যে ঢাকা শহরে দরিদ্র থেকে অতি দরিদ্র মানুষ লাখ লাখ;
যেখানে দরিদ্র লাখ লাখ অধিবাসী ক্ষুধার জ্বালায় দুপুর বেলা ফুটপাতের রুটি-গুড় কিনে খেতেও ব্যর্থ হয়;
যে ঢাকা শহরের অসহায় দরিদ্র্য মেয়েরা বেঁচে থাকার জন্য সম্ভ্রম হারাতে বাধ্য হয়-
সে ঢাকা শহরে আগামী ০৯ ডিসেম্বর ২০১০ ঈসায়ী তারিখে আসছে কথিত বলিউড সুপার স্টার শাহরুখ খান।
রাজধানী ঢাকার বড় বড় বিলবোর্ডে শাহরুখ খানের ছবিসহ প্রচারণা এবং দেয়ালগুলোতে শাহরুখের ঝলমলে রঙ্গীন পোস্টার শোভা পাচ্ছে।
আবার সেই একই ফুটপাতেই পলিথিনের ঘুপচি ঘরে বসবাস করছে গরিব দুঃখী মানুষেরা।
যাদের তিন বেলা পেট পুরে ভাত খাবার সামর্থ্য নেই। বৃষ্টির দিনে যাদের খুপড়ি ঘর ভিজে যায়।
যে রাজধানীতে টাকার অভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়া পাওয়ার স্টেশন ঠিক হয় না।
বিদ্যুতের অভাবে অন্ধকারে গরমে হাঁসফাঁস করে ঢাকাবাসী।
যে শহরের মানুষরা বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য দীর্ঘ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।
আরো লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে এই শহরের খেটে খাওয়া মানুষরা স্বল্পমূল্যে মোটা চাল কিনবার জন্য, তীব্র রোদ মাথায় নিয়ে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে-
সেই দরিদ্রপীড়িত, সমস্যায় জর্জরিত ঢাকা শহরে আসছে ভারতের কথিত সুপার হিরো শাহরুখ খান। তার সাথে আরো আসছে ভারতের আরো ৪০/৪৫ জন নায়ক-নায়িকা। তারা ০৯ ডিসেম্বর ঢাকা আসছে। ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে ১০ ডিসেম্বরে তারা নেচে-গেয়ে দর্শকদের আনন্দ দিবে। নাঊযুবিল্লাহ!
গত কয়েক দিনে বাংলাদেশের কথিত জাতীয় দৈনিকগুলো শাহরুখের ঢাকা আগমন উপলক্ষে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়ে খবর ছাপাচ্ছে।
‘দৈনিক প্রথম আলো’ পত্রিকায় হেডিং হয়- ‘শহর মাতাতে শাহরুখ’।
খবরে বলা হয়- “বলিউডের ডন কিংবা কিং খান নামেই তাকে চেনে গোটা দুনিয়া। কখনো প্রেমিক, কখনো কমেডিয়ান, কখনো আবার দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সামরিক কর্তা, অভিনয়ের এই সার্বজনীনতার গুণে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছানো এই তারকার নাম শাহরুখ খান। দীর্ঘদিন ধরে হিন্দি ছবির নাম্বার ওয়ান নায়কের আসন দখল করে রাখা এই মেগা স্টার প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আসছে ৯ ডিসেম্বর।
নগরের আর্মি স্টেডিয়ামে ১০ ডিসেম্বর নেচে-গেয়ে দর্শকদের মন মাতাবে শাহরুখ খান।
আর এই শাহরুখসহ অন্যান্য বলিউডের নায়িকা, গায়ক ইত্যাদি আনার মূল পরিকল্পনাকারী অন্তর শোবিজ।
অন্তর শোবিজের চেয়ারম্যান স্বপন চৌধুরী জানান, শাহরুখ খান আসবে তার নিজস্ব চার্টার প্লেনে চড়ে। বলিউডের এই কথিত বাদশা তার নিজস্ব বডিগার্ড, মেকআপ ম্যানসহ পুরো স্টাফ নিয়েই ঢাকায় ঢুকবে। ঢাকার পথে চলার জন্য সে ফরমায়েশ দিয়েছে বিএমডব্লিউ সেভেন সিরিজের গাড়ি। ভোজনের জন্য বিশেষ কোনো পদের খায়েশ না দেখালেও পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো তার পাতে তুলে দেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করবে না অন্তর শোবিজ। পাঁচতারকা হোটেলের একটি স্যুইট বুক করা হয়েছে কিং খানের আয়েশ করার জন্য। ব্যস্ততার ফাঁকে নগরের কোথাও তার ঘোরার ফুরসত হবে কি-না, তা জানা যায়নি।
