গতকাল নিউজ হেডিং হয়েছে, “বিক্ষোভ, পুলিশ-শ্রমিক সংঘর্ষ। চট্টগ্রামে ৩ শ্রমিক নিহত, আহত ২ শতাধিক। রূপগঞ্জে আহত ২৫, আটক ৫। কুড়িলে ভাংচুর, পুলিশের লাঠিপেটা।”
প্রসঙ্গত যে প্রশ্ন অতি তীর্যক ও সঙ্গত যে, এই কী অতি সাম্প্রতিককালে গার্মেন্টস সেক্টরে ঘটে যাওয়া প্রথম সংঘর্ষ অথবা রক্তপাত? মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর আশুলিয়া, সাভার, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ প্রভৃতি স্থানে আরো বহুবার কী এ ধরনের সংঘর্ষ হয়নি?
তাহলে সেগুলি থেকে প্রশাসনের অর্জন ও অভিজ্ঞতা কী?
এতো অভিজ্ঞতার পরও কেনো বার বার নতুন নতুন ঘটনার উদ্রেক হয়?
তবে কী প্রশাসনেও রয়েছে কথিত ‘সর্ষের ভূত’?
গতকাল ‘দৈনিক আল ইহসান্তু-এই আরেকটি হেডিং হয়েছে, “ঢাকা ইপিজেডে কঠোর নিরাপত্তা।”
প্রশ্ন হলো, ঢাকায় কঠোর নিরাপত্তা নেয়া হলেও চট্টগ্রামে কেনো যথাসময়েই নিরাপত্তা জোরদার করা হলো না? তার লক্ষণ বা শঙ্কা কী একেবারেই অমূলক ছিলো?
গার্মেন্টস শিল্পে যে চরম নাশকতার ষড়যন্ত্র চলছে তা মহাজোট সরকার ক্ষমতায় বসার পর থেকে ‘দৈনিক আল ইহসান্তু-এর সম্পাদকীয় নিবন্ধে শুধু আলোকপাতই করা হয়নি; বরং সামগ্রিক নির্দেশনাও ব্যক্ত করা হয়েছে।
কিন্তু সরকারের ক্রমাগত অবহেলা আর অলসতার কারণেই শুধু সরকারকেই যে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে তা নয়, বরং গার্মেন্টস শিল্পসহ গোট দেশবাসীকেই মুখোমুখি হতে হচ্ছে চরম নৈরাজ্যের মুখোমুখি।
গত জুলাইয়ে গোয়েন্দারা গার্মেন্টস সেক্টরে ৪৮ শ্রমিক নেতা নামধারীকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। মোবাইল ট্রাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে উক্ত নেতাদের বিভিন্ন সময়ের কথাবার্তা রেকর্ড করে এই শনাক্তকরণ করা হয়। বিষয়টি অন্য শ্রমিক সংগঠনগুলো জানতে পেরে আন্দোলন থেকে পিছিয়ে আসে।
দেখা যাচ্ছে, গার্মেন্টস সেক্টরে কারা নাশকতা চালায় তা গোয়েন্দা রিপোর্টে বহু আগেই উল্লেখ রয়েছে।
অথচ গতকালের গার্মেন্টস অরাজকতার পরও শ্রমমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন যে, ‘তৈরী পোশাক শিল্পে অসি'রতার বিষয়টি গোয়েন্দারা খতিয়ে দেখছেন।’
আমাদের প্রশ্ন, গোয়েন্দারা যদি এখনও খতিয়ে দেখতে থাকে; তাহলে সে দেখার শেষ করার আগেই গার্মেন্টস সেক্টর ধ্বংস হয়ে যাবে।
এ দেখা দিয়ে শ্রমমন্ত্রীর বা গোয়েন্দাদের কী লাভ?
গার্মেন্টস সেক্টর তথা দেশবাসীরও বা কী লাভ?
আর যে তথ্য এখন সাধারণ মানুষও জানে; তার চেয়ে পুরাতন তথ্য আবিষ্কারেই যাদের গলদঘর্ম হতে হয়, তাদেরকে গোয়েন্দা বলেইবা কী লাভ?
আর এ ধরনের অগা-মগা গোয়েন্দা পুষেই বা সরকার তথা জনগণের কী লাভ?
