প্রসঙ্গত সরকার নিজেই যেখানে সংবিধানের বর্ণিত শিশু সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ আমল করে না; সেখানে সরকার শিশুশ্রম আইন প্রয়োগের প্রচারণা করার সাহস পায় কী করে
১৮ বছরের কম বয়সীদের শিশু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে শিশু আইন, ২০১০-এর খসড়া নীতিগতভাবে গত বৃহস্পতিবার অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। এ আইনের ফলে এখন থেকে ১৮ বছরের নিচে প্রত্যেকেই শিশু হিসেবে বিবেচিত হবে। এ শিশুদের কল্যাণে একটি বোর্ড থাকবে। শিশুদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে শিশুবান্ধব পুলিশ কর্মকর্তাও নিয়োগ দেয়া হবে। কোনো শিশু অপরাধে জড়িত হলে, আনুষ্ঠানিক বিচারের পরিবর্তে বিকল্প ব্যবস্থা থাকবে।
১৯৭৪ সালের শিশু আইন যুগোপযোগী করে শিশু অধিকার সনদের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। খসড়ায় অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে, বিশেষ করে আইনের সংস্পর্শে আসা এবং আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় বিধানের উল্লেখ করা হয়েছে। ৯ বছরের নিচের বয়সী শিশুকে আদালতে সোপর্দ না করার পাশাপাশি এতে ১২ বছরের কম বয়সী শিশুকে গ্রেপ্তার করার সময় হাতকড়া না পরানো বা বলপ্রয়োগ না করার বিধান রাখা হয়েছে। খসড়ায় শিশুদের বিশেষ সুরক্ষা দেয়া, যত্ন-পরিচর্যা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন এমন শিশুদের নির্দিষ্ট করার কথা বলা হয়েছে।
বলাবাহুল্য, আপাতভাবে এসব আপ্তকথা অত্যন্ত শ্রুতিমধুর। কিন' এর অন্তর্নিহিত এবং অনিবার্য গরলটাকে উপস্থাপন ও বিশ্লেষণ করার বস্থনিষ্ঠ মনোভাবের অভাব প্রকট।
এদিকে তৈরি পোশাক শিল্পে শিশুশ্রম বন্ধে আগামী ১১ মে মাসে ঢাকায় আন্তর্জাতিক পরামর্শ সভার আয়োজন করতে যাচ্ছে গ্লোবাল মার্চ অ্যাগেইনস্ট চাইল্ড। এছাড়া বৈশ্বিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী বছরের অক্টোবর মাসে মরক্কোতে শিশুশ্রমবিরোধী বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভা শিশু বয়স সংক্রান্ত আইন পাশের পাশাপাশি একইদিনে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে ‘ন্যাশনাল কনসালটেশন অব গ্লোবাল মার্চ অ্যাগেইনস্ট চাইল্ড লেবার বাংলাদেশ চ্যাপ্টার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়।
আরো জানানো হয়, একটি ব্যাপক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে ২০১১ সালে বিশ্বব্যাপী আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে গ্লোবাল মার্চ রোড ম্যাপ ২০১৬ অনুসরণ ও এর বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ।
উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে বিশ্ব পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিছু পশ্চিমা দেশ ও ট্রেড ইউনিয়নের পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু দাতা সংস্থার অর্থ সাহায্যে কিছু এনজিও এই বিশ্ব পদযাত্রা আয়োজন করেছিল। তখন থেকে বাংলাদেশে পশ্চিমাদের অনুকরণে শিশু শ্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করার পক্ষে একটি মহল জোরালো তৎপর চালিয়ে আসছে।।
অথচ পশ্চিমা দেশে সোশ্যাল সিকিউরিটি বা বেকার ভাতার ব্যবস্থা আছে। কেউ বেকার হয়ে পড়লে সরকার তার জীবন ধারণের জন্য ভাতা প্রদান করে। কোন বিধবা বা বিচ্ছেদপ্রাপ্ত মা এবং তার শিশু সন্তানদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা আছে এবং সে ভাতা খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট। এমন কি, ওইসব দেশের প্রতিটি ছেলে মেয়ে হাই স্কুল পাস করার পর ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পড়াশুনা করতে পারে। পরে চাকরি করে ঋণ শোধ করে দিতে পারে। তাদের পক্ষে শিশুশ্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব।
কিন' বাংলাদেশে যেখানে বেকার ভাতা নাই, শিশু ভাতা নাই, শিক্ষা ঋণের ব্যবস্থা নাই, সেখানে শিশু শ্রম বন্ধ হবে কার স্বার্থে?
