somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সমস্যার আবর্তে ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সরকারের আশু সহায়তা দরকার

২১ শে মার্চ, ২০১১ রাত ১২:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উন্নয়ন সহায়তা (এসএমই) বন্ধ। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে দেশের ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প। নতুন প্রণীত শিল্পনীতিতে এ সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছে। এতে করে দেশের ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প ধ্বংস হবার উপক্রম হয়েছে। সরকার গত আগস্ট মাসে নতুন শিল্পনীতি প্রণয়ন করে। প্রণীত এ শিল্পনীতিতে বেসরকারি শিল্প খাতকে উৎসাহিত করাসহ দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের শিল্প স্থাপন ও সহায়তা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। ওই শিল্পনীতিতে মাঝারি শিল্পের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রে ১০ কোটি থেকে ৩০ কোটি টাকা বিনিয়োগ বা যে প্রতিষ্ঠানে ১০০ থেকে ২৫০ জন শ্রমিক র্কমর্রত, সেবামূলক ক্ষেত্রে ১ কোটি থেকে ১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ বা ৫০ থেকে ১০০ জন শ্রমিক কর্মরত রয়েছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র শিল্পের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রে ৫০ লাখ থেকে ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ বা যে প্রতিষ্ঠানে ২৫ থেকে ৯৯ জন শ্রমিক কর্মরত, সেবামূলক ক্ষেত্রে ৫ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা বা ১০ থেকে ২৪ জন শ্রমিক কমর্রত থাকতে হবে। একই সাথে কুটির শিল্পের সংজ্ঞায়িত বিনিয়োগ হচ্ছে ৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা বা ১০ থেকে ২৪ জন শ্রমিক কমর্রত থাকার বিধান।
সরকার ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে উন্নয়নের লক্ষ্যে স্মল এন্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজেস (এসএমই) ফাউন্ডেশন গঠন করে। এ প্রতিষ্ঠান থেকে শুধুমাত্র ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ঋণ বা সহায়তা প্রদান করলেও বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর সাথে জড়িত কুটির শিল্পের প্রতি উদাসীনতা দেখানো হয়েছে। সরকার প্রণীত শিল্পনীতিতে ক্ষুদ্র শিল্পের কথা বলা হলেও কুটির শিল্পের প্রতি উদাসীনতায় এ শিল্প মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে। অথচ এর আগে ২০০৮ সালে সরকারের জারিকৃত এক পরিপত্রে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সংজ্ঞায় বলা ছিল ৫০ হাজার থেকে ৫০ লাখ পর্যন্ত বিনিয়োগ হলেই তাকে সহায়তা প্রদান করা হবে। কুটির শিল্প মূলত বাঁশ, বেত, কাঠ, পাটি, শীতল পাটি, তাঁত ইত্যাদি পরিবেশ বান্ধব শিল্প। এসব শিল্প পারিবারিকভাবে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করে থাকে। সরকারি সহায়তার অভাবে এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান মহাজনী সুদ অথবা এনজিওর কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে কুটির শিল্পের সাথে জড়িতরা আরো ঋণের জালে আটকে যান। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের শিল্পকে সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে এসএমই বিভাগ নামে স্বতন্ত্র একটি সেল গঠন করে সারাদেশে এসএমই ঋণ প্রদান করছে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে। এবছর বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। কিন্তু কুটির শিল্প খাতে ব্যাংক লোন দেয়ার ক্ষেত্রে নানা সমস্যার কারণে সংশ্লিষ্টরা নিতে পারে না। এই সুযোগ গ্রহণ করে দেশের এনজিওগুলো। ফলে কুটির শিল্প উন্নতি লাভ করতে পারছে না।
অপরদিকে গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং আর্থিক সঙ্কটের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প মুখ থুবড়ে পড়ছে। গত চার বছরে দশ লাখের বেশি ক্ষুদ্র শিল্প ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
গত চার বছরে বেসরকারি হিসাবে তাঁত ইউনিট বন্ধ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ। এক লাখের বেশি পোল্ট্রি খামার বন্ধ হয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ চালিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ইউনিট বন্ধ হয়েছে কয়েক লাখ। গ্যাস-বিদ্যুৎ নেই, শিল্পও বন্ধ হচ্ছে। হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এখন গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কটের মুখে বন্ধ হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। যত দিন পর্যন্ত গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কট না কাটবে ততোদিন এই শিল্প আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। তাঁত শিল্পে জড়িতরা বলছেন, বিদ্যুৎ আর পুঁজির সঙ্কট সেই সাথে সুতার মূল্য বৃদ্ধি তাদের জন্যে বড় সমস্যা।
ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি গত চার বছরের ব্যবধানে (২০০৬-০৭ থেকে ২০০৯-১০) ৬.৬৯ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার (বিসিক) তথ্য হচ্ছে- গত ২০০৯-১০ অর্থবছরেও তারা পূর্বের মতো এই শিল্পকে সহায়তা দিয়েছে। তাদের সহায়তায় গত অর্থবছরের ৬ মাসে ৩৪৫৯টি শিল্প গড়ে উঠে। বিসিক শিল্প নগরীতে এ পর্যন্ত ৫৪৩৯টি শিল্প ইউনিট গড়ে উঠেছে। মোট বিনিয়োগ ১৩,৫৮৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। কর্মসংস্থান ৩ লাখ ৪২ হাজার।
বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সংখ্যা কত, এমন কোনো সঠিক হিসাব বা পরিসংখ্যান নেই। বিসিক এর উপর হালনাগাদ কোনো জরিপও করছে না। তাঁত বোর্ডের কাছে তাঁত শিল্পের উপর হালনাগাদ কোনো জরিপ নেই। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প সংস্থা হচ্ছে বিসিক। বিসিকের আওতার বাইরে লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প গড়ে উঠেছে বা উঠেছিল। সেগুলোর হিসাব সরকারের কাছে নেই। জীবন-জীবিকার তাগিদেই এই সব শিল্প গড়ে উঠে। বিসিক বলতে পারবে না পুরান ঢাকায় কতগুলো ক্ষুদ্র শিল্প আছে। যারা এই শিল্পের সাথে জড়িত তাদের মধ্যে ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ১৫ লাখের অধিক ক্ষুদ্র শিল্প আছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ না পাওয়ায় এসব শিল্পের বেশির ভাগই বন্ধ হয়ে গেছে বা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের বাঁশ বেতসহ নানা ক্ষুদ্র শিল্প আছে। তাদের গ্যাস-বিদ্যুতের প্রয়োজন না হলেও অর্থের প্রয়োজন। তারা অর্থ সঙ্কটের কারণে এই হস্তশিল্প বাঁচিয়ে রাখতে পারছেন না। অথচ এটা বাংলাদেশের জন্যে একটি সম্ভাবনাময় খাত ছিল বা এখনও আছে। গত চার বছরের গড় হিসাবে হস্তশিল্পজাত দ্রব্য রফতানিতে বার্ষিক আয় ছিল গড়ে ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এখন এখাতে রফতানি আয় কমে যাচ্ছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে নতুন করে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রেখেছে। একে তো বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ, তারপর আবার সংযোগ আছে এমন গ্রাহকরা বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। ফলে চালু শিল্পও বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। উল্লেখ্য, গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট বর্তমানে শিল্পায়নে বড় বাধা, এমন কথা সরকারের দায়িত্বশীলরাও এখন অকপটে স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সঙ্গতকারণেই দেশব্যাপী দ্রুত শিল্পায়নের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পখাতের বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্ভাব্য সর্বপ্রকার সহায়তা প্রদানে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)- এর আরো তৎপর হওয়া প্রয়োজন। সরকারের শিল্পনীতিও অবিলম্বে সংশোধিত হওয়া প্রয়োজন। একই সাথে বিসিক কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের কাজ লক্ষ্যমাত্রা অনুয়ায়ী নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বিকাশের কোনো বিকল্প নেই। দেশে স্থাপিত বৃহৎ মাঝারি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উন্নয়নে সাব-কন্ট্রাক্টিং সংযোগব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
সাব-কন্ট্রাক্টিং সংযোগব্যবস্থা দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বাজারজাতকরণে সহায়তা করে।
পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশ শিল্পের অবাধ প্রসারে সাব-কন্ট্রাক্টিং পদ্ধতিতে কাজ করছে। এসব দেশে বড়, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পকে একে অন্যের প্রতিযোগী না হয়ে পরিপূরক/সহায়ক শিল্প হিসেবে গড়ে তোলা হয়। বর্তমান বিশ্বে ইতালি কোরিয়া, তাইওয়ান, ভারত, জার্মানি, থাইল্যান্ডের মতো শিল্পোন্নত দেশগুলোর দ্রুত উন্নয়নের পেছনে রয়েছে সাব-কন্ট্রাক্টিং সংযোগব্যবস্থার উন্নয়ন।
এমতাবস্থায় সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যেন ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের তৈরি যন্ত্রাংশ বাধ্যতামূলকভাবে ক্রয় করে এ রকম একটি বিধিমালারও জরুরী ভিত্তিতে করা দরকার।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×