somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সো দেসকাদের দেশে-৬ (সন্ত্রাসী সন্দেহে জেরার বেড়াজালে)

২৭ শে নভেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৪:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পঞ্চাশ পার হয়নি, এক বছরও হলোনা। জন্মদিনও কাছেপিঠে নেই যে কেউ শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্ট দিয়েছে। তাহলে হুস করে ভেসে ওঠে কী বলার আছে? দিন কেমন গেলো, জাপানে কেমন শীত পড়লো, অর্থনৈতিক মন্দার বাজারে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের ক্রমোন্নতিতে আমার সুখ সুখ অনুভূতি হচ্ছে কিনা? এরিক ক্ল্যাপটন ফেব্রুয়ারি তে আসছেন, ডিসেম্বরে ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালের টিকেট পেলামনা অনেক কসরত করেও, জাপানিজ মা'রা পুতুলের মত দেখাবে বলে বাচ্চাদের কসমেটিক সার্জারির প্রতি ঝুঁকে পড়ছেন, এসব বলব? ক্যাম্পাসে তিনদিনের ফুড ফেস্টিভালে জাপানিজদের সিংগাড়া, খিচুড়ি, পিঁয়াজু, কারি খাইয়ে আর 'ইরাশশাইমাসে' বলে বলে গলা ফাটিয়েছি কিংবা ৫০ জন মিলে খাঁটি বাংগালী বনভোজনে গিয়েছি, ছবি তুলেছি, এসব বলার বা পড়ার মত কিছু? ব্লগের সাজি'পু, তুষার, শাপ্লাপু, সাইফুর, দুরন্ত, নাঈম, আসিফ, তানজু, সবাক, ভাইগনা শামীম নিরন্তর খুঁচিয়েছে "ব্লগে আসেননা, লিখেননা, কী হয়েছে?", তাই শুকনো ধন্যবাদ জানাব? মাঝখানে জাতীয়, আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ব্লগের উইটি সংবেদন মিস করেছি, তা নিয়ে নাকি কান্না কাঁদব?

লিসেন তাজীন, কারো কোথাও থাকা না থাকায় ব্রহ্মাণ্ডে এধার ওধার হয়েছে কখনো? ভাবছ কেন, তোমারি তো সব্বাই, লিখে ফেলো আঙুলে যা আসে।

সো দেসকাদের দেশে সিরিজ টা অনেকদিন লেখা হচ্ছেনা। অবশ্য এহেন তিনখানা চেহারা দেখিয়ে ঘাপটি মেরেছেন। শুনুন তবে আজকে বলি মামার ঘটনা। জাপানিজ পুলিশ মামা। রীতিমত এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে, মিটিং প্লেস ঠিক করে ইন্টারোগেশনের দাওয়াত পেলাম। সাইতামা সিটি পুলিশ ভিনদেশী কালচার, আন্তর্জাতিক সম্পক্কো, জাপানে পরাবাসী জীবনের হাঁচড়পাচড় এসব নিয়ে বেজায় চিন্তিত হয়ে উঠেছে নাকি, তাই আমরা যদি তাদের রিসার্চে একটু সাহায্য করি। ভালোই তো, দামী ক্যাফেতে সুশি, সাশিমি, তেম্পুরা, স্প্যাগেটি সাবাড় করে মামাদের সাথে খানিকটা আড্ডা মারা যাবে মুফতে। সময়মত পৌঁছে দেখি স্যুট পরা দু'জন গ্ল্যমারাস নরনারী। মাসুম খোঁচা দিলো আমাকে, তুমি না বললা পুলিশ? ও বোধহয় ভেবেছিল আর্মড, ইউনিফর্মড কারো সাথে জেরায় বসতে হবে। যথারীতি জাপানিজ বিনয়ে গদগদ হয়ে, মেয়ের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের আপ্যায়নের মেজাজে বসতে দিলো দু'জনকে। পরিচয় পর্ব শেষ হলে খাবার অর্ডার দিতে বললো। রোজা ছিলাম আমি। দারুণ একটা সূত্রপাত হয়ে গেলো আলাপের। সিয়াম ব্যাপারটা কী, মুসলিমদের এ বিষয়ক দর্শন, বাংলাদেশে রোজা পালনের খুঁটিনাটি এসব নিয়ে ভাবনা বিনিময় হলো। জাপানে আমরা নির্বিঘ্নে ধর্ম পালন করতে পারছি কিনা, হালাল ফুডের ব্যাপারটা আসলে কীরকম এসব চলে আসলো প্রাসঙ্গিকভাবে। খালা প্রায় চুপচাপ ছিলো। মামাই আলাপ টেনে নিচ্ছিলো। ব্যাপক তথ্য এবং উপাত্ত নিয়ে এসেছে। আলাপের প্রকৃতি কোন ধারায় নেয়া হচ্ছে সেটা বুঝতে তেমন বেগ পেতে হলোনা খানিক পরে। বেশ নিরাপদ নিষ্পাপ মুখ বানিয়ে জানতে চাইলো সাইতামা ইউনি-র মুসলিম ছাত্ররা প্রার্থনা কোথায় করে, সেটা নির্দিষ্ট কোথাও বা কতবার করে করা হয়, সবাই একসাথে জড়ো হলে কীধরণের আলোচনা চলে, কোন সংগঠনের ব্যানারে নামাজ পড়া হয় কিনা এসব নানা ইতং বিতং। আসলে সবকিছুই তার জানা, তাও আমাদের কাছ থেকে ঝালাই করে নিচ্ছে। মাঝখানে একবার মাসুম সাবধান করে দিলো দু'জনে যাতে বাংলায় কথা না বলি ফাঁকতালে। নিশ্চই রেকর্ড করে নিচ্ছে সবকিছু।