এদেশে বহু বিধবা এবং বিচ্ছেদপ্রাপ্ত মায়ের সংসার আছে যা একটি বা দুটি, শিশু বা কিশোরের আয়ে চলে। এসব শিশুর কাজ বন্ধ করে দিলে, ওই শিশু, তার কোন ভাই-বোন বা মাকে পেটের তাড়নায় গোপনে অনৈতিক বা আরো খারাপ কোন কাজ করতে হবে। না খেয়ে তো তারা বাঁচতে পারবে না।
সরকার বৃদ্ধ ভাতা, বিধবা ভাতা চালু করেছে। কিন' সে ভাতার সংখ্যা ও পরিমাণ কি শিশু শ্রম বন্ধ করতে পারবে?
১৯৯৮ সালে গ্লোবাল মার্চ এগেইনস্ট চাইল্ড লেবার ক্যাম্পেইনের পর, সরকার ও আইএলওর উদ্যোগে, গার্মেন্টস মালিকরা শিশু শ্রমিক হিসেবে গার্মেন্টস কারখানা থেকে কিছু শ্রমিককে বাদ দিয়েছিলো। তাতে কি শিশু শ্রম বন্ধ হয়েছিলো? বরং পরিবারের ভরণ পোষণ যোগাড় করতে আসা এসব শিশুকে, সোজা পথে আয়-রোজগার করতে না দিয়ে, তাদের আয়ের পথ রুদ্ধ করে দিয়ে, অধিকতর নির্যাতনের ও অন্ধকার জগতে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে ১৯৯৮ সালে গ্লোবাল মার্চ এগেইনস্ট চাইল্ড লেবার ক্যাম্পেইনের অর্থ যোগান দিয়েছিলো ইউরোপের বড় বড় সব ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন। অর্থাৎ ট্রেড ইউনিয়ন তাদের সার্থকে সংহত করার জন্যই এ উদ্যোগ নিয়েছিলো।
আজও গ্লোবাল মার্চ এগেইনস্ট চাইল্ড লেবার ক্যাম্পেইনের অনেক পার্টনার ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ট্রেড ইউনিয়ন। ১৯৯৮ সালে যাদেরকে শিশু শ্রমিক হিসেবে গার্মেন্টস কারখানা থেকে বাদ দেয়া হয়েছিলো, তাদের জন্য সরকার, আইএলও এবং বিজেএমইএ, স্কুল খুলেছিল এনজিওদের সহায়তায়। ওইসব স্কুলের ২০% ছাত্রও বাদ পড়া গার্মেন্টস শ্রমিক ছিলনা।
সরকারি হিসেব মতে দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৭৯ লাখ। এর মধ্যে ৬৪ লাখ গ্রামে এবং ১৫ লাখ শহরে বিভিন্ন শ্রমে নিয়োজিত। শিশুশ্রম দুনিয়াজুড়ে অমানবিক বলে গণ্য হলেও বাংলাদেশসহ পৃথিবীর কোনও কোনও দেশে তা অনিবার্য। কেননা কোনও কোনও পরিবারে ১০/১৫ বছরের শিশুরাই একমাত্র উপার্জনকারী। কারণ তাদের অনেকের মা-বাবা মারা যায় কিংবা নানা অসুখ-বিসুখের জন্য উপার্জন করতে পারে না। বাধ্য হয়ে শিশুদেরই সংসারের হাল ধরতে হয়।
এছাড়া আমাদের গ্রামাঞ্চলে বাবার সঙ্গে শিশু ছেলেদের কৃষিক্ষেত্রে কিংবা মায়েদের সঙ্গে শিশুকন্যাদের সাংসারিক কাজের কিছু না কিছু এমনিতেই করতে হয়। সব পরিবারে কাজের লোক রাখবার সুযোগ এবং অর্থও অনেক সময় থাকে না। কাজেই যে কাজগুলো শিশুদের জন্য করা সহজ তা অনেক সময় বাধ্য হয়েই করতে হয়। বিশেষ করে গৃহস্থালি কাজে শিশুদের সহযোগিতা থাকেই। এটা হচ্ছে আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার বাস্তবতা। আইন অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু। কারোর মা-বাবা শিশুকালে মারা গেলে কিংবা কেউ অভিভাবকহীন হয়ে পড়লে তাকে ১৮ বছর পর্যন্ত খেয়ে-পরে তো বাঁচতে হবে। আমাদের দেশে অভিভাবকহীন বিশেষ করে ১৮ বছর বয়স অবধি শিশুদের খাওয়ানো-পরানোর ব্যবস্থা তেমন নেই। তবে বিদেশে শিশুদের জন্য সরকারি ব্যবস্থায় অনেক কিছুই রয়েছে।
পাশাপাশি বিশেষভাবে উল্লেখ্য, আমাদের দেশে এখনও প্রায় ৪০ ভাগ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এরকম এক দরিদ্র পরিবারে একজনের রোজগারে সংসার চলে, দিনে আয় হয় সর্বোচ্চ ১৫০-২০০ টাকা, যা দিয়ে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমূল্যের বিপরীতে ক্ষুধার জ্বালা মেটানোই দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তাই এসব পরিবার খাওয়া, কাপড়-চোপড়, চিকিৎসার খরচের পর সাধারণত পড়াশোনার কথা চিন্তা করে। ফলে সন্তানকে দিয়ে পড়াশোনা করিয়ে তার পেছনে টাকা খরচ করার চেয়ে তাকে দিয়ে অল্প-স্বল্প আয় করানোর চিন্তাই শ্রেয় মনে করে সন্তানের পিতা। পড়াশোনা বাদ দিয়ে তাদের এ ধরনের শ্রমিক হওয়ার একমাত্র কারণ অজ্ঞতা নয় বরং তাদের দরিদ্রতা।
বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫(ক) ধারায় খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের জন্য মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
সংবিধানের ১৭(ক) ধারায় বলা হয়েছে, আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল শিশুকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রদানের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
প্রসঙ্গত বিবেচ্য বিষয় হলো, সরকার স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও শিশুদের জন্য বর্ণিত অনুচ্ছেদ যথাযথভাবে পালন না করে তথা নিজেই অমান্য করে উল্টো ‘১৮ বছরের শিশু কাজ করতে পারবে না’- এই আইন অমান্যের ভয় দেখায় কি করে? অন্যের প্রতি আইন অমান্যের অভিযোগ আনার আগে সরকারের উচিত, নিজেরাই সংবিধানের সঙ্গত অনুচ্ছেদ পূর্ণ পালন করা।
উল্লেখ্য, পরিসংখ্যান ব্যুরোর বাইরে বিভিন্ন সংস্থার জরিপ অনুযায়ী দেশে শিশু শ্রমের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখের মতো। শিশুশ্রমিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রয়েছে ছিন্নমূল শিশু এবং এদের মধ্যে ৫০ শতাংশের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। তাই জীবন রক্ষার্থে তারা প্রতিদিন যোগদান করছে শ্রমসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে।
বিশ্বের প্রতি ছয়জন শিশুর একজন আজ শিশুশ্রমে জড়িত, যা তাদের ভাবাবেগ বিকাশের জন্য ক্ষতিকর। আইএলও’র তথ্যানুযায়ী বিশ্বব্যাপী ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ২৪৬ মিলিয়ন শিশু শ্রমিক রয়েছে। শ্রমিকদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ (৬৯.৫ শতাংশ) ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিযুক্ত। বিশ্বব্যাপী ৮.৪ মিলিয়ন শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে। তাদের মধ্যে পাচারকৃত শিশু ১.২ মিলিয়ন, জোরপূর্বক ও বন্ধকী শ্রমে নিয়োজিত ৫.৭ মিলিয়ন, সশস্ত্র সংঘাতে নিয়োজিত ০.৩ মিলিয়ন, পতিতাবৃত্তি ও পর্নোগ্রাফিতে নিয়োজিত শিশু ১.৮ মিলিয়ন এবং অনৈতিক/অবৈধ কাজে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ০.৬ মিলিয়ন।
বলাবাহুল্য, এতো অধিক দেশে এতো জঘন্য শিশুশ্রম চালু থাকলেও বর্তমানে বাংলাদেশে এ নিয়ে জোড়জোড় চলছে কেবলমাত্র গার্মেন্টসসহ এদেশের উদীয়মান সব শিল্প ধ্বংস করার জন্য। যেমনটি উজবেকিস্তানে অনেক তুলা উৎপাদিত হয়েছে। বাংলাদেশে সে তুলা আমদানি হলে বর্তমানে গার্মেন্টস-এ যে লাভ হচ্ছে তার তিনগুণ বেশি লাভ হতো। কিন' শিশুশ্রমের উসীলা দিয়েই তা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এতে করে বাংলাদেশে ও উজবেকিস্তান উভয়কে চরম ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। অপরদিকে বাংলাদেশে শিশুশ্রম বন্ধের উদ্দেশ্য শুধু এদেশের গার্মেন্টসই বিপর্যস্ত নয়, সাথে গোটা অর্থনীতি ধ্বংস তথা প্রায় দেড় কোটি শিশুর আয়ের সাথে জড়িত প্রায় পাঁচ কোটি দরিদ্র পরিবারকে সম্পূর্ণ অনাহারের দিকে ঠেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটিয়ে দেশকে অকার্যকর ও ব্যর্থ রাষ্ট্র করে তোলা। দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন করা জাতিসংঘ বাহিনীর অনুপ্রেবশ ঘটনো।
কাজেই জাতিসংঘ প্রণীত শিশুদের বয়সসীমা ১৮ বছর মানা বাংলাদেশের জন্য কোনোমতেই ঠিক নয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