অথবা গোয়েন্দাদের অগা-মগা তথা নিষ্ক্রিয় রেখে সত্যিকার অর্থে কাদের লাভ?
‘দৈনিক আল ইহসান্তু-এ বহুবার সতর্ক করা হয়েছে, গার্মেন্টস ব্যবসাকে পাটকলের ন্যায় অন্যদেশে নিয়ে যাওয়ার পাঁয়তারা চলছে। বিদেশী ২২টি এনজিও এর নেপথ্যে কাজ করছে। ভাড়া করা শ্রমিকদের দিয়ে তৈরি তথাকথিত শ্রমিক অসন্তোষকে এই সকল এনজিও সহিংস ঘটনার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় এমপি, দলীয় নেতা-কর্মীরা ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা নিয়ে শ্রমিক নেতাদের জড়িয়ে অসন্তোষ সৃষ্টি করছে। চাঁদাবাজির সঙ্গে ওই সকল এমপি ও নেতা-কর্মীরা জড়িত হয়েছে।
ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের আশীর্বাদ থাকায় এসব শ্রমিক নেতা বার বার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ওই শ্রমিক নেতারা বিদেশী কোন শক্তির এজেন্ট হয়ে কাজ করে দেশের গার্মেন্টস সেক্টর ধ্বংস করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে।
এর মধ্যে একটি এনজিওর কর্ণধারকে গ্রেফতার করা হলেও কূটনৈতিক চাপে শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দেয়া হয়।
মূলত গার্মেন্টস সেক্টরের ষড়যন্ত্র এবং কারা ষড়যন্ত্র করছে তা মোটেই রাখঢাকের মধ্যে নেই।
১৯৭৮ সালে ৮ লাখ টাকা দিয়ে যাত্রা শুরু হওয়া বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের রফতানি বর্তমানে ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ৪০ হাজার থেকে বেড়ে কর্মসংস্থান দাঁড়িয়েছে ৩৫ লাখে। ৪০ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিনিয়োগে তিলে তিলে গড়ে ওঠা এ শিল্পখাত জিডিপিতে ১৪ শতাংশ অবদান রাখছে। গত ২০০৯-১০ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৬৭৬ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের মধ্যে ৫৩৬ কোটি টাকাই এসেছে পোশাক শিল্পখাত থেকে।
গত বছর বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পাঁচ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা মুনাফার তিন হাজার ৯০০ কোটি টাকাই এ খাতের অবদান। পরিবহন খাতকে গার্মেন্ট শিল্প দেয় বছরে ৫২০ কোটি টাকা, প্রিন্টিং সামগ্রী ব্যবহৃত হয় পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি। শুধু তা-ই নয়, গার্মেন্ট শিল্পে কর্মরত ৩০ লাখ নারী শ্রমিক প্রতি বছর অন্তত ২০০ কোটি টাকার কসমেটিকস ব্যবহার করছেন। কিন্তু সরকারের উদাসীনতার কারণে সম্ভাবনাময় এ শিল্প আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
বলাবাহুল্য, বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টর দখলে আটঘাট বেঁধে নেমেছে প্রতিবেশী ষড়যন্ত্রকারী রাষ্ট্র ভারত। নিজস্ব এজেন্টদের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে দিয়ে একে একে দখল করে নেয়া হচ্ছে বড় বড় গ্রুপের পোশাক কারখানাগুলো। কোনোটির আংশিক মালিকানা আবার কোনোটির পুরো মালিকানা কিনে নিচ্ছে ভারতীয়রা।
এরই মধ্যে পোশাক খাতের বড় কয়েকটি কারখানা চলে গেছে ভারতীয়দের হাতে। মালিকরা বলেছেন, সঙ্কটের কারণে তারা কারখানা চালাতে না পেরে বিক্রি করে দিয়ে দায়মুক্তি নিয়েছেন। গত এক বছরে এ ধরনের অর্ধশতাধিক কারখানার মালিক হয়েছেন ভারতীয়রা। কিনে নেয়া কারখানাগুলোতে উন্নতমানের মেশিন বসিয়ে ছাঁটাই করা হচ্ছে ৯০ শতাংশ শ্রমিক। বিক্রির তালিকায় আছে আরও শতাধিক কারখানা। ভারতের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার কয়েকজন উদ্যোক্তাও অবশ্য বাংলাদেশের গার্মেন্টস দখলকারীর তালিকায় আছেন।
