ভারতে মুসলমানদের প্রতি নির্যাতন ও নিপীড়নের ভয়াবহতার প্রকৃত খবর ক’জনে রাখে?
অথচ মিডিয়ায়ও এসব খবরের সংখ্যা কম নয়
হিন্দু মৌলবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ভারতে রাম সেনাদের নাম কয়েক বছর ধরেই বেশ আলোচিত। ২০০৭ সালে মকবুল ফিদা হুসেনের চিত্রপ্রদর্শনীতে হামলার পর প্রমোথ মুথালিক প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি আলোচনায় আসে। তারপর আরো নানা কীর্তিকলাপ থেকে শুরু করে ২০০৯ সালে এক ‘পাব’-এ নারীদের ওপর আক্রমণের মাধ্যমে নানা সময় আলোচনায় এসেছে এই সংগঠনটি। কিন্তু প্রতিবারই হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী সংগঠন রাম সেনাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে তাদের সব কর্মকা- সনাতনী রীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই।
তবে বরাবরই অভিযোগ ছিল, এসব ঘটনার পেছনে রয়েছে অন্য চক্রান্ত। সন্ত্রাসবাদী সংগঠন রাম সেনার সদস্যরা চুক্তিবদ্ধ হয়ে ভারতের নানা স্থানে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা ছাড়ানোর কাজ করে বলেও ধারণা ছিল অনেকের। সন্ত্রাসী রাম সেনাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ভারতের অন্যতম শীর্ষ সাপ্তাহিক ‘তেহেলকা’ একটি অনুসন্ধান চালায়। এতে তেহেলকা প্রতিনিধি নিজের সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে, চিত্রশিল্পীর পরিচয়ে একটি প্রদর্শনীতে হামলার চুক্তি নিয়ে আলোচনা করে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী সংগঠন রাম সেনার শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে। এই আলোচনার মাধ্যমে ধর্মীয় খোলসের আড়ালে থাকা রাম সেনার আসল রূপ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় সহজেই।
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
গোঁড়া হিন্দুত্ববাদী নেতা মুথালিকের সঙ্গে আলোচনা শেষে শুরু হয় প্রসাদ আত্তাভারের সঙ্গে দেখা করার প্রক্রিয়া। আত্তাভারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন রাভি পুজারীর হয়ে কাজ করে। রাভি পুজারী মুম্বাইয়ের গ্যাংস্টার ছোটা রাজনের সঙ্গে একসময় কাজ করতো। বর্তমানে কাজ করছে দাউদ ইব্রাহিমের সহযোগী হিসেবে। পুজারীর খোঁজ পাওয়ার জন্য আত্তাভারকে গ্রেপ্তার করার উদ্যোগ নেয় ভারতীয় পুলিশ। তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়। তাই আত্তাভার বেশ নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকে। কারো সঙ্গে সরাসরি বা ফোনেও যোগাযোগ করতো না। তাই তেহেলকা প্রতিনিধিকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বেশ শ্রম ব্যয় করতে হয়।
