সাধারণের অনেকেই জানেনা যে, বাজারে যাওয়া সুন্নত। ক্রেতা হওয়া সুন্নত। আবার বিক্রেতা হওয়াও সুন্নত। আবার ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্পর্ক মধুর, সাবলীল, স্বচ্ছ হওয়াও সুন্নত।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। পণ্য বিক্রয় করে মুনাফা অর্জনের চিরন্তন অধিকার রয়েছে বিক্রেতার। পক্ষান্তরে ক্রেতারও অধিকার রয়েছে সঠিক দামে সঠিক জিনিসটি পাওয়ার। কিন' বাস্তবতা হলো, ক্রেতা সে অধিকার হতে শুধু বঞ্চিতই হন না বরং অনেক মহলের দ্বারাই শোষিত হয়ে থাকেন।
বাংলাদেশের বাজারে কয়েকটি প্রবণতা আছে। যেমন অল্পসংখ্যক ব্যবসায়ী বাজারের বেশির ভাগ পণ্য নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা সবাই বড় ব্যবসায়ী। দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার তাদের কাছে চলে গেছে অনেক আগেই। তারাই বিভিন্ন পণ্য আমদানি এবং স্থানীয় বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
দ্বিতীয়ত, উৎপাদন পর্যায় থেকে ক্রেতার হাতে আসা পর্যন্ত আট থেকে ১০ বার হাত বদল হয়। এতে মাঝপথেই দাম বেড়ে যায়। রয়েছে পাইকারি বাজারের সঙ্গে খুচরা বাজারের পার্থক্য। এর বাইরে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেলে এর প্রভাব পড়ে দ্রুত কিন' কমলে সহজে এর প্রভাব দেখা যায় না।
প্রসঙ্গতঃ বর্তমানে ঢাকায় টমেটোর দাম ৭০ থেকে ১০০ টাকা কেজি।
কিন' রাজশাহীর কৃষক এই টমেটো উৎপাদন করে পেয়েছেন মাত্র ১৬ টাকা।
রাজশাহী থেকে ঢাকার খুচরা বাজারে আনতে খরচ পড়েছে প্রতি কেজিতে ৪ থেকে ৫ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৫০ থেকে ৮০ টাকাই অতিরিক্ত মুনাফা হয়ে ঢুকেছে রাজশাহীর পাইকারী ব্যবসায়ী, ঢাকার কারওয়ান বাজারের আড়তদার আর খুচরা বিক্রেতার পকেটে।
জানা যায়, জমির টমেটো কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত আসতে তিন থেকে পাঁচ হাত বদল হয়। প্রতিটি হাত বদল হলেই বাড়ে দাম। কৃষক ঢাকায় টমেটোর খুচরা দাম জানতে পারে না। পাইকাররা বেশির ভাগ সময় প্রকৃত দামের চেয়ে কম দাম বলে কৃষককে ঠকায়।
উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ্য, রাজশাহীর গোদাগারী ছাড়াও কুমিল্লার নিমসারের টমেটোই এলাকার মূল অর্থনীতি। হাজার কৃষকের মরা-বাঁচার প্রশ্ন এর সঙ্গে জড়িত। বৎসরের এ সময়টায় রোজ বিরাট হাট বসে। টমেটো ওঠে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ ট্রাক। নিজ নিজ টমেটোর খাঁচি আগলে বসে থাকেন চাষিরা। কিন' ক্রেতারা সহজে হাটে নামেন না। তবে ক্রেতা-পাইকাররা বসে থাকেন হাটের ধারেই, চা স্টলে। কৃষকদের উদ্দেশে পাইকাররা গল্পের ছলে বলেন, ঢাকার বাজার ভালো না। এত টমেটো আজ কেনা যাবে না। আসলে এটা একটা কৌশল। এসব কথা বলে কৃষকদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করেন পাইকাররা। এমন কৃত্রিম চাপ দিয়েই গেল মৌসুমে তারা পাঁচ টাকা দরের টমেটো ৫০ পয়সায় নামিয়ে এনেছে। আর এটা শুধু কুমিল্লা নয়; রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা, ময়মনসিংহসহ দেশের সব টমেটো বাজার তথা সবজি বাজারের একই অবস্থা।
