যখন এডুকেশন নিয়ে উচ্চশিক্ষার সিদ্ধান্ত নিলাম স্বভাবতই তখন আমাকে ক্ষেত্র পছন্দের জন্য গবেষণার বিষয়গুলোতে চোখ বুলাতে হয়েছে। আমার আগ্রহ এবং অস্ট্রেলিয়ার রিসার্চ সেন্টারগুলোর বর্তমান উপজীব্য এ দু’টোকে পাশাপাশি রেখে Moral Education নিয়ে পড়ার নেশাটা পেয়ে বসলো। যে গুণগুলো অর্জন করলে একটা বাচ্চা তার নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ হতে শিখবে এবং তার পরিপার্শ্বের প্রতি কর্তব্যটুকু ঠিকভাবে পালন করবে, তাকেই নৈতিক শিক্ষা বলা যায়। মনোবিজ্ঞান আর শিক্ষা বিষয়ক গবেষণায় এ বিষয়টা নিয়ে দারুণভাবে ভেবে চলেছেন দুনিয়াজোড়া গবেষকরা। নির্দিষ্ট করে বললে কিশোর অপরাধ, অপ্রাপ্তবয়সের মাতৃত্ব, আত্মহত্যার ঊর্দ্ধগতি এসব কিছু থেকে পরিত্রাণ মিলবে স্কুলে নীতিবোধ শিখানোর মাধ্যমে, এমন বিশ্বাস দানা বাঁধছে জোরেসোরে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টার ফলপ্রসূ উপস্থিতির অভাব আমাকে প্রথমবারের মত ভাবিয়ে তুললো। এখন কথা হচ্ছে, আমাদের শিক্ষা নৈতিকতা বিবর্জিত বলে আমি ধরে নিচ্ছি কিনা। অথবা আদৌ নৈতিক শিক্ষা কখনো পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভূক্ত হতে পারে কিনা। সাদা চিন্তায় ধরে নিচ্ছি, ধর্মকে জানা ছাড়াও নৈতিক শিক্ষার বীজ বপনের জন্য আমরা বাধ্যতামূলকভাবে ধর্মশিক্ষা পড়ে আসছি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। ব্যাক্তিজীবনে সেটার চর্চাতে আমাদের সেই কাগুজে Values Education ঘুণাক্ষরেও কোন প্রভাব ফেলছে কিনা, এ বিষয়টা হঠাত করেই বেশ মজাদার মনে হলো। যুগে যুগে নৈতিক শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে কীভাবে গৃহীত হয়েছে, কেনোইবা এটার গুরুত্ব চোখে পড়েছে বিভিন্ন সমাজব্যবস্থায়, এ নিয়ে পড়াশোনার আগ্রহ হলো।
‘ভালোমানুষি কি স্কুলে শেখানোর বিষয়?’ এ ভাবনাটা নিয়ে আমি যখন নিজের সাথে খেলা করছিলাম, তখন আরো কয়েকজনের মতামত নেয়ার ইচ্ছা হলো। একজনকে জিজ্ঞেস করতেই বললো, নাহ। এটা অন্য বিষয়ের মত স্কুলে পড়ার কোন বিষয় নয়। আমরা বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান, ভূগোল শেখার জন্য স্কুল কলেজে যেতে পারি। কিন্তু নীতিবোধ শেখাবে প্রথমত আমাদের পরিবার, এরপর সমাজ। আমার মতামত ছিলো, পরিবার যদি একটা প্রতিষ্ঠান হয়, বিদ্যালয়ও তেমন। দিনের একটা দীর্ঘ সময় স্কুলে কাটিয়ে একটা বাচ্চা যদি পরিবার থেকে নৈতিকতা শেখার জন্য অভ্যর্থিত হতে পারে, তবে স্কুল থেকেও তাকে সেটা শেখানো যায়। বস্তূতপক্ষে আমাদের পাঠ্যক্রমে পঠন উপাদান নির্বাচনের সময় অবশ্যই নীতিবোধ শেখানোর বিষয়টা মাথায় রাখা হচ্ছে, সচেতনভাবে কিংবা অচেতনে। হতে পারে