স্বাধীনতার সুফল বৈষম্যহীমভাবে ভোগ করতে হবে। নিজের ফরয হক্ব আদায়ে প্রয়োজনে কঠোর প্রতিবাদ করতে হবে।
বাংলাদেশে কোন কিছুই অসম্ভব নয়। এক জাহাজ শিল্পে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং জনবল যোগান দিতে পারলে এ খাত থেকে বছরে লাখ লাখ কোটি টাকা বা বর্তমান বাজেটের চেয়ে দেড়গুণ বেশি বিদেশী মুদ্রা অর্জন সম্ভব ইনশাআল্লাহ।
ইউরোপের বাজারে সুনাম অর্জন করেছে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প। এতদিনে যে বাজার ছিল কোরিয়া, জাপান ও সিঙ্গাপুরের দখলে সেখানে স্থান করে নিচ্ছে এদেশের তৈরি অত্যাধুনিক ও উন্নতমানের জাহাজ। অন্যদেশের তুলনায় দাম কম ও সর্বাধুনিক হওয়ায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী এবং প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের তৈরি জাহাজের উপর ঝুঁকছে। বাংলাদেশের প্রথম জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান আনন্দ গ্রুপ ইতোমধ্যে ডেনমার্ক, মোজাম্বিক ও নেদারল্যান্ডে ৮টি জাহাজ রফতানি করেছে। অন্যদেশের তুলনায় মান ভালো হওয়ায় গেল দুই বছরে প্রতিষ্ঠানটি ৫০টি জাহাজ নির্মাণের অর্ডার পেয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ৬০০ মিলিয়ন ডলার। কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা মনে করেন, বড় জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট জাহাজ তৈরিতে আর আগ্রহী নয়, শ্রমের উচ্চ মূল্যের কারণে।
আন্তর্জাতিক নৌসংস্থা আইএমওর (ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন) জারি করা আইএসপিএস কোড অনুযায়ী পরিবেশ সচেনতনাকে কেন্দ্র করে সমুদ্রগামী জাহাজ চলাচলের ওপর নানাবিধ বিধিবিধান আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে ইউরোপের দেশগুলোকে শীঘ্রই ৩ হাজারেরও বেশি জাহাজকে স্ক্র্যাপ ঘোষণা করতে হবে এবং এর স্থলে নতুন জাহাজ সংযোজনের উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়া আগামী ২০১২ সালের মধ্যে সারাবিশ্বে প্রয়োজন হবে ১০ হাজারেরও বেশি ছোট, মাঝারি এবং বড় ধরনের জাহাজ। বয়সজনিত ও ফিটনেস না হওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে ইতোমধ্যে অসংখ্য জাহাজের শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। যার মধ্যে ৫ হাজারেরও বেশি হচ্ছে ছোট ও মাঝারি আকারের জাহাজ। এর ফলে আগামী প্রতিবছরে বিশ্বব্যাপী জাহাজ নির্মাণে ২শ’ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশির বাজার রয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী যেসব জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে তারা প্রতি বছর ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের জাহাজ নির্মাণে সচেষ্ট রয়েছে। অবশিষ্ট ৫০ মার্কিন বিলিয়ন ডলার মূল্যের জাহাজ নির্মাণের জন্য বাংলাদেশসহ এ খাতে আসা নতুন নতুন দেশের দিকে ঝুঁকছে ক্রেতারা।
বর্তমানে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ভিয়েতনাম আগামী পাঁচবছর নাগাদ জাহাজ নির্মাণ ও সরবরাহের জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। যেহেতু আগামী পাঁচ বছরের আগে সরবরাহের জন্য নতুন ক্রেতাদের কাছ থেকে তারা কোন অর্ডার নিতে পারছে না সেক্ষেত্রে জাহাজ নির্মাণের উদীয়মান দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এসব অর্ডারের বড় একটি অংশ পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ব্যাপক।
গত ২৬ নভেম্বর/২০১০ জার্মান জাহাজ ক্রেতার জন্য ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ ইয়ার্ড নির্মাণ করেছে 'গ্রোনা এমারসাম' ও 'গ্রোনা বিএসাম' নামের দুটি বৃহদাকৃতির জাহাজ ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ১শ’ মিটার লম্বা এবং ৫২০০ বিডব্লিউটি আইস ক্লাস মাল্টিপারপাস এ জাহাজ দুটি একযোগে তৈরি হয়েছে। জার্মানির গ্রোনা শিপিং নামের একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের ওয়েস্টার্ন মেরিনের কাছে যে ১২টি জাহাজ নির্মাণের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে এ জাহাজ দুটি এর অংশ। ২৬ নবেম্বর হস্তান্তর অনুষ্ঠানে গ্রোনা শিপিংয়ের ফ্লিট ম্যানেজার মারকু ভেডার জানিয়েছেন, বিশ্বে উন্নত জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সমকক্ষ এ জাহাজ দুটি।
ইতোমধ্যে এ খাতে অর্জিত হয়েছে ৫শ’ কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা। সরকারের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা এবং জাহাজ নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুঁজি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নির্মাণকাজে গুণগত মান ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদি ঠিক রেখে এ খাতে মনোযোগী হলে আগামীতে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক খাতে নতুন এক বিপ্লবের সূচনা ঘটবে নিঃসন্দেহে, যা আগামী ৫ থেকে ৬ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে নিম্ন আয়ের থেকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করবে।