আসলে পণ্য উৎপাদনকারী নয়, বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে দালাল-ফড়িয়ারা। কারণ স্বল্পসংখ্যক বড় কৃষক কম দামে টমেটো না বেচে ফিরিয়ে নিতে পারলেও, মধ্যম কৃষকরা তা পারেন না; ক্ষুদ্র কৃষকরা তো কোনোক্রমেই পারেন না। এমনও অনেক চাষি আছেন, যাদের এ টমেটো বেচে রাতের খাবার কিনে নিয়ে যেতে হয়। তাদের জন্য এ এক মরণ দশা।
গত মৌসুমে খবর হয়েছিলো, ‘জেলা প্রশাসক ভবনের সামনে টমেটো ছড়িয়ে ফেলে ন্যায্যমূল্য দাবি।’ সংবাদটিতে বলা হয়েছিল, ‘সিলেটের টমেটো চাষীরা তাদের টমেটো বিক্রি করতে পারছেন না। তারা সিলেটের জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। স্মারকলিপিতে বলা হয়, টমেটোর উৎপাদন খরচ প্রতিকেজি চার টাকা। কিন' এখন তারা প্রতি কেজি ৫০ পয়সাতেও বিক্রি করতে পারছেন না। তাই তাঁরা নিরুপায়।’
বলাবাহুল্য, কৃষিপণ্য উৎপাদন মৌসুমভিত্তিক হওয়ায় কৃষিপণ্যের দরদামের ওঠানামা অত্যধিক। অমৌসুমে দাম আকাশছোঁয়া হয়। আবার উৎপাদন মৌসুমে তা নেমে আসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বাংলাদেশে বরাবরই এ হচ্ছে কৃষিপণ্যের চিরায়ত বৈশিষ্ট্য। এরজন্য অবশ্য দালাল, ফড়িয়া, পাইকার তথা মধ্যস্বত্যভোগী এবং সরকারের নিষ্ক্রিয়তা মূখ্যতঃ দায়ী।
কিন' এক্ষেত্রে সরকারের তরফ থেকে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর বা বিপণন অধিদপ্তর প্রতিটি কৃষিপণ্যের বিগত পাঁচ বছরের গড় মূল্যধারা বিশ্লেষণ করে বছরের কোন মাসে কৃষিপণ্য মূল্য কত থাকে, সে বিষয়ে এলাকাভিত্তিক কৃষকদের আগেই পূর্বাভাস দিতে পারে বা ছাপানো রেখাচিত্র সরবরাহ করতে পারে। মাসিক সেই রেখাচিত্র দেখে কৃষক বা উৎপাদক বুঝতে পারবেন, কোন মাসে কোন পণ্যের দাম কত থাকে, কখন উৎপাদন ও বিক্রয় করতে হবে, কখন মজুদ ছাড়তে হবে।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য, আজকের বাণিজ্যিক কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় শুধু প্রযুক্তির বিষয় সমপ্রসারণই যথেষ্ট নয়, বিপণন বিষয়ে পরামর্শ প্রদানও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে দরদাম স্থির হওয়ার বিষয়ে সরকার ভূমিকা রাখতে পারছে না । কিন' মূল্যের পূর্বাভাস দেওয়া, অমৌসুমের জাত উদ্ভাবনেও সরকার প্রণোদনা দিতে পারে কিংবা পরিবহনে চাঁদাবাজি হয়ে যাতে পণ্যমূল্য অযৌক্তিকভাবে বাড়তে না পারে সে ব্যবস্থা সরকার অবশ্যই করতে পারে।
সরকারের মূল কাজ বাজার সঠিক পথে রাখা। নানা ধরনের বিকৃতি বাজারে থাকে। ভোক্তাদের সেই বিকৃতির কুফল থেকে রক্ষার দায়িত্ব সরকারের।
‘দৈনিক আল ইহসান’-এ বহু লেখালেখির পর সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘সরকার সিন্ডিকেট ভাঙতে মরিয়া’।
কিন' সরকারকে এখন শুধু সিন্ডিকেট ভাঙলেই হবে না। মধ্যস্বত্ত্বভোগীদেরও দূর করতে হবে। প্রয়োজনে স্পর্শকাতর দ্রব্যগুলো সরকারকেই আমদানি করতে হবে। যে কোন মূল্যে দ্রব্যমূল্যের দাম কমাতে হবে।
মূলত এজন্য প্রয়োজন মন-মানসিকতার পরিবর্তন। ইসলামী আদর্শের প্রতিফলন। কারণ যেনোতেনোভাবে দুনিয়াবী অর্থ কামাই ও তা ব্যয়ের পরিবর্তে যখন আল্লাহ পাক-উনার ভয় উদয় হবে তখনই দ্রব্যমূল্যেরও ভারসাম্য আসবে।
হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, “ক্বিয়ামতের ময়দানে সবাইকে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। তন্মধ্যে দু’টি হলো, কোন পথে সে অর্থ আয় করেছে এবং কোন পথে ব্যয় করেছে।”

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



