার ঘটনা হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে এক হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম ছিলো ৫ ডলার। এই সার কারখানাকে তা প্রথমে দেয়া হয়েছে ৪০ সেন্টে পরবর্তীতে দেড় ডলার। তারপরেও এই সার কারখানা বিদেশে সার রফতানি করতে টন প্রতি লোকসান দিয়েছে ২৪ ডলারেরও উপরে। দেশের ভিতরে এই সার ব্যবহার করলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি। কারণ, পরিবহন খরচ পড়বে এবং পড়ছে অনেক বেশি।
আমাদের স্টিল মিল তিন শিফটে চলার উপযোগী করে তৈরি। অথচ চলছে মাত্র এক শিফট।
আমাদের জিইএম প্লান্ট তিন শিফটের উপযোগী করে তৈরি। সেখানে এক শিফটও ঠিকমত চলে না।
আমাদের মিরপুর ইনসুলেটর অ্যান্ড স্যানেটারি ফ্যাক্টরি জায়গার দিক দিয়ে বাংলাদেশে বৃহত্তম। তিন শিফটের উপযোগী করে তৈরি। মাত্র ২৫ থেকে ৩০ ভাগ ক্যাপাসিটিতে চলে। এর বেশি মাল বাজারে চলে না। তারপরেও বছরে মাত্র কোটি টাকার উপর লাভ করে। তাহলে কি পরিমাণ লাভ করে? তাহলে এরা কি করে ভারতীয় সস্তা মালের সাথে টিকে থাকবে?
আমাদের জিকে প্রজেক্ট তৈরি করা হয়েছে তিন লক্ষ ৫০ হাজার একর জমিতে পানি সেচনের জন্য। শুকনো মৌসুমে তা সেচন করে মাত্র ৮০-৮৪ হাজার এক জমিতে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত ৭৫ হাজার একর জমিতে। অর্থাৎ চার ভাগের এক ভাগ ক্যাপাসিটিতে চলে।
প্রায় একই চিত্র পাওয়া যাবে মনু সেচ প্রকল্প, মুহুরী সেচ প্রকল্পের বেলায়।
১৯৬৭ সালে চার কোটি টাকার মেঘনা- ধোনাগোদা প্রকল্প ছিল। ১৯৮৮ পর্যন্ত ১৫৬.১৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এখনও প্রকল্পের ভেতরের কাজ ধরা হয়নি। কতদিনে, কত টাকায় শেষ হবে, কে বলতে পারে?
এইসব ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করে শুরু হয়েছে তিস্তা প্রকল্প। শেষ হওয়ার ঠিক ঠিকানা নেই, এদিকে আবার উদ্বোধনও হয়ে গেছে। বলা হচ্ছে, সাড়ে ১৪ লক্ষ একর জমিতে জল সেচন করবে। আমরা জানি, শুকনো মৌসুমে দুই লক্ষ একর জমিতেও জল সেচন করতে পারবে না। মাত্র ৩০/৪০ কোটি টাকার প্রজেক্ট শেষ করতে এক হাজার কোটি টাকারও অনেক বেশি খরচ হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে রেললাইনের নিচে পাথরকুচি দিয়ে রেল লাইন মজবুত করার জন্য সিলেটের ভারতীয় সীমান্ত ভোলাগঞ্জ থেকে পাথর সংগ্রহ করার প্রকল্প তৈরি করেছে, যা ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে (রজ্জুপথ) পাথর প্রকল্প নামে খ্যাত। এই প্রকল্পটি বছরে ১৪ লক্ষ ঘনফুট পাথর সংগ্রহের জন্য তৈরি। অথচ তা সংগ্রহ করে মাত্র ৪-৫ লক্ষ ঘনফুট। কেন ১৪ লক্ষ ঘনফুটের পরিবর্তে ৪-৫ লক্ষ ঘনফুট পাথর সংগ্রহ করে, বাকি পাথর সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না কেন, এ ব্যাপারে রেল কর্তৃপক্ষ বা মন্ত্রণালয় কখনও কোন জবাবদিহি পর্যন্ত চায়নি। অথচ প্রকল্পের টার্গেট মাফিক পাথর সংগ্রহ করতে পারলে ২৫-৩০ বছরে বাংলাদেশের বাদবাকি সমাপ্ত রেল লাইনের নিচে পাথর ফেলা সম্ভব।
বাংলাদেশের রেল লাইনের অবস্থা সবার জানা। রেলওয়ে কামরার স্বল্পতার কথাও সবার জানা। এ অবস্থায় সর্বোচ্চ ৫০০ থেকে ১৫০০ অশ্বশক্তির রেল ইঞ্জিনই যথেষ্ট। কিন' বাংলাদেশ বহু সংখ্যক ২৬০০ অশ্বশক্তির রেল ইঞ্জিন আমদানি করেছে এবং করে।
ভুল পরিকল্পনার আরেক নমুনা উল্লেখ করে বলতে হয়, বিখ্যাত ক্রুগ মিশন (১৯৫৮) রিপোর্টের সুপারিশ মোতাবেক ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (আমেরিকা) ১৯৬০-৬৪তে বাংলাদেশের পানি সংক্রান্ত যে মাস্টার প্লান তৈরি করেছিলো তাতে যমুনার পশ্চিম পাড়ের বাঁধে প্রতিটি শাখা নদী ও উপনদীর সংযোগস্থলে উপযুক্ত সাইজের রেগুলেটর নির্মাণ করতে বলেছিলো। কিন' অদূরদর্শী দেশীয় পরিকল্পনাবিদরা যমুনার পশ্চিম পাড়ে নিশ্ছিদ্র বাঁধ নির্মাণ করে উক্ত নদীগুলোকে হত্যা করেছে। পরিণামে যমুনার পশ্চিম পাড়ে নদী ভাঙ্গন বেড়ে গিয়ে যমুনা নদী পশ্চিমে সরে যাচ্ছে। নদীগুলোর আশপাশের এলাকাসমূহ মারাত্মক পরিবেশ দূষণের শিকার হয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখেনা, গভীরভাবে চিন্তা করে দেখার দরকার এখন জনগণের। অপচয় বা অপব্যয় এবং অর্থনৈতিক সর্বনাশের পরিমাণ কি ভয়াবহ চিত্র প্রতিদিন সাধিত হচ্ছে তা সব সরকারই জানে; কিন' জনগণ জানেনা। কিন' জনগণকে এবার জানতে হবে, বুঝতে হবে।
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×