উল্লেখ্য, প্রায় পাঁচ হাজার তৈরি পোশাক কারখানায় বর্তমানে ২২ হাজারের মতো বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত আছেন। এদের মধ্যে দেড় হাজারের বেশি ভারতীয়। যোগাযোগ, মার্কেটিং, গুণগত মানসহ সব দিক থেকে দক্ষ হওয়ায় বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প মূলত তাদেরই নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উদ্যোক্তারা পরিচালিত হন তাদের তৈরি করা ছক অনুযায়ী। এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ যে ভারতের তুলনায় বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে তার সবই ভারতীয়দের নখদর্পণে। তারাই মূলত ছক আঁকেন বাংলাদেশের সেরা কারখানাগুলোকে ভারতীয়দের দিয়ে কিনিয়ে নেয়ার। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শ্রমিকদের উস্কে দিয়ে কারখানায় ভাংচুর চালিয়ে উদ্যোক্তাদের মনোবল নষ্ট করেন তারা। পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের ব্যবসায়িক সম্ভাবনাগুলো সম্পর্কে ধারণা দিয়ে কারখানা কিনিয়ে দেন। মালিকানা পরিবর্তন হওয়ার আগে বিভিন্ন অজুহাতে কারখানাগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। নতুন মালিকরা এসে এগুলোর আধুনিকায়ন করেন উন্নত মেশিনারি দিয়ে। ফলে এসব কারখানা থেকে প্রায় ৯০ ভাগ শ্রমিকই বাদ পড়েন।
বিশ্বের ইউরোপ আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের শত শত ক্রেতা এখন বাংলাদেশে। কোটি কোটি টাকার অর্ডার আসছে প্রতিদিন। একের পর এক কাজের অর্ডার আসতে শুরু করায় উজ্জীবিত গার্মেন্টস মালিকেরা।
সবকিছু মিলে এক জমজমাট অবস্থা দেশের গার্মেন্টস সেক্টরে। ইউরোপ এবং আমেরিকার বড় বড় ক্রেতারা যারা এদেশ থেকে চলে গিয়েছিলো তারা এখন আবার ফিরে আসছে। যা বংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরের সামনে এক অপার সম্ভাবনা নিয়ে আসে।
কিন্তু ভারতীয় এজেন্ট ও দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের তাণ্ডবের মুখে কোটি কোটি টাকার তৈরি পোশাক রপ্তানির যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিলো তা নস্যাৎ হতে চলেছে।
সিইপিজেডসহ চট্টগ্রামের গার্মেন্টস সেক্টরে একটি সুনাম ছিলো বিশ্বব্যাপী। অতীতে বিভিন্ন সময় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, আশুলিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে নারকীয় তাণ্ডব চালানো হলেও চট্টগ্রামে কোন ধরনের অঘটন ঘটেনি। এতে করে ইউরোপ আমেরিকার বহু অর্ডার এসেছিলো চট্টগ্রামে। কিন্তু গত দুইদিনের ঘটনায় চট্টগ্রামের গার্মেন্টস সেক্টরের সেই ইমেজ ধুলোয় মিশে গেছে। ইয়ংওয়ানের মতো একটি বিশ্বখ্যাত কোরীয় কোম্পানির উপর হামলা এবং অসংখ্য গার্মেন্টস ভাঙচুরের ঘটনার বার্তাটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পর শ্রমিক তাণ্ডবে যদি সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় তাহলে আর বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আসবে না, বায়াররাও আসবে না। এটাই ষড়যন্ত্রকারীদের মূল ষড়যন্ত্র।
সঙ্গতকারণেই সরকারকে মনে রাখতে হবে যে, গার্মেন্টস ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় তার সরকারের ব্যর্থতা হবে দেশবাসীর সাথে চরম বেঈমানী করার শামিল। অথচ প্রশাসনের যে অবস্থা তাতে প্রতিভাত হয়, তারা এখনও নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে আছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