ডর্মের লবিতে মুসলিম ছাত্ররা নামাজ পড়ে, ধর্মীয় কার্যকলাপ বলতে এটাই। একটা সংগঠন আছে ঠিকই। বাংলাদেশী ছাত্ররা সপ্তাহে একবার কোরান হাদিস নিয়ে আলোচনায় বসে কারো বাসায়। সিটি পুলিশের কাছে সব তথ্যই আছে। গোপনে কোন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলছে কিনা, এসব জানতেই আসলে কায়দা করে এই ডেটিং এর আয়োজন করা হয়েছে। ব্যাপারটা আমরা যে বুঝেছি এটা হয়ত ওরাও বুঝে গেছে ততক্ষণে। জানতে চাইলো মুসলিমদের কোন ক্লাব আছে কিনা ভার্সিটিতে। সেখানে কি শুধুই মুসলিম নাকি অন্য ধর্মের লোকও যেতে পারে? বাংগালীরা যেসব পার্টি, প্রোগ্রাম আয়োজন করে সেখানে কী করা হয় আসলে? মনে মনে বললাম, সোজা বলে ফেল আল-কায়েদার সাথে যোগাযোগ আছে কিনা, এত কায়দা করতে হবেনা। বললাম আমাদের ছেলেরা ক্রিকেট খেলে মাঝেমাঝে, শ্রীলংকানদের সাথে ম্যাচ খেলেছে কয়েকবার। এখানেও কিছু একটা গন্ধ শোঁকার চেষ্টা করলো। মুসলিম ছাত্রদের যে সংগঠন আছে সেটার চাঁদা দিতে হয় কিনা জানতে চাইলো। মাসুম নিজেও জানেনা চাঁদা কত বা দেয়া বাধ্যতামূলক কিনা। আমাদেরও প্রশ্ন করার সুযোগ দিলো শেষে। বললাম জাপানের বাংলাদেশীদের সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কী? খুব জোর দিয়েই বললো, ক্রিমিনাল রেকর্ড বাংলাদেশীদের বিরুদ্ধে নেই বললেই চলে। কিন্তু ধর্মীয় জংগিবাদ, বোমাবাজি এসব যে বাংলাদেশে একটা সমস্যা ছিলো কিছুদিন আগেও এ ব্যাপারটা নিয়ে ওরা চিন্তিত।