সামপ্রতিক বিশ্বমন্দার মধ্যেও এদেশের ৬ লাখ কোটি টাকার অর্থনীতির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৬ শতাংশ, আশির দশকেও যা ছিল সাড়ে ৩ শতাংশ। তিনি জানিয়েছেন, গত চার দশকে রফতানি বেড়েছে ১১ শতাংশ, দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে বাণিজ্য। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এক বিলিয়ন থেকে এগারো বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ৫ গুণ বেড়েছে প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স। এছাড়া গার্মেন্টস, সিরামিকস, ওষুধ এবং জাহাজ নির্মাণশিল্প আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছেছে। যার কারণে চীন এবং জাপান থেকেও বিনিয়োগকারীদের আসা বৃদ্ধি পেয়েছে।
সূত্র জানায়, শতভাগ রফতানিমুখী পণ্যখাতের মধ্যে একমাত্র শিপ বিল্ডিং খাতে শুরুতে ভ্যালু এডিশনের পরিমাণের হার ৩৫ শতাংশ, যা অন্য কোন শিল্পে হয় না। গার্মেন্টসে শুরু হয় আড়াই শতাংশ ভ্যালু এডিশন দিয়ে। ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত জাহাজ নির্মাণখাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে ৫শ কোটি টাকারও বেশি। আগামী দু'বছরের মধ্যে এ খাতে আসবে আরও সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সমীক্ষায় উঠে এসেছে বাংলাদেশে শিপ বিল্ডিং জোন প্রতিষ্ঠার জন্য অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধায় শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম। এরপরে রয়েছে ঢাকার মেঘনাঘাট এলাকা এবং তারপরে রয়েছে খুলনার মংলা। লজিস্টিক ও অবকাঠামোগত সুবিধা ব্যাপকভাবে বিদ্যমান থাকার কারণে চট্টগ্রামে এ জোন দ্রুত প্রতিষ্ঠা করা যায়। নদীমুখ এবং সাগরের সঙ্গে সংযুক্তি থাকার কারণে কর্ণফুলী নদীর প্রায় ৪০ হাজার মিটার (৪০ কি.মি.) এলাকাজুড়ে অসংখ্য শিপ বিল্ডিং ইয়ার্ড গড়ে তোলার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ১২নং জেটি থেকে কালুরঘাট ব্রিজ পর্যন্ত ৪০ কি.মি. এলাকাজুড়ে কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ে এখনও এ ধরনের তেমন কোন শিল্প গড়ে ওঠেনি।
একটি শিপ বিল্ডিং ইয়ার্ডের জন্য প্রয়োজন নদীমুখ সংলগ্ন সর্বোচ্চ ২শ' মিটার জমি। নদীমুখের পেছনে থাকতে হবে অবকাঠামোগত সুবিধা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় জমিসমূহ। কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ের ৪০ হাজার মিটারের এলাকায় নদীমুখের সর্বোচ্চ ৪ হাজার মিটার জমি নিয়ে ২০টি শিপ বিল্ডিং ইয়ার্ড সংবলিত একটি জোন প্রতিষ্ঠা করার সুবিধা রয়েছে। পাশাপাশি মেঘনা ঘাট এলাকা ও মংলায় যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিপ বিল্ডিং জোন প্রতিষ্ঠা করার সুবিধা রয়েছে।
অর্থাৎ অপার সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প। এ শিল্পে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। শুধু প্রয়োজন বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি অবকাঠামোগত সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা।
ভারতে এ শিল্পের ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৭ শতাংশ। কিন' বাংলাদেশে ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ। বিদেশী ব্যাংকের গ্যারান্টি চার্জ হিসেবে আরও ৪ থেকে ৫ শতাংশ বর্তায়। ফলে সরকার বিষয়টি দ্রুত খতিয়ে দেখে সুদের হার শূন্য করে বিনা সুদে এ শিল্পের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো (ইপিবি) এবং বিদেশে বাংলাদেশী দূতাবাসগুলোর উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মেলা আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বমানের জাহাজ তৈরির যে তালিকাভুক্ত হয়েছে তা জানান দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এতে করে বিদেশী ক্রেতারা দ্রুত বাংলাদেশের প্রতি ঝুঁকবে। জাহাজ শিল্প মালিকরা বলেছেন, আমরা চাচ্ছি সরকার এ সেক্টরের প্রতি যেন আরো বেশি নজর দেয়। কারণ এ সেক্টর থেকে এখন যে অবকাঠামো আছে, তাতেই বছরে কমপক্ষে ১০ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। সরকার যদি তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের মতো আমাদেরও সমান হারে সুবিধা দেয়, তাহলে আগামী ৫ বছরের মধ্যে এ শিপ বিল্ডিং সেক্টর থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।
‘বাংলাদেশ আগেও গরিব ছিলো না। এখনও গরিব নয়। সদিচ্ছা, সততা আর সক্রিয়তা থাকলে সোনার বাংলার ঐতিহ্য বাংলাদেশ অচিরেই ফিরে পেতে পারে।’ বর্ণিত জাহাজ শিল্পের সোনালী সম্ভাবনা সে নির্দেশনারই প্রমাণ বহন করে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