সেটা বাংলা কিছু উপদেশমূলক গল্প, কবিতা কিংবা রচনা লিখনে ‘দেশপ্রেম’, ‘সততা’, ‘নিয়মানুবর্তিতা’, ‘অধ্যবসায়’, ‘মানবপ্রেম’ ইত্যাদি ধরাবাঁধা বিষয় টেনে এনে। তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে নৈতিকতাকে পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভূক্ত না করলেও এর অনস্বীকার্য, সূক্ষ উপস্থিতি রয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার গলদের জন্য আমরা যেমন অনেক কিছু শিখেও আসলে কিছুই শিখিনা, সেই একই পঙ্কে পড়ে আমাদের মধ্যে সামগ্রিক অর্থে নৈতিকতা চর্চারও কোন সামাজিক দায়বদ্ধতা নেই।
ইতিহাস ঘেঁটে চমকপ্রদ কিছু তথ্য পেলাম। বিদ্যালয়ব্যবস্থা প্রচলনের একদম শুরু থেকেই অভিভাবকরা প্রত্যাশা করেছেন স্কুল বাচ্চাদেরকে ভালো মানুষ বানিয়ে তুলবে, নীতিবোধ শিক্ষা দেবে পরিপূর্ণভাবে। সব প্রাপ্তির মধ্যে এ ব্যাপারটাকেই বড় করে দেখা হচ্ছিল প্রারম্ভিক পর্যায়ে। সেটা অবশ্য কেন্দ্রীভূত ছিলো বাইবেলের উপদেশমূলক বাণী আত্মীকরণের সাফল্যে। উনিশ শতকের শুরু থেকেই ‘কমন স্কুল’ ধারণাটার প্রসারের সাথে সাথে অসাম্প্রদায়িক নৈতিক শিক্ষাদানের চর্চা শুরু হলো। শিক্ষকদেরকে তুমুলভাবে প্রশিক্ষিত করে তোলা হল যেন তারা ছাত্রের চরিত্র গঠনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব নিয়ে বিবেচনা করেন। যেসব বই উপদেশমূলক গল্পে ঠাসা সেগুলো বিক্রি হলো দেদারসে। তবে, কোন ভালোই একেবারে মসৃণভাবে পথ চলতে পারেনা। সামগ্রিক এই মূল্যবোধ শিক্ষার জোয়ারে বাধা হয়ে দাঁড়ালো ধর্মীয় বিভাজন। দেখা গেলো ক্ষমতাশীলদের ধর্মই জায়গা করে নিচ্ছে নীতিবোধের কাঠামো হিসাবে। উনিশ শতকের শেষে এবং বিশ শতক জুড়ে এই দ্বন্দ্ব আর কোনভাবেই এড়ানো গেলোনা। গীর্জা আর প্রশাসনিক কাঠামোকে একেবারেই দু’মেরুতে পাঠানোর জন্য বুদ্ধিজীবীরা লড়ে যেতে থাকলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই আন্দোলন বাড়তে থাকে নানান প্রকার এবং মাত্রায়। ষাটের দশকের ইতিহাস স্মরণযোগ্য এক্ষেত্রে যখন সামগ্রিক মূল্যবোধের দেয়ালে ছোটবড় আঁচড় পড়তে লাগলো। একটা পর্যায়ে এসে বিদ্যালয়গুলো পুরোপুরি Values-free করে দেয়া হলো। বিশ শতকের শেষ চতুর্ভাগে প্রাতিষ্ঠানিক মূলোবোধ শিক্ষার প্রতি বিমুখতার কিছু ফল পাওয়া গেলো। যেমন, ছাত্রদের অর্জন ক্রমাবনত হলো, অনিয়মতান্ত্রিকতা আর ব্যবহারগত সমস্যাগুলো প্রকট হলো। নৈতিক শিক্ষা দানের ভালো উপায় তাহলে কোনটা হওয়া উচিত? ধর্মকে আনলে গোলমাল লাগছে, আবার ধর্মবিহীন একেবারে অসাম্প্রদায়িক মানবতা শেখানোর ব্যাপারেও রাষ্ট্রের সব মহল একমত হতে পারছেননা। গবেষকরা এ সময়ে দু’টো সম্ভাব্য ধারার কথা বললেন।