এরই মধ্যে ২০০৯ সালে ম্যাঙ্গালোরের ‘পাব’-এ ঢুকে মেয়েদের নির্যাতন করার মামলায় মুথালিক ও আত্তাভারসহ রাম সেনার প্রায় ২৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের এক সপ্তাহ পরই অবশ্য তারা জামিনে মুক্ত হয়ে বীরের মতো জেল থেকে বেরিয়ে আসে। এরপর মুথালিকের সূত্রে তেহেলকা প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা হয় আত্তাভারের। আত্তাভার বেশ সাবধানী এবং বিচক্ষণ হওয়ায় মুথালির মতো কোনো দীর্ঘ আলাপে যায়নি। সে প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা করার আগেই মুথালিরকর কাছ থেকে সব বিষয় জেনে রেখেছিল। তাই তেহেলকা প্রতিনিধির সঙ্গে সে আলোচনার শুরু থেকেই কেবল প্রদর্শনীতে হামলার ঘটনা নিয়েই কথা বলে। আত্তাভার বেশ উদ্ধত্যভাবেই বলে, ‘মুম্বাই থেকে শুরু করে কলকাতা এমনকি উড়িষ্যায়ও যদি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়, তবেও আমরা খুব সহজেই হামলা চালাতে পারব। তবে আপনি যদি আপনার প্রদর্শনী কর্নাটকের বাইরে আয়োজন করেন, তবে কাজ করতে সুবিধা হবে।’
তেহেলকা প্রতিনিধি আত্তাভারকে জানায়, প্রদর্শনীর প্রচারণা আরো জমজমাট করে তোলার জন্য রাভি পুজারীর মাধ্যমে কোনো হুমকি দেয়া সম্ভব কিনা! আত্তাভার আশ্বাস দিয়ে বলে, ‘এটা কোনো ব্যাপারই না।’
এই হামলা সম্পর্কে কোনো পুলিশি ঝামেলা হবে কিনা জানতে চাইলে আত্তাভার জানায়, সেটাও আগে থেকেই ঠিক করে রাখা হবে।
আত্তাভারের সঙ্গে এই আলোচনার ঠিক ছয় দিনের মাথায় ম্যাঙ্গালোরের পুলিশ তাকে আবারও গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়। রিমান্ড শেষে তাকে পাঠানো হয় বেল্লারি জেলে। বেল্লারি কর্নাটকের সবচেয়ে নিরাপত্তাবেষ্টিত বিশেষ কারাগার। সেখানে বসেই আত্তাভার তেহেলকা প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা চালু রাখে। একসময় কারাগারের ভেতরেই প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়। এই ব্যবস্থাপনার জন্য তেহেলকা প্রতিনিধির কাছ থেকে জেলের সুপারিনটেনডেন্ট এস এন হুল্লুর ও কারাপ্রহরীরা আড়াই হাজার রুপি আদায় করে।
কারাগারে আলোচনায় তেহেলকা প্রতিনিধি আত্তাভারের কাছে দাবি করে যে, ম্যাঙ্গালোরের হামলায় প্রায় ২০০ রাম সেনাকে থাকতে হবে। আত্তাভার তাতে রাজি হয়। এই হামলা বাবদ প্রায় ৫০ লক্ষ রুপি রাম সেনাদের দিতে হতে পারে বলে তেহেলকা প্রতিনিধিকে জানায় আত্তাভার। তবে এই পরিমাণ আরো বাড়তে পারে বলেও জানায় সে। আলোচনা শেষে আত্তাভার পকেট খালি থাকার কথা বলে তেহেলকা প্রতিনিধির কাছ থেকে আরো তিন হাজার রুপি নেয়। বাকি কথা মোবাইলফোনে করা হবে বলে জানায় আত্তাভার। আত্তাভারের আইনজীবী সঞ্জয় সোলানকির কাছ থেকে পরে জানা যায়, কারাগারের সুপারিনটেনডেন্ট হুল্লুরকে খুশি করলে এই কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত কারাগারে বসেও মোবাইলফোনে বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা কোনো ব্যাপারই না!