দ্বিতীয় দিন আবার বসা হলো। এদিনের মূল বিষয় ছিলো মুসলিম ছাত্রদের সংগঠনটির কর্তাব্যাক্তিদের নিয়ে। আমরা আসলে জানিইনা কে এখন প্রধান বা কার্যনির্বাহী কমিটিতে কে কে আছে। এটা নিয়ে কেউ মাথাও ঘামায়না। সাধারণত মিশরের ছাত্ররাই থাকে। আমরা কোন তথ্য দিতে অপারগ হলাম। একটু পরে কয়েকজনের ছবি ছাপানো একটা লিস্ট বের করলো। এখানে মিশর আর বাংলাদেশের কয়েকজনের ছবি। আমরা হাসব নাকি কাঁদব বুঝতে পারছিনা। অনেক গোয়েন্দাগিরি করে নিশ্চই বের করেছে কে কে নিয়মিত নামাজে আসে, কে ইমাম হয় নামাজের, কে খুতবা পড়ায়। আমাদের নিরীহ, ভালোমানুষ বন্ধুদের ছবি দেখে পেট ফেটে হাসি আসছিলো, রাগও হচ্ছিলো। ওদের কাছে একদম তালিকা আছে জাপানের কোথায় কোথায় মুসলিম ছাত্রদের কী সংগঠন আছে, সেসবের সক্রিয় কর্মী কারা। জানালো তাবলীগ জামাতকে ওরা খুব ভয় পায়, সবসময় নজরদারির উপরে রাখে। জিহাদ নিয়ে ওদের আতঙ্ক আছে, জাপানের কোথায় কোথায় মসজিদ করার জন্য ফাণ্ড রাইজিং হচ্ছে অনেক তথ্যই জানলাম। বলাবাহুল্য আমাদের চেয়ে ঢের বেশী তথ্য ওদের ডাটাবেজে আছে। এটাও বললো পার্কে বা উন্মুক্ত স্থানে মুসলিমরা নামাজে দাঁড়ালে সাধারণ জনগণ খুব ভয় পায়। আরো জানলাম জাপানে সবচেয়ে ধনাঢ্য বাংগালীর কথা যিনি আট মিলিয়ন ইয়েন ভাড়ার বাসায় থাকেন। জাপানে বাংগালীদের কোন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে এ লোকের পৃষ্ঠপোষকতা আছে কিনা সেটা জানাই ওদের মূল আগ্রহের জায়গা, বোঝা যায়। মিশরের দু'জন ছাত্র সম্পর্কে বারবার জেরা করছিলো। এরা কেমন, আর কোনকিছুর সাথে জড়িত কিনা। আমরা এ দু'জনকে ব্যাক্তিগতভাবে চিনি। অনেকের কাছেই ওরা ভালোমানুষির ইস্কুল। বললাম, তোমরা এদের কারো সম্পর্কেই অন্যরকম ভেবোনা। প্রয়োজন হলে আমরা ওদের নিয়ে আসি, তোমাদের কিছু জানার থাকলে সরাসরি জিজ্ঞেস করো। ওরা আমাদের বন্ধুমানুষ, নিপাট সজ্জন। আমন্ত্রণ জানালে অবশ্যই আসবে। বললো, "না দরকার নেই। ওদের সাথে কথা বলা খুব সহজ ব্যাপার হবেনা"। ওরা হয়ত ভেবে বসে আছে যে এদের সাথে সিটিং এর আগে ফোর্স রেডি করে আসতে হবে। কষ্ট হচ্ছিলো সবকিছু শুনে, দেখে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা যে পর্যায়ে পৌছেছে সারাবিশ্বে, তা থেকে নিস্তারের তরিকা আদৌ আসবে কি?

সুযোগ পেয়ে আমরা ইসলাম এবং ইসলামী জঙ্গিবাদের স্বরূপ নিয়ে যা জানি সব ঝেড়ে দিলাম। বললাম, মিডিয়া পরিস্থিতিকে কতটা ঘোলাটে করেছে তার প্রমাণ আজ তোমাদের এই অহেতুক সন্দেহ। আমন্ত্রণ জানালাম আমাদের কম্যুনিটির ভেতরে এসে ওদের প্রশ্নের উত্তর মেলানোর জন্য। নামের কারণে এয়ারপোর্টে হয়রানির অনেক কাহিনী বললাম।

কতটুকু বুঝেছে কী জানি, ফোন করে আরো একদিন সিটিং এর সময় নিয়েছে। আগামী কিছুদিন ডুব মারলে কিছু একটা ধারণা করে নিয়েন আপনারা।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ৯:৪৮
৩৭টি মন্তব্য ৩৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×