প্রথমটা হল, Values Clarification. ব্যাপারটা এমন, কোনটা ভালো কোনটা খারাপ এ ব্যাপারে শিক্ষকরা নিজেদের কোন মতামত দিতে পারেবননা। তারা শুধু ছাত্রদের হাতে কিছু অপশন তুলে দিবেন। প্রতিটা অপশনের ভালো, খারাপ দিকগুলো নিয়ে ভাবতে শেখাবেন। চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে ছাত্রের। সেই নির্ধারণ করবে একটা কাজ ভালো কি খারাপ। এই এপ্রোচটা যদিও ব্যাপকভাবে চর্চিত হয়েছে কিন্তু সমালোচনার মুখে পড়তে থাকলো একটা কারণে। বাচ্চারা আসলে যা শিখছে তা কোনভাবেই নৈতিকতা নয়, বরং নৈতিক আপেক্ষিকতা।
দ্বিতীয়টা হল, একটা শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিস্তারের সাথে সাথে নৈতিক শিক্ষা দেয়া। এ ধারণার প্রবর্তন করেছেন সুইস দার্শনিক Jean Piaget এবং পরবর্তীতে আরো কাজ করেছেন লরেন্স কোলবার্গ। আগেরটার সাথে এই ধারণার পার্থক্য হলো, এখানে শ্রেনীকক্ষভিত্তিক ব্যবহারিক শিক্ষা থেকে তত্ত্বীয় শিক্ষার উপরে বেশি জোর দেয়া হবে। নৈতিক উন্নয়নের ছয়টা নির্দিষ্ট ধাপের কথা বলা হচ্ছে যেগুলো একটা মানুষ ধারাবাহিকভাবে চর্চার মধ্য দিয়ে ভালোমানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারে। বিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই একটা বাচ্চা সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতরে থেকে মূল্যবোধ শিখে যাবে, এক ধাপ থেকে পরের ধাপে পা বাড়াবে।
ধর্ম সাথে থাকুক আর নাই থাকুক, বাবা মারা চান স্কুল বাচ্চাদের চরিত্র গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করুক। Moral Education এজন্য দিনে দিনে Character Education হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করেছে। বাবা মা’রা তো চেয়েই খালাস। একটা প্রতিষ্ঠানে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কীভাবে ভালোমানুষি শেখানো যাবে, এ বিষয়ে নিরন্তর গবেষণা চলছে। ধর্মে যদি নৈতিকতার একটা রূপরেখা ইতিমধ্যেই দেয়া থাকে এবং সেটা যদি সরাসরি সিলেবাসে ঢোকানো যায় তাহলে অসুবিধা কোথায়? শিক্ষাবিষয়ক চিন্তাকারকরা আবার এটাতেও ঝামেলা দেখছেন। এ বলবে, আরে আমার বাচ্চাকে স্কুলে কী সব শিখিয়ে বিধর্মী বানানোর পাঁয়তারা চলছে, ও বলবে - নাহ কীসব কূপমন্ডুকতা আমদানি করেছে। উপায় কী তবে?
অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান গবেষণার ধারা হচ্ছে প্রধান ধর্মগুলো থেকে নৈতিকতা শিক্ষার উপাদান নিয়ে সর্বজনগ্রাহ্য একটা শক্তমোক্ত সিলেবাস দাঁড়া করানো। এ বিষয়ে পরে লেখার ইচ্ছে রইলো। শুভরাত্রি।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সকাল ৮:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



