আঞ্জু রাজাকার বহু মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারে
যে ঘাতকের ভয়ে একাত্তরে ৯ মাস আতঙ্কিত ছিলো নেত্রকোনার মানুষ- তার নাম হেদায়েতউল্লাহ (আঞ্জু) বিএসসি। গোলাম এরশাদুর রহমান রচিত ‘নেত্রকোনার মুক্তিযুদ্ধ’ গ্রন্থে এই কুখ্যাত রাজাকারের কাহিনী উল্লেখ আছে। তার হিংস্রতার প্রত্যক্ষদর্শী বয়োবৃদ্ধরা তার নাম শুনে আজো শিউরে উঠেন। দৈত্যদানবের গল্প শুনে শিশুরা যেমন ভয়ে ঘুমিয়ে পড়ে তেমনি এই মানবরূপী দানবের নাম শোনামাত্রই শিশুরা কান্না থামিয়ে ঘুমিয়ে পড়তো বলে জানিয়েছেন অনেকেই। লোকে বলে, কুখ্যাত এই রাজাকার একাত্তরে ব্যবহৃত তার খাকি পোশাকের ব্যাগটি অতি যত্ন সহকারে রেখে দিয়ে আজো তার পাকিস্তানি গোলামীর স্মৃতি মনে রেখে গর্ববোধ করে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, তৎকালীন নেত্রকোনা মহকুমা ও পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জের
ধর্মপাশায় হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজসহ অসংখ্য কু-কর্মের নায়ক এই আঞ্জু রাজাকার। ১৯৭০এর প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে মদন, খালিয়াজুরী ও আটপাড়া থানার কিয়দংশ নিয়ে গঠিত আসনে ধর্মব্যবসায়ী জামাত প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িপাল্ল্লা প্রতীকে নির্বাচন করে সে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। উগ্র জঙ্গিবাদী চেতনায় বিশ্বাসী আঞ্জু রাজাকার আজো চরম মানবতাবিদ্বেষী। প্রথমে জাহাঙ্গীরপুর টি. আমিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় এবং পরে নেত্রকোনার চন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত শিক্ষকতা করেছে। এক সময় জামাতী মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় কর্মরত ছিলো বলেও জানা যায়। আটপাড়া উপজেলার কুলশ্রী গ্রামে জন্মগ্রহণকারী, পাকিস্তানি বাহিনীর এই কুখ্যাত দালাল ছিলো নেত্রকোনা মহকুমা শান্তিকমিটির অন্যতম সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর নিজ ইউনিয়ন সুখারীতে আব্দুল হককে (ফক্কু) সভাপতি এবং সোনাকানিয়ার মজিবরকে সদস্য সচিব করে সে এই তথাকথিত শান্তিকমিটি গঠন করে। কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলো তার আপন ভাই এনায়েত উল্লাহ্ (মঞ্জু), নিজ গ্রাম কুলশ্রীর সোহরাব ফকির, দারগ আলী, নবাব মিয়া, ইসলাম উদ্দিন; সুখারী গ্রামের ইছার উদ্দিন, বাছির, সাহেদ আলী, চান খাঁ, খালেক, ফজর আলী, ডা. জবর উদ্দিন, আমির উদ্দিন, হাতিয়ার ওয়াহেদ আলীসহ আরো অনেকে। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস এরা এলাকায় হত্যা, লুটপাট, রাহাজানি, অগ্নিসংযোগ ছাড়াও স্বাধীনতাকামী জনতার ধান-চাউল, গবাদি পশু, টাকা-পয়সা ও ঘরের চালের টিন লুট করে।
সুখারী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাক বাহিনীকে নিয়ে আঞ্জু রাজাকার জাহাঙ্গীরপুর গ্রামের দেওয়ান বাড়িসহ মধ্যখালী গ্রাম এবং মঙ্গলশ্রী গ্রামের বহু ঘর-বাড়িতে অগ্নি সংযোগ করে ও লুটপাট করে। জাহাঙ্গীরপুর গ্রামের মুদাচ্ছের হোসেন শফিক জানান, টি. আমিন স্কুলে শিক্ষকতার সময় জাহাঙ্গীরপুরের দেওয়ান হাবিবুল্লাহর ঘরে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিলো হেদায়েতউল্লাহ আঞ্জু্র। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অপরাধে এই নিমকহারাম দেওয়ান হাবিবুল্লাহ ও সমাজসেবক দেওয়ান আফরোজ বখতের বাড়িতেও আগুন লাগিয়ে দেয়।
প্রকাশ্য দিবালোকে আঞ্জু রাজাকার সুখারী গ্রামের ৭ নারীকে ধরে মদন থানা আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে লাশ মগড়ার পানিতে ভাসিয়ে দেয়। আঞ্জু রাজাকার ও তার সহযোগীরা অনেক পরিবারের জমিজমাও দখল করে নেয়।
জানা গেছে, যুদ্ধকালীন স্থানীয় জামাত নেতাদের দেয়া ‘ড্যান্ডি কার্ড’ (আইডেনটিটি কার্ডকে পাকিস্তানি সৈন্যরা উচ্চারণ করতো এভাবে) না থাকলে তারা ব্যবসায়ীদের মালামাল ও নগদ অর্থ কেড়ে নিতো।
স্বাধীনতার পর ঘাতক আঞ্জু রাজাকার পালিয়ে গিয়ে রাজশাহীতে তার শ্বশুরালয়ে আশ্রয় নেয় এবং বর্তমানে সেখানেই বসবাস করছে। যুদ্ধের পরে তার গ্রামের বাড়ির পুকুর থেকে শত শত বান্ডেল লুট করা টিন এবং কাঁসা ও কাঁচের অসংখ্য বাসন-কোসন উদ্ধার করা হয়। এলাকাবাসী আজো তার কুকীর্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রত্যাশায় প্রহর গুনছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