মঞ্চের খুব কাছ থেকে শাহরুখকে দেখতে হলে ২৫ হাজার টাকার প্লাটিনাম টিকিট কাটতে হবে। প্লাটিনাম সারির একটু পেছনেই ১০ হাজার টাকার গোল্ড শাখার আসন। গোল্ডের ঠিক পরই ক্রমানুসারে রয়েছে পাঁচ হাজার টাকার সিলভার ও তিন হাজার টাকার ব্রোঞ্জ ক্যাটাগরি শাখার আসন। টিকিটের চড়া মূল্য সত্ত্বেও নগরবাসীর মধ্যে উৎসাহের কমতি দেখা যাচ্ছে না। ২৬ নভেম্বর থেকে টিকিট বিক্রি শুরু হলেও আগেভাগেই বুকিংয়ের জন্য দৌঁড়াদৌঁড়ি শুরু করেছে অনেকেই। রক্ত-গোশতের শাহরুখকে দেখা চাই-ই তাদের।”
‘দৈনিক কালের কণ্ঠ’ পত্রিকায় হেডিং হয়- ‘তারা আসছে’।
খবরে বলা হয়- “আর কয়েকদিন পরই বিশাল দলবল নিয়ে দুটি উড়োজাহাজে করে ঢাকা মাতাতে আসছে বলিউড তারকা শাহরুখ খান ও রানী মুখার্জি। আগামী ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় তাদের কনসার্টকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উৎসাহ ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। সরাসরি তাদের অনুষ্ঠান দেখার সাধ মেটাতে এরই মধ্যে অনুষ্ঠানের বেশির ভাগ টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে বলেও জানা গেছে।
....অন্তর শোবিজের প্রচারণা মারফৎ জানা গেল যে, আগামী ৯ ডিসেম্বর ভারতের মেগা স্টার শাহরুখ খান আসছে। সাথে থাকছে রাণী মুখার্জি, অর্জুন রামপালসহ আরো অনেকে। ১০ ডিসেম্বর প্রায় ৬ ঘণ্টাব্যপী এদের কর্মকাণ্ড চলবে ঢাকাস্থ আর্মি স্টেডিয়ামে। অন্তর শোবিজ প্রায় ২০,০০০ টিকেট ছাড়ছে। এর মাঝে ন্যূনতম ৫,০০০ টাকা থেকে থাকছে ১০,০০০, ১৫,০০০ এবং ২৫,০০০ টাকার টিকেট।”
এদিকে, খবর প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ মূল্য অনুযায়ী টিকেট সংখ্যা জানায়নি। তাই গাণিতিক সুবিধার জন্য ধরে নিলাম ৫,০০০ টাকার টিকেট সংখ্যা ১০,০০০ (৫০%), ১০,০০০ টাকার টিকেট সংখ্যা ৫,০০০ (২৫%), ১৫,০০০ টাকার টিকেট সংখ্যা ৩,০০০ (১৫%) এবং ২৫,০০০ টাকার টিকেট সংখ্যা ২,০০০ (১০%)। এই হিসেবে ২০,০০০ টিকেটের মোট মূল্যমান সাড়ে ১৯ কোটি টাকা মাত্র। আর অ্যাড ও স্পন্সরশিপ বাবদ অন্তত এর অর্ধেক টাকা আসবে (প্রায় ১০ কোটি)। সর্বসাকুল্যে উঠে আসবে প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
সাধারণত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কখনই প্রকাশ করে না যে, কোন খাতে কত টাকা খরচ হয়েছে। তারকারা অনেক বেশি জনপ্রিয় সেটা মাথায় রেখেই অর্থভাগের একটা হিসেব করে। ধরে নেয় তারকারা পাবে এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ১০ কোটি টাকা। সরকারকে দেয়া করসহ অন্যন্য ব্যবস্থাপনা খরচ আরো এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ১০ কোটি টাকা। এবং অন্তর শোবিজের লাভ বাকি এক-তৃতীয়াংশ ১০ কোটি টাকা। এটা একটা গড়পরতা হিসেব।
এটা সারাদেশের অর্থপাচারের একটা উদাহরণমাত্র। আমাদের ভেতর এই অপচয়ের সংস্কৃতিটা বেশ ভালোভাবেই শেঁকড় গেড়েছে। যেখানে আমাদের দেশের অনেক লোকই এক বেলা খবার পর ভেবে পায় না যে পরের বেলাতে খাবার জুটবে কি-না; সেখানে কি করে একজন ভিনদেশী কথিত নায়ককে নিয়ে শহরবাসী এরকম উন্মাদ আচরণ করতে পারে?
