’৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে রাজধানী ঢাকার মতো পাবনাতেও পাকিস্তান বাহিনী অতর্কিতে স্বাধীনতাষ্কামী নিরীহ বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তবে পাবনার অবস্থা ছিল একটু ব্যতিক্রম। তদন্তকালে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শী একজন মধ্যবয়স্কা মহিলা জানান, ’৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত থেকেই পাবনার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি আর্মি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধরে নিয়ে আসে। ২৬ মার্চ বিকেল আনুমানিক ৩টার ঘটনা। একজন মহিলা তখন পাবনা রায়েরবাজারের প্রধান সড়কের ধারে একটি পুরনো বাড়ির দোতলার জানালায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। জানালার খড়খড়ি দিয়ে দেখছিলেন ভীত-সন্ত্রস্ত পাবনা শহর। হঠাৎ তিনি পাকিস্তানি আর্মির একটি লরি রাস্তার উপর থামতে দেখেন। লরির পেছনে লম্বা দড়ি দিয়ে বাঁধা প্রায় ১০০ মানুষ, যাদের পাকা রাস্তার উপর দিয়ে টেনে আনা হয়েছে। প্রত্যেক বন্দির জামা-কাপড় ছিন্নভিন্ন, তাদের হাঁটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত সাদা হাড় দেখা যাচ্ছিল আর শরীর ছিল রক্তে মাখামাখি। লরির ভেতরে পাকিস্তানি আর্মিদের সঙ্গে মাওলানা আবদুস সুবহানকে বসা দেখেছিলেন তিনি। আর যাদের সিমেন্টের রাস্তার উপর দিয়ে টেনেহেঁচড়ে আনা হচ্ছিল তাদের মধ্যে তিনি পাবনার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবু সাঈদ তালুকদার, এডওয়ার্ড কলেজের প্রফেসর হারুন এবং অ্যাডভোকেট ও আওয়ামী লীগের নেতা আমিনউদ্দিনকে চিনতে পেরেছিলেন। লরি থেকে নেমে কিছু সৈন্য কয়েকটি দালানের উপর ওড়ানো বাংলাদেশের পতাকা নামানো এবং পোড়ানোর ব্যবস্থা করে চলে যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, ভীতসন্ত্রস্ত ওই মহিলা জানান, ২৯ মার্চ ’৭১ সালের মধ্যে তার দেখা ওইসব পরিচিত ব্যক্তির সবাইকে মেরে ফেলা হয়।
পাবনা জজকোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর এবং আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা আলহাজ গোলাম হাসনায়েন (কাচারীপাড়া, পাবনা) বলেন, ‘মাওলানা আবদুস সুবহান আওয়ামী লীগ নেতা আমিনউদ্দিন সাহেবের বাসা পাক আর্মিদের চিনিয়ে দিয়েছিল।’ তিনি আরো বলেন, ‘পাবনার আল-বাদর , রাজাকার, শান্তিকমিটির সব সদস্যকে মাওলানা সুবহান সংগ্রহ ও সংগঠিত করেছিল।’
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবদুল গনি (কালাচাঁদপাড়া, পাবনা) জানান, ‘১৭ এপ্রিল দুপুরে কুচিয়াপাড়া ও শাঁখারীপাড়ায় মাওলানা আবদুস সুবহান পাকিস্তানি আর্মিদের সঙ্গে নিয়ে অপারেশন চালায়। ওইদিন সেখানে ৮ জনকে হত্যা করা হয়। তারা ২০/২৫টি ঘর পোড়ানো এবং সে সঙ্গে লুটতরাজ ও নারী নির্যাতনও করেছিল।’ অধ্যক্ষ আবদুল গনি আরো বলেন, ‘মে মাসে পাবনার ফরিদপুর থানার ডেমরাতে মাওলানা আবদুস সুবহান, মাওলানা ইসহাক, টেগার ও আরো কয়েক দালালের একটি শক্তিশালী দল পাকিস্তানি আর্মিকে নিয়ে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। সেখানে ওইদিন আনুমানিক ১ হাজার মানুষ হত্যাসহ ঘরবাড়ি পোড়ানো, লুণ্ঠন, নারীর সম্ভ্রমহরণ ইত্যাদি করা হয় (সূত্র : গণতদন্ত কমিশন রিপোর্ট)।
পাবনার দ্বিতীয় বৃহত্তম গণহত্যাটি হয় সুজানগর থানায়। ‘মে মাসের প্রথমদিকে এক ভোরে নাজিরগঞ্জ-সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের প্রায় ৪০০ জনকে হত্যা করা হয়’-বলেন মুজিব বাহিনীর সুজানগর থানা লিডার এবং ঢাকার ব্যবসায়ী জহিরুল ইসলাম বিশু। তিনি জানান, সুজানগর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ও শান্তিকমিটির সদস্য মৌলভী মধুকে তারা ’৭১-এর মে মাসের শেষদিকে গ্রেফতার করেন এবং পরে মেরে ফেলেন। জিজ্ঞাসাবাদের সময় এই ঘাতক জানিয়েছিল, ‘সুজানগর অপারেশনের আগের দিন পাথরতলায় মাওলানা আবদুস সুবহানের বাসায় মিটিং হয়েছিল এবং মিটিংয়ে সুজানগর অপারেশনের পরিকল্পনা নেয়া হয়।’ পাবনার যে কোনো অপারেশনের আগে মাওলানা সুবহানের বাসায় পরিকল্পনা করা হতো বলে জহিরুল ইসলাম বিশু গণতদন্ত কমিশনকে জানায়। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে পাবনায় জামাতের দখলদারিত্ব ও লুটপাটের রাজত্ব চলে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে শহরে ৫ কোটি টাকার ৩ একর জায়গা মাত্র ৭৪ লাখ টাকায় জামাতকে দেয়া হয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