এর বেশ কিছুদিন পর তেহেলকা প্রতিনিধি মুথালিকের সঙ্গে আবারও দেখা করে। এ সময় ব্যাঙ্গালুরু রাম সেনা সভাপতি ভাসান্তকুমার ভবানীও উপস্থিত ছিল। তবে এই আলোচনায় সে তেমন সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়নি। হয়তো সে এভাবে আলোচনাকে নিরাপদ মনে করতে পারেনি।
তাই এর কিছুদিন পর এক মধ্যরাতে রাম সেনাদের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে তেহেলকা প্রতিনিধির সঙ্গে সে আলোচনায় বসে। সেখানে সে এই পরিকল্পনা কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, কিভাবে সর্বোচ্চ প্রচারণা পাওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা করে। ব্যাঙ্গালুরুর রবীন্দ্র কালাসেত্রায় প্রদর্শনী আয়োজনের পরামর্শ দেয়। কারণ এর পাশেই সিটি মার্কেট এবং এটি একটি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা। তাই এখানে যেকোনো ধরনের হামলা ঘটলেই তা বড় আকার ধারণ করবে। এর ফলও পাওয়া যাবে ভালো। প্রদর্শনী কবে আয়োজন করলে ভালো হবে, তা নিজের মোবাইলফোনের ক্যালেন্ডার দেখে নিজেই ঠিক করে দেয় সে।
প্রদর্শনীর প্রতি মানুষের আগ্রহ জাগানোর জন্য ভবানী তেহেলকা প্রতিনিধিকে পরামর্শ দেয় কর্নাটকের ওয়াকফ্ বোর্ডের মন্ত্রী মুমতাজ আলী খানকে আমন্ত্রণ জানানোর। এতে গণমাধ্যমের প্রচার পাওয়া যাবে বেশ ভালোভাবে। ভবানী আরো বলে যে, ‘এই হামলার জন্য রাম সেনার বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে। মামলা যেন বেশ ভালোভাবে পরিচালিত হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রদর্শনীতে মন্ত্রী উপস্থিত থাকলে এই ব্যাপারটা সহজ হবে। এই ঘটনা নিয়ে যদি মামলা-মোকাদ্দমা না হয়, তবে সাধারণ মানুষের মনে-প্রশ্ন জাগবে। এই ঘটনা যে পুরোটাই বানোয়াট, তা প্রকাশিত হয়ে যাবে।’ কিভাবে কী করতে হবে, তার সব কিছু ভাবনী তেহেলকা প্রতিনিধিকে জানাবে বলে নির্দেশ দেয়।
এই কাজের জন্য তেহেলকা প্রতিনিধি কত মূল্য দিতে প্রস্তুত তা জানতে চায় ভবানী। একটা কাগজে প্রতিনিধি ৭০ লাখ রুপি লিখে, তা ভবানীর দিকে এগিয়ে দেয়। ভবানী তা দেখে কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তার মুখে চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে। এ সময় গোপন ক্যামেরায় ধরা পড়ে তার চিন্তিত হওয়ার অনুভূতি। তারপর সে বলে যে, ‘এই মূল্যে সম্ভবত আত্তাভার রাজি হবে না। তাই পুলিশের প্রাপ্যটাও তেহেলকা প্রতিনিধিকেই পরিশোধ করতে হবে।’ তবে চূড়ান্ত মূল্যটা ভবানী কেন্দ্রীয় নেতা মুথালিকের সঙ্গে আলোচনা করে তারপর জানানোর কথা বলে।
তেহেলকা প্রতিনিধি জানতে চায়, এই অর্থ চেকে দেয়া যাবে কিনা? ভবানী এই ঘটনার সঙ্গে রাম সেনাদের জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ রাখতে চায় না; তাই লেনদেন কোনো চেকের মাধ্যমে হবে না বলে জানিয়ে দেয়।
ভবানীর সঙ্গে আলোচনার একদিন পর তেহেলকা প্রতিনিধি আবারও আত্তাভারের সঙ্গে আলোচনা করতে যায়। তার সঙ্গে আলোচনার সব চূড়ান্ত হওয়ার পর আবারও মুথালিকের সঙ্গে আলোচনা করে তেহেলকা প্রতিনিধি। আত্তাভার ৫০ থেকে ৬০ লাখ রুপিতে এই কাজ করতে রাজি হলেও মুথালিক ও ভবানীর কথায় তা ৭০ লাখ রুপি নির্ধারিত হয়। এবং এই মূল্যে ব্যাঙ্গালুরু, ম্যাঙ্গালোর ও মাইশোরে একই সঙ্গে প্রদর্শনী আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই তিন স্থানে একই সঙ্গে হামলার পরিকল্পনা করে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী সংগঠন রাম সেনা।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