যাদের টাকা আছে তারা খাবে, যাদের নেই তারা না খেয়ে থাকবে এটাই পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যের মূলনীতি। যাদের টাকা আছে তারা শাহরুখের সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা উপভোগ করবে। তাতে দেশের ক্ষুধার্ত মানুষের ভাগ্যে একমুটো ভাতও জুটবে না। আর মোটা চালের দাম ২ টাকাও কমবে না, বরং বাড়বে।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, কথিত ভারত বিরোধীতাকারীরা কিন' এখনো মুখে কুলুপ এটে বসে আছে। তাদের মুখে এই মহা অপচয় বন্ধের জন্য কোনো আন্দোলন নেই। নেই কোনো আস্ফালন। তারা ভারতের বিরোধিতা করে শুধুমাত্র
রাজনৈতিক ফায়দা হাছিলের জন্য,
ব্যক্তি স্বার্থ হাছিলের জন্য
সস্তা জনপ্রিয়তা হাছিলের জন্য।
এই ভারত বিরোধীতাকারী ছাড়াও দেশের তথাকথিত সংস্কৃতিবাদীরা কিন' শাহরুখ খানের এই অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে কিছু বলছে না, বলছে না এটা দেশের সংস্কৃতি ও নৈতিক মূল্যবোধ বিরোধী। তারা বলছে না এই কারণে যে, বললে দাদারা তাদের প্রতি নাখোশ হবে। দাদাদের নেক নজর পাওয়া যাবে না। এসব কথিত প্রগতিশীলরাই আবার পহেলা বৈশাখে বাঙালি সাংস্কৃতি নিয়ে বুলি আওড়ানো শুরু করবে। একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলা ভাষার প্রতি দরদ উথলে উঠবে এসব প্রগতিশীল কথিত সংস্কৃতিবাদিদের। কিন' এখন এরা বোবা, বধির, অথর্বের ভূমিকা পালন করছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, রক্ত-গোশতের শাহরুখকে দেখার জন্য টিকিটের অগ্নিমূল্যের মাধ্যমে বুঝা যায়, আমাদের দেশের সাধারণ মানুষদের জন্য এই আয়োজন নয়। অবশ্য ইসলামের দৃষ্টিতে কারো জন্য কোথাও এবং কখনো এ আয়োজন করা জায়িয নয়।
চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হচ্ছে মানুষে মানুষে বৈষম্য কত বেড়েছে। যারা এতো টাকা খরচ করে টিকেট কিনবে, তাদের আয়ের উৎস দেখবে না সরকার? সাধারণ মানুষের পকেট কেটে যারা আজ এত অর্থ বিত্তের মালিক তাদেরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর মত শক্তি কি দিন বদলের আওয়াজ তুলে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকারের আছে কি?
পাশাপাশি বর্তমান সরকারের কী একথাও মনে নেই যে, তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিলো ‘কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ শরীফ বিরোধী কোনো আইন পাস হবে না’। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ শরীফ বিরোধী এত বড় একটা হারাম গান-বাজনার আয়োজনের অনুমতি সরকার দেয় কি করে?
সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার নিজেই কি কাঠগড়ায় দাঁড় হয়ে যায় না?
উল্লেখ্য, কথিত ইন্ডিয়ান আইডল দিয়ে অন্তর শোবিজ এই রমরমা ব্যবসা শুরু করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এ আয়োজন যতই হারাম হোক না কেনো, কেনো টিকিটই অবিক্রিত থাকবে না বলে ধারনা করা যায়।
ইন্ডিয়ান আইডল রাহুল যখন ঢাকায় এসেছিলো; তাকে নিয়ে যে মাতামাতি হয়েছিলো তাতে সে নিজেই ঘাবড়ে গিয়েছিলো। সে অবাক হয়ে বলেছিলো যে, ‘তার নিজ দেশ ভারতেও তাকে নিয়ে কেউ এমন মাতামাতি করে না’।
অতএব, কোটি কোটি টাকা অপব্যয়ের মহোৎসবে মেতে উঠার কেন্দ্রবিন্দু শাহরুখের ঢাকা আগমন বন্ধে এই সরকারকে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুবা গরিব অর্ধভুক্ত মেহনতি মানুষের দীর্ঘশ্বাসে পুড়ে অঙ্গার হবে এই সরকার। তখন কিন' কথিত বলিউড কিং খান এসে এই সরকারকে সাহায্য করতে পারবে